banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার []

এখনকার মতো তখন রমজান মাস ছিল। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। ইফতারের মাত্র ১ থেকে দেড় ঘণ্টা বাকি। আমরা সবাই প্রাতিদিনের মতোই বার্তাকক্ষে ব্যস্ত। আমার ডেস্কের পাশেই বসে পত্রিকার সম্পাদক। যার কারনে সম্পাদকের সঙ্গে অধিকাংশের কথপোকথন আমরা প্রায়ই শুনতে পাই। সম্পাদক ও প্রকাশক সব মিলিয়ে তিনিই প্রতিষ্ঠানের একনায়ক। হঠাৎ করে সম্পাদকের কাছে একজন লোক আসলেন। বয়স চল্লিশের উপরে। এর আগেও তিনি বেশ কিছু সংবাদপত্রে কাজ করে এসেছেন, বর্তমানে তার কোন কাজ নেই। মূলত একটি কাজের উদ্দেশ্যেই তিনি সম্পাদকের কাছে এসেছিলেন। 

বর্তমানে তার কোন কাজ নেই এবং তার একটি কাজ খুবই দরকার। লোকটি সংক্ষিপ্ত কথায় ও তার চোখের ভাষায় সম্পাদককে ভালোভাবেই বোঝিয়েছেন। সম্পাদকও বোঝতে পেরেছিলেন, সঙ্গে যারা শুনেছেন তারাও। এরপর সম্পাদক কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। এক পর্যায়ে সম্পাদক বললেন আমাদের এখানে এখন তেমন কোন লোকবলের প্রয়োজন নেই। তারপরও তুমি যেহেতু এসেছো তোমাকে তো আর ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। 

কিন্তু লোকবলের প্রয়োজন আছে নাকি নেই আমরা যারা বর্তমানে কাজ করছি তারা হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছি। ততক্ষণে আমারাও বোঝে গেছি সম্পাদক লোকটির বেকারত্ব ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে চাচ্ছেন। 

আমরা যারা সেখানে কাজ করতাম তারা সবাই রাষ্ট্রীয় আইনে মজুরির পরিমাণ, তাদের শ্রম, যোগ্যতা ও চাহিদার চেয়ে নগণ্য মজুরি পেতাম। আমি তখন শিক্ষার্থী ছিলাম যার কারণে আমাকে সে মজুরি মেনেই কাজ করতে হয়েছে। অন্যরাও পরিস্থিতি ও বাস্তবতার শিকার হয়ে সে মজুরি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। 
সেদিন সম্পাদক আগত লোকটিকে আমাদের চেয়েও স্বল্প একটি মজুরির প্রস্তাব দিলেন। যা তার জন্য ছিল দু’চার দিন অভ্যাসজাত দ্রব্য সেবনের চেয়েও নগণ্য। তিনি বললেন তুমি যদি এ মজুরির মধ্যে থাকতে চাও তাহলে থাকতে পারো। তখন লোকটির চেহারায় খুবই অসহায়ত্বের একটি প্রদীপ জ¦লে উঠল। সম্ভবত এটি সেদিন উপস্থিত কেউ লক্ষ্য করেছে কিনা তা বলতে পারবো না। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছিলাম দারুণভাবে। 

লোকটিকে আমার মনে হয়েছিল বহুদিন ধরে মরুভূমির মধ্যে পথ হারিয়ে দিশেহারা ও প্রচ- তৃষ্ণাত্ব কোন পথিক হঠাৎ কোন এক কূপের সন্ধান পেয়ে গেল। কিন্তু বহু পরিশ্রম ও চেষ্টা করার পরও বৃহৎ এ জলভা-ার হতে সে শিশির বিন্দুর মতো ১ ফোটার বেশি নিতে পারলো না। লোকটির চেহারার দিকে তাকিয়ে তখন আমি আমার চক্ষুকে স্থির করতে পারছিলাম না। মনে হয়েছিল, আহ! এ মূহুর্তের জন্য যদি আমি অন্ধ হয়ে যেতাম। কারণ তাকে সাহায্য করার মতোও কোন সামর্থ যে আমার ছিলনা। 

এরপর লোকটিকে দৈনিক প্রায় ১০-১২ ঘণ্টার কাজ বোঝিয়ে দিল। পরদিন থেকে কাজে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েই লোকটি বিদায় নিল।

বাল্যকাল থেকে মক্তব, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত আমরা শিক্ষা গ্রহণ করে এসেছি। সেখানে সবসময় আমরা অধিকার, সত্য, ন্যায়, সমতা ইত্যাদি ইতিবাচক বিষয়েই কেবল শিক্ষা গ্রহণ করেছি। কিন্তু বাস্তব জীবনে পর্দাপণ করার পর অধিকার আদায় করার চেয়ে অধিকার হরণ করা বেশি শিখেছি, সত্যের চেয়ে মিথ্যা বলতেই বেশি শিখেছি, ন্যায়ের চেয়ে অন্যায় করতেই শিখেছি বেশি, সমতা রক্ষা করার চেয়ে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করতেই শিখেছি দারুণভাবে। 

যারা আমাদের পুস্তক ও মৌখিকভাবে অধিকার, সত্য, ন্যায়, সমতা এসব শিখিয়েছিল কাজে কর্মে তারাই আবার আমাদের এসবের বিপরীত দেখিয়েছে। নিষ্ঠুর ও কঠিন হতে শিখিয়েছে বাস্তব জীবনের আঁকে বাঁকে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধ্য করেছে অসৎ হতে। সবকিছুই শিখেছি। পেয়েছি বাস্তব জীবনের অনাকাঙ্খিত স্বাদ। 

কিন্তু তখনও শেখা হয়নি কিভাবে অপরের অসহায়ত্বের সুযোগ ব্যবহার করতে হয়। সেদিন সেটিও আর শেখার বাকি রইল না। শুধু হাতে বই পুস্তকে বা কোন শিক্ষকের কাছে নয়। সেটিও বাস্তবেই শিখে নিয়েছি সেদিন। 


লেখক: কবি, সাংবাদিক ও উপস্থাপক

ট্যাগ: banglanewspaper সুযোগ