banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার:

পূর্বা ও হাবীবা দু’বোন। মা, বাবা ও এক ছোট ভাইকে নিয়ে তাদের পরিবার। বাবা স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি। পূর্বা ও হাবীবা একটি স্কুলে পড়ে। আর ছোট ভাইটিকে এখনও কোথাও ভর্তি করা হয়নি। বাবা তার সাধ্য অনুযায়ী জনকল্যাণ করে যাচ্ছেন। যদিও জনগণের চাহিদা সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ হয়না। তারপরও একটি দরিদ্র রাষ্ট্রের সাধারণ একজন জনপ্রতিনিধি আর কত পারেন।

তারা এমন একটি রাষ্ট্রে বসবাস করেন যে রাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুই পরিশোধের সামর্থহীন পরিশোধের সামর্থহীন বৃহৎ অঙ্কের একটি ঋণ নিয়ে জন্মায়। তারপরও রাষ্ট্রের হালধরা ব্যক্তিদের অন্যায় ও দুর্নীতি চলতে থাকে অবিরাম। তারা রাষ্ট্র ও জনগণের দায়িত্ব গ্রহণ করার মূল উদ্দেশ্যই হলো নিজের ভাগ্যের উন্নয়ন।

অনেকে আবার মাদক, হত্যা ইত্যাদির সঙ্গে জড়িয়ে রাষ্ট্র ও মানবতাকে মেরুদ-হীন করে দিতেও দ্বিধা করেনা। আবার তাদের বিরুদ্ধচারণ করাও আজন্ম পাপ। কেউ বিরুদ্ধচারণ করলে সে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলে। তবুও সেখানকার মানুষ বাঁচে, সহ্য করে, ধৈর্য ধরে।

তেমনি এক মাদক সম্রাটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বশবর্তী হয়ে গর্জে উঠেছিল পূর্বা ও হাবীবার বাবা রাশেদ। তার শ্রম ও শক্তি সর্বস্ব দিয়ে রাশেদ লড়াই করেই চলছে আত্ম সুযোগ লুটতরাজের বিরুদ্ধে। জেনেও রাশেদের অজানাই রইল যে, সে তার বেঁচে থাকার অধিকার ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছে। সংক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে তার বেঁচে থাকার মেয়াদ। 

সত্যি একদিন রাশেদ তার বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেললো। স্তব্ধ হয়ে গেল তার জীবনের প্রদীপ। তাকেই মাদক ব্যবসায়ীর অপবাদ দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনীই তাকে হত্যা করে। সঙ্গে মাদকের অপবাদ নিয়ে জীবন চলে গেল তার স্থায়ী গন্তব্যে। রাশেদের যা হওয়ার হয়েই গেছে। এ দেশে এমনটিই হয়। কারণ সবারই জানা যে এ ধরণের মাদক চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধচারণ করাই আজন্ম পাপ।

কিন্তু জীবন থমকে গেল পূর্বা ও হাবীবার। নির্মূল হয়ে গেল তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। পরিবারের একমাত্র অর্থ যোগানদাতাকে হারিয়ে দিশেহারা দু’বোন। এখনও তাদের স্কুলের অনেক গুলো বেতন বাকি। কে পরিশোধ করবে এ বকেয়া। অন্য, বস্ত্রের সমন্বয়ে কিভাবে বেঁচে থাকবে তারা।  রাশেদ তো গেলই, সাথে অকার্যকর করে দিয়ে গেল পূর্বা ও হাবীবাদের জীবন।

শোকাহত পরিবারটি শোক বহন করেই তাদের প্রিয়জনকে অন্যায়ভাবে হত্যার যাবতীয় প্রমাণসহ বিচার ও তাদের জীবনের নিরাপত্তা চাইল। মুখাপেক্ষী হতে থাকল বিচার ও শাসনের দায়িত্বে থাকা প্রভাবশালীদের। কিন্তু কেউ তাদের দিকে ফিরে তাকালো না। কারণ যে মারা গেছে সে তো গেছেই। তার বিচার করতে গিয়ে তো রাষ্ট্র হত্যাকারীকে হারাবে না। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রেরও মদদ আছে এ হত্যাকা-ের পেছনে। আর রাষ্ট্র তো তার অপরাধ স্বীকার করার প্রশ্নই উঠেনা। 

কারণ ভবিষ্যতে তো হত্যাকারীকেই রাষ্ট্র কাজে লাগাবে। মৃত ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্য কিছু বয়ে আনবে না। সুতারাং পূর্বা ও হাবীবার পরিবারের কোন প্রত্যাশাই পূর্ণ হলো না। রাষ্ট্র নিরব ভূমিকাই পালন করে গেল।

পূর্বা ও হাবীবা কচি সরল হৃদয়ের দুই কিশোরী মাত্র। যতটুকু সম্ভব বিচারও তারা চাইল। আর কিছু করার সামর্থ ও শক্তি কোনটিই তাদের নেই। যে রাষ্ট্রকে শৈশব থেকে তারা মা বলে মর্যাদা দিয়ে এসেছে সে রাষ্ট্রই তাদের পিতাকে হত্যা করেছে। আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে তারা হয়ে যাবে রাষ্ট্রদ্রোহী।

রাষ্ট্রই যখন বাবার হত্যাকারী তখন তারা কি রাষ্ট্রদ্রোহীতা করবে। তাদের জন্য বিচারের আর কোন দরজা খোলা নেই। প্রতিক্ষায় আছে কাঙ্খিত শেষ বিচারের দিনের। বাবা তো চলেই গেয়ে রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে তারা আর নিজেদের হারাতে চায়না।

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও উপস্থাপক

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: Banglanewspaper রাষ্ট্র বাবার হত্যাকারী