banglanewspaper

হযরত আবু আবদুল্লাহ ইবনে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেনঃ একবার রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের কিছু জোয়ানকে কুরাইশদের একটি দলের মোকাবিলার জন্য পাঠালেন। আমাদের সেনাপতি ছিলেন আবু উবাইদা। 

রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের রসদ হিসেবে এক ব্যাগ খুরমার অতিরিক্ত কিছুই দিতে পারলেন না। ক্ষুধা লাগলে আবু উবাইদা আমাদের প্রত্যেককে একটি করে খোরমা দিতেন। শিশুরা যেমন চুষে চুষে অনেক্ষণ ধরে খায়, আমরাও তেমনিভাবে খেতাম এবং খাওয়া শেষে বেশি করে পানি খেয়ে নিতাম। এতেই আমাদের পুরো একদিন চলে যেত। 

কখনো কখনো আমরা উটের খাদ্য ‘খাবাত’ নামক গাছের পাতা লাঠি দিয়ে পেড়ে পানি দিয়ে ভিজিয়ে খেয়ে নিতাম। এভাবে চলতে চলতে আমরা সমুদ্রের কিনারে গিয়ে উপনীত হলাম। সমুদ্রতীরে আমাদের সামনে পড়লো একটা বিরাট আকারের বস্তু। দূর থেকে দেখে মনে হলো বালুর স্তূপ। কাছে গিয়ে দেখি আম্মার নামক এক প্রকান্ড সামুদ্রিক জন্তু। আবু উবায়দা প্রথমে বললেনঃ ওটা মৃত। 

কিন্তু পরক্ষণেই আবার বললেন, আমরা এখন আল্লাহর রাসূলের প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর পথে জেহাদরত। এখন আমরা অনন্যোপায়। কাজেই, চল ওটাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা যাক। অতঃপর আমরা ৩০০ জন মোজাহেদ ঐ জন্তুটার উপর নির্ভর করে এক মাস কাটালাম। ওর গোশত খেয়ে আমরা বেশ মোটাসোটা হয়ে গেলাম। শুধু তাই নয়, ওর চোখের কোটর হতে আমরা কলসি কলসি চর্বিও সংগ্রহ করলাম এবং এত বড় এক টুকরো গোশত কেটে আলাদা করলাম যে, যার প্রত্যেকটা এক একটা ষাড়ের মত দেখতে।

আবু উবাইদা আমাদের মধ্য থেকে ১৩ ব্যক্তিকে ওর চোখের কোটরের ওপর বসিয়ে দিলেন এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে আমাদের সবচেয়ে বড় উটটার ওপর চড়িয়ে দিলেন। এই বোঝা বহন করে উটটি রওনা হল। আমরাও অনেক গোশত কেটে নিয়ে চললাম। 

মদীনায় যখন রাসূল(সা) কে পুরো ঘটনা জানালাম, তখন তিনি বললেনঃ “ওটা তোমাদের খাদ্য হিসেবে আল্লাহ সরবরাহ করেছিলেন। ওর কিছু গোশত কি তোমাদের সাথে আছে, যা আমাদেরকেও খেতে দিতে পার?” তখন আমরা তার কিছু গোশত রাসূলুল্লাহ(সা) এর কাছে পাঠালাম এবং তিনি তা খেলেন। (মুসলিম)।

হযরত জাবের বর্ণনা করেন যে, খন্দক যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে আমরা যখন মদীনার চারিপাশে পরিখা খনন করছিলাম, তখন এক পর্যায়ে এমন শক্ত মাটি পাওয়া গেল যার ভেতর কোদাল বসতেই চায় না। 

সবাই এসে রাসূল (সা) কে ব্যাপারটা জানালে তিনি বললেনঃ আমি আসছি। অতঃপর তিনি রওনা হলেন। অথচ তখনও রাসূল(সা) এর পেটে পাথর বাঁধা ছিল। তিনিসহ আমরা তিন দিন যাবত কোন খাবার মুখে তুলিনি। রাসূল(সা) কোদাল দিয়ে কোপ দিতেই তা নরম মাটিতে পরিণত হয়ে গেল।

আমি বললামঃ হে রাসূল! আমাকে একটু বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দিন।” বাড়ী গিয়ে আমি আমার স্ত্রীকে বললেনঃ রাসূল(সা) কে এমন অবস্থায় দেখেছি, যা সহ্য করার মত নয় (পেটে পাথর বাঁধা)। তোমার কাছে খাবার কিছু আছে কি? সে বললঃ আমার কাছে কিছু যব ও ছোট একটা ভেড়ার বাচ্চা রয়েছে। আমি ভেড়ার বাচ্চাটা যবাই করলাম আর আমার স্ত্রী যব পিষতে শুরু করল।

যখন গোশত ডেগচিতে করে চুলোর ওপর চড়ানোর পর প্রায় সিদ্ধ হয়ে এসেছে এবং যব অনেকখানি পিষ্ট হয়ে গেছে, তখন আমি গিয়ে বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল; আমার কাছে অল্প কিছু খাবার প্রস্তুত আছে। আপনি এবং একজন বা দু’জন চলুন।” তিনি বললেনঃ “খাবারে পরিমাণ কতটুকু?” আমি সঠিক পরিমাণ জানালাম। 
তিনি বললেনঃ “যথেষ্ট পবিত্র খাবার। তোমার স্ত্রীকে গিয়ে বল, আমি না আসা পর্যন্ত যেন চুলোর ওপর থেকে রুটি ও গোশত না নামায়।” অতঃপর বললেনঃ “ তোমরা সবাই চল।” মোহাজেরগণ ও আনসারগণ সবাই চললেন। আমি আমার স্ত্রীর কাছে আগেভাগে গিয়ে পৌঁছলাম। আমি বললামঃ তোমার ওপর আল্লাহ সদয় হোন। রাসূল(সা) সকল আনসার ও মোহাজেরগণ নিয়ে সদলবলে এসে গেছেন। সে বললোঃ খাবার পরিমাণ কেমন তা কি তোমার কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলেন? আমি বললাম, হ্যাঁ।

যা হোক, রাসূল(সা) সমবেত আনসার ও মোহাজেরগণকে বললেনঃ “তোমরা ভিড় করো না। একে একে প্রবেশ কর।” অতঃপর রাসূল(সা) এক এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে নিতে লাগলেন, তার সাথে গোশত যুক্ত করে চুলো ও  ডেকচি ঢেকে দিয়ে সাহাবীগণকে দিতে লাগলেন। এভাবে দিতে দিতে সবাই পেট পুরে খেল এবং আরো অবশিষ্ট রইল। 

অন্য রেওয়ায়াতে আছে যে, রাসূল(সা) গোশত ও রুটিতে সামান্য থুথু ছিটিয়ে দিলেন। এক হাজার সাহাবী পেট পুরে খেলেন এবং তারপরও ডেকচি থেকে এমন আওয়াজ এসেছিল যে, তাতে তখনো অনেক গোশত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছিল। অতঃপর রাসূল(সা) হযরত জাবেরের স্ত্রীকে বললেনঃ তোমরা খাও এবং অন্যদেরকে খাওয়ায়। কারণ বহু লোক ক্ষধার্ত রয়েছে। (বোখারী ও মুসলিম)।

শিক্ষাঃ এই দুটি ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া গেল যে, ইসলামের জন্য যারা সংগ্রাম করে তাদেরকে কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়; বিশেষত ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের পরীক্ষা অনিবার্য। এ পরীক্ষায় ধৈর্যের পরিচয় দিলে আল্লাহর সাহায্যও আসবে ইনশাল্লাহ। আল্লাহ বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে ভীতি, ক্ষুধা, জান-মাল ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে অবশ্যই পরীক্ষা করবো। যারা এতে ধৈর্যধারণ করবে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও।”

ট্যাগ: Banglanewspaper ক্ষুধা দারিদ্র্যের পরীক্ষা