banglanewspaper

মোহাম্মাদ তারেক রহমান:

দেশের সকল সরকারি আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত চাকরিতে কোটা প্রথার সংস্কারের দাবিতে সম্প্রতি আন্দোলন বিক্ষোভ করছে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তবে এখন পর্যন্ত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি সরকার।

স্বাধীনতার পর সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। সে সময় মেধাতালিকা ২০ শতাংশ বরাদ্দ রেখে, ৪০ শতাংশ জেলাভিত্তিক, ৩০ শতাংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এবং ১০ শতাংশ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ নারীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার এই কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন করা হয়।

নিবন্ধিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই-আড়াই লাখ, অর্থাৎ এক হাজার মানুষের মাঝে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১.২ জন বা ১.৫ জন। যা সমগ্র জনসংখ্যার ০.১২/০.১৫ শতাংশ। ০.১২ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার জন্য কোটার পরিমাণ ৩০ শতাংশ। যা হাজারে রূপান্তর করলে দেখা যায়, এক হাজার জনতার মাঝে ১ থেকে ১.৫ (দেড়) জন মুক্তিযোদ্ধার জন্য কোটার পরিমাণ ৩০০।

এরই মধ্যে ১ম শ্রেণিতে ৫৬%, রেলওয়েতে ৪০% পোষ্যসহ ৮২% এবং প্রাইমারিতে ২০% পোষ্যসহ ৯৬%, অন্য দিকে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেনিতে ৭০% এরও বেশি কোটা আছে দেশে। এগুলো শুধু কোটায় নয় এগুলো জন্ম দিচ্ছে নানা অন্যায় আর সামাজিক অপরাধের। ফলে কোটার প্রতি বাড়ছে ক্ষোভ, বাড়ছে অসম্মান।

এবার দেখা যাক কোটা কি কি অন্যায়ের জন্ম দিচ্ছে:

১. কোটা সুবিধা পাবার আশায় টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট কেনা বেচা চলছে। আর এ জন্যই মেহেদী এমপি, শাজাহান খানসহ আরো অনেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিরুদ্ধে। এছাড়া যারা এরই মধ্যে ৮ থেকে ১০ লাখ ইনভেস্ট করেছে সার্টিফিকেট কিনতে তারা পড়েছে বিপাকে।

২. ভার্সিটিতে ভর্তির সময় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়ে ভর্তির কার্যক্রম চালাচ্ছে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। রাজনৈতিক সুপারিশ থাকায় সেই সকল অবৈধ ছাত্রদের বহিষ্কারও করা যাচ্ছে না।

৩. কোটার ফলে যেহেতু পাশ করলেই চাকরি; তাই কোটারিদের মধ্যে প্রশ্নফাঁস ও ডিভাইস জালিয়াতি করে পাশ করার একটা প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রবণতা সাধারণদের মধ্যে নেই, একটাই কারণ যে তারা পাশ করলেই চাকরি হবে এই নিশ্চয়তা নাই বললেই চলে। সাধারণদের মাঝে ১২/১৫ বার ভাইবা দিয়েও চাকরি না হবার অনেক উদাহরণ আছে। তাই লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রশ্ন ফাঁসে জড়ানোর প্রশ্নই আসে না।

৪. নতুন এক জালিয়াতি শুরু হয়েছে প্রিলি পাশ না করেই লিখিত তে পাশ ও ভাইবার জন্য মনোনিত হওয়া। অর্থাৎ জালিয়াতি করে লিখিত পরীক্ষা না দিয়েই ভাইবার জন্য মনোনিত হওয়া। এখানে যে কাজটি হয় টাকা খরচ করে একটা ফেল করা রোলকে লিস্টে ঢুকায় দেয়া। দুর্ণীতি করে লাখ লাখ টাকা খরচ করে কে এই কাজটি করতে চাইবে? যারা কোটা দিয়ে একবার ভাইবাতেই চাকরি হবার সম্ভাবনা আছে সেই কেবল রেজাল্টে রোল প্রবেশ করার প্রতিযোগিতা বাধা টপকাতে চাইবে।

৫. আর একটা অন্যায় যেটার স্বীকৃতি রাষ্ট্র নিজেই দিয়েছে সেটা হলো, একজন ব্যাক্তি একাধিকবার কোটার সুবিধা নিচ্ছে। ফলে যে কাজটি হয়, সেই ব্যাক্তি একের পর এক চাকরি নেয় কোটা সুবিধা ব্যবহার করে অন্যদিকে আগের চাকরিতে শূন্যপদের সৃষ্টি হয়। যেখানে বেকারত্বের কষাঘাতে জর্জরিত বেকারদের মাঝে হাহাকার সেখানে একই ব্যক্তির কোটা প্রয়োগ করে চাকরি পরিবর্তন জুলুম ছাড়া আর কি হতে পারে।

৬. একটা অন্যায় যেটা আজ বলতেই হবে, তা হলো ২০% থেকে ৪০% পোষ্য কোটা। রেলওয়েতে ৪০% পোষ্য কোটাসহ ৮২% কোটা বিদ্যমান। অন্যদিকে প্রাথমিকে ২০% পোষ্য কোটা সহ ৯৬% কোটা বিদ্যমান। আমি মনে করি জাতিকে মেধাশূন্য করার চরম নীল নকশা এই পোষ্য কোটা। অন্যায় আর জুলুমের চরম বহিঃপ্রকাশ এমন পোষ্য কোটা। আর এর তদন্ত করা উচিত যে পোষ্য কোটার মত এই নীল নকশার মাস্টারমাইন্ড কোন মহান ব্যাক্তি। জাতির বেকার সমাজের সাথে প্রহসন করা এই মানুষগুলোকে বিচারের আওতায় আনা উচিত।

এই বিষয়গুলো বেশির ভাগ তথ্য নির্ভর, কিছুটা মুখে মুখে শোনা এবং কিছুটা আমার ব্যক্তিগত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। সকল কোটাধারী এমন অন্যায় পথ অবলম্বন করে তা নয়। কোটাধারী যারা মেধাবী তারা তো আর কোটায় চাকরি নেন না, তারা সাধারণের ৪৪% এ এসে ভাগ বসান। ফলে সাধারণদের জন্য যে ৪৪% বলে আসছি তাও আর থাকে না ১ম শ্রেণির চাকরিগুলোতে। 

আর একটা বিষয়, যেহেতু কোটাধারীরা কোটা পাচ্ছে তাদের মনবলটাও বেশি সাধারণদের চেয়ে। আমাদের সাধারণ বেকারদের মত তাদের হতাশা নিয়ে তাদের পড়াশুনা করতে হয় না। ফলে এখনেও একটা অদৃশ্য বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে সাধারণ বেকাররা, যা সমাজের দৃষ্টিতে দৃশ্যত অন্যায়।

এ ভাবেই সমাজে অন্যায় সমূহ দানা বাদছে, পাল্লা ভারী অলস আর অসৎ একটা শ্রেনির, যাদের কিনা শর্টকাটে উপরে উঠার প্রবণতা আছে, যাদের টেবিলের নীচে লেনদেন করেই কর্মজীবন শুরু হয়েছে। এইসব লোকের মাস শেষে ৫ লাখ টাকার টার্গেট থাকা যে অস্বাভাবিক তা বলতে চাই না আমি।

অন্যদিকে যারা পরিশ্রম করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, লাইব্রেরির সামনে ফজর নামাজের পড়ে তাদের ব্যাগ হাতে লাইন লম্বা হতেই আছে। লাইন লম্বা হচ্ছে আর একটা করে বছর পার হচ্ছে। লাইন লম্বা হচ্ছে আর ক্ষীণ  হয়ে আসছে বেচে থাকার স্বপ্ন। মাঝে মাঝে দুষ্টামির সুরে, কষ্ট ভরা কন্ঠে বড় ভাইদের মুখে শুনা যায়, ‘গার্লফ্রেন্ডের বয়স হয়ে গেছে বিয়ে দিতে হবে।’

লেখক

যুগ্ম আহবায়ক,

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: Banglanewspaper মোহাম্মাদ তারেক রহমান কোটা শিক্ষার্থী