banglanewspaper

ঢাকার রাস্তায় প্রায়শই উল্টাপথে গাড়ি চালাতে দেখা যায় প্রভাবশালীদের। মন্ত্রী, পুলিশ অফিসার ও সাংবাদিকদেরই এ কাজ করতে বেশি দেখা যায়। ট্রাফিক পুলিশও যেন তাদের প্রতি একটু ‘উদার’। তবে এ ট্রাফিক পুলিশ অন্যদের চেয়ে ভিন্ন। উল্টোপথে আসা জাতীয় পতাকাবাহী একটি গাড়িকে মাঝ রাস্তায় থামিয়ে দিয়েছেন এ পুলিশ অফিসার।

গাড়িটির পেছন পেছন আরেকটি গাড়িও উল্টাপথে আসছিল। এ পুলিশ কর্মকর্তা দুটি গাড়িকেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। 

প্রত্যক্ষদর্মী একজন এ দৃশ্য ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট করেন। ভিডিওটিতে অনেকেই পুলিশ কর্মকর্তার ‘সাহসিকতার’ প্রসংশা করেছেন। 

কবির হোসেন নামের একজন লিখেছেন ‘সব পুলিশ অফিসার যদি এমন হতো, তাহলে সত্যি দেশটা ডিজিটাল হয়ে যেত।’

উল্টোপথে আসা একটি ভিআইপি গাড়ি, বনেটে জাতীয় পতাকা; তার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা। গাড়িটিকে উল্টোপথ থেকে ঘুরে সোজা রাস্তায় যাওয়ার মিনতিটা ছবিতে স্পষ্ট। জানা যায়, শেষ পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তার অনড় অব্স্থানে ঘুরেও যায় গাড়িটি। সামাজিক যোগাযোগ্য মাধ্যমে এ ছবি ছড়িয়ে পড়লে ছবির সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে স্যালুট জানিয়ে ধন্যবাদে ভাসিয়েছেন অনেকেই।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে কথা হয় ছবিতে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা রমনা ট্রাফিক জোনের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) তারিকুল আলম সুমন। জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘যেকোনো সাধারণ গাড়ি উল্টোপথে এলে আমরা মামলা করে দেই। কিন্তু একজন মন্ত্রীর গাড়ি যখন পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে আসে, তখন মামলা করা যায় না। তখনই হাতজোড় করতে হয়, হাতজোড় করে তাদের ঘুরিয়ে দেই।’

গতকাল বুধবার (৬ জুন) বিকেলেও রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকসহ কয়েকজন মন্ত্রীর গাড়িকে উল্টোপথে আসার কারণে ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে জানান সুমন। আর যে ছবিটি আজ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি শিল্পমন্ত্রী আমীর হোসেন আমুর গাড়ি। সুমন বলেন, ‘আমি দেখছিলাম, গাড়ি আসছিল উল্টোপথে। অনেক দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করে গাড়িটিকে ফিরে যেতে বলা হলেও চালক আমলে নেয়নি। পরে হাতজোড় করেই দাঁড়িয়ে যাই গাড়ির সামনে।’

এ সময় গাড়ি থেকে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নেমে আসেন। কিন্তু সুমন ছিলেন তার দায়িত্বে অবিচল। খুব বিনয়ের সঙ্গে তিনি ওই কর্মকর্তাকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যেতে অনুরোধ জানান। সুমন বলেন, ‘হাতজোড় করে বলেছি, আপনারা যেতে পারবেন না। আমি যেতে দেবো না। পরে তারা গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যায়।’

প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন তারিকুল আলম সুমন। গত বুধবার থেকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধা ও যমুনার মাঝখানের রাস্তাটুকুতে অভিযান চালাচ্ছেন তারা। এ সময় কোনো গাড়িকেই উল্টোপথে যেতে দিচ্ছেন না। অভিযান শুরুর পরদিন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের গাড়িও ঘুরিয়ে দিয়েছেন জানিয়ে সুমন বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী আসছিলেন চারটি গাড়ি নিয়ে। তখন স্যারের গাড়িও ঘুরিয়ে দিয়েছি। তিনি চলে গেছেন।’

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি বেশ সাহসিকতার কাজ— বলতেই এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আসলে সাহসিকতার বিষয় নয়, উল্টোপথে গাড়ি যেতে দেওয়ার জন্য সিনিয়র নির্দেশ দিলে তখন আর কিছু করার থাকে না। কিন্তু দেখা যায়, উল্টোপথে আসা গাড়ির মধ্যে শতকরা ৮০ শতাংশই ভিআইপিদের। তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সিনিয়র সচিব, পুলিশ কর্মকর্তারা। বাকিরা সাধারণ মানুষ। আমরা সেই ৮০ শতাংশকে কিছুই করি না, বাকি ২০ শতাংশ সাধারণ মানুষের যানবাহনকে মামলা দিয়ে দেই। এটা আমার বিবেকে লাগে।’

সুমন বলতে থাকেন, ‘একজন মন্ত্রীর গাড়ি উল্টোপথে এসে গর্বের সঙ্গে চলে যাচ্ছে, আর আমি একজন সাধারণ মানুষকে ৯০০ টাকার মামলা দিচ্ছি— এটা আমার বিবেককে দংশন করে। তখনই চিন্তা করলাম, মামলা তো করতে পারব না, অন্তত গাড়িগুলো ঘুরিয়ে দিতে পারব। সেই ভাবনা থেকেই এই কাজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘স্যারদের সঙ্গে তো আমি সরাসরি কথা বলি না। আবার তাদের গাড়িকে মামলাও দিতে পারব না। তাই গাড়ি ঘুরিয়ে দেই।’

 

ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন>

 

 

ট্যাগ: banglanewspaper পুলিশ