banglanewspaper

নিজস্ব প্রতিবেদক: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী বছর থেকে বছরে দুটি সেমিস্টার চালুর যে নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে দাবি করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালকরা। তারা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু থেকেই এ পদ্ধতি ভালোভাবে চলছে। এর পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে তারা বলেন, ওই সব দেশে বছরে দুইয়ের বেশি সেমিস্টার পদ্ধতি চালু রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের মত নিম্ন মধ্যবিত্ত দেশের অভিভাবকদের জন্য বছরে দুই সেমিস্টার খুবই কষ্টসাধ্য হবে।

এদিকে ইউজিসি বলছে, ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রথা বাতিল করে আগামী জানুয়ারি থেকে দুই সেমিস্টার চালু করতে হবে। পাশাপাশি মানসম্মত সিলেবাস-কারিকুলাম পড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সূত্রে জানা গেছে, বছরে দুটি সেমিস্টার হলে তাদের একবারে একটা মোটা অংকের অর্থ গুনতে হবে যা অনেক পরিবারের ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়। বর্তমানে যে তিন সেমিস্টার প্রথা চালু আছে এতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি যে আগ্রহ আছে দুই সেমিস্টার হলে অনেক সময়ের ব্যাপার, সেক্ষেত্রে অনেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। অনেকেই আবার সেমিস্টার গ্যাপও দিতে পারে। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি) বলছে, বর্তমানে যে তিন সেমিস্টার পদ্ধতি আছে এটিই সফল ও পরীক্ষিত।

সংগঠনটি বলছে, সরকারের পক্ষ থেকে হঠাৎ প্রতিষ্ঠিত ও সফল একটি পদ্ধতিকে ভেঙে দুই সেমিস্টারের নির্দেশনা তাদের কাছে বোধগম্য নয়। এতে শিক্ষার্থীদের খরচ কমবে না বরং বাড়বে।

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি জানিয়েছে, দুই সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হলে শিক্ষার্থীদের খরচ কমার কোনো কারণ নেই। উল্টো মাসভিত্তিক ফি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

সংগঠনটি মনে করে, এমন একটি সিদ্ধান্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব সময়ই সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আমরা আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে চাই।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি ও ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই সেমিস্টার চালু আছে বলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করতে হবে এটা কখনই যথার্থ না। 'আমরা প্রথম থেকেই তিন সেমিস্টার প্রথা চালু করে আসছি। এরমধ্যে সমস্যাটা শুরু করল ইউজিসি নিজেরাই। তারা হঠাৎ করে দুই সেমিস্টার করার কথা বলছে। কিন্তু পাবলিকের মত প্রাইভেটে দুই সেমিস্টার প্রথা চালু করা সম্ভব নয়। কারণ সরকার পাবলিক কোটি কোটি টাকা সেখানে বিনিয়োগ করছে, সরকারি টাকায় শিক্ষকেরা চাকুরি করছেন। এতে তাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না, সরকার নিজেই তাদের সাহায্য করছে। কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তো সম্পূর্ণ ভিন্ন'।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটা সিস্টেম চলে আসছে, এতদিনে কোনো সমস্যা হয়নি সেখানে নতুন একটি সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে আমাদের সাথে বিস্তারিতভাবে আলোচনা না করেই। এটা আমার মনে হয় কখনই যথাযথ নয়। আমেরিকার মত যায়গাতেও তিন সেমিস্টার পদ্ধতিতে লেখাপড়া হচ্ছে। 

শেখ কবির হোসেন বলেন, 'আমি ইউজিসি চেয়ারম্যানকে বলেছি যে, আপনার দুই সেমিস্টার সিস্টেমটাকে অপশনাল (ঐচ্ছিক) করে দেন, যদি কেউ দুই সেমিস্টার চালাতে চাই তাহলে চালাবে। আমরা যেটা পারব সেটাই আমাদেরকে দেওয়া উচিত বলে মনে করি'। 

শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে তিনি বলেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে তারা অনেকেই পার্ট টাইম চাকুরী করছে। দুই সেমিস্টার পদ্ধতিতে তাদের পড়ালেখাতে ঝামেলা সৃষ্টি হবে।

ইউআইইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. চৌধুরী মফিজুর রহমান বলেন, দুই সেমিস্টার পদ্ধতিতে সব থেকে বড় সমস্যা খরচ বেড়ে যাওয়া। দুই সেমিস্টারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা বেশি লাগবে, শিক্ষক বেশি লাগবে এবং অন্যান্য খরচও বেড়ে যাবে। 

ভিকরোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবিএম মঈনুদ্দিন চিসতী বলেন, দুই সেমিস্টার পদ্ধতি রাতারাতি করতে গেলে আমার মনে হয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই সহজভাবে নেবে না। একটা নতুন পদ্ধতি চালু করতে গেলে খারাপ ভালো দুটোই প্রভাব বিস্তার করে। ইউজিসি দুই সেমিস্টার প্রথা চালু করলে আমার মনে হয় না যে সেটা ভালো হবে। কিছু কিছু ডিপার্টমেন্টে দুই সেমিস্টার চালু করা যেতে পারে কিন্তু ঢালাওভাবে সব ডিপার্টমেন্টে দুই সেমিস্টার চালু করা আমার পক্ষে যুক্তিযুক্ত মনে হয় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি উপার্জনের মূল যায়গা। এমন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই যেখানে ইউজিসি’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আত্মীয় স্বজন চাকরি করে না। ইউজিসিতে কর্মরত যারা আছেন তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের আগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জন্য খোঁজ করা শুরু করেন। একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ইউজিসি’র বর্তমান চার সদস্য ২০১৮ সালে অবসরে যাচ্ছেন। সেই মোতাবেক ওই চার সদস্য ইউজিসি থেকে অবসরের পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে।

উল্লেখ্য, সিলেটের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাবেক ইউজিসি চেয়ারম্যান, চট্রগ্রামের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যিনি ইউজিসি’র সাবেক সদস্য, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্সের উপাচার্য প্রফেসর ড. আবুল হোসেন যিনি ইউজিসি’র সাবেক সদস্য, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর উপদেষ্টা প্রফেসর ড. এ. কে আজাদ চৌধুরী যিনি সাবেক ইউজিসি চেয়ারম্যান।

নাম না প্রকাশের শর্তে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি অনেক সময় আমাদের বাধ্য হয়েই পার্ট টাইম চাকুরী করতে হয়। কিন্তু দুই সেমিস্টার পদ্ধতিতে লেখাপড়া চালু হলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের অনেক সমস্যায় পড়তে হবে।’

ট্যাগ: Banglanewspaper বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসি সেমিস্টার