banglanewspaper

নওগাঁ প্রতিনিধি: উর্তি বয়সের উচ্চ গতি সম্পন্ন মটরসাইকেলের রেসই গ্রুপের ১৫/২০ জনের একেকটি দল ছুটে চলছে দ্রুত গতিতে। অধিকাংশ গাড়ীতে নেই লুকিং গ্লাস। হাতে সিগারেট অথবা কোলড্রিংস পানীয়। মটরসাইকেলের সাইল্যানস্যারের মুখ খোল। লাইড্রলিক ব্রেক, লাইড্রলিক হর্ণ। উচ্চ শব্দ করে ছুটে চলে। তাদের বাধা দেয়ার তেমন কেউ নেই। সকাল কিংবা বিকেল-রাত। সময় নেই; নেই দিন ক্ষণ। এর নওগাঁ শহরের বসবাসরত প্রভাবশালী রাজনৈতিক অথবা উচ্চপদস্থ ব্যক্তি আদরের পোলাপান। পুলিশ কিংবা ট্রাফিক পুলিশ তাদের গাড়ী আটক করতেই আসে বিভিন্ন মহল থেকে ফোন। বেশি ভাই ছেড়ে দিতে বাধ্য হন সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এটি ঈদ-উল-ফেতরের আগের কথা। 

তবে পাল্টে গেছে সেই চিত্র এবার পবিত্র ঈদুল ফিতরে। বিভিন্ন মহলের দাবিতে জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান ও জেলা পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেনের নির্দেশে পুলিশ ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। রোজার শুরু থেকে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ মোতায়ন করা হয়। যানজট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শুরু হয় উতি বয়সের কাগজপত্র বিহীন ও অনিয়ন্ত্রিত মটরসাইকেল বিরোধী অভিযান। যার ফলে এবারের ঈদে নওগাঁয় রেসই গ্রুপ অথবা কোন পথচারীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়নি।  

স্থানীয়রা ও পুলিশ সূত্রে জানান, স্বস্তিকর অবস্থার মধ্যদিয়ে এবার পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছে নওগাঁ শহরবাসী। শহরে ছিল না ওভারটেক প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং অসহনীয় যানজট। চাঁদাবাজি, পকেটমার আর ছিনতাইকারীর শিকার হওয়ার কোন খবরও পাওয়া যায়নি। ১১টি উপজেলা ছাড়াও নওগাঁর পার্শ্ববর্তি জেলা বগুড়া ও জয়পুরহাট থেকেও প্রতিবারের মতো এবারও মানুষের ঢল নেমেছিল নওগাঁয় ঈদের কোনাকাটায়। শহরের অপ্রসস্থ সড়কগুলোকে করা হয়েছিল একমূখী।

সেই সড়কগুলোর যানজট মুক্ত রাখতে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি নওগাঁ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির নিয়োজিত তরুনরাও দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যবসা প্রধান এলাকাগুলোতে চেম্বারের স্থাপিত নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়াও ছিল ব্যবসায়িদের নিজ নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরা। তীব্র গরম উপেক্ষা করে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের ঢল নেমেছিল ঈদের কেনাকাটায়। ১০ রমজানের পর চাঁদ রাত পর্যন্ত গভীর রাত অবধী চলেছে ঈদের কেনাকাটা। ফলে শহরে ছোট ছোট যানবাহন বিশেষ করে ইজিবাইক, ব্যাটারী চালিত রিক্সা, সিএনজি চালিত অটোরিক্সা নিয়ন্ত্রণ করা ছিল দূরহ ব্যাপার। তবে সেই কঠিন কাজটিও করেছিল পুলিশ বিভাগের প্রতিদিনের কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা।

ডাবপট্টি মহল্লার বাসিন্দা রাকেশ চৌধুরী, সুকুমার কুমারসহ অনেকেই জানান, ডাবপট্টি, চুড়িপট্টি, কাপড়পট্টি, হোটেল পট্টি, বাটার মোড়, তুলাপট্টি, গোস্তহাটি, লাইব্রেরী পট্টি এলাকার রাস্তাগুলো সরু হওয়ায় বছরের বেশি ভাগই যানজন লেগে থাকে। দুটি ঈদ ও পূজার সময় অটোরিক্সা, পি-আপ ভ্যান শহরের মধ্যে আসায় তীব্র যানজট লেগে যেতো। কিন্তু এ বছর প্রশাসনিক তৎপরতায় শহরের মধ্যে অটোরিক্সা, পি-আপ ভ্যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও রাস্তা একমূখী করায় মোটামুটি স্বস্তীতেই পথ চলা সম্ভব হয়েছে।  

হোটেল পট্টির স্বর্ণ ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন, কাপড়পট্টির কাপড় ব্যবসায়ী আওরঙ্গজেব হোসেন জানান, বিগত প্রশাসনের তুলনায় বর্তমানে শহরের আইনশৃঙ্খলা অনেক ভালো রয়েছে। যার কারণে সকাল থেকে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দোকানে কেনা-বেচা করা হয়েছে। 

নওগাঁ ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) সারোয়ার হোসেন জানান, রোজার এক মাসে অবৈধ্য যানবাহনসহ বিভিন্ন  কাগজপত্র না থাকায় প্রায় ৮শ’ মামলা দেয়া হয়েছে। আর ঈদের পরবর্তীতে তিন দিনে একশ’ গাড়ী আটক করা হয়েছে। 

নওগাঁ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল হাই জানান, রোজার শুরু থেকে ঈদেরপরের তিন দিনে রেইসগ্রুপদের প্রায় দেড়শ’ মটরসাইকেল আটক করা হয়। এরপর অভিভাবকদের ডেকে সতর্ক ও লিখিত নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এতে ওই রেইসগ্রুপের অভিভাবক ও নওগাঁ বাসিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। 

বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির নওগাঁ সভাপতি অ্যাডভোকেট মহসীন রেজা জানান, শহর অনুপাতে বাজার মহল্লার রাস্তাগুলো অপরিকল্পিত ও অপ্রসস্থ। পুলিশের কড়াকড়ি তরুণদের তীব্রগতিতে মটরসাইকেল চালানো বিষয়টিও ছিল নিয়ন্ত্রিত। ফলে অনাকাংখিত দুর্ঘটনাও ঘটেনি শহরে। প্রতিবার বিশেষ করে ঈদের দিন নওগাঁ শহর বাইপাস সড়কে তরুণ সাইকেল চালকদের তীব্রগতিতে চলানোর এক প্রকার প্রতিযোগিতা চলতো। এতে প্রতি বছরই ঈদের দিনগুলোতে দূর্ঘটনায় মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। মারাও গেছেন; মামলাও হয়েছে। কিন্তু মামলায় এখন পর্যন্ত কোন ক্ষতিগ্রস্থ্য পরিবার বিচার পাননি। 

নওগাঁ সাংবাদিক ইউনিয়নের আহবায়ক অ্যাডভোকেট শহীদ হাসান সিদ্দিকী স্বপন জানান, জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান ও পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেনের নির্দেশনায় ও তদারকিতে পুলিশের কর্মকর্তাদের নির্রলস পরিশ্রমেই ঈদে ক্রেতা-বিক্রেতা ও শহরবাসী সহজেই চালাচল ও কেনাকেটা করতে পেরেছেন। মটরসাইকেল রেইস গ্রুপের বিরুদ্ধে এবার পুলিশের বিশেষ নজরদারী ছিল। ফলে দূর্ঘটনা এড়ানো গেছে। আগামীতেও এই অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানান তিনি। 

নওগাঁ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সভাপতি ইকবাল শহরিয়ার রাসেল জানান, শহরে এবার ঈদ ছিল স্বস্তিদায়ক। প্রশাসনের পাশাপাশি চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সমন্বিত চেষ্টায় নওগাঁর মানুষ শান্তিপূর্ণ ভাবে পবিত্র রমজান মাসে কেনাকাটাসহ পবিত্র ঈদুল ফিতর পালন করতে পেরেছেন। 

পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন জানান, দুই পবিত্র ঈদ ও দুর্গা পূঁজায় নওগাঁ শহরে প্রচন্ড যনজটের সৃষ্টি হয়। এই বিষয়টি নিযন্ত্রণের জন্য সর্বাত্মক ভাবে চেষ্টা করেছি। এছাড়াও বিশেষ করে তরুণ বাইক চালকদের বেপোরওয়া ভাবেই বাইক চলানোর কারণে বিগত বছরগুলোতে এই উৎসবের দিন গুলোতে দূর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এবার এবিষয়ে চালকেদের সতর্ক করে মাইকিং করা হয়েছে। বিশেষ বিশেষ স্থানে পুলিশ চেকপোষ্ট বসানো হয়েছিল। এবার আমরা এ ধরনের দূর্ঘটনা এড়াতে পেরেছি। ছিনতাই, চাদাবাজি ও পকেটমারের কোন ঘটনা ঘটেনি। আমি আমার প্রচেষ্টা ও পূর্বের অভিজ্ঞতা প্রয়োগে এবং নওগাঁ বাসীর সহযোগিতায় এবার পবিত্র ঈদুল ফেতর শান্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যদিয়ে পালন করা সম্ভব হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, পবিত্র ঈদ ও রমজান মাসকে সমনে রেখেই আমরা বিভিন্ন গ্রুপের সাথে মতবিনিময় করেছি। যেন যে যার দায়িত্ব সুষ্ঠু ভাবে পালন করতে পরে। পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা ও ভূমিকা ছিল নি:সন্দেহে উল্লেখযোগ্য। এবার সকলের সহযোগিতায় জেলায় পবিত্র ঈদুল ফিতর সুষ্ঠু ও শন্তিপূর্ণ ভাবে পালন করতে করা সম্ভব হয়েছে। 
 

ট্যাগ: banglanewspaper নওগাঁ