banglanewspaper

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট: মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে নানামুখি কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে লালমনিরহাট জেলা পুলিশ। একদিকে মাদক পাচারকারী, বহনকারী এবং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দিনরাত চলছে বিশেষ অভিযান, অপরদিকে মাদক চোরাচালানপ্রবণ এলাকা গুলোর বাড়ি বাড়ি গিয়ে চালানো হচ্ছে মাদক বিরোধী প্রচারণা।

ফলে প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি ধরা পড়ছে চিহ্নিত ও কুখ্যাত মাদকের ব্যবসায়ীসহ গডফাদাররা। এতে করে কমে আসছে মাদকের সহজলভ্যতা, আর জনমনে ফিরেছে অনেকটাই স্বস্তি।

দেশব্যাপি মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান শুরুর পর গত ১৫ দিনে লালমনিরহাট পুলিশ বিপুল পরিমাণ গাঁজা, ফেন্সিডিল, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার করে। এসব অভিযানের সময় এশার আলী নামে একজন কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় এবং দুইজন মাদকের গডফাদার পুলিশের গুলিতে আহত অবস্থায় আটক হয়।

মাদক পাচারে দেশের অন্যতম বৃহত্তম ও নিরাপদ রুট হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে এসব মাদক বিরোধী অভিযানের আগে গত প্রায় দু’বছর ধরে জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এসব এলাকার মাদক পাচারকারী ও ব্যবসায়ীরা। ফলে বাধ্য হয়ে দেশে প্রথমবারের মত আত্মসমর্পণ করে সীমান্ত এলাকার চিহ্নিত শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী। অভিশপ্ত জীবন থেকে তাঁরা ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনে আর সবজি চাষ, মুদি ব্যবসাসহ শুরু করেন বিভিন্ন কর্মমুখি পেশা।

মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের এমন সাফল্যে খুশি স্থানীয় সাধারণ মানুষজন। তাঁরা জানান, দেশব্যাপি মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান কিছুদিন আগে শুরু হলেও লালমনিরহাটে মূলত এ অভিযান শুরু হয়েছে প্রায় দু’বছর আগেই। জেলার পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হকের নেতৃত্বে দু’বছর ধরে জেলায় মাদক চোরাচালান, ব্যবসা নির্মূলে বিশেষ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পেশাজীবিদের সাথে মতবিনিময়, পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট বিতরণ, জনসচেতনতামূলক কর্মকান্ড চালানো হয়।

সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে লালমনিরহাটের প্রধান সমস্যা মাদক সমস্যা। প্রায় প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে গত তিন দশক ধরে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য চোরাচালান হয়ে আসছে। জেলার সীমান্ত এলাকার কয়েক’শ পুরুষ, নারী এমনকি শিশুরাও এসব মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িত। সামান্য কয়েকটা টাকার আশায় এসব মানুষ সহজেই মাদক পাচারের কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

জেলা পুলিশের অব্যাহত বিশেষ অভিযানের মুখে গত দুই বছরে বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৩০ হাজার বোতল ফেন্সিডিল, ৪ হাজার কেজি গাঁজা, ১৫ হাজার ইয়াবা টেবলেট, ১৯ হাজার পুড়িয়া হেরোইনসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়। সেই সাথে মাদক সংশ্লিষ্ট ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় প্রায় ২ হাজার জনকে।

অপরদিকে দেশব্যাপি মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান শুরুর পর জনচেতনতামূলক কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে জেলা পুলিশের সদস্যরা গত এক সপ্তাহ ধরে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাদক ব্যবসা থেকে দুরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন।

গত রবিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন সীমান্তবর্তী মাদকপ্রবণ এলাকা হিসেবে খ্যাত ইউনিয়ন গুলোর কয়েকটি গ্রামের বেশ কিছু মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি যান পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। একইভাবে পরদিন সোমবার যান সদর উপজেলার কুলাঘাট ও বড়বাড়ি ইউনিয়ন এলাকায়। সেখানকার তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে চালানো হয় একই কার্যক্রম। প্রায় প্রতিদিনই চলছে পুলিশের এ রকম উদ্যোগ।

পুলিশের এমন উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন জেলার সুশিল ও নাগরিক সমাজ। জেলা সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর সদস্য ক্যাপ্টেন (অবঃ) আজিজুল হক বীর প্রতীক বলেন, উপর্যুপরি মাদক বিরোধী অভিযানে বেশ কিছু মাদক ব্যবসায়ী এক সাথে আত্মসমর্পণ করার নজির গোটা দেশের মধ্যে লালমনিরহাট পুলিশই উদহারণ সৃষ্টি করে। অভিযানের পাশাপাশি পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে জনসচেতনতা সৃষ্টির যে কাজটি করা হচ্ছে তাকে আমরা সমর্থন ও সাধুবাদ জানাই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর জেলা সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক বীর মুক্তযোদ্ধা এস এম শফিকুল ইসলাম কানু বলেন, অনেক সময় শুধু বল প্রয়োগের মাধ্যেমে মাদকের মত ভয়াবহ সামাজিক সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়না। সেক্ষেত্রে লোকজনের মাঝে মাদক বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে জনসচেতনতা বাড়াতে জেলা পুলিশের প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে।

বর্তমান পুলিশ সুপার এ জেলায় যোগদানের পর তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তাঁর মাদক বিরোধী প্রচারণা এখানকার জনসাধারণের মাঝে আশার আলো জাগিয়েছে।

লালমনিরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(এ সার্কেল) সুশান্ত কুমার সরকার জানান, সীমান্তের গ্রামগুলোর অজ্ঞ ও স্বল্প শিক্ষিত মানুষগুলো সামান্য লোভে পড়ে মাদক চোরাচালানীর সাথে যুক্ত হয়। বর্তমান সরকারের মাদক বিরোধী অভিযান ও পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারনে মাদক ব্যবসায়ীরা আত্মগোপন করেছে। তাই মাদক ও চোরাচালান নির্মুলে সীমান্তবর্তি গ্রামের মানুষদের মাঝে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে।

লালমনিরহাট পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক বলেন, মাদক একটি সামাজিক সমস্যা এবং একই সাথে এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যাও বটে। মাদক নির্মুলের আন্দোলনে সমাজের প্রতিটি মানুষকে সম্পৃক্ত করতে এ প্রচারাভিযান। মাদকের বিরুদ্ধে যে কঠোর পদক্ষেপ গত দু’বছর ধরে চালানো হচ্ছে সম্প্রতি তা আরও জোরদার করা হয়েছে।

যারা মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন তাদেরকে আত্মসমর্পণ করে আলোর পথে ফিরতে আহবান জানানো হচ্ছে। পরবর্তীতে মাদক ও চোরাচালান নির্মুলে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে। মাদকের গডফাদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।।পর্যায়ক্রমে জেলার প্রতিটি সীমান্তবর্তি গ্রামে এ কার্যক্রম চলবে।

ট্যাগ: Banglanewspaper লালমনিরহাট পুলিশ