banglanewspaper

মানুষ স্বভাবতই নিজেকে ভালোবাসে। সে তার সৃষ্টিকর্তাকেও ভালোবাসে। হূদয়বৃত্তির ব্যাপক একটি ভুবনে মূলত ভালোবাসা দুটি পর্যায়ে বিভক্ত: একটি হলো স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির প্রেম, অন্যটি হলো সৃষ্টির সঙ্গে সৃষ্টির প্রেম।

নিজের প্রতি ভালোবাসার মূল সূত্র ধরেই মানুষ তার বাবা-মা, ভাইবোন, সন্তানসন্ততি, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে ভালোবাসে। স্রষ্টা নিজেও তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসেন এবং সৃষ্টির সেরা জীবের জন্য পৃথিবীকে সুশোভিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: ‘আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালোবাসে।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৫৪)

সৃষ্টিজগৎকে না ভালোবাসলে স্রষ্টাকেও ভালোবাসা যায় না। মানুষ প্রকৃতিপ্রেমে নিমগ্ন হয়, অনেকে আপনজনহীন হয়েও একদল অনাত্মীয়ের ভিড়ে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। কেউ অসহায় কোনো মানুষ, শিশু বা জীবজন্তুকেও নিঃস্বার্থভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। মানবপ্রেম সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আর তিনি (আল্লাহ) তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আর-রুম, আয়াত: ২১)

জাগতিক সব কাজকর্ম ও নেক আমল আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা সুদৃঢ় করার উপলক্ষ মাত্র। সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি লাভই ধর্মপ্রাণ মানুষের সর্বোচ্চ মর্যাদার সম্বল। স্রষ্টাপ্রেম অর্জনের সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে তাঁর প্রতি গভীর ধ্যানমগ্নতা, আত্মসমর্পণ ও মনোনিবেশ করা। সমগ্র সৃষ্টি তার স্রষ্টাকে ভালোবাসে, আর স্রষ্টা নিজে তাঁর সর্বোত্তম সৃষ্টি ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল বিশ্বনবী (সা.)-কে ভালোবাসেন।

মানবীয় গুণাবলির বিকাশসাধন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরপারে পরিত্রাণ লাভ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ বাস্তবায়নে ও তাঁর ভালোবাসা অন্তরে স্থান দেওয়া ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে ঘোষিত হয়েছে, ‘বলো, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)

মানবশ্রেণীতে সর্বাধিক ভালোবাসার শ্রেষ্ঠতম পাত্র হচ্ছেন নবীকুল শিরোমণি হজরত মুহাম্মদ (সা.)। উম্মতে মুহাম্মদির প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ও অবদান সবচেয়ে বেশি। নবী করিম (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা একটি অপরিহার্য কর্তব্য, যার অবর্তমানে ইমানই পরিশুদ্ধ হয় না।

এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার মা-বাবা, সন্তানসন্ততি ও সমগ্র বিশ্ববাসী অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় না হব।’ (বুখারি ও মুসলিম) তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা ইমান না আনা পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।

আবার পরস্পরকে ভালোবাসতে না পারা পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয়ের খবর দেব না, যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসতে সক্ষম হবে? (তা হলো) তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের ব্যাপক প্রচলন করবে।’ (মুসলিম)

মানুষ যে উৎসের পরিপ্রেক্ষিতে একে অন্যকে ভালোবাসে, এ নিয়ে গভীরভাবে বিবেচনা করলে নির্দ্বিধায় বলতে বাধ্য হবে—আমার প্রেম-ভালোবাসা, জীবন-মৃত্যু, আমার সর্বস্ব সেই মহান সত্তার জন্য নিবেদিত, যিনি আমার সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা; যেমনিভাবে বলেছিলেন মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)।

পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ—সবকিছুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, যিনি নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক।’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬২) তাই মুমিন মুসলমান হতে হলে অবশ্যই প্রত্যেক মানুষকে তার জীবন, সম্পদ, সন্তানসন্ততি—সবকিছুর চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সর্বাধিক ভালোবাসতে হবে। তাঁর বিধি-বিধানগুলো স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার জন্য পালন করতে হবে।

সৃষ্টিকর্তা মানুষের স্বভাব-চরিত্রে যে প্রেমবোধ দিয়েছেন, তা শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সর্বব্যাপী। তাই মানুষ আপনজনের গণ্ডি ছাড়িয়ে তার ভালোবাসা আশপাশের সুবিস্তৃত পরিবেশমণ্ডলীতে ছড়িয়ে দেয়। ফলে দয়া-মায়া, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা ও হূদয়ের টান একজন মানুষের পক্ষ থেকে অন্য মানুষ অবশ্যই পেতে পারে। ভালোবাসার পাত্র হতে পারেন সন্তানসন্ততির জন্য তাদের মা-বাবা, মা-বাবার জন্য তাঁদের ছেলেমেয়ে, ভাইয়ের জন্য বোন, বোনের জন্য ভাই এবং অপরাপর আত্মীয়-অনাত্মীয় যেকোনো আপনজন।

একজন মানবের ভালোবাসা একজন মানবীও পেতে পারেন। তবে সে ভালোবাসা হতে হবে বৈধ ও অনুমোদিত। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসা, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা কেবল শরিয়তের অনুমোদনের গণ্ডিতেই আবদ্ধ নয়; বরং তা বহুবিধ পুণ্যময় কাজ। ভালোবাসা পোষণ ও প্রকাশের বৈধ কোনো সম্পর্ক ছাড়া ইসলামে একজন মানব-মানবীর মধ্যে হূদয়ের কোনো টান থাকা এবং প্রেমকে আরও গভীর করার কোনো সুযোগ নেই।

সুতরাং ইহকাল ও পরকালে সুখ-শান্তির জন্য আল্লাহ ও রাসুলকে ভালোবাসতে হবে এবং সৎ পথে চলতে হবে। কথায়, কাজে, চিন্তায়, বিশ্বনবী (সা.)-এর পরিপূর্ণ অনুসরণ সম্ভবপর হলেই সফলকাম হওয়া যাবে। যে বা যারা মা-বাবা, ভাইবোন, স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন, গরিব-দুঃখীজন ও অন্য সবাইকে মানবতার দৃষ্টিতে যথারীতি ভালোবাসে; সে মূলত আল্লাহর হুকুমেরই তাঁবেদারি করে এবং সব মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ব-কর্তব্য যথাযথ পালন করা বস্তুত স্রষ্টাপ্রেমের নামান্তর।

তবে বিবাহবহির্ভূত প্রেম-ভালোবাসা প্রকাশের প্রতিযোগিতায় জঘন্য পাপাচার, ব্যভিচার ও অশ্লীলতায় নিমজ্জিত হওয়ার চেয়ে মনকে প্রকৃত অর্থে মানবপ্রেমের উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা একান্ত কর্তব্য হওয়া উচিত।

 

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

ট্যাগ: Banglanewspaper নবী করিম (সা.) মানুষ ভালোবাসা সৃষ্টিকর্তা