banglanewspaper

দেশের ৩২টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম মূল্যায়িত করে তাদের (বিশ্ববিদ্যালয়) র‌্যাংক নির্ধারণ করেছে কয়েকটি স্বনামধন্য পত্রিকা। এই র‌্যাংকিং দেখে আমার আগের একটি র‌্যাংকিংয়ের কথা মনে পড়ছে। সে র‌্যাংকিং করেছিল এক প্রতিষ্ঠান, যার কর্ণধার ছিলেন ইউজিসি’র তৎকালীন চেয়ারম্যানের ভাগ্নে। তিনি বর্তমানে তার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে মোটর গ্যারেজের ব্যবসায় নেমেছেন। 

তবে আজকের মূল্যায়নটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেননা, ওআরজি কোয়েষ্ট অপেক্ষা বেশী খ্যাতিমান ব্যক্তিগণ তার সাথে জড়িত হয়েছেন। সেই সংগঠনের দেওয়া তথ্যের উপরই র‌্যাংকিং হয়েছে বলে আমি তাদের দায়িত্ব সীমিত বলে মনে করি। র‌্যাংকিং এ অবস্থান করে নেওয়া এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যাদের ভিসি, প্রো-ভিসি বা কোষাধ্যক্ষ নেই। এমন বিশ্ববিদ্যালয় আছে যারা জঙ্গীবাদের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। 

এছাড়া যে মিডিয়া এই র‌্যাংকিং করেছে তাদের রয়েছে নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের একজন অধ্যাপক মুখ্য মূল্যায়ক হিসাবে আছেন। র‌্যাংক পাওয়া সব ক’টি বিশ্ববিদ্যালয় মাত্রাতিরিক্ত খন্ডকালীন শিক্ষক ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু র‌্যাংকিংয়ে নাম না থাকলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যারা ৯৭ ভাগ পূর্ণকালীন শিক্ষক ব্যবহার করে আসছে।

এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ প্রয়োজন ছিল যারা মানোন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠার দিন থেকে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সূলভে মান-সম্পন্ন শিক্ষা দিচ্ছে, যার প্রকাশনায় অন্তত তিন/চারটি নামকরা জার্নাল আছে। যারা রীতিমত সেমিনার সিম্পোজিয়াম ও শিক্ষা সম্পর্কিত কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়নের ফলাফল এখন প্রকাশিত হলেও তা দিয়ে কে কতটা উৎসাহিত হবে তাও একটি বড় প্রশ্ন। তাছাড়া ফ্যাকচুয়েল ও পারসেপচুয়াল মানের বন্টন যথাক্রমে ৬০ ভাগ ও ৪০ ভাগ হলে সত্যের প্রকাশটা কিছুটা বাস্তবতার কাছাকাছি হত। 

আর একটি প্রশ্ন: ৮৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম স্তরে ৩২টি এবং দ্বিতীয় স্তরে ২০টি নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে করা হয়েছে তাও গ্রহণ যোগ্যতার মাত্রা নির্ণয় করবে।

পরিশেষে ইউজিসিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, তারা এই র‌্যাংকিংকে আমলে নেন নি। আমি মনে করি এসব অনির্ভরযোগ্য র‌্যাংকিং এর উপর নির্ভর না করে বরং উচ্চ-শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের মতামতের উপর ভিত্তি করা যেতে পারে।

তবে বিপদ হচ্ছে এসব রিপোর্টের আয়ু আজকাল অনলাইন পত্রিকা বা আইসিটি’র কারণে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কারণ এখন ভর্তির সিজন। যার কারনে শিক্ষার্থীরা ভূল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসতে পারে। এই আশংকটা বেশি করছি।

মোঃ কামরুল হোসেন
সোবহানবাগ, ঢাকা
Email: hossainkamrul189@gmail.com

 

আরও পড়ুন: 

-> ইউজিসিকে ঢেলে সাজাতে হবে : প্রফেসর ড. দুর্গাদাস ভট্টাচার্য

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ:

মতামত
‘কোনও রাজনৈতিক অভিলাষে দেশে আসিনি, এসেছিলাম...’

banglanewspaper

সুদূর নিউইয়র্ক থেকে ছুটে এসেছিলেন ডা. ফেরদৌস খন্দকার। উদ্দেশ্য ছিল করোনা পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের পাশে থেকে মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেবেন। কিন্তু সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দেশে এসে তার সেই মহৎ উদ্দেশ্য পূরণে শুরুতেই বিপত্তি ঘটলো। বিমানবন্দর থেকে তাকে বাসায় যেতে না দিয়ে পাঠানো হলো কোয়ারেন্টাইনে।

গত ৭ জুন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন ডা. ফেরদৌস। সেখান থেকে বনানীতে নিজ বাসায় যেতে চাইলে তাকে বাধা দেয়া হয়। পাঠানো হয় হজ ক্যাম্পের ৭ তলায়। থাকতে দেয়া হয় ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে।

১৪ দিন পর কোয়ারেন্টাইন থেকে মুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফেরদৌস খন্দকার রবিবার (২১ জুন) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। পাঠকের জন্য তার সেই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো

অবশেষে কোয়ারেন্টাইন মুক্ত হলাম আমি। কেটে গেলো ১৪টি দিন। সময়তো কাটবেই। থেকে যাবে কেবল স্মৃতি। এই মুহূর্তে কোন অভিযোগ নয়, কেবল ধন্যবাদই দিতে চাই সবাইকে। যারা গত ১৪টি দিন আমার সাথে ছিলেন। বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়েছেন, মানসিকভাবে শক্ত থাকতে প্রেরণা জুগিয়েছেন। তবে একথা আমাকে বলতেই হবে যে, শুরুটা বেশ কঠিনই ছিল আমার জন্যে। আমার বিরুদ্ধে "অহেতুক" এবং "মিথ্যা অভিযোগে" বিরাট ঝড় উঠেছিল। সব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ঝড়ও হয়তো থেমে গেছে।

যা বলছিলাম, দেশে আসার পর আমাকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে দেয়া হয়েছে; এই বিষয়টি আমি প্রথম পাঁচদিন মানতেই পারছিলাম না। কেননা আমার এন্টিবডির সনদ ছিল। তখন মানসিকভাবে রীতিমতো বিদ্ধস্ত হয়ে পড়েছিলাম। পরিবার, সহকর্মী, বন্ধু, সুধীজন, সহযোদ্ধারা, সাংবাদিক এবং দেশের মানুষের সহায়তা ও সমর্থণ আমাকে সাহস জুগিয়েছে।

দেশে এসেছিলাম কয়েক সপ্তাহ দেশবাসীর জন্যে কাজ করবো বলে। সাথে ছোট্ট একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তুলে যাবো, এমন আশা ছিল। সেই লক্ষ্যেই দুই থেকে তিন সপ্তাহের জন্যে এসেছিলাম। যদিও সময় কিছুটা ক্ষেপন হয়ে গেছে। এরপরও আমি মনে করি, কোন আক্ষেপ নেই আমার। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কিছুটা কাজ করে যাবো। তবে সাথে নিয়ে যাবো গত দুটি সপ্তাহে ঘটে যাওয়া অনেক কিছু ও অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে যেসব সৈনিক ভাইয়েরা আমার সাথে ছিলেন, তারা অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন। অনেক সহযোগিতা করেছেন। আপনাদের মমতা কোনদিন ভুলবার নয়। সেই সাথে কুয়েত প্রবাসী কিছু ভাই শেষের দিকে কোয়ারেন্টাইনে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের ভালোবাসায় ভরা স্মৃতিগুলোও বাকি জীবন আমার সাথে থাকবে। কখনো যদি দেখা হয়, নিশ্চয়ই ভালো লাগবে; বুকে জড়িয়ে ধরবো আপনাদের। দেখা না হলেও, আপনাদেরকে আমার সবসময় মনে থাকবে।

দেখুন আমি অতি সাধারণ একজন চিকিৎসক। তবে দেশকে, দেশের মানুষকে খুব ভালোবাসি। এসেছিলাম, দূর্যোগের এই সময়টায় কেবলই দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। কোন রাজনৈতিক অভিলাষ বা ইচ্ছা আমার ছিল না; নেইও। ফলে যারা তেমনটি ভেবেছিলেন, আশা করছি আপনাদের ভুলটা ভেঙেছে। বাংলাদেশের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সম্মুখসারির যোদ্ধারা করোনার এই সময়টায় রীতিমতো জীবন বাজি রেখে লড়াই করছেন। তাদের আত্মত্যাগ, এই জাতি সবসময়ই মনে রাখবে। সামনের দিনগুলোতেও তারা এমনিভাবে লড়ে যাবেন বলে আমার বিশ্বাস।

আমি এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য বিষয়ক ছোট্ট একটি সেটআপ শুরু করবো। কারো বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। মায়ের বিরুদ্ধে সন্তানের কোন অভিযোগ থাকে না। আমারো নেই। আবারো দেখা হবে। ভালোবাসা বাংলাদেশ। সবাই ভালো থাকুন। নিরাপদে থাকুন। আপনাদের মঙ্গল হোক।

এর আগে গত ৭ জুন দেয়া এক স্ট্যাটাসে ডা. ফেরদৌস খন্দকার লিখেছিলেন- প্রিয় বাংলাদেশ। দেশে এসেছিলাম নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কারোনা নিয়ে সবার পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করতে। তার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতেও আমি পিছপা হইনি।

যখন ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে আমি দেশে এসেছি, তখন একদল লোক আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, আমি নাকি খুনি খন্দকার মোশতাকের ভাতিজা কিংবা খুনি কর্নেল রশিদের খালাতো ভাই। অথচ পুরো বিষয়টি কাল্পনিক। 

আমার বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বারে। কুমিল্লায় বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের বাড়ি। কুমিল্লা বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য জেলা। কুমিল্লায় বাড়ি হলেই কেউ খুনি মোশতাকের ভাতিজা কিংবা কর্নেল রশিদের খালাতো ভাই হয়ে যায় না। আমি স্পষ্ট করে বলছি, এই দুই খুনির সঙ্গে আমার পারিবারিক কিংবা আদর্শিক কোনো সম্পর্ক নেই। বরং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে আমি তাদেরকে চরম ঘৃণা করি।

যারা এই খারাপ কথাগুলো ছড়াচ্ছেন, বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার; ভালো কাজে বাধা দেয়া। এটা অন্যায়। আমি তীব্র প্রতিবাদ ও ঘৃণা জানাচ্ছি। সেইসঙ্গে প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছি। যদি মনে করেন আমার সেবা আপনাদের দরকার, তাহলে পাশে থাকুন।

ট্যাগ:

মতামত
দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে ঈদের শুভেচ্ছা ॥ অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

banglanewspaper

স্বজন ও বিরুদ্ধবাদীদের কটূকথার ঝুঁকি নিয়েই প্রধানমন্ত্রী ও দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তবে এটা কোন চাটূকারিতা নয়, একজন বিশিষ্ট মানুষের নিরলস পরিশ্রম আর নিষ্ঠার নির্মোহ মূল্যায়ন মাত্র। মূল প্রসঙ্গে আসার পূর্বে আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে দু’একটি কথা বলে নিচ্ছি। আমাদের সংস্কৃতি হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের প্রানীর ন্যায় দুর্নিবার আনুগত্য আর এক প্রানীর মত অনন্য হিংস্রতায় ভরা। কখনো কখনো হিংস্রতায় দিয়ে আমরা সিংহকে ছাড়িয়ে যাই। সময়মত ক্ষমতার প্রত্যাশায় যেকোন সীমা লংঘন করি। কেউ কেউ ক্ষমতার জন্যে এতটা লালায়িত যে তারা ক্ষমতায় যেতে ও ক্ষমতা পেতে নিজের পবিত্র মস্তকটা ক্ষমতার উৎসে সঁপে দিতেও দ্বিধান্বিত নন। আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই নিজের পা দুটো অন্যর কাঁধে বা মাথায় নির্দ্ধিধায় তুলে দিতে উন্মুখ।

ক্ষমতায় গেলে বা পেলে কেউ কেউ ধরাকে সরাজ্ঞান করেন। আমাদের সংস্কৃতির অপর বৈশিষ্ট হলো  সময় সময় কাউকেও ফেরেশতার আসনে বসিয়ে সামান্য দ্বন্দ্বের কারণে তাকে শয়তানের অবস্থানে ঠেলে দেই। এ’সব হচ্ছে চরম পন্থীদের কাজ। মধ্যম পন্থীদের সংখ্যা নিতান্ত কম। মধ্যম পন্থীদের সম্পর্কে রবি ঠাকুরের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে উত্তম নিশ্চিন্তে চলেন অধমের সাথে; তিনিই মধ্যম যিনি চলেন পশ্চাতে। মধ্যম পন্থীদের বৈশিষ্ট সম্পর্কে রবি ঠাকুরের বর্ণনার সাথে আমার মতের মিল নেই। আমার মতে ভালোকে ভালো বলা আর মন্দকে মন্দা বলা হচ্ছে মধ্যম পন্থা। তবে এই ভালো ও খারাপকে দুটো স্থির প্রান্ত ধরে পরিসংখ্যান বা অংকের ভাষায় অগনিত পারমুটেশন বা কম্বিনেশন হতে পারে। সে কারনে সমাজটাতে মধ্যম পন্থীদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। আমি এই মধ্যম পন্থীদের একজন হয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মূল্যায়ন করি। শিক্ষার্থীরা যখন তাকে দেশরত্ন উপাধিতে ভূষিত করেন, তখন আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে, সে উপাধিটা  সে মুহূর্তে যথার্থ কিনা। এখন মনে হচ্ছে এই অভিধা একমাত্র তারই প্রাপ্য এবং প্রতিদিন বলতে গেলে প্রতিটি কাজে তিনি তার প্রমান রেখে যাচ্ছেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে কোন একটি লেখায় আমি একবার তার এই অভিধার মূল্যায়ন করেছিলাম। ব্যতিক্রম এ’বছরটি অথচ এ’বছর তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটির আশ-পাশ ঘিরে এমন কিছু দুঃসাহসিক কাজ করেছেন যার বিরূপ সমালোচনা না করে ইতিবাচক মূল্যায়নের প্রয়োজন ছিল। আর সেটা হোত তাকে কর্মযজ্ঞে নিবিষ্ট রাখার প্রণোদনা।

এ’যাবত তিনি যেসব ভালো কাজ করেছেন, ১৯৭৫ সালের পর কে বা কারা যুগপত ভাবে তার ত্রিশ শতাংশ কাজও করেছেন? তার ভালো কাজের ফিরিস্তি দিতে গেলে অনেক কিছু এসে যায়। তাই মাত্র বিগত কয়েক সপ্তাহের কিছু কাজের একটা বর্ণনা দেব। তিনি ভুল করেন না বলব না, কিন্তু পরিকল্পিত ভুল করেন নিতান্তই কম। ভুল ত হতেই পারে; তিনি ত অতিমানব নন কিংবা ফেরেশতার বিপরীত সত্বাও নন। এই দুর্যোগ ও দুঃসময়ে অন্য কেউ ক্ষমতায় থাকলে কি করতেন তা ত অতীত ধরেই বলা সম্ভব। আমাদের স্মৃতি বড্ড ক্ষীণ আর ভালো কাজের প্রশংসা নিরন্তর অনুপস্থিত। এই ক’দিনে ঘটে যাওয়া কিছু জিনিষের প্রতি তাকান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতাকে ঝেড়ে মুছে ফেলার প্রয়াসগুলো কি প্রশংসার যোগ্য নয়? ত্রাণ আত্মসাতের অভিযোগ উঠার সাথে সাথে দলমত নির্বিশেষে যে ব্যবস্থা নিয়েছেন তাকে আমি চরম পদক্ষেপ বলব; যার বর্তমান ও সুদূর প্রসারী ফলাফল রয়েছে। এই যে ৬৪ জেলায় ৬৪ জন সচিবকে দিয়ে ত্রাণ ও কল্যাণের কাজ; মাননীয় এমপিদের টপকিয়ে জেলা প্রশাসকদের দিয়ে ঈদ কেন্দ্রিক ত্রাণ ও কাপড় চোপড়  বিতরনের দায়িত্ব কিংবা ৮ লাখ ভূয়া ত্রাণ শিকারীর টেলিফোন বাতিল ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের পদক্ষেপ কি সঠিক ও দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নয়? শেখ হাসিনা ছাড়া অতীতে এমন কাজ আর কে করতে পেরেছে? স্বল্প সময়ে এক যোগে এতগুলো জনহিতকর পদক্ষেপ কে কবে নিয়েছে? মাত্র ক’দিন আগে শ’খানেক নেতাকর্মীদের দলের ভাবমূূর্তি ভঙ্গের কারনে শীতল ঘরে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে ত বটেই পৃথিবীর কোথায় কবে নিজ দলের মানুষের প্রতি এমন শানিত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? এমন ব্যবস্থা যে কি ঝুঁকিপূর্ণ তা তার মরহুম পিতার সপরিবারে হত্যার পর কি বুঝা যায়নি?  মহান নেতার বহু ইতিবাচক পদক্ষেপের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখার আমার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হলে আমার তিন ‘বেয়াকুব’ প্রতিরোধ গড়তে রাস্তায় নেমেছিলাম। তাদের দু’জন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আর একজন ছিলেন সরকারী আমলা। ছোট বড় কাউকেও প্রতিরোধে টানতে পারিনি। তাদের কেউ কেউ খেয়ে খেয়ে এত মোটা হয়েছিলেন যে তারা ভূমি ছেড়ে দাঁড়াতে পারেননি। আবার কেউ কেউ না খেয়ে এতটা শীর্নকায় হয়েছিল যে তারাও উঠে দাঁড়াতে পারেননি। তাই প্রতিরোধ ত দূরের কথা বঙ্গবন্ধুর মরদেহের সৎকারের পদক্ষেপ না নিয়ে তারা অনেকেই চাচা আপন প্রান বাঁচার ভূমিকায় নেমেছিলেন। আমরা রাস্তায় নেমে আর এক ধরনের মানুষ দেখলাম যারা ছিল তার অতি ভক্ত-অনুরক্ত। সেদিন তাদের কারো কারো উক্তিতে বিস্মিত হয়েছিলাম বললেও কম বলা হবে। একজন সুবিধাভোগী ত বলেই বসলেন, ‘এমন এক নায়কের পরিনতি এমনই হয়’। আর একজন আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি ত এ ক’বছর দেশে ছিলে না। অতএব, তার দুঃশাসন দেখনি’। আমি স্তম্বিত হয়ে ভাবলাম মেজর ডালিম কথা বলছেন নাকি? আল্লাহ না করুক শেখ হাসিনার তেমন কিছু হলে এই যে শক্তিমান মানুষ গুলোকে ত্রান বিতরন থেকে বিরত রাখা হলো, দল থেকে গুটিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা হলো, ৮ লাখ মোবাইল টেলিফোনের প্রভাবশালী মালিকদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থাধীনে এনে বিক্ষুব্দ করা হলো; তারা কি সুযোগ পেলে শেখ হাসিনার সাথে সদয় ব্যবহার করবেন? শেখ হাসিনা তার পিতার হত্যায় কাদের অংশ গ্রহন ছিল, তার দলের কারা নির্লিপ্ত ছিল সবই জানেন। জেনে শুনে তিনি বিষপ্রানও করেছেন। জেনে শুনে বিষপ্রানকারীগনকে মহৎ ও অনন্য ছাড়াও বহু অভিধায় ভূষিত করা সম্ভব? একটু বিরূপ সমালোচনার ঝুঁকি নিয়ে তাকে প্রশংসা করতেই হবে। কারণ ভালো কাজের প্রশংসাই হতে তার কর্মোদ্দীপনার ফলধারা ও নিরন্তর নিজকে সঁপে দেবার জীবনী শক্তি। বুঝতে হবে তিনিও রক্তে মাংসের মানুষ এবং তিনিও উর্ধমূখী চালিকা শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে। তার ব্রত ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ মানে আশা’। এক স্রস্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস রয়েছে তার। সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও পিছিয়ে পড়াদের জন্যে অন্তহীন ভালোবাসা আছে। তাই তিনি বেশী এ’দিক সেদিক  না দেখেই এগিয়ে যান। মাঝে মাঝে তার বিশেষ দিনে বা বিশেষ কারনে আমি যখন তাকে শুভেচ্ছা পাঠাই। তখন আমি বলি ‘সুস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘায়িত হোন যাতে আপনি প্রতিনিয়ত আমাদের মুখোজ্জ্বল করতে পারেন’।

করোনার বিষাক্ত ছোবলে আমরা বিধ্বস্ত ও বিভ্রান্ত। তার মাঝে মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মত আম্পান এল। দিন রাত অমানুসিক পরিশ্রম ও একাগ্রচিত্তে মহাদুর্যোগের মোকাবিলা করে যাচ্ছেন। আমি মনে করি না, এমন দুর্দিন, দুঃসহ ও মরার উপর খাড়ার ঘা জাতীয় সময়ে শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কেউ আমাদের জাতিকে এত উত্তম সেবা দিতে পারতেন? শেখ হাসিনা ফিরে না আসলে আর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না হলে আমাদের কি হোত, তা নিয়ে আগে আলোচনা করেছি। সংক্ষেপে বলছি তিনি ফিরে না এলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশটা হারিয়ে যেত। শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কেউ এত দ্রুত ডুবন্ত স্বদেশকে উদ্ধার করতে পারত না। এবারে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তারিখ আর ঈদের দিনটা কাছাকাছি পড়েছে।  

প্রথমটিতে স্বশরীরে অংশ নেয়া ছিল আত্মহননের সামিল, তেমনি শেষেরটিতে স্বশরীরে অংশ নেয়া হবে তার প্রয়াসকে ভন্ডুল করার উদ্যোগ। গণমাধ্যমকে আকড়িয়ে তার মহৎ ও দুঃসাহসি কর্মের মূল্যায়ন পূর্বক ঈদের শুভেচ্ছা যুক্ত করছি। দেশরত্ন শেখ হাসিনা আপনি যথার্থই নিজেকে দেশের রত্ন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আবারও বলছি আপনি সু-স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘায়ূ হোন যেন আপনি দুখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারেন। আর আমাদের মত মানুষদের উত্তরোত্তর মুখোজ্জ্বল করে যেতে পারেন। এইটুকুু কি খুব বড় প্রত্যাশা?

*শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

 

 

ট্যাগ:

মতামত
নিজের জানাজা নিয়ে লাইভে যা বললেন ব্যারিস্টার সুমন

banglanewspaper

লকডাউন ভেঙে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজায় ব্যাপক লোকসমাগমের ঘটনায় দেশজুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা সমালোচনা। 

এবার মাওলানা জুবায়েরের জানাজায় জনসমাগম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইয়েদুল হক সুমন।

এ নিয়ে গতকাল শনিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে আসেন তিনি। সেখানে ব্যারিস্টার সুমন বলেন, ‘আমার নিজেরও আনসারী সাহেবের জানাযায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু দেশে এখন মহামারি। মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন চলছে। প্রিয় নবীর একটি বাণীর কথা স্মরণ করে আমি জানাযায় যাইনি। প্রিয় নবী বলেছেন, “কোন এলাকায় মহামারি দেখা দিলে  আপনি যে জায়গায় আছেন, সেখানেই থাকবেন। অন্য কোন জায়গায় যাবেন না। অন্য জায়গা থেকেও মহামারি এলাকায় আসতে দিবেন না।” 

ব্যারিস্টার সুমন আরও বলেন, ‘এই লকডাউন অবস্থায় জানাজায় লাখ লাখ মানুষ দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছে। আপনি বাসায় দুই রাকাত নামাজ পড়েও তার প্রতি সন্মান দেখাতে পারতেন। এরকম একটা মহামারির সময়  আপনারা লকডাউন ভঙ্গ করে পুরো ব্রাক্ষণবাড়িয়া, সিলেট অঞ্চল অরক্ষিত করে দিলেন। করোনাভাইরাস বিস্তারের সুযোগ করে দিলেন। করোনা তো এখন পুরো জায়গা দখল করে নিবে। এর থেকে কষ্টের কিছু নেই। প্লিজ আপনারা আর এ রকম করবেন না।’

এসময় ব্যারিস্টার সুমন আবেগতাড়িত কন্ঠে বলেন, ‘এখন যদি আমার নিজের জানাজাও হয়, দুই/চারজনের বেশি লাগবে না। এটা আমার এলাকার মানুষদেরকেও বলছি। কারণ আমি তো দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি, যাতে আমার কারণে, আমার জানাজায় এসে অন্য কোনও মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত না হন।’

গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় সরাইলের জামিয়া রহমানিয়া বেড়তলা মাদরাসায় মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন স্থান ও জেলার শীর্ষ আলেমরা ছাড়াও হাজার হাজার মাদরাসাছাত্র ও সাধারণ মানুষ অংশ নেয়। জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারীর ছেলে হাফেজ মাওলানা আসাদ উল্লাহ।

গত শুক্রবার বিকেল পৌনে ৬টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মার্কাসপাড়ায় নিজ বাড়িতে মারা যান মাওলানা জুবায়ের। 

এদিকে জানাজায় ব্যাপক লোকসমাগমের ঘটনায় জেলার ৩টি উপজেলার ৮টি গ্রামকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। জানাজায় লাখো মানুষের জনসমাগমে ব্যবস্থা নিতে না পারায় সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহদাৎ হোসেন টিটুকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। 

ট্যাগ:

মতামত
‘জামায়াত ট্যাগ’ নিয়ে আজহারীর আবেগঘন স্ট্যাটাস

banglanewspaper

‘আজহারী জামায়াতের প্রোডাক্ট’- ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আব্দুল্লাহ’র এমন মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে নিজের ফেরিফাইড ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারী।

সেখানে তিনি দাবি করেছেন, তিনি কোনও দলের প্রোডাক্ট বা এজেন্ট নন, তিনি সরকার বিরোধীও নয়। ভিন্নমতকে থামানোর অপকৌশরের অংশ হিসেবে তাকে ‘জামায়াত-শিবির’ ট্যাগ দেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ্য করেন।

স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

‘আমি কোন দলের এজেন্ট বা প্রোডাক্ট নই। আর কোন রাজনৈতিক দলের অর্থায়নে আমার শিক্ষা জীবনও কাটেনি। মিথ্যাচার যেন এদেশে মহামারিতে রুপ নিয়েছে। আর সেটা যখন প্রকাশ্যে, গণমাধ্যমে, দেশের কোন উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীলের মুখ থেকে প্রকাশ পায়, তখন আফসোস আর হেদায়েতের দোয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

নিজের চিন্তা আর মতের বিরুদ্ধে গেলেই এদেশে একটা স্বস্তা ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয়। আর সেটা হল “জামাত শিবির”। এবার আপনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হোন অথবা মনেপ্রাণে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক হোন। দ্যাট ডাজেন্ট মেটার। ভিন্নমতকে দমনের এই অপকৌশল পুরো জাতির ভাগ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

একজন দা’ঈ ইলাল্লাহর কোন দল নাই। তিনি সকল দলের, সকল মানুষের। তাদেরকে দলীয়করণ না করে ব্যাপক ভাবে দ্বীনের খেদমতের সুযোগ করে দেওয়া উচিত। দেশের সব দলের মানুষ যেন তাদের দ্বারা আলোকিত হতে পারে সেটার পরিবেশ থাকা উচিত।

আমি সরকার বিরোধী নই। আমি অন্যায় বিরোধী। তাই, কোন অন্যায় দেখলে সে ব্যাপারে কথা বলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এবার সে অন্যায় যেই করুক না কেন, যে দলই হোক না কেন।

ব্যক্তিগতভাবে, এদেশের রাজনীতিতে আমার কোন ইন্টারেস্ট নেই। স্যোশাল অ্যাক্টিভিটি ও দা’ওয়াহ অ্যাক্টিভিটি এ দুটি কাজই হল আমার আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

আমার মিশন হল এদেশে ইসলামের মধ্যমপন্থার সৌন্দর্য্যকে প্রমোট করা। যেটাকে আরবিতে বলে আল-ওয়াসাতিয়্যাহ। জীবন যাপনে ভারসাম্য, চিন্তায় ভারসাম্য, কাজে ভারসাম্য, এবং আচরণে ভারসাম্যপূর্ণ মুসলিম তৈরি করা।

ভিন্নমতের ব্যাপারে আমি বরাবরের মতই শ্রদ্ধাশীল। সকল মুসলমানকে আপন ভাইয়ের মত শ্রদ্ধা করি ও ভালোবাসি। তাদের নাজাতের জন্যে মন ভরে দোয়া করি। কারো পিছু লেগে থাকা, কাদাছোড়াছোড়ি করা এবং কোন মুসলিম ভাইয়ের ব্যাপারে অন্তরে হিংসা পুষে রাখা পছন্দ করি না। কারণ ইসলাম আমাকে এটা শিখায়নি। আর প্রিয় নবীর আদর্শও এমনটি নয়।

আমি চাই বিভিন্ন ঘোরনার আলেমরা সহনশীলতার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা করুক। তাদের উদারতার প্রভাব পরুক দেশের সকল শ্রেণির মানুষের মাঝে। সংকীর্ণতা আর হীনমন্যতা পরিহার করে, দ্বীনের সকল দ্বায়ীরা কুরআন সুন্নাহর সুধা বিলাতে থাকুক পুরো দেশ জুড়ে, পুরো পৃথিবী জুড়ে।’

ট্যাগ:

মতামত
শীতকালীন প্রকৃতি ও মানব জীবনের পরিবেশ দর্শন

banglanewspaper

নজরুল ইসলাম তোফা: 'বাংলাদেশ' ষড়ঋতুর দেশ। এ শীত ঋতু ষড়ঋতুর একটি ঋতু। আর এমন পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকৃতির পরিবর্তন হয়। তাইতো বাংলার ঘরে ঘরে বারবারই ফিরে আসে- 'শীত'। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা নিকেতনের দেশ-বাংলাদেশ। ষড় ঋতুর এই দেশে প্রত্যেকটি ঋতু তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভূত হয়। 'পৌষ এবং মাঘ মাস'- শীত কাল হলেও অগ্রহায়ণ মাস থেকেই শীতের সূচনা হতে থাকে। এমন শীতের আগমন পত্র কুঞ্জে, জলে-স্থলে সর্বত্রই পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আসলে হেমন্তের প্রৌঢ়ত্বের পরে আসে জড়তা গ্রস্ত শীত ঋতুর নির্মম বার্ধক্য। শুষ্ককাঠিন্য ও রিক্ততার বিষাদময় প্রতিমূর্তি রূপেই শীত আবির্ভাব ঘটে।

তবুও শীতকালের প্রকৃতি ও মানুষের পরিবর্তনের বাস্তব লীলা অনেকেরই ভালো লাগে। বলা যায় যে, কবি সাহিত্যিক সংস্কৃতমনা মানুষের কাছে শীত কাল কাব্য সৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বলতেই হয় যে, বিশ্বের যত মনোরম দৃশ্যের স্থান আছে, সেই গুলোর মধ্যে শীত প্রধান স্থান-ই বেশি। তাই শীতল সেই সকল এলাকা অনেকেরই মন ছুঁয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই এ দেশেও শীতকালীন আবহাওয়া অনেকের খুব পছন্দ। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলের মানুষ শীত কালের এমন সময়, আলাদা প্রশান্তির আমেজেই থাকে। শীতের রাত্রিটা দীর্ঘ হওয়ায় তীব্র ঠান্ডায় নিঃস্তব্ধ প্রকৃতি থাকে। প্রকৃতির মাঝ হতে মানুষ ঘরে ফিরেই যেন সারারাত্রীতে কম্বল, লেপ কিংবা কাঁথা মুড়ি দিয়ে জড়সড় হয়ে গভীর তন্দ্রায় যায়।

খুব ভোর বেলায় ঘনকুয়াশার ধবল চাদরে প্রকৃতি ঢাকা থাকে। তখন হিমেল হাওয়ায় 'হাড় কাঁপানি শীত' জেঁকে বসলেও যেন- শীতের দাপট কাটিয়ে ওঠার জন্যেই মানুষজন সাধ্য মতো দামি দামি শীতবস্ত্র শরীরে জড়িয়েই প্রকৃতি নীরবতাকে উপভোগ করে। তার পাশা পাশি সব শ্রেণীর মানুষ নিজ ত্বকের যত্নশীল হয়। অবশ্য পরিবেশ গত কারণেই বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকে ইতিবাচকভাবেই দেখে।

শীতকালে এই দেশের বেশ কিছু গাছে ফুল ফুটে যেমন, গাঁদা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, গোলাপ প্রভৃতি ফুল শোভাবর্ধন করে থাকে। ফুলের দোকান গুলোতে বাহারি ফুলে ভরে যায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি বরণ করতে নানা ফুলের দোকানগুলোতে নানা রকম ফুলের ডালি, তোড়া কিংবা মালাসহ সুসজ্জিত ফুলের উপকরণ বিক্রি এবং কেনার হিড়িক পড়ে যায়। শীতকালে বিভিন্ন সবজির পাশাপাশি খেঁজুর গাছের মিষ্টি রস, নানান পিঠাসহ হরেক রকমের সু-স্বাদু খাবার অন্য সময় দেখা দায়। তাছাড়া ধান ক্ষেত বা শাকসবজির ওপরে টলমল করা শিশির বিন্দু, সূর্যের সোনালি রশ্মিতে একপ্রকার মুক্তার মতোই যেন ঝলমল করে।

শীতকালের বহু শাকসবজিতে ক্ষেত খামার ভরে যায়। শিম, লাউ, টমেটো, লালশাক,শালগম, পালংশাক, বরবটি, গাজর এবং মুলাসহ নানা রকমের শাক সবজি প্রকৃতির শোভাবর্ধন করে। যা অবশ্যই এই বাংলাদেশের মানুষেরই স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। বাংলার মানুষকে আকৃষ্ট করা বিভিন্ন ধরনের ফলনশীল ফসল, শাকসবজি আর সুস্বাদু পিঠা মেলার আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়।

সরিষা ফুলের হলুদ ক্ষেত আর মৌমাছির গুঞ্জনের দৃশ্য মনকে খুব পুলকিত করে। আহা!! কি আনন্দ আকাশে- বাতাসে! শীতে শিশিরভেজা বনেজঙ্গলে মধু পিয়ে নেচে পাপিয়ারা পিয়া পিয়া বলে ডাকে গুনগুন করে এক দল মৌমাছি, মহুয়া গাছের ফাঁকে ফাঁকে। কতোই মধুর সুরে কতো পাখিরা গায়; কতো না রঙিন ফুলের ডালে ডালে, বাঁশবনে ডাকে আপন খেয়ালে ঝুঁটিবাঁধা হরিয়ালী। তাই অরূপ রূপের এই শীতে কালকেই বাংলার 'রূপের রানী' বললে ভুল হবে না। গ্রামাঞ্চলে সূর্যোদয়ের দেখা পেলেই গোসলের আগে ও পরে খাঁটি সরিষা তেল শরীরে মেখে দুপুরের কাঁচা রোদে বসে কেউ মজার গল্প করে কেউবা বিভিন্ন বই পড়েই বিনোদন করে থাকে। আবার বিকেলে নদী,খাল, বিল ও দীঘির পারে বসে আড্ডা দিয়ে থাকে।স্থির জলের উপর বিকেল বেলার সেই ঢলে পড়া সূর্যের মৃদু আলোর প্রতিচ্ছবি দেখার মজাই আলাদা। তারপর  আস্তে আস্তে কুয়াশার চাদর নেমে আসে।

শীতের সকালে গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষদের কন কনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। শীতকালে মাঝে মাঝে শুরু হয় শৈত্যপ্রবাহ। এ সময় তাপমাত্রা খুব নিচে নেমে আসে। হাড় কাঁপানো তীব্র শীত গ্রাম বাংলার মানুষ-জীবজন্তুর সহিত প্রকৃতি অসাড় হয়ে পড়ে। এমন শীতের হাত থেকে হত-দরিদ্র মানুষ বাঁচতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। তাদের সাধ্যমত শীতবস্ত্র কেনারও ধুম পড়ে যায়। শীতের সকালে ও রাতে ছিন্নমূল মানুষ আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা চালায়। শীতের সকালে শহর এবং গ্রামে শিশু, যুবক বা বৃদ্ধ সহ সব বয়সের মানুষকে যেন আগুনের কুন্ডলী তৈরি করে উত্তাপ নিতে দেখা যায়। এ আগুন জ্বালিয়ে উত্তাপ নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে আলাদা এক অনুভূতি।

অনেক দেরিতেই ওঠে সূর্য। প্রকৃতির ওপর সূর্যের নির্মল আলো ছড়িয়ে পড়ে। তাই তো মনে হয়, সূর্যের আলোতে কোনো তেজ নেই। শীত মৌসুমে ফসল তোলা মাঠ যেন দিগন্তব্যাপী সীমাহীন এক শূন্যতা বিরাজ করে। আসলে ভালো আর মন্দের সমন্বয়েই যেন এই শীত। সুতরাং এই শীতের সকালেই কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশাতে সব কিছু জড় সড় হয়ে আসে, সামনের কোনো কিছুই ঠিক মতো দেখা যায় না, সব কিছু যেন খুব অস্পষ্ট মনে হয়।কখনো কখনো কুয়াশার স্তর এত ঘন থাকে যে, দেখলে মনে হয় সামনে কুয়াশার পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কোনো এলাকায় ঘন কুয়াশার সঙ্গেও ঝিরিঝিরি শিশির বিন্দুর অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়ে। কুয়াশা ভেদ করে সূর্য মামার উঁকি দেয়া প্রাকৃতির রঙিনতা আবহমান বাংলার সকল জনপদ রাঙিয়ে তোলে। রাস্তায় গাড়ি গুলো চলে হেডলাইট জ্বালিয়ে। তারমধ্যেই যেন শীতের রংবেরঙের বিভিন্ন পোশাক গায়ে জড়িয়েই মানুষ ছুটে চলে কাজের নিমিত্তে নিজ গন্তব্যে।

সকালে উঠে সূর্য ওঠার অপেক্ষায় শিশু কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ সহ সবাই যেন উসখুস হয়ে থাকে। চায়ের দোকান গুলোতে চা পানের ধুম পড়ে যায়। শীতে শহরের বিভিন্ন রকমের দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। তাছাড়াও গ্রামে প্রচণ্ড শীতের মাঝে সকল শ্রেণীর মানুষ চা খায়। কাক-ডাকা ভোরের সময় শহর এবং গ্রামবাসীর ঘুম ভাঙে। কনকনে শীতের সকালে শহর ও গ্রামের রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকান বা স্টলে বাহারি রঙের দেশী-বিদেশী নামি দামি 'ড্রেস' পরে জমজমাট আড্ডায় কোলাহল মুখর থাকে। খুব সকালে যখন যুবক ও শিশুরা চা বা গরম দুধ খায়, ঠিক তখনই তাদের মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হয়। এই ধোঁয়া বাহির করে। তারা খুব মজা করে। বন্ধুদের কাছে বলে,- সবাই দেখো বিড়ি খাচ্ছি , তাই তো এমন এই ধোঁয়া! এমন দুষ্টামি তো শীতেই মানায়। শীতে কুয়াশা ভেজা নরম প্রকৃতি কিংবা মানুষের মধ্যে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

বলা দরকার যে কিষকের বউ মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলে সুনিপন হাতে ভাপাপিঠা তৈরি করে, আতপ চাল নারিকেল বা গুড়ের গন্ধে গরম ধোঁয়া উঠা সু-স্বাদু পিঠা একেকবারই একেক জনের হাতে পরিবেশন করার দৃশ্য শীত ঋতু না আসলে সম্ভব নয়। এ যেন একটি চিরায়াত গ্রামবাংলার চিরচেনা শীতের সময়ের পরম মমতা এবং ভালবাসার ছবি। শৈশবে বা কৈশোরে নিজ গ্রামাঞ্চলের সকল শ্রেণীর মানুষের এক আলাদা অনুভূতি। তাই এই শীতের সকালের 'মিষ্টি রোদে' ছেলে মেয়েরা চিড়া-মুড়ি- খেজুরের পাটালি গুড় খেতে খেতেই যেন রোদ পোহাতে থাকে। শীতের দিনে বেলা খুব ছোট হওয়ার জন্যে বেলা মাথার ওপর আসতে আসতেই যেন সন্ধ্যা হয়। এ সময়ে শীতের তীব্র দাপট থেকে বাঁচতে সকল মানুষ- জ্যাকেট, সোয়েটার, মাফলার এবং কোট সহ রংবেরঙের বাহারি শীতবস্ত্র পরিধান করে। সাজপোশাকেও আসে বৈচিত্র্য। বাহারি এসব পোশাক দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। গ্রামের দিকে দৃষ্টি দিলেই শীতের বিশুদ্ধ অনুভূতি ভালো ভাবেই পরিলিক্ষত। গ্রামে ছেলে মেয়েরা তাড়াতাড়িই ঘুম থেকে উঠে, ব্রাশ করতে করতে বাড়ির আশপাশ ঘোরাফেরাও করে। বলা যায় বেশিরভাগ দিনেই যেন কুয়াশার চাদরে আবৃত করে রাখে গ্রামাঞ্চল। ঘাসের আগায় বিন্দু বিন্দু শিশির কনা যেন- মুক্তার মতোই চকচক করে। কোথাও ঘাসের মধ্যে হওয়া ছোট্ট মাকড়সার জাল গুলি অনেক শিশিরের স্পর্শেই যেন 'হীরক খচিত' জালের মতো মনে হয়। ঘাসের শিশির ফোঁটাগুলো নিজ পায়ে মাখাতে এক অনাবিল আনন্দ। 

এদের বয়সটা কম তাই প্রত্যেক শীতের বিকেল ও সন্ধ্যা বেলায় নিজের পালুই থেকে কিংবা অন্যের পালুই থেকে খড় টেনে বের করে বা শুকনো খট-খটে মাঠের বড় বড় নাড়া ছিঁড়ে জড়ো করে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করে মজা পেত। সূয্যিমামা ওঠার আগে ও পাটে যাবার বেলা হালকা হালকা যখন হিম পড়া শুরু করে, মাঠের জমির সবুজ শাক-সবজির উপরে দিনের সূর্য ওঠার মূহুর্তে বা শেষবেলার আলো ঢলে পড়লে সেই মুহূর্তেই- তারা যেন খড়-কুটোতে অগ্নিসংযোগ করে। এ ছেলেমেয়েরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে লকলক করে ওঠা- 'আগুনের শিখার তাপ' যেন নিজ গায়ে মাখতো। তারা ছাইয়ের সে শেষ রক্তিম অঙ্গারটুকু টুপ করে নিভে যায়, তখন হাত ধরাধরি করে হইহই করতে করতে বাড়ি ফিরে। শীতকালে পিকনিকও করে পাড়া-প্রতিবেশীর শিশু-কিশোরা বাড়ির আঙিনায় কিংবা ফাঁকা মাঠে। এই বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান এবং পিকনিক স্পট গুলোতে শীতকালেই ভ্রমণকারীদের ঢল নামে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শিক্ষাসফর শুরু হয়। তা ছাড়াও গ্রামের হাট-বাজারে বা উন্মুক্ত স্থানসহ সর্বত্র পিকনিকের আয়োজন বেড়ে যায়।

শীতের সময়ে গ্রামের খেতে খেতে ধান কাটাও শুরু হয়। পাকা ধানের সোনালি খেতের দৃশ্য দেখে চোখ ফেরানো যায় না। পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার পরপর কৃষকরা আবার বোরো আবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তা যেন বাংলার চরম নান্দনিকতা। কুয়াশাচ্ছন্ন তীব্র শীতের সকালে এই দেশের কৃষক লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে গরুসহ মাঠে যায়। যদিও এই দৃশ্য আজকাল খুব একটা চোখে পড়ে না, তবুও কিছু এলাকাতে আজও দেশীয় গরু ও লাঙল দিয়ে চাষাবাদ হয় বলেই বাংলার সৌন্দর্য ফুটে উঠে। এ বাংলায় কৃষক সৌন্দর্যের প্রতীক। তারাই কনকনে শীতে বোরো বীজ তলা, সদ্য রোপা এবং বোরো আবাদ রক্ষা করায় সকাল-বিকালেই অনেক ঠান্ডা পানি উত্তোলন বা পরিবর্তন করে। তাদের শ্রমের তুলনা হয়না, শীতের হাত থেকে ক্ষেতরক্ষা এবং পরিচর্যায় কঠিন বাস্তবতা সত্যিই যেন প্রশংসনীয়। শীত মানেই- "কুয়াশা আর শৈত্য প্রবাহ সহ তীব্র ঠান্ডা"। দুচোখ বন্ধ করলেই মনের পর্দায় ভেসে উঠে হাড়কনকনে শীতে জবুথুবু একটি গ্রামের ভোর। এ দৃশ্যপট বাৎসরিক ক্যালেন্ডারের পাতায় না থাকলে যেন ক্যালেন্ডারের পরিপূর্ণতাই পায়না। শীতের শিশির ভেজা ভোরের দৃশ্য আহা কি অপরূ, উদীয়মান সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত গ্রামীণ বাড়ির উঠোন। চাদর মুড়ি দেয়া মানুষ, নিঃস্তব্ধ প্রকৃতি ধোঁয়াশা উজ্জ্বল, নরম এবং কোমলতায় ভরা প্রকৃতি। চিত্রশিল্পীরা শীতের প্রকৃতি ছবি আঁকতেও ভালোবাসে। জলরং চিত্র আসলেই যেন শীতের সকালে খুব ভালো হয়। গাম্ভীর্যময় বৈশিষ্ট্যের জন্যই যেন শীতের সকাল বছরের অন্যান্য ঋতুর সকাল থেকে স্বতন্ত্র। কবি সুকান্ত বলেন, শীতের সকাল/ দরিদ্রের বস্ত্রের আকাল/শীতের সকাল/অসাম্যের কাল/ধনীরসুখ আর আনন্দ/শ্রেণি সংগ্রাম এ নিয়ে চলে দ্বন্দ্ব।

নিম্ন আয়ের বা অসহায়-দুস্থ মানুষের জীবনযাত্রা শীতে কাহিল হতেও দেখা যায়। তবুও জামাই আদর করতেই শীতেঋতুকে বেছে নিয়ে সুস্বাদু রসের পিঠা তৈরি করে। বাড়ী ভর্তি আত্মীয় স্বজনদের খাওয়া দাওয়ার ধুম পড়ে যায়। সুতরাং এটিই হলো শীতকালীন এক উল্লেখযোগ্য বাংলার ঐতিহ্য। শীতে গ্রাম শহরে বলা যায় সব খানেই যেন চলে শীতকে ঘিরে নবান্নের উৎসব। এই শীতকালে মেলা সহ সর্বত্রই নানা রকম পিঠা তৈরি হয়। এমন দেশে ১৫০ বা তারও বেশি রকমের পিঠা থাকলেও মোটামুটি প্রায় তিরিশ প্রকারের সুস্বাদু পিঠার প্রচলন অনেকাংশে লক্ষ্যনীয়। তা ছাড়া আরও কতো রকমারি পিঠা অঞ্চল ভেদে রয়েছে সেই গুলোর নাম বলে শেষ করা যাবে না। যেমন হলো:- নকশি পিঠা, ভাঁপা পিঠা, ছাঁচ পিঠা, দোল পিঠা, রস পিঠা, পাকান পিঠা, চাপড়ি পিঠা, চিতই পিঠা, পাতা পিঠা, মুঠি পিঠা, ছিট পিঠা, মালাই পিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, ঝাল পিঠা, খেজুরের পিঠা, পুলি পিঠা, ডিম চিতই পিঠা, ছিটকা পিঠা, চাঁদ পাকন পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা,পানতোয়া পিঠা, জামদানি পিঠা, মালপোয়া পিঠা, ভেজিটেবল সরভাজাপিঠা,তেজপাতা পিঠা, ঝালপোয়া পিঠা, কাটা পিঠা, লবঙ্গ লতিকা পিঠা, তেলপোয়া পিঠা, হাঁড়িপিঠা, মুঠিপিঠা, চুটকিপিঠা, গোকুল পিঠা, রস ফুল পিঠা, নারকেল পিঠা, পুডিংপিঠা, আন্দশা পিঠা, সুন্দরী পাকন পিঠা, মেরা পিঠা, তেলেরপিঠা, চাপড়িপিঠা, দুধ- রাজ পিঠা, সেমাই পিঠা, ঝুড়ি পিঠা, ফুল পিঠা, গোকুল পিঠা, বিবিয়ানা পিঠা, ঝিনুকপিঠা, ফুলঝুরি পিঠা, কলা পিঠা, ক্ষীরকুলি পিঠা, কুশলি পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, ঝাল মোয়া পিঠা,নারকেল জেলাফি পিঠা, নারকেলের ভাজা পুলি পিঠা, নারকেলের সেদ্ধ পুলি পিঠা, নারকেল- নাড়ু পিঠা, ফিরনি পিঠা, চিড়ার মোয়া পিঠা কিংবা কাউনের মোয়াপিঠা ইত্যাদি নাম অঞ্চলভেদে পিঠা হিসেবেই যেন বিবেচ্য। গ্রামে গ্রামে রং-বেরঙের পিঠা, ক্ষীর ও পায়েস খাওয়ার ধুম পড়ে শীতমৌসুমে। আর হতদরিদ্র মানুষের বাড়িতেও হরেক রকমের পিঠাপুলির আয়োজনের দৃশ্য সত্যিই যেন সর্বশ্রেণীর মানুষদেরকে আনন্দ দেয়। এমন শীতে দেশের নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে রকমারি পিঠা উৎসব হয়। তা ছাড়াও খেজুর রসের তৈরি পায়েস এবং বিভিন্ন রকম সু-স্বাদু পিঠা নিয়েই যেন পৌষ-সংক্রান্তির উৎসবও জমে ওঠে। আর নিজের বাড়ি ছাড়াও সন্ধ্যায় হাট-বাজারে যেন আতপ চালের গুঁড়া, নলেন গুড় এবং নারিকেল দিয়ে গণমানুষের জন্য তৈরি করা গরম ভাপা পিঠা বা পাটিসাপটা পিঠা খাওয়ার নান্দনিক দৃশ্যগুলো  উপভোগ করার মতো। অন্যকে খেতে দেখলে নিজেরও অজান্তে জিহ্বাতে পানি এসেই যায়। সকালে খেজুরের -"মিষ্টি রস আর মুড়ি" খাওয়া সবার মন কাড়ে। গাছিরা কলস ভরে 'রস' নিয়ে আসার নান্দনিক দৃশ্য চমৎকার। চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্মে শীত ঋতুর খেজুর গাছ ও গাছিরা না থাকলে শীত ঋতুর তাৎপর্য ফুটে উঠে না। খেজুরের "কাঁচা রস" রোদে বসে খাওয়ার মধ্যেই একটা- আলাদা স্বাদ আছে। আর সুন্দর পরিবেশের মধ্যে খেজুর রসের পায়েস আর নলেন গুড়ের কথা ভাবলেই যেন মনে হয় এমন বাংলায় বারবারই 'শীত' ফিরে আসুক। ইতিবাচক আর নেতিবাচক যাই হোক শীতের সৌন্দর্য প্রকৃতি আর জনজীবন বিমোহিত হয়।

বাতাসে নতুন ধানের গন্ধে যেন ভেসে বেড়ায় প্রকৃতি ও পরিবেশ। শীতে বেশির ভাগ জমিতেই ফসল থাকত না। আবার যে জমিতে ধান কিংবা ফসল হয় তার খড়কুটো জমিতেই বেশি থাকে। সেই রকম কোনো জমিতেই প্রায় প্রত্যেক শীতে ফুটবলের মাঠ এবং ক্রিকেট খেলার পিচ তৈরি করে দামাল ছেলেরা আনন্দ করে। হয়তো গ্রামের কোথাও খেলা ধুলার কোনো জায়গা বা জমি না থাকে, তখন তারা বাড়ির আসেপাসে খেলাধুলার জন্যে সীমিত ভাবে খেলতো, ক্রিকেট খেলায় ছক্কা মারা হতোনা। তাই শীতের খেলার জন্যেই উন্মুক্ত মাঠের পিচের গুরুত্ব ছিল বিশাল। গ্রামে শীতের সকাল ও বিকাল বড়ই চমৎকার। ব্যক্তিভেদে জীবনযাপনের ভেদাভেদ উহ্য থাকলেও এই শীতের সময়টা মনোমুগ্ধকর হয়েই উঠে। শীতের সকাল, বিকেলের প্রাকৃতিক দৃশ্যের বৈচিত্র্য অন্য সময় তা দেখা মেলে না। ভোরের শিশির ও শিশির ভেজা গাছের সকল পাতা, ঘাস ও কুয়াশা সহ দিন রাতের শীতল আমেজের অনুভূতি উপভোগ করার মতোই। হাড় কাঁপানো কুয়াশা শীতেকালে গ্রামাঞ্চলের দামাল ছেলেরা খাওয়াদাওয়ার কিছুক্ষন পরেই যেন জড়ো হয় নিজ হাতে তৈরি খেলার মাঠে। শীতকালের এ খেলাধূলার আয়োজন অন্য ঋতুর চেয়ে ভালো পরিবেশ গড়ে উঠে। বাংলাদেশের গ্রামে বা গঞ্জে শীতে নানানধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়৷ কিন্তু সেই সংখ্যা কমে আসলেও কোন না কোনো অঞ্চলে তা এখনো অব্যাহত আছে৷ শীতে এখন ধর্মীয় উৎসবগুলো বেশি জাঁকজমক পূর্ণ ভাবেই হয়৷ আসলেই প্রতিটি ঘরে টেলিভিশন থাকাতে মানুষ ঘরেই বিনোদন করে। বাইরে রাতে কম বাহির হয়। রক্ষণশীলতা বাড়লেও সাংস্কৃতিক চর্চা শীতেই ভালো হয়। শীতে রাতভর যাত্রাপালা দেখার উৎসাহ আজো গ্রামের মানুষেরা পায়। বাংলা ভাষাতেই কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, শীতকাল নিয়ে রঙ্গরস ভরা কবিতা লিখেছে। আসলে ঠান্ডা পানি যে কত ভীতপ্রদ তা বর্ণনা করে ঈশ্বর গুপ্ত বলেন:- জলের উঠেছে দাঁত, কার সাধ্য দেয় হাত.../ আঁক করে কেটে লয় বাপ,/ কালের স্বভাব দোষ,... ডাক ছাড়ে ফোঁস ফোঁস.../ জল নয় এ যে কাল সাপ। নৈসর্গিক শীতের ছোয়ায় প্রকৃতি এবং পরিবেশের সঙ্গে কিঞ্চিৎ হোক আর সর্ববৃহৎ হোক না কেন, তা যেন একেবারেই হত-দরিদ্র মানুষ কষ্ট দেয়। এক মহল শীতে আনন্দ উপভোগ করে অন্য মহল কষ্ট পায়। এটাই যেন শীতের বৈশিষ্ট্য। শীতের আমেজের সহিত এই হতদরিদ্র মানুষ সহ সকল শ্রেণী পেশার গণমানুষেরাই খুঁজে পায় 'ধূসর প্রকৃতি'। আবহমান বাংলার মানুষ, হেমন্তের শেষ বিকেলে প্রকৃতির নান্দনিকতার মাঝে তাদের জীবনকে উপভোগ করার মজাটা যেন আলাদা ভাবে দেখে। শান্ত প্রকৃতিতে ষড়ঋতুতে শীতের আগমন বৈচিত্র্যময়। বাড়ে কুয়াশাময় শীতের দাপট তার সাথে বাড়ে বিভিন্ন পাখির সংখ্যা। দেশী-বিদেশী অসংখ্য পাখিরা সারাদিন মুখরিত রাখে কলতানে। এই সময় সূদূর সাইব্রেরিয়া সহ অন্যান্য দেশ থেকে পাখিরা বাংলাদেশে এসে মাঠে-ঘাটে ও গাছ থেকে গাছেই স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়ায়। শীতের অতিথী পাখিদের বদ করা হয় না। অন্য দেশে তীব্র শীত হওয়ার জন্যে এই দেশে অসংখ্য পাখিদের আনাগোনা হয়। 

বাংলাদেশের ঋতুচক্রে অন্য পাঁচটি ঋতু হতে শীত কাল একটু বৈশিষ্ট্যর। আসলেই ভিন্নতার জন্যেই শুষ্ক চেহারা ও হিমশীতল অনুভব নিয়ে আলাদা হয়ে ধরা দেয় শীত। সবুজ প্রকৃতি রুক্ষ মূর্তি ধারণ করে। এ শীতের শুষ্কতায় অধিকাংশ গাছ পালার পাতা গুলো ঝরে পড়তে থাকে।শীত তার চরম শুষ্কতার রূপ নিয়ে প্রকৃতির ওপরে যেন জেঁকে বসে। রুক্ষতা, তিক্ততা ও বিষাদের প্রতিমূর্তি হয়ে শীত আসে। শীতের তান্ডবে প্রকৃতিও হয় বিবর্ণ। সুতরাং কুয়াশাচ্ছন্ন সমগ্র প্রকৃতি, শিশির সিক্ত রাস্তা ঘাট কিংবা হিমেল বাতাস মিষ্টি মধুর আমেজ শীতকাল একটি ভিন্ন রূপ নিয়ে আসে। আবার কোনো কোনো গাছে থাকে না পাতা, ফুল বা কোনো মাঠেও থাকে না ফসল। আসলেই কর্ম মুখর প্রকৃতি যেন এখানেই এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। শীতকালে এদেশের নদ-নদীগুলো শুকিয়ে যায়। সকাল বেলা নদীর পানি থেকে কুয়াশার ধোঁয়া সৃষ্টি হয়ে কুণ্ডলী আকারে এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করে। নিঃস্তব্ধ গভীর রাতে গাছের পাতায় পাতায় শিশির বিন্দু জমতে থাকে। আবার ভোররাতে শিশিরকণা খুব বড় বড় ফোঁটায় এক ধরনের বৃষ্টির মতোই ঝরতে থাকে। টিনের চালে, ঘরের চালে, পাতার ওপর টুপটাপ বৃদ্ধির মতো পড়তে থাকে। সকালে মাঠে মাঠে ঘাসের ডগায় বিন্দু বিন্দু জমে থাকা শিশির রোদের আলোয় ঝিকমিক করে।

পরিশেষে বলতে চাই, গ্রাম এবং শহরের সকল মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হওয়ার জন্যেই শীতে কালের নিস্তব্ধ জনজীবন বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত হয়েছে। ঘরে বসে শীতবস্ত্র পরিধান করে টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং ফেসবুকের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সময় কাটায়। এ শীতকালে মানুষের জন্যে কিছু মানুষ খোঁজে পাওয়া যায়, তারাই হত-দরিদ্র মানুষকে, পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ানো মানুষকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। তারাই তো হলেন সরকার, দানশীল ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সংগঠন এর ব্যক্তি। দুস্থ-গরিবদের মধ্যেই শীত বস্ত্র বিতরণ করে মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চায়। অপরদিকে এদেশের বিত্তবানদের গরম কাপড়ের প্রদর্শনী বাংলার প্রকৃতিতে মন ভোলানো রূপ বিরাজ করে। সকল শ্রেণির মানুষের মুখে হাসি এবং তারা শীতকালের বাহারিপোষাক পরেই ফুরফুরে মেজাজে থাকে। কবিরা কবিতায় বলেন- শীত, শীত, শীত উমের চাদরে মায়ের মমতা মাখা, আমার গাঁয়ের পথ চলে গেছে বহুদূর আঁকাবাঁকা। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়ে। একটি ঘাসের শিষের উপর একটি শিশির বিন্দু। বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথের এই কথা যুগে যুগে যাথার্থই। বাংলাদেশের গ্রামের শীতঋতু সত্যিই এর তুলনা হয় না। কোনো দেশেই নেই এই দেশের মতো এমন নয়নাভিরাম অলংকারে মুড়োনো প্রকৃতি ও মানুষ। কোথাও পাবে না খুঁজে এমন দেশটি- 'বাংলাদেশ'।

ট্যাগ: