banglanewspaper

এম মতিউর রহমান মামুন: বাঙালি হিসাবে নিজেকে ধন্য মনে করি এই জন্য যে, আমাদের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর আত্রাইয়ের বাসিন্দা হিসাবে নিজকে ধন্য মনে করি এই কারণে যে আমাদের নির্বাচিত এমপি ইসরাফিল আলম।

সময় ২০০৯ সাল, রবীন্দ্রস্মৃতি উদ্ধার ও সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল পঞ্চাশ দশকে জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির সময় পতিসর রবীন্দ্র কাচারী বাড়ি থেকে যে সমস্ত রবীন্দ্রস্মৃতি চিহ্ন হারিয়ে গিয়েছে তা পূনরায় উদ্ধার করে পতিসরে পূর্ণঙ্গ রবীন্দ্র মিউজিয়াম করা। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন রবীন্দ্রস্মৃতি উদ্ধার করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে হস্তান্তর হল।

তবে  নতুন এক অভিজ্ঞতার অর্জন করলাম  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত 'পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংকের' হিসাবের মহামূল্যবান লেজারটি উদ্ধার উদ্ধার করার পর। লেজার টি নিয়ে আমরা গবেষণা করছিলাম কারণ এমন লেজার দুই রাংলার কোথায় নেই। পতিসর কৃষিব্যাংকের তথ্যাদি শুধু গবেষকদের কলমেই ছিল, বাস্তব এ ধরণের কোন খাতা-পত্র ছিল না।

গবেষণা পর যখন বুঝতে পারলেন এটা রবীন্দ্রনাথের কৃষিব্যাংকের হিসাবের খাতা তখন বগুড়ার সিনিয়র রিপোটার হাসিবুর রহমান বিলু ডেইলী ষ্টার পত্রিকায় ৫. ৩ ২০০৯ তারিখে 'টেগোর কৃষিব্যাংক ডোসিয়ার ফাউন্ড ইন নওগাঁ' শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৃষিব্যাংকের দীর্ঘ ২৫ বছরের  যাবতীয় তথ্যাদি তুলে ধরেন।

খাতাটির প্রতিটা পৃষ্টায় সিংহের হাতে আরহি ভোলানাথের মনোগ্রামের জলছাপ বসানো আছে। ম্যানেজার রেবতী কান্ত ভৌমিক স্বাক্ষরিত লেজারটির খবরটি বিশ্ব মিডিয়াতে প্রকাশের পর বেশ বড় ঝামেলাতে আমাকে পরতে হল। দেশের বাইরের (লন্ডনের) একটি চক্র তা পেতে মরিয়া হয়ে উঠে। যে কোন মূল্যে তারা তা পেতে চায়। ফোনের পর ফোন আসতে থাকে। 

ইংরেজী এবং বাংলা দু'টি ভাষাতেই তারা আমার সংঙ্গে কথা বলে। "কি চান আপনি? কত টাকা নিবেন, ৪/৫ কোটি দিলে হবে? না হলে আরও দিতে পারি' এমন আরও অনেক অফার। আমি বিচলিত! তারা লেজারটা ছিনিয়ে নেয় কি না তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। বিষয়টা নিয়ে আমি কথা বলি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্তাদের সংঙ্গে। ফোনালাপ করলাম নব নির্বাচিত এমপি মো ইসরাফিল আলম সাহেবের সঙ্গে। তাঁর পরামর্শ ক্রমেই রিজার্ভ গাড়িতে খাতাসহ আমি ন্যায়েম ভবনে তাঁর বাসাতে যাই।

রাত  নয়টায় লন্ডন থেকে আবার ফোন আসে, আমি কথা না বলে ইসরাফিল ভাইকে কথা বলতে অনুরোধ করি। তিনি তাদের সঙ্গে অনেক সময় কথা বলেন, ঐ একই কথা "কত টাকা চান? আপনার চাহিদা মত টাকা দিতে পারি, আপনি মামুনকে রাজী করাবেন" প্রতি উত্তরে ইসরাফিল আলম এমপি বলেছিলেন 'রবীন্দ্রনাথের কৃষিব্যাংকের লেজার আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ওটা দেশে থাকবে, অর্থের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ আমি বিকিয়ে দিতে পারিনা, কবিগুরু তাঁর জীবনের শ্রেষ্ট অর্জন দিয়ে পতিসরে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে গরীব চাষি প্রজাদের সহজ সর্তে ঋণ প্রদান করে দাসত্বগোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

একজন বাঙালি হিসাবে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ করা আমাদের দ্বায়িত্ব। তারপর আমি মামুনকে যতটা জানি ও রবীন্দ্র ভক্ত, ওর গবেষণার কর্ষ্টাজিত সম্পদ আপনাদের কে দিবেনা, দিলে অনেক আগেই দিতে পারতো। তাছাড়া এমপি হিসাবে আমার দেশের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমার কাধে'। ওরা যে কোন মূল্যে লেজার টা নেওয়ার জন্য মরিয়া ছিল।

রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত কৃষিব্যাংকের ওই খাতাটার মূল্য, গুরুত্ব কাঁরা বুঝতে পেরেছিল তাই যে কোন মূল্যে কেনার চেষ্টা করেছে, আমরা হয়তো তার কদর আজও জানিনি, বুঝিনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারী পরিচালনার কাজে এসে পতিসরের প্রজা সাধারণের কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রনা ও অসহায়  গ্রমীণ মানুষের বেঁচে থাকার প্রকৃিত রুপ অবলোকন করে তাদের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দাসত্ব গোলামীর জিঞ্জির থেকে রক্ষা করতে পতিসরে (১৯০৫) সালে ধারদেনা করে পতিসরে কৃষি ব্যাংক করেছিলেন।

পরে ১৯১৩ সালে নবেল প্রপ্তির পর (১৯১৪) নোবেল প্রাপ্তির সমুদয় অর্থ পতিসর কৃষি ব্যাংকে জমা করে কৃষককে সহজ সর্তে ঋণ প্রদান করেন। উদ্দেশ্য ছিল কৃষি নির্ভশীল অর্থনীতিতে কৃষককে  স্বাবলম্বী করা। তাতে কৃষক মহাজনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে এবং কৃষক অর্থনিতীতে স্বনির্ভর হলে শিক্ষায় এগিয়ে শিক্ষিত হয়ে আধুনিক স্বনির্ভর সমাজ গঠন করতে পারবে, এবং স্বাস্থের উন্নতি সম্ভব হবে। অথ্যাৎ অর্থ বৃত্তের সঙ্গে শিক্ষার যোগসুত্র বোধ করেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিসরে কৃষিব্যাংক স্থাপন করেছিলেন।

সে দিক থেকে বিবেচনা করে হলেও লেজার টা সংরক্ষণ  আমার কর্তব্যেই ছিল। দেশকে বঞ্চিত করে অর্থের লোভে এ সম্পদ আমি বিক্রি করতে চাইনি এটা বুঝবে কে? তাই এই মহামূল্যবান সম্পদটি যথাযথ সরকারকে দিয়ে দায়মুক্ত হয়েছি। এখন এই সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবহার করতে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। দুঃখের বিষয় আমাদে দেশ রবন্দ্রনাথের স্মৃতি সংরক্ষণের তেমন কোন গুরুত্ব নেই, নেই সংগ্রাহকের গুরুত্ব।

কিন্তু এটা যদি পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে হত তাহলে এর গুরুত্ব বুঝা যেত এবং রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহের যথাযথ মূল্যাযন করা হত।

লেখক রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক

ট্যাগ: Banglanewspaper রবীন্দ্রনাথ কৃষিব্যাংক