banglanewspaper

এম মতিউর হহমান মামুন ॥ বাংলাদেশে মাদক-বিরোধী বিশেষ অভিযানে নিহতের সংখ্যা ১৪৯-এ পৌঁছেছে। বে-সরকারী কিছু সংস্থার মতে আরও বেশি। সারাদেশে আটক হয়েছে তের হাজারের মত । অপরাধ ঠেকাতে সরকার আরো কঠোর বলেই মনে হচ্ছে। সকারের মাদকবিরোধী অভিযান দেশের সাধরণ মানুষ গ্রহণ করলেও মানবাধিকার সংগঠন তা মানতে নারাজ তাঁরা এটি বিচার বহিঃভূত হত্যা বলছে। এক্ষেত্রে আমার ধারণা  সরকারে সকল পদক্ষেপের শুধু  কঠোর  সমালোচলনা না করে  পাশাপাশি গঠণ মূলক আলোচনা ও স্থায়ী সমাধানের পরামর্শই জরুরী।  অতীতেও তাঁরা সরকারোর জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযানে একই কথা বলেছিলেন। অতছো দেশ-মাত্রিকার সন্মান বাঁচাতে গিয়ে যে, গর্বিত পুলিশ সদস্য আত্মত্যাগ করেছিলেন তাঁদের নাম কখনো উচ্চারণ করেননি, তাতের পরিবারের খোঁজখবর রাখেনি। বরং পুলিশ অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে মরলোনা কেন সেটাই ছিল তাঁদের মাথাব্যাথার কারণ। যাহোক বাংলাদেশে মাদক ব্যবসা এবং পাচারের সাথে জড়িত সন্দেহভাজনদের আইনের আওতায় আনার জন্য মাদক বিরোধী আইন রয়েছে। বাংলাদেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসেব ও বিভিন্ন গণমাধ্যমেরর তথ্যনুযায়ী  ২০১৭ সালে মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে মোট ১১৬১২টি। চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৩২৮৯টি। পত্র-পত্রিকায় ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যনুযায়ী ২০১৭ সালে ২৫৪৪টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১০১৬টি মামলায় আসামীর সাজা হয়েছে।" আর আসামী খালাস পেয়েছে ১৫২৮টি মামলায়। ওদিকে, সারা দেশে এই বিশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত  ৪৯জন নিহত হওয়ার ঘটনার কথা জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। এদিকে সহযোগী এক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও পুলিশ সদর দপ্তরেরর হিসাব  অনুযায়ী ২০১৩ সালে মাদক আইনে মামলা হয়েছে ৩৫ হাজার ৮৩২টি। পরের বছর মামলা প্রায় সাত হাজার বেড়ে হয় ৪২ হাজার ৫০১টি।

২০১৫ সালে মাদক আইনে মামলা আরও বাড়ে পাঁচ হাজারের মতো। ওই বছর মামলা হয় ৪৭ হাজার ৬৭৯টি। পরের বছর মামলা বাড়ে ১৫ হাজারের বেশি। ওই বছর মামলা হয় ৬২ হাজার ২৬৮টি।

বিগত  বছরে তুলনায় এ বছরের  মামলা বেড়েছে ২৫ হাজারেরও বেশি। এই বছর মামলা হয় ৯৮ হাজার ৯৮৪টি। অর্থাৎ প্রতি দিন মামলা হয়েছে ২৭১টি। প্রশ্ন আসতে পারে মামালা গুলো দ্রত নিস্পত্তি হচ্ছেনা কেন? এ প্রসঙ্গে ইতপূর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন 'সাক্ষীর অভাবে মাদক সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিস্পত্তি   করা সম্ভব হচ্ছে না। যুব সমাজকে মাদকদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখার কৌশল নির্ধারণে একটি  বোর্ড গঠন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন  তিনি।   এবং  প্রতি তিন মাস পরপর এ বোর্ডের সভা হবে বলেছিলেন'।  এ কথা তো সঠিক বলেই মনে হয় মামলা যখন পুরাতন হয়, সাক্ষীরা অনেক কিছুই ভুলো যায়, আবার আসামীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে সাক্ষীদের নিজের পক্ষে বলতে বাধ্যকরে। এ জন্য সাক্ষী সু-রক্ষা আইন জরুরী।

এত  কিছুর পর কি মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশ কে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে?  দেশের যুব সমাকে ভয়াবহ মাদক থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়েছে? এরজন্য দরকার সামাজিক আন্দোলন,  সাংস্কৃতিক আন্দোলন। দরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা এবং প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের জনবল বৃদ্ধি করে একে আরো শক্তিশালী, গতিশীল ও আধুনিক করা, দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা উপজেলা  পর্যায়ে মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা। আমরা জানি দেশে বর্তমান সরকারি চারটি এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) তত্ত্বাবধানে ৬৫টি মাদক নিরাময় কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। তবে সেগুলো কতটা যথাযথ পরিচালিত হচ্ছে তা  সরকারের পক্ষ থেকে খোঁজ খবর নেওয়ার বিশেষ কমিটি গঠন করে ঐ সংস্থা সহয়োগিতা  দেয়া। তা ছাড়াও সরকারি তত্ত্বাবধানে নতুন নতুন মাদক নিরাময় কেন্দ্র জরুরী ভাবে  স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার ।  মাদক সংক্রান্ত মামলায় বিভিন্ন কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের জন্যও বিশেষ মাদক নিরাময় কার্যক্রম শুরু করার কথা ছিল তা কতটা হয়েছে জানিনা, তবে দ্রত করা দরকার।    মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শক্তিশালী করতে পুরোনো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনও সংশোধন জরুরী। এ প্রসঙ্গে সরকার দলীয় এম, পি ইসরাফিল আলম বলেছেন 'অস্থায়ী সমাধানের জন্য স্থায়ী সমস্যা সৃষ্টি করা রাজনৈতিক সরকারের জন্য সহায়ক হয় না। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এবং আগ্রাসী ছোবল থেকে দেশ জাতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য সরকার জিরো টলারেন্সসহ অল আউট ফাইট শুরু করেছে তার ফলে প্রতিদিনই প্রায় গড়ে ৪/৫ জন মাদক ব্যবসায়ী নাম ধারীরা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে। পদক্ষেপটি জনগনের সমর্থন পেলেও এ ধরনের ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের জন্য প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনেনি।

বিজ্ঞ  রাজনীতিবিদ এই সাংসদ আরও মন্তব্য করেছেন  মাদকের সমস্যা মানব সভ্যতার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং হ্রাস পেয়েছে কিন্তু নির্মূল হয় নাই। বাংলাদেশে মাদক সমস্যার সৃষ্টি আশির দশক থেকে দৃশ্যমান রূপ লাভ করলেও রাষ্ট্রের প্রভাবশালীদের দৃষ্টি সেদিকে গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়নি।

 ইসরাফিল আলম   বলেন, সম্প্রতি প্রভাব এবং তার কুফল সম্পর্কে অবগত হয়ে সরকার যে অভিযান পরিচালনা করছে তার আইনত নৈতিক ভিত্তি নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। তবে একটি ভাল কাজের যাত্রা পথ যদি মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও আইনের মৌলিক বৈশিষ্টগুলোকে ধারণ না করে তাহলে তার চূড়ান্ত ফলাফল অভিযান পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে যায়। মাদকবিরোধী অভিযানে মাদকের অবস্থানকে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিশ্চয়ই সামাজিকভাবে অনেকটাই পরিত্রাণ দিচ্ছে এবং দিবে কিন্তু কোন স্থায়ীত্বশীল কাঠামো বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। যেমন যে ব্যক্তিটি মারা যাচ্ছে তার আপনজন পরিবার প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরা কোনভাবেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে না এবং তাদের মানবিক হৃদয়ে স্বজন হারানোর যে স্থায়ীক্ষত তা চিরদিন তাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াবে। সে জন্য ক্ষতিগ্রস্থ হবে রাজনৈতিক সরকারের তৃণমূলের রাজনীতি এবং বুদ্ধিজীবিসহ মানবাধিকারকর্মীদের কঠিন সমালোচনা তাই অভিযানের পাশাপাশি সরকারের উচিত সংশোধন, পূনর্বাসন ও মাদকের উৎস মুখগুলোকে বন্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরামর্শ তিনি প্রদান করেন। আমার যতটা মনে পরে  ইতপূর্বে মেক্সিকো, ফিলিপাইন, ব্যাংকক, ভেনিজুয়েলা, সাউথ আফ্রিকা, মালেশিয়া এমন মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছিলো কিন্তু সফলতা কতটুকু পেয়েছিলো তা দেখা দরকার। প্রয়োজনে আমাদের যে,  গর্বিত নির্লোভ পুলিশ কর্মকর্তা আছে তাঁদের মেধা প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে বর্ডার, নৌপথে সিসিটিভি  ক্যামেরার আওতায় নিতে পারলে কিছুটা পরিত্রান পাওয়া যেতে পারে। সব চেয়ে ভালো হয় প্রতিটা পরিবারের নিজের মত করে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত করা, সমাজ প্রধানদের, বিশেষ করে চেয়ারম্যান, মেম্বার,জনপ্রতিনিধি,  সুশিল সমাজের প্রতিনিধি তাদের নিজ অবস্থান থেকে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচানলা ছাড়া আমাদের পরিত্রান বরই কঠিন।  তাদের সহযোহিতা করবে সরকার। ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর তাদের অর্পিত দ্বায়িত্ব পালন করতে  না পারলে 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন ও পূর্নবাসন বিষয়ক মন্ত্রানালয়'  গঠন  করা যেতে পারে।

লেখকঃ রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক

 

 

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper মাদক