banglanewspaper

পরাণের গহীনে ছোট্ট কুঠুরিতে যার উন্মাদ ঘুম-জাগরণ সে-ই প্রেম। সৃষ্টির সবচেয়ে প্রাচীন এবং বহুমাত্ৰিক অনুভূতির এই রোগ-রহস্য আজও পূজনীয় এবং ঐশ্বরিক। সেই ঐশ্বরিক কামনার এক স্নিগ্ধ জলছাপ সৈয়দ মুজতবা আলীর 'শবনম'।
হৃদপিন্ড ঘড়ির প্রতি অনুরণনে প্রেম প্রার্থনা এবং শুন্যতায় তাকে অভ্যর্থনার কামনা, মূলত এই মানচিত্রেই উপন্যাসের গড়ন।

যেখানে প্রথম দর্শনেই আফগান তরুণী শবনমকে মন দিয়ে ফেলে বাঙ্গালী যুবা মজনুন এবং ক্রমেই তা দ্বৈত সত্ত্বায় পরিণতি লাভ। কিন্তু আফগান জাতিগত বিদ্বেষ ও নারীর প্রতি ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবাহোত্তর শবনম অপহৃত হন এবং শুরু হয় মজনুনের অপেক্ষা অভিযাত্রা।

তত্ত্ব ছড়ি:
‘কাঠামোবাদের’ আশ্রয়ে যেকোনো বিষয়কে বুঝতে তার ঐ সময়ের সামগ্রিকতা জানা জরুরী। সে হিসেবে এ উপন্যাস তৎকালীন আফগান জাতি বিদ্বেষেপূর্ণ সমাজ এবং তার মানুষগুলোর মানবিক-অমানবিকতাকে নির্দেশ করে। যেখানে সামাজিক ভারসাম্য নির্মাণ হয় দখলে এবং নারীর উপযোগিতা শুধুমাত্র পণ্য গুণে।

ইনফ্রা পলিটিক্স:
ক্ষমতার বিপরীত মেরুতে থাকা প্রান্তিক মানুষের যেকোনো উপায়ের ছোট ছোট প্রতিবাদই ইনফ্রা পলিটিক্স। সে হিসেবে 'বোরকাকে' পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার আবিষ্কার ভাবলেও ‘শবনম ভাষ্যে’ এটা আসলে পুরুষের প্রতি নারীর ইনফ্রা পলিটিক্স। যা বোরকা পরার কারণ সম্পর্কে জানাতে শবনম কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘এ-দেশের পুরুষ এখনো মেয়েদের দিকে তাকাতে শেখেনি’ (পৃ.৩৪)।

নারী এবং ধর্ম:
ক্ষমতার ‘আদিম’ এবং এক পক্ষীয় মানদণ্ড’ ‘ধর্মে’ নারীর চিরায়িত অবস্থান অধঃস্তন। আর এর কারণ কোনো ধর্ম বা দর্শন নারীর রূপায়ণে রুপ বা প্রতিষ্ঠা পায়নি তাই ! যার সাক্ষ্য, পুরুষ প্রতিষ্ঠিত ধর্ম, রাষ্ট্র এবং সমাজে পৌরুষীয় শ্ৰেষ্ঠত্ব এবং ভোগের জায়গা প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতিফলিত।
‘পুরুষের (মজনুনের) প্রতি শবনম’ সংলাপে যা নিনাদিত, 'চারটে বিয়ে করতে পার, স্বপ্নে জাগরণে যা খুশি ভাগাভাগি করতে পার। কিন্তু আমি মেয়ে ছেলে’ (পৃ.৬৮)।

পুরুষ কপাটে রুদ্ধ নারী:
‘প্রেম মেয়েদের সর্বস্ব, পুরুষ জীবনের মাত্র একটা অংশ’ (পৃ.৭৫)।    
উপরোক্ত উদ্ধৃতি একপেশে পুরুষ শৃঙ্খলে অবরুদ্ধ নারীর সর্ব ঘ্রাণ বিকিরণ এবং পুরুষের তা আহরণের ইঙ্গিত। যেখানে উলঙ্গ প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে পুরুষ চাইলেই তার এই তুচ্ছ ‘প্রেম ভূষণ’ বদল ঘটাতে পারেন। কিন্তু নারী, তার যাপন সমাধি ঐ এক সর্বগ্রাসী পুরুষেই।

সাংস্কৃতিক টুলস:
জাতি রাষ্ট্রের প্রবাদ-প্রবচন ঐ ভূখণ্ডের সংস্কৃতির প্রকাশক। তাছাড়া নৃতত্ত্ব মতে, সংস্কৃতি হল ‘Tottal Way Of Life’. সে হিসেবে কোন ভূখণ্ডের মানসিক অবস্থান বুঝতে তার এই ছোট্ট ‘বাগান-উপাদানে’ চোখ রাখলেই হয়।
‘রুটি খায় নি দল খায় নি, খায় নি কভু দই, হাড়-হাভাতে ঐ এলরে খাবে তোরে সই’ (পৃ.৯৬)!
যা নারীর উপযোগিতা শুধুই শরীর কেন্দ্রিক এবং তা পুরুষ ভোগ্য উপাদান হিসেবেই ইঙ্গিত করে।

প্রেম ও পিতৃতান্ত্রিকতা:
‘তুমি কেন আমার মুখের বসন দু'হাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলো না। সিংহ যেরকম হরিণীর মাংস টুকরো টুকরো ছিঁড়ে খায়’ ( পৃ.১০৭)।
তাত্বিক ‘সংস্কৃতির দোকানে’ যাদের সদা যাতায়াত তাঁরা এই উদ্ধৃতির কান্ধে সাওয়ারে ‘সৈয়দ মুজতবা আলীকে’ পিতৃতান্ত্রিকতার তিলক পরাতে পারেন। যদিও এটি হবে শুধু প্রেমহীন তরবারির শব্দহীন আস্ফালন।
কারণ জাগতিক যাপনের অবিচ্ছেদ্য এই ঐশ্বরিক উপহার ‘প্রেম শুধু হৃদয়ে নয় কামনা ঝড় তার শরীরেও। যা পূর্ণতায় রচনা করে ‘সৃষ্টি’।

ভাষার ভাবাবেগ:
পরমেশ্বর তার সৃষ্টি জগৎকে প্রতিনিয়ত নির্মাণ-বিনির্মাণ করেন প্রেম-প্রলয়ের ঝংকারে। যাতে প্রতিবন্ধকতা ও জয় দুইয়ের হাতছানি নিহিত। 
‘প্রেম যমুনায় নাইতে’ মজনুনের প্রতিবন্ধকতা ছিল ভিনদেশী ভাষা। তবে ‘শবনমের’ প্রেম নিঃসৃত কাব্য সুধা পানে মজনুন সেই নদীও সাঁতরেছেন ভিনদেশী ভাষা শেখার মাধ্যমে।

ইতিবৃত্তান্ত:
প্রেম কাব্য রচনায় ‘সৈয়দ মুজতবা আলীর’ শব্দ গাঁথুনি এবং চোখ অনন্য। তবে এ উপন্যাসের তলানি স্রোত ঐখানটায় যে ‘প্রেমের পরিণয় শুধু মিলনে নয় বিরহেও’। যার জন্যে অপহৃত 'শবনমের' অপেক্ষায় মজনুনের এ উদ্ভ্রান্ত চেয়ে থাকা যাপন এবং নিনাদিত ‘শবনম’ ধ্বনি। ভিন্নভাবে ‘শবনম বিরহে মজনুনের এ অপেক্ষা’ ‘পুরুষতান্ত্রিক প্রেম ভাবনাকে’ ভেঙ্গে ফেলারও একটা ইঙ্গিত।

 

হায়দার মোহাম্মাদ জিতু
সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

 

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 জিতু