banglanewspaper

রাবি প্রতিনিধি: সাধারণত বাসায় বাবা-মা কিংবা পরিবারের সদস্যদের কারো ডাকে ঘুম ভাঙ্গে সাহরিতে। তৈরি খাবার দিয়ে সাজানো থাকে টেবিল। ইফতারের সময়েও প্রায় একই অবস্থা। বাড়িতে থাকেন তাদের কাছে পবিত্র রমজানে এগুলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু যারা বাড়ি ছেড়ে বাইরে অর্থাৎ মেস, হোস্টেল কিংবা আবাসিক হলে থাকেন তাদের ক্ষেত্রে সাহরি ও ইফতারের চিত্রটা একটু ভিন্ন। তবে সাহরি ও ইফতারে কিছুটা হলেও পারিবারিক আমেজ বিরাজ করে নগরীর সাহেববাজার মোল্লা ছাত্রাবাসে।

সাহরির সময় হয়ে গেছে। মেসের ডাইনিং কক্ষের বিশাল জায়গা হাতে গণা কয়েকজন ছাড়া ডাইনিংয়ের পুরোটাই ফাঁকা। মনে হতে পারে এই মেসের কেউ হয়ত রোজা থাকে না। কিন্তু পুরো বিপরীত চিত্র মেসের ছাদে। কয়েকশত শিক্ষার্থী একসঙ্গে এক পরিবারের সদস্য হয়ে সাহারি খেতে বসেছে। এছাড়াও ছোট ছোট ভাগে গোলচত্বর হয়ে বসে পড়েছে সবাই। বাড়ির পরিবেশের মতোই খোশগল্প করতে করতে সাহারি করছেন তারা। এদের কেউবা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কেউবা কর্মজীবী। সারাদিন যে যার মতো ব্যস্ত থাকলেও সাহারি ও ইফতার তাদেরকে এক পরিবারের মতোই একত্রিত করে দিয়েছে। বাবা-মা, পরিবার ছেড়ে ভিন্ন শহরে এসে, পরিবার থেকে দুরে থাকার কষ্টটা বন্ধু, বড় ভাই ও রুমমেটদের সঙ্গে ছাদে বসে, গল্প-গুজব করে সেহারি খাওয়ার মজাটা সাময়িক সময়ের জন্যে হলেও কষ্টটা ভুলিয়ে দেয়।

মোল্লা ছাত্রাবাসসহ আরো কিছু ছাত্রাবাস আছে যেগুলোতে তুলনামূলকভাবে কিছুটা হলেও সাহারি -ইফতার মানসম্মত হয়। তবে নগরীর বিভিন্ন ছাত্রবাসের খাবারের মানটা ভয়ানক রকম খারাপ। শুধু বাঁচার জন্য খেতে হয়- তাই খাওয়া। এসব মেসে একদিকে যেমন খাবার নিম্নমানের খাবারের দামও অন্যান্য মেসের তুলনায় অনেক বেশি। এতে নি¤œমানের খাবার খেয়ে রোজা রাখা খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে এসব ছাত্রাবাসের বসবাসকারীদের।

মোল্লা ছাত্রাবাসে অবস্থানরত রাজশাহী কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রোমিও বলেন, শিশুকাল থেকে বাবা মার সঙ্গে একসাথে বসে ইফতার করার যে সংস্কৃতি, পরিবার থেকে দূরে এসে তা আমাদের ভেঙ্গে ফেলতে হয়। আমদেরকে এই সংস্কৃতি ভেঙ্গে বাবা-মাকে ছেড়ে শিক্ষার জন্য বাইরে আসতে হয়েছে। এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন রকমের সহপাঠিদের সঙ্গে মিশতে হয়। তৈরি হয় নতুন আরেকটি পরিবার। কষ্ট হলেও নতুন পরিবারের সাথে মানিয়ে চলতে হয় আমাদেরকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং করতে আসা আশিফ জানান ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, রোজার সময় বাসায় একটা রুটিন থাকতো, মায়ের ডাকে ঘুম থেকে উঠে সাহারি করা, তারপর ফযরের নামায শেষে ঘুমিয়ে পড়া। কিন্তু মেস জীবনের চিত্রটা একেবারেই আলাদা। এখানে নিজ দায়িত্বে ওঠা, খাওয়া। ইচ্ছে হলে সাহারি খেয়ে একেবারে সকাল বেলা ঘুমাতে যাওয়া। পুরো রমজান মাসকে ঘিরে বাসায় যে একটা আনন্দ ছিল, সেই আনন্দের জায়গাটা মেস জীবনে নাই।

অন্য একটি মেসে বসবাসকারী ব্যাংক কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, মেস জীবনটা একদিকে যেমন কষ্টের, অন্যদিকে অনেক উপভোগ্যও বটে। সমবয়সী, ছোট, বড় ভাইদের সাথেই জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে হয়। রোজার সময় এখানে সাহারি ইফতারি একটা উৎসবের মত। সাহারির সময় হলেই অন্যান্য সদস্যরা ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়। ইফতারিতেও সবাই মিলে রাজ্যের যত গল্প করতে করতে খাওয়া।

তবে খাবারের মান নিয়েও বিভিন্ন সময় খুব মন খারাপ হয়ে যায়। কোনো কোনো দিন আবার রান্নাও হয় না। সেসব দিনগুলোতে বাইরে খেতে হয়। রোজার মাসেও এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে কয়েকবার।

সর্বোপরি সবকিছুর ভালো মন্দ দিক থাকে। তেমনি মেস জীবনে অনেক মন্দ দিক থাকার পরেও মেস জীবনে কাটানো সময়টা প্রতিটি ব্যক্তির হৃদয়ে গেঁথে থাকে। এখানে বিভিন্ন এলাকার বড় ভাই, ছোট ভাইদের সঙ্গে কাটানো সময়টাই সোনালী অতীত হয়ে থেকে যাবে স্মৃতির পাতাতে। পড়ালেখার

গন্ডি শেষ করে একদিন সবাই এ মেস জীবন ছেড়ে আবারও চলে যাবে, থেকে যাবে সুখে দুঃখে কাটানো হাসি কান্না মাখা এই মূহুর্তগুলো।

ট্যাগ: banglanewspaper রাবি