banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার:

১৪ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি কিশোরী উইসেল শেখ খালিল। গাজা সিটিতে জন্ম নেওয়া খুবই সাধারণ একটি মেয়ে। গাজার রাস্তায় হেসে খেলে বেড়াতো। গণিত ও নৃত্যে অসাধারণ দখল ছিল। ভালো ছবিও আঁকতো। সবসময় রাস্তায় এক্কাদোক্কা খেলতে দেখা যেত। আর তার মায়ের ফোনে অডিও ভার্সন ডাউনলোড করে কোরআন শুনত।

যখন থেকে ইসরাইলের দখল করে নেয়া ঘরবাড়িতে ফিরতে ফিলিস্তিনিদের পদযাত্রা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচির প্রথম দিনেই একের পর এক ফিলিস্তিনিকে গুলি করে ইসরাইল। তখন ১৮-২০ জন নিহত ও কয়েকশ আহত হন। তবে উইসেল শুরু থেকেই এ কর্মসূচিতে যেতে রাজি ছিল না।
কিন্তু যখন মে ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিব থেকে পবিত্র জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরের দিন উইসেল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি।

হঠাৎ করে ক্ষোভে ফেটে পড়ল সেই শান্ত কিশোরী। পরিবারের সদস্যরা অনেক বোঝাল। বলল সীমান্তে গেলে ইসরাইলি সেনারা গুলি করে মেরে ফেলবে। পরিবারের সবাই তাকে খুবই পাহারায় রাখতো। কিন্তু কারও কথাই মানতে রাজি নয় ১৪ বছর বয়সী উইসেল।

একদিন সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ১১ বছরের ছোট ভাইকে নিয়ে ইসরাইলি অত্যাচারের রিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে চলে যায় সে। সেখানে ইসরাইলি সেনাদের গুলি ও কাঁদানে গ্যাস উপেক্ষা করেই একেবারে সীমান্তে পৌঁছে যায়।

প্রথমে সে বিক্ষোভকারীদের পানির বোতল এগিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু ইসরাইলি সেনারা দমন-পীড়ন ও অত্যাচার যখন বাড়িয়ে দেয় ক্ষিপ্ত হয়ে যায় এ ফিলিস্তিনি কিশোরী। একদম সীমান্ত লাগোয়া জায়গায় হাজির হয় সে। তার মাতৃভূমি ফিলিস্তিনকে দখল করে গড়ে তোলা ইসরাইলের কাঁটাতারের বেড়া কেটে ফেলতে চেষ্টা করে বার বার।

একপর্যায়ে ইসরাইলি সেনাদের স্নাইপার রাইফেলের নিশানায় পরিণত হয় সে। এরপর আর বেশি টিকে থাকতে পারেনি এ অপ্রতিরোধ্য বিপ্লবী। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে উইসেল।

ঝড়ো হওয়ায় উত্তাল বিক্ষুব্ধ পৃথিবী সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও জ্ঞান ছিল না যার, সেই অসম সাহসী কিশোরীই ইসরাইলের নিপীড়নবিরোধী মিছিলে শামিল হয়ে যায়। তখন ইসরাইলের অবরোধে গাজা উপত্যকার অর্থনৈতিক অবস্থা চরম দুর্দশায়। আল বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে উইসেলের পরিবারকে দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাসহ তারা ছয় ভাইবোন একটি ছোট্ট কক্ষে বসবাস করত। আবার ঠিক সময় ভাড়া শোধ করতে না পারলে তাদের সেই কক্ষে থেকে উচ্ছেদ করা হতো। শুধুমাত্র বেঁচে থাকতেই যখন হিমশিম খাচ্ছে গাজাবাসী। উপকূলীয় অঞ্চলে দারিদ্র্যের সর্বনিম্ন সীমার মধ্যে বাস করছে উইসেলের পরিবার। রাজনীতির সঙ্গে তাদের কোনো সংযোগ ছিল না।

গত এক দশকে ইসরাইল ও মিসরের অবরোধে গাজার অর্থনীতির পতন ঘটেছে। সেখানে ৪০ শতাংশ লোক বেকারত্বের মধ্যে রয়েছে। তাদের ঋণের বোঝা দিনে দিনে বাড়ছে।

ইহুদিবাদী বৈষম্যের বিরুদ্ধে সেচ্চার হয়ে মুক্তির অপ্রতিরোধ্য নেশায় উত্তাল হয়ে উঠে ছোট্ট উইসেলের মন। নিহত হওয়ার আগে সে জানিয়েছিল, এভাবে আর ইসরাইলি অত্যাচার সে মেনে নেবে না। অবশ্যই অন্যদের সঙ্গে সীমান্তে গিয়ে বিক্ষোভ করবে। এ কথা শুনে অন্য ভাইবোনরা উইসেলকে সুপ্ত করার চেষ্টা করেন। সে যাতে বিক্ষোভে না যায়, তা বোঝাতে চেষ্টা করে। পরিবারের বাধা কানেই তোলেনি উইসেল ও তার ১১ বছরের ছোট ভাই।

অন্যান্য মোজাহিদরা জানায় সেদিনের বিক্ষোভে নিহতদের তালিকায় উইসেল ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন পুরুষ। ইসরাইলের সেনাদের দিকে ছুড়তে সে পাথর নিয়ে এসে প্রতিবাদকারীদের হাতে দিত। বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে তারা সীমান্তে কালো ধোঁয়ার কু-লীর ভেতর গিয়ে ইসরাইলি নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখায়। তখনই ইসরাইলি স্নাইপারের গুলিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে উইসেল। তার ছোট ভাইটি বলেছে, সীমান্তের কাঁটাতার কাটতে গিয়েছিল তার বোন। তার হাতে একটা কাঁটাতার কাটার যন্ত্রও ছিল।

সুযোগের অভাবে তার জন্য পড়াশোনা ছিল বেশ কষ্টের। কিন্তু সে অঙ্ক করতে ভালোবাসতো। সুযোগ পেলেই গণিতের বই নিয়ে বসে যেতো। অংকে পারদর্শিতা দেখে তার শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, বড় হলে সে যেন এ বিষয়ের ওপর উচ্চশিক্ষা নেয়। এ ছাড়া অঙ্কন ছিল তার শখের কাজ। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগেও নিজের নোটবইয়ে সে বেশ কয়েকটি ছবি এঁকেছিল।

উইসেলে ছবির আঁকার খাতা বের করে তার মা বলেন, সে ছিল আমার জীবন। রাজনীতিতে অনাগ্রহী তার মেয়েটি বিক্ষোভে যোগ দেয়ার আগে তাকে বলে যায়, মা, আমি যদি মরে যাই, তবে আমাদের ছোট্ট কক্ষটিতে আমার ভাইবোনরা একটু স্বাচ্ছন্দে থাকতে পারবে। তারা থাকতে একটু বেশি জায়গা পাবে। কারণ জালে শত শত মাছ আটকে গেলে যেমন দেখায়, উইসেলরাও একটি কক্ষে সেভাবে গাদাগাদি করে থাকত।

কিন্তু অসংখ্য জীবনের করুণ পরিণতি গুলো অত্যাচারীদের বিবেকে একটুও কড়া নাড়ে না। তারা অবিরাম অত্যাচার চালিয়েই যায়। বোঝতে চায় না মজলুমদের জীবনাচরণের মূহুর্তগুলো, শুনতে চায়না মানুষের বাঁচার আকুতি। অনুধাবন করে না জীবনের পতন কোন পর্যায়ে গেলে উত্তাল হয়ে উঠে উইসেলের মতো সরল সহজ রাজনীতি বিমুখ কিশোরীর হৃদয়। 

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও উপস্থাপক

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: Banglanewspaper উইসেল