banglanewspaper

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইসলামি উৎসবগুলোর প্রভাব অনস্বীকার্য। ঈদ মানেই বাজার চাঙ্গা। অর্থনীতি গতিশীল। ফুটপাত থেকে বড় শপিংমল সবখানেই ক্রেতার ভিড়। কাপড় আর পাদুকার বাজার অতিক্রম করে ইলেকট্রনিক্স বাজরে এমনকি ব্যাংকপাড়া পর্যন্ত ঈদের ইতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একটু বেশি মুনাফা অর্জনের আশায় ব্যবসায়ীরা থাকে ঈদের অপেক্ষায়।

দুই ঈদের মধ্যে অর্থনীতিতে ঈদুল ফিতরের ভূমিকাই বড়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিআইয়ের সমীক্ষা মতে, রোজা ও ঈদে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার জোগান আসে।
ইসলামপুরেই প্রতিদিন প্রায় শতকোটি টাকার কাপড় বিক্রি হয়। সারা বছর যা বিক্রি হয় তার ৩০-৪০ ভাগই বিক্রি হয় রমজান মাসে। প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার পাদুকা বিক্রি ঈদুল ফিতর কেন্দ্রিক। যাতায়াত খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার খরচ হয়। (সকালের খবর : ২০-০৬-২০১৭)।  
ঈদ অর্থনীতিতে গতিশীলতা তৈরিতে ফিতরার একটা বিরাট ভূমিকা আছে। এফবিসিএইয়ের তথ্য মতে, ধনীদের দেওয়া জাকাত ও ফিতরা বাবদ অর্থনীতিতে যোগ হয় ৬৭ হাজার কোটি টাকা। (আমাদের সময় : ১৮-০৬-২০১৭)।
জাকাত ও ফিতরার এ বিশাল অর্থে ঈদ অর্থনীতিতে বিশাল ফ্যাক্ট। অনেক গরিব মানুষ ফিতরার টাকায় তাদের সন্তান ও পরিবার পরিজনের জন্য ঈদের পোশাক কেনেন। ফলে ধনী থেকে গরিবের হাত হয়ে ব্যবসায়ী পর্যন্ত চলে যায় ফিতরার উপকারিতা। আর সদকাতুল ফিতরের মূল লক্ষ্যও গরিবদের সাময়িক অভাব পূরণই।
ইসলামী অর্থনীতিতে দারিদ্র্য বিমোচনে চূড়ান্ত ব্যবস্থা হলো জাকাত। আর ঈদকেন্দ্রিক গরিবদের সাময়িক খাবার ও নিত্যপ্রয়োজন পূরণের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে ফিতরার। ফিতরার মাধ্যমে গরিব মানুষগুলো সাময়িকভাবে অভাব পূরণের ব্যবস্থা হবে আবার ধনীরা তাদের রোজায় অনাকাক্সিক্ষতভাবে ঘটে যাওয়া ভুলত্রুটি ক্ষমা পাবেন এর মাধ্যমে।
ফিতরা আরবী শব্দ, যা জাকাতুল ফিতর বা সাদাকাতুল ফিতর নামেও পরিচিত। জাকাতুল ফিতর বলা হয় ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গরীব দুঃস্থদের মাঝে রোজাদারদের বিতরণ করা দানকে। নারী-পুরুষ, স্বাধীন-পরাধীন, শিশু-বৃদ্ধ, ছোট-বড় সকল মুসলিমের জন্য ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। 
রাসূল (সা.) সকলকে ঈদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বেই ফিতরা আদায় করার আদেশ দিয়েছেন।
নামাজে অনাকাঙ্ক্ষিতত কোনো ভুল হলে সাহু সিজদা দিয়ে যেমন তা শোধরে যায় তেমনি রোজায়ও অনাকাক্সিক্ষত কোনো ভুল হলে সদকাতুল ফিতরের মাধ্যমে তা শোধরানো যায়। আল্লাহ এই সদকার মাধ্যমে রোজার ভুল মাফ করে দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায়কারীকে রোজার পূর্ণ সওয়াব দিয়ে দেন। সদকাতুল ফিতরের দুটি উদ্দেশ্য।
১. রোজাদারের রোজাকে পবিত্র করা।
২. মিসকিন ও অভাবীদের ঈদ আনন্দের দিনে হাত পাতা থেকে বিরত রাখা।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রহ.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘অশ্লীল ও অনর্থক কথাবার্তার কারণে সিয়ামে ঘটে যাওয়া ক্রটি-বিচ্যুতিগুলো দূর ও মিসকিনদের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য রাসুলে কারিম (সা.) সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। (আবু দাউদ : ২/১১১)। 
সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হলো নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হওয়া। জাকাতের জন্যও নিসাব পরিমাণ মাল থাকতে হয় আবার সদকাতুল ফিতরের জন্য নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হতে হয়। 
তবে জাকাতের জন্য বছরপূর্তি অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের এক বছর পূর্তি হওয়া শর্ত কিন্তু সদকাতুল ফিতরের জন্য এক বছর শর্ত নয়।
ঈদুল ফিতরের দিন ভোরবেলায় যার কাছে নিসাব পরিমাণ মাল থাকবে তার ওপরই সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। এমনকি ওই ব্যক্তি যদি এর আগের দিন কিংবা পরের দিনও সম্পদহীন থাকে কিন্তু ঘটনাক্রমে ঈদুল ফিতরের দিন ভোরবেলায় তার পরিবারের প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ মাল থাকে তাহলেই তার এবং তার অধীনস্থদের সবার পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে।
নিসাব হলো নিত্যপ্রয়োজন ও ঋণের অতিরিক্ত কারও কাছে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে বাহান্ন তোলা রূপা অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রোপার সমপরিমাণ নগদ অর্থ থাকা। 
সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ হলো এক সা (৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) খাদ্যদ্রব্য, খেজুর, জব, কিশমিশ অথবা পনির। তা ছাড়া অর্ধ সা (১ কেজি ৬৫০ গ্রাম) গম দিয়েও সদকাতুল ফিতর আদায় করা যায়। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমরা এক সা’ (৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) খাদ্য অথবা এক সা’ খেজুর অথবা জব অথবা      কিশমিশ অথবা পনির দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম। (বোখারি : ২/৫৪৮)।
আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) হতে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আমরা দুই ম্দ্দ গম দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম। (মুসনাদে আহমাদ: ৬/৩৫৫)।
অন্য একটি হাদিসেও খেজুর, জব, কিশমিশ, পনির ও গম দিয়ে সাদকায়ে ফিতর আদায় করার বিষয়টি বর্ণিত। গম দিয়ে আদায় করলে অর্ধ সা’ আদায় করতে হয়।
ইসলাম গরিবের স্বার্থকেই সব সময় বড় করে দেখেছে। সর্বনিম্ন অর্ধ সা গম ও সবোচ্চ এক সা খেজুর দিয়ে আদায় করা যায়। সামর্থ্য অনুযায়ী, সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। বেশি বিত্তশালীদের খেজুর দিয়ে আদায় করতে হবে। যার সামর্থ্য কম সে অন্তত গমের হিসেবে আদায় করবে।  
গম দিয়ে দিলে আধা সা বা এক কেজি ৬৫০ গ্রাম। আর খেজুর, জব, পনির বা কিশমিশ দিয়ে আদায় করলে জনপ্রতি এক সা’ বা তিন কেজি ৩০০ গ্রাম দিতে হবে। গমের পরিমাণটা কম কারণ তখন অধা সা গমের দাম ১ সা খেজুর, কিশমিশ জব কিংবা পরিরের চেয়েও বেশি ছিল।
বর্তমানে এই পাঁচটি পণ্যের মধ্যে গমের দামই সবচেয়ে কম। সাহাবায়ে কেরাম যেই জিনিসের দাম বেশি সেই জিনিস দিয়ে ফিতরা দিতেন আর অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের জিনিস দিয়ে ফিতরা দিই। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বনিম্ন দামি পণ্য দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায় করেছেন এমনটি পাওয়া যায় না।
এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক দামি জিনিসটিই ছিল তাদের প্রথম পছন্দ। আধা সা’ গম বা তার মূল্য দিলেই সদকাতুল ফিতর আদায় হবে ঠিক কিন্তু যাদের সামর্থ্য আছে কিশমিশ দ্বারাই আদায় করবেন। বাংলাদেশের বর্তমান বাজারের মূল্য অনুযায়ী, আধা সা গমের দাম ৭০ টাকা।
তাই এবার ইসলামিক ফাউন্ডেশন সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করেছে ৭০ টাকা। তা ছাড়া এক সা জবের মূল্য ৫০০ টাকা, ১ সা কিশমিশের দাম ১ হাজার ৩২০ টাকা, এক সা খেজুরের দাম ১ হাজার ৯৮০ টাকা আর সর্বোচ্চ ১ সা পনিরের দাম ২ হাজার ৩১০ টাকা। তাই যাদের সামর্থ্য আছে তারা ২ হাজার ৩১০ টাকাই আদায় করবেন। 
একটি ফিতরা একজন গরিবকে দেওয়া উত্তম। তবে কয়েকজনকে ভাগ করে দেওয়াও জায়েজ আছে। কেউ কোনো কারণবশত রমজানের রোজা না রাখতে পারলেও ঈদুল ফিতরের দিন নিসাব পরিমাণ মালের মালিক থাকলে তাকে সাদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে।
ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় ফিতরা ওয়াজিব হয়। সুতরাং যে সন্তান ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের আগে জন্মগ্রহণ করবে তার সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। কিন্তু যে শিশু সুবহে সাদিকের পর জন্মগ্রহণ করবে তার পক্ষ থেকে বাবাকে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/২০৬)।
কখন আদায় করবেন সদকাতুল ফিতর? যেহেতু সদকাতুল ফিতরের ব্যবস্থা করা হয়েছে ঈদুল ফিতরের দিন গরিবদের ভিক্ষামুক্ত রাখতে তাই ঈদুল ফিতরের দু’একদিন আগে অথবা ঈদের দিন নামাজের জন্য বের হওয়ার আগে তা আদায় করাই উত্তম। 
তবে এরও আগে আদায় করলেও আদায় হবে তবে অবশ্যই তা ঈদের নামাজে বের হওয়ার আগে আদায় করতে হবে। গরিব ভাইবোন অথবা নিকটাত্মীয়দেরও সদকাতুল ফিতর দেওয়া যায়। (ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১৯০)। 

যুবায়ের আহমাদ : খতিব, বাইতুশ শফিক মসজিদ, বোর্ডবাজার (আ. গণি রোড), গাজীপুর।

ট্যাগ: banglanewspaper ফিতরা