banglanewspaper

রনি মল্লিক:

এদেশের মানুষ ভালো নেই। ভালো নেই একদম। তবু এদেশের মানুষ কেন এত হাসিখুশী থাকে, সুখী ভাব নিয়ে থাকে সেটা জানিনা। ঢাকা শহরের মানুষের গড় জীবন দেখি, সকালে রুটি -আলুভাজি খেয়ে একজন মানুষ তাঁর কর্মজীবন শুরু করে মুড়ির টিন বাসে উঠে; এই গরমে টিনের বাসগুলি হয় ওভেনের মতো গরম!

সেই গরমে দুই আড়াই ঘন্টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অফিসে যায়। অফিসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাঁদের শরির থেকে পানির মতো ঘাম বেরুতে থাকে; এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা দুপুরে টাকা বাঁচাতে লাঞ্চ করেন না। চা-বিস্কুট খেয়ে পার করে দেন বেলা! আবার রাতে সেই বাসে করে ঘরে ফেরার যাত্রা।

বাসা'র ভাড়া দিতে গিয়ে অনেকেরই আয়ের অর্ধেক টাকা চলে যায়! তবুও শান্তি কই? অল্প দামের কম পুস্টিকর বিষাক্ত খাবার খেয়ে বুকজ্বালা নিয়ে ঘুমোতে গেলেও শুরু হয় মশার কামড়! বিশ্রামহীন ক্লান্ত শরীর নিয়েই আবার পরের দিনের অফিস! আমি একবার একজন কেরানীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি সারাদিন পান চিবোন কেনো? তিনি পান চিবানো মুখে দাঁত ছড়ানো হাসি দিয়ে বললো, পান চিবালে ক্ষুধা কম লাগে। সারাক্ষন মুখে কিছু থাকে, তাই পান চিবোলে শান্তি পাই!

এখনো একজন ডিপ্লোমা পাশ ছেলের বেতন শুরু হয় ৮/১০ হাজার টাকা দিয়ে। গ্রাজুয়েট পাশ ছেলে পায় ১২/১৫ হাজার টাকা। মাস্টার্স পাশ ছেলে পায় ১৫/১৭ হাজার টাকা। এটাই আমাদের দেশের কমন বেতন স্কেল। প্রমোশনের গ্যারান্টি নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই, ইনক্রিমেন্টের খবর নেই। সে তাঁর অফিসের দায়িত্ব নেয় কিন্তু অফিস তাঁর জীবনের দায়িত্ব নেয়না; খরচ বছর বছর বাড়ে। সন্তানকে স্কুলে পড়ালেই হয় না।

গাইড বই লাগে, টিউটর লাগে। রোগ ব্যাধি হলে হাজার হাজার টাকা লাগে। পাঁচশোর নিচে ডাক্তার ভিজিট নেয়না, হাজার টাকার নিচে টেস্ট হয়না, হাজার টাকার নিচে প্রেস্ক্রিপশনের সব ওষুধও কেনা যায়না; আমার এক পরিচিত লোক গত বছর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলো এবছর তাঁর পাঁচশো টাকা ইনক্রিমেন্ট হবে।

কিন্তু ইনক্রিমেন্ট হবার আগেই গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ালো, পাশাপাশি বাড়ি ভাড়া ৫০০টাকা বেড়ে গেল! মেরুদন্ড ভাংগা লোকটার ঘাড়টাও যেন সেই মুহূর্তে  ভেঙ্গে গেল!

এদেশের বাবারা সম্ভবত বেঁচে থাকেন এই স্বপ্ন নিয়ে যে, তাঁর সন্তান বড় হয়ে রাজার জীবন কাটাবে! এটাই বোধহয় তাঁদের বেচে থাকবার একমাত্র অবলম্বন, স্বপ্ন; কিন্তু এখনো মেয়ে সন্তানকে বিয়ে দিতে লাখ লাখ টাকা লাগে। ছেলেকে দেশে ভালো একটা চাকরী জুগিয়ে দিতে লাগে পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা ঘুষ! তা না হলে বিদেশে পাঠাতে লাগে বারো থেকে চৌদ্দ লাখ টাকা! একজন ছা পোষা অফিসদার যে বেতন পান, সেটাকে এই টাকা দিয়ে ভাগ করে দেখুন কতযুগ লাগবে তাঁর এই টাকা জমাতে! একসময় বাবা চেয়ে দ্যাখেন যে তাঁর সন্তানের জীবনও তাঁর মতোই হচ্ছে; জহীর রায়হানের বরফ গলা নদীতেই সবার জীবন কাটে!

আমার খুব কাছের এক বন্ধুর বাবার মরনঘাতী রোগ হয়েছিলো। চিকিৎসা করাতে গেলে তাঁর সব সঞ্চয় শেষ হয়ে যাবে এই ভেবে তিনি এই রোগের কথা পরিবারকে জানতে দেননি। চিকিৎসা করাননি; নীরবে একসময় এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান; পরিবার তাঁর রোগের কথা জানতে পারেন তাঁর মৃত্যুর পর! অথচ এদেশের মানুষ কিন্তু অলস নন। একজন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ, একজন গার্মেন্টস কর্মী, আর একজন কৃষকের জীবন নিয়ে ভাবুন! তাহলেই বুঝবেন!

তবুও এদেশের মানুষ এতো হাসিখুশী কেন!? সম্ভবত এদেশের মানুষেরা পোড়া মনের মোবিলে রক্ত গরম রাখে; কেনোনা ভালো খেয়ে পোড়ে রক্ত গরম রাখার সক্ষমতা তাঁরা জীবন থেকে পায়নি; কিছু মানুষ আবার অশান্তি করে, ফ্যাসাদ করে, কথায় কথায় উত্তেজিত হয়! মাথা গরম রেখে তাঁরা বেঁচে থাকেন কারন তাঁরা জানেন মাথা ঠান্ডা হলেই জীবনের যে হিসাব তাঁদের সামনে এসে দাঁড়াবে তাতে সব শূণ্য দ্যাখাবে, যা দ্যাখার সাহস তাঁদের নেই!

পরিস্থিতির কারণে এদেশের অনেক মানুষ এমন কিছু উপায়কে অবলম্বন করে বেঁচে থাকে এবং তাঁদের সন্তানরাও ওই একই মানুষিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠে! অভাব, দারিদ্রতা ও মৌলিক সুযোগসুবিধা বঞ্চিত হবার কারনে ইভ টিজিং, মারামারি, অন্যের সম্মানহানি এমনকি দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ড করাও তাঁদের কাছে ছোটবেলা থেকেই স্বাভাবিক মনে হয়!!

যতদিন তাঁদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ আপনি না দেখাতে পারবেন, পথভ্রষ্ট ধর্মান্ধতা বলেন, ধর্মবিদ্বেষ অথবা পলিটিক্যাল ভায়োল্যান্স বলেন বা মরন ঘাতক মাদক, এর কিছুই নির্মূল হবেনা! এবং  দেখবেন এই দেশের ভেতর থেকেই লোকবল আর নীরব উস্কানীদাতা জোগাড় হয়ে যাচ্ছে! সম্পদের সুষম বন্টন ও সুশাসন খুব জরুরী হয়ে পড়েছে, যদি তা সম্ভব হয় তবেই শান্তি আসবে! সফলতা আসবে সর্ব ক্ষেত্রে।

লেখক

-রাজনৈতিক কর্মী

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: Banglanewspaper অভিবাদন