banglanewspaper

নতুন আতঙ্ক পেয়ে বসেছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের চিকিৎসকদের। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের (মমেক) ভাইস প্রিন্সিপাল পদে ডা: আবুল হোসাইন যোগ দেয়ার পর থেকেই বদলী আতঙ্ক জেঁকে বসেছে অন্তত তিন শতাধিক চিকিৎসকের মাঝে। আর এ আতঙ্কের মূল কারণ ভাইস প্রিন্সিপাল পদে যোগদানের পর পরই তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় এক চিকিৎসক নেতার যুবলীগ পদধারী ছোট ভাই’র ফেসবুকে কেক কাটার ছবি ভাইরাল হওয়ায়।

গুরুত্বপূর্ণ এ পদে দায়িত্ব পাওয়া এ চিকিৎসকের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বদলী আতঙ্কে থাকা চিকিৎসকরা। তাদের ভাষ্যে, এই ভাইস প্রিন্সিপালের বিএমডিসি’র স্বীকৃত পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রী নেই। এরপরেও তিনি কীভাবে সহযোগী অধ্যাপক ও ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পেলেন এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সাধারণ চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সূত্র মতে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশক্রমে অন্ত:বিভাগীয় বদলীর জন্য সপ্তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের বদলীর জন্য গঠিত ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির একজন এই ভাইস প্রিন্সিপাল। গুরুত্বপূর্ণ এ পদে তাকে স্থলাভিষিক্ত করেছেন মূলত কেন্দ্রীয় ওই চিকিৎসক নেতা ও তার ছোট ভাই।

ফলে হাসপাতালটিতে সেবার পরিবেশ ধরে রাখতে এতোদিন হাসপাতালের ‘রোগী বান্ধব’ পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিনকে আকুন্ঠ চিত্তে সমর্থন জানানো প্রায় তিন শতাধিক চিকিৎসক রয়েছেন মহাফাঁপরে। ওই চিকিৎসক নেতার ছোট ভাইকে ‘তোয়াজ’ না করা এসব চিকিৎসকরা ভেতরে ভেতরে বদলী আতঙ্কে ভুগছেন।

এ আতঙ্কের কারণও ব্যাখা করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক। তারা বলছেন, কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে আবুল হোসাইন যোগ দেয়ার পর পরই তাকে নিয়ে রীতিমতো ‘ফেসবুক শোডাউন’ করেছেন ওই কেন্দ্রীয় চিকিৎসক নেতার ছোট ভাই।

একে অপরের মুখে কেক তুলে দিয়ে হাস্যোজ্জল ছবি ফেসবুকে নিজের লোকজনকে দিয়ে ছড়িয়ে দিয়ে প্রকারান্তরে সিন্ডিকেট বিরোধী চিকিৎসকদের ‘বদলী বার্তা’ দিয়েছেন। এ নিয়েও তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে।

এসব বিষয়ে কলেজটির সদ্য যোগ দেয়া ভাইস প্রিন্সিপাল ডা: আবুল হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, দিন-রাত ২৪ ঘন্টা জরুরি ওয়ান স্টপ সার্ভিস, শতভাগ ওষুধ সুবিধা, রোগীদের মানসম্মত উন্নত খাবার নিশ্চিতসহ একাধিক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছেন হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন আহমেদ। এ পরিচালকের দক্ষ, বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্বে যখন এ হাসপাতাল দেশের চিকিৎসা সেবার মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন কেন্দ্রীয় এক চিকিৎসক নেতার ছোট ভাই’র নেতৃত্বে সুবিধালোভী একটি সিন্ডিকেট আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে।  ক্ষমতাধর এ সিন্ডিকেটকে শেল্টার দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় ওই চিকিৎসক নেতা।

ছক কষে এ সিন্ডিকেট আবারো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফিরিয়ে এনেছে হরিমোহন পন্ডিত নিউটনকে। সম্প্রতি ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তিনি এ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। পর পর দুই বার তিনি কীভাবে একই জায়গায় ফিরে এলেন এ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন ওঠেছে।

নিয়ম অনুযায়ী এ হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের আবাসিক সার্জন (আরএস) পদে পঞ্চম গ্রেডের চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু সিন্ডিকেটের আশীর্বাদ নিয়ে এডহক ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত সিক্স গ্রেডের জাকির ঠিকই ‘ইন’ হয়েছেন এ পদে। অথচ এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া অন্য চিকিৎসকদের পঞ্চম গ্রেড পাওয়ার কোন দৃষ্টান্ত নেই।

দায়িত্বশীল একটি সূত্রের তথ্যমতে, হাসপাতালের মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিভাগে বিভিন্ন সময়ে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে হাজার হাজার টাকার পরীক্ষা পাঠিয়ে কমিশন পেতেন সিন্ডিকেটের ‘সুনজরে’ থাকা ওইসব চিকিৎসকরা। কিন্তু হাসপাতালেই সব সেবা নামমাত্র মূল্যে চালু থাকায় তাদের মাথায় হাত পড়েছে। তাদের নিজস্ব আয় কমেছে। ফলে সার্ভিস চার্জের দোহাই দিয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিসসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধে ‘আজগুবি’ সব থিউরি দিচ্ছেন।

চিকিৎসকদের বদলী আতঙ্কের বিষয়ে কোন কথা না বললেও হাসপাতালের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি সিন্ডিকেটের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন আহমেদ।

এ প্রতিবেদককে তিনি বলেছেন, ‘ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। সুবিধা বঞ্চিত চক্র দীর্ঘদিন যাবতই হাসপাতালকে অস্থির করে তোলার ষড়যন্ত্র করছে। তাদের শেল্টার দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় এক চিকিৎসক নেতা, তার ছোট ভাই ও গুটিকয়েক চিকিৎসক। আমি বিশ্বাস করি ময়মনসিংহবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে যে কোন চক্রের সব ষড়যন্ত্র রুখে দিবে।’

 

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে সীমাহীন দুর্নীতি

অভিযোগ ওঠেছে, ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই ২০১৬-১৭ বছরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ৯ কোটি টাকার ভারী যন্ত্রপাতি কিনতে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে। আরডেন্ট সিস্টেম নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ওই দরপত্রের কার্যাদেশ পাইয়ে দিতে নাম-গোত্রহীন দৈনিকে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। অতি উচ্চমূল্যে তাদের কাজ দেয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে আকাশ পাতাল পার্থক্য দেখানো হয়েছে কেনা যন্ত্রপাতির বাস্তব ও সরবরাহকৃত দামের মধ্যে। আর এসব করে চেনা সেই সিন্ডিকেটের হর্তাকর্তা থেকে শুরু করে সদস্যরা নিজেদের মাঝে পার্সেন্টিজ ভাগাভাগি করেছেন বলেও কানাঘুষা চলছে হাসপাতাল ও কলেজের অন্দরে-বাইরে। কলেজের শিক্ষা উপকরণ ও স্টেশনারী কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যাসত্য যাচাই-বাছাই করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তেরও দাবি তুলেছেন অনেকেই।

যদিও এসব অভিযোগের বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের (মমেক) প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা: মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, দুর্নীতির খবরটির নুন্যতম কোন ভিত্তি নেই। এটি মূলত মহল বিশেষের একটি অপপ্রচার। সরকারি বিধি মোতাবেকই ওই প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়েছে। উচ্চমূল্যে যন্ত্রপাতি কেনার খবরটিও ভূয়া।’

ট্যাগ: banglanewspaper ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ