banglanewspaper

বাংলাদেশ প্রবাদতুল্য তিনটি উক্তি আছে যা হলো বাংলাদেশের ইতিহাস মানে ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস মানে আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস। উক্তি তিনটি কমবেশি গ্রহনযোগ্য, কিন্তু এই প্রবন্ধে আমি শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালের ১লা জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাকে প্রায়শঃ ‘রাজকীয় ক্ষতিপূরণ’ বলে ধারনা করা হয়। ১৯০৫ সালে বাংলা ও আসাম নিয়ে পূর্ববঙ্গ প্রদেশ গঠিত হয় এবং ১৯১১ সালে তথাকথিত হিন্দু ভদ্রলোকদের আন্দোলনের প্রেক্ষীতে এই বঙ্গভঙ্গ রোধ করা হয়। মুসলমান সম্প্রদায়ের বিক্ষুব্ধতাকে প্রশমনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হিসাবে পরিত্যক্ত কতিপয় সুরম্য প্রাসাদ ও রমনার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ও উপাচার্য ভবন এর ন্যায় দু’একটি বাংলো আজও সে স্মৃতি বহন করে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে মুসলিম জাগরনে একটি মাইলস্টোন বলে চিহ্নিত করা যায়। এই সময় সাম্প্রদায়িক বিভাজন তীব্র হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমন কিছু গ্রাজুয়েট জন্ম নেয় যারা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এবং মুসলমানদের একক প্রতিষ্ঠান মুসলীম লীগের জন্ম ও বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান আন্দোলনের এক প্রধান নেতা শেরে বাংলা ফজলুল হক এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই তার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু রাজনৈতিক নেতা ও যুব নেতারা ঢাকায় বসবাস গড়েন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব বরন করেন। কেউ কেউ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করলেও ঢাকায় এসে তার সমাপ্তি টানার প্রয়াস নেন। বাংলাদেশের মহান স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এ’সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন’, যদিও ঘটনা পরম্পরায় তিনি ডিগ্রি শেষ করতে পারেন নি। অধ্যায়নকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বহিস্কৃত হন। 

১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তানে কিংবা পাকিস্তানপূর্ব বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের সূচনা কারীদের বেশ অনেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আবারও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আসতে হয়। তার সংগঠন ছাত্রলীগ ও তাকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বস্তুতঃ ভাষা আন্দোলনকে বাংগালীর সুপ্তি ভঙ্গের আন্দোলন বা বাঙালী জাতি সত্বার রেনেসা বা পুনর্জাগরন বলে অভিহিত করা যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের মহানায়কদের সাথে যেমন শেখ মুজিবের নাম জড়িয়ে আছে তেমনি আছে আবুল কাশেম, নুরুল হক ভূঁইয়া, অলি আহাদ, কামরুদ্দিন আহমদ, আতাউর রহমান খান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এর নাম। তারা ছিলেন এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আত্মাহুতিদাতাদের কেউ কেউ ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। 

ভাষা আন্দোলনের পর যে আলেখ্য বিশিষ্টতা অর্জন করে আছে তার নাম হলো যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের পূর্বাংশের প্রাদেশিক নির্বাচনে তার বিজয়। এই যুক্তফ্রন্টের তিন নেতার একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই যুক্তফ্রন্ট ভিত্তিক স্বাধীকার আন্দোলনে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন সম্পৃক্ত ছিল। সম্পৃক্ত ছিল কৃষক শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল শামসুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। 

১৯৫৪ সালে যে ছাত্রটি নূরুল আমিনকে নির্বাচনী ভোটে পরাজিত করেছিলেন সেই খালেক নেওয়াজও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই সময়ে স্বায়ত্ব শাসন চেতনা তীব্রতর হতে থাকে, যখন যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ভানুমতির খেলা শুরু হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ৬ দফা আন্দোলনের কথা অনস্বীকার্য। এই আন্দোলনের মহান প্রণেতা ও প্রবক্তা ছিলেন শেখ মুজিব। তার সুযোগ্য সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। ইতোপূর্বে দুই অর্থনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি রচয়িতারা বিশেষতঃ আতোয়ার হোসেন, আনিসুর রহমান, নূরুল ইসলাম, ওয়াহিদুল হক ও রেহমান সোবহান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। 

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রপথিকদের প্রায় সবাই ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে আয়ুব বিরোধী ও মার্শাল ল বিরোধী এসব আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল। ছাত্র শক্তি নামে একটি ছাত্র সংগঠন তাদের সহযোগী হিসাবে কাজ করে। এ’সব সংগঠনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া তারা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের শিক্ষার্থী। ১৯৬২ সালের দিকে শেখ মুজিব আগরতলা গিয়েছিলেন এবং সে সময় থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতীয় সম্মতি লাভ করেন। তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি কতিপয় গোপন সংগঠন যথা স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদ; বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ) গঠনে ব্রতী হন। ১৯৫৯ সালে সংগোপনে ছাত্রলীগকে পূর্ণজীবিত করার পরই বঙ্গবন্ধু উপর্যুক্ত দু’টি সংগঠনের জন্ম দেন। এ’সবের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীগণ।  

১৯৬৪ সালের আইয়ুব ও মোনেম বিরোধী আন্দোলনের সৈনিকগণ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে সময়কার আছমত আলী শিকদার, শেখ ফজলুল হক মনি, কমরেড ফরহাদ, রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরীর নাম কে না জানে। তবে তারা যে সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন সে কথা হয়ত অনেকে জানেন না। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে অপর একটি অনন্য ঘটনা হচ্ছে ১৯৬৬ সালের ৭ই জুনের হরতাল। ৬ দফার স্বপক্ষে ও শেখ মুজিবের মুক্তির লক্ষ্যে সেদিন সারা বাংলাদেশকে স্তব্দ করে দেয়া হয়েছিল। সেদিনের নেতৃত্বে শিরোভাগে ছিলেন শেখ ফজলুল হক, সিরাজুল আলম খান, আল-আমিন চৌধুরী, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল মান্নান চৌধুরী, মনিরুল হক চৌধুরী, শেখ শহিদুল ইসলাম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ। এদের সবাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। 

৬ দফা ও ১১ দফার আন্দোলনের সব নেতারাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। তোফায়েল আহমদ এর ন্যায় কিংবদন্তী নেতা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আবদুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, শামসুদ্দোহা, মাহবুবুল হক দোলন, ফখরুল ইসলাম, নাজিম কামরান চৌধুরী বা দীপা দত্ত ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী। 

১৯৬৮-৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের পুরোধা ব্যক্তিদের সব ক’জন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ। ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবকে তারাই বঙ্গবন্ধু অভিধায় ভূষিত করেছিলেন। ৬ দফা ও ১১ দফার নেপথ্যের মন্ত্রনাদাতা যথা- আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি ও মতিয়া চৌধুরী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি সন্তান। ৬ দফা আন্দোলনের পূর্বে অতি সংগোপনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগকে পুর্নজীবিত করা হয়। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে কয়েকটি বাহিনী যথা জহুর বাহিনী, জয় বাংলা বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এগুলো ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক। ৬ দফা আন্দোলনে সহায়ক শক্তি হিসেবে শিল্প ও সাহিত্য সংঘ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। প্রতিষ্ঠাকালে এর প্রধান ছিলেন রফিকুল্লাহ চৌধুরী। অমর একুশের সংগীত রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, খালেদ হাশিম, আবদুল মান্নান চৌধুরীও এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। আয়ূব মোনায়েমের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত ছাত্রলীগের সম্পূরক হিসাবে এর অবদান অনস্বীকার্য। সংস্কৃতি সংসদও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছিল এবং তার নেতারা রাজনীতির সম্পূরক সংস্কৃতি চেতনায় অগ্রগামী ছিলেন।  

আয়ুব-মোনায়েমের পতনের পর ইয়াহিয়ার মার্শাল ল বিরোধী আন্দোলনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কৃতিত্ব রয়েছে। পাকিস্তানে এক ব্যক্তি এক ভোট ব্যবস্থায় ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃত হন এবং এবারে আর স্বায়ত্ব শাসন নয়, সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যান। 

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখক ছাত্রনেতা নির্বাচনে অংশ নেন। তাদের মধ্যে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সত্তর সালের নির্বাচনের পরই বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন যে সেই ১৯৫৪ সালের মতই তাকে ও তার দলকে ক্ষমতায় যেতে দেয়া হবেনা। তাই তিনি স্বশস্ত্র যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্মতি নিয়ে রাখেন। ঘটনার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ প্রদানসহ বিভিন্ন ধরনের সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া হয়। এমনকি মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডের মাধ্যমে আত্ম-অবমাননাকর বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রস্তাবও দেয়া হয়। এ’সব প্রস্তাবে সাড়া না দিতে গৃহাভ্যন্তর থেকে শেখ ফজলুল হক মনি ও শেখ হাসিনা, ড. আবদুল ওয়াজেদ মিয়া ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। 

১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুর মনোবল তুঙ্গে উঠে। তবে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা নিয়েও সন্দেহ পোষন করেন। তাই ১৯৭১ সালের প্রথম পর্বে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ৬ দফার স্বপক্ষে অনড় থাকার শপথ বাক্য পাঠ করান। তারপর কি হতে যাচ্ছে তা তিনি জানতেন। তিনি ১লা মার্চ সংসদ অধিবেশন স্থগিতের অগ্রিম খবরও জানতেন। ১লা মার্চের জঙ্গী কার্যক্রম ২৮ ফেব্রুয়ারীতে নির্ধারিত হন। মূলত: সেদিন থেকেই চার যুব নেতা তথা শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ ও চার ছাত্রনেতা তথা আ, স, ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাহজাহান সিরাজের উপর তিনি সশস্ত্র যুদ্ধের দায়িত্ব অর্পন করেন। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে বাংলাদেশের পতাকা জনসম্মুখে প্রদর্শিত হয়। ৩রা মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার প্রস্তাব, জাতীয় সংগীত ও শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পালিত হয়। তবে ৩রা মার্চ সকাল এগারোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ স্বাধীনতার স্বপক্ষে সক্রিয় ভূমিকায় নামেন। ঐদিন বেলা এগারোটায় শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১ দফা অর্থাৎ স্বাধীনতার স্বপক্ষে বটতলায় এক সভা অনুষ্ঠিত হন। বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক আবদুল মান্নান চৌধুরীর প্রস্তাবনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের আগেই ৬ দফার বদলে এক দফার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ২৮শে ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধু ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডের মধ্যে অনুষ্ঠিত একান্ত সভা ও বৈকালিক টেলিফোন যোগাযোগের পর বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত হন যে সশস্ত্র লড়াই ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। তিনি এই সিদ্ধান্ত শেখ মনি ও আবদুল মান্নান চৌধুরীকে জানিয়ে দেবার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্বাধীকার ও স্বায়ত্ব শাসনের গন্ডি ছাড়িয়ে স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। 

১লা মার্চ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা অস্ত্র লুট ও অস্ত্রের প্রশিক্ষণে ব্রতী হন। শিক্ষকরা এক ধরনের থিংক ট্যাংক গড়ে তুলেন এবং বঙ্গবন্ধু ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে লিয়াজোঁ করার জন্যে আবদুল মান্নান চৌধুরীকে মনোনয়ন দেন। 

৩রা মার্চের পর ছাত্র নেতৃত্বের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারীদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ট হতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক ৭ মার্চের ভাষণ তৈরীতে সহায়তার প্রস্তাব দিলেও সে ভাষন সম্পূর্ণ ছিল বঙ্গবন্ধুর একক ও নিজস্ব। সে ভাষনের ব্যাপারে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও শেখ হাসিনার প্রভাব বলতে গেলে অনেক বেশী। মার্চের প্রথম সপ্তাহে গনহত্যা আঁচ করতে পেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ পূর্বাহ্নে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিকট সতর্ক বার্তা প্রেরণ করেন এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে সংযোগ স্থাপন করেন। 

২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউন পরবর্তী হত্যাযজ্ঞে সেনাবাহিনীর হাতে আত্মাহুতি দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ জন শিক্ষক; ১০১ জন শিক্ষার্থী, একজন কর্মকর্তা ও ২৮ জন কর্মচারী। ২৫ মার্চ রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিত যথা শিক্ষক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জোর্তিময় গুহ, সরাফত আলী সহ অনেকে নিহত হন। সেনাবাহিনী নিরীহ সরাফত আলীকে একটিভিষ্ট আবদুল মান্নান চৌধুরী মনে করে হত্যা করে, তথ্য বিভ্রান্তির কারনে এমনটা ঘটে। 

মার্চের প্রতিরোধ যুদ্ধের সাথে পেশাধার সৈনিক ও সশস্ত্র বাহিনীর সীমিত সংযুক্তি ছিল, ব্যাপক সংযুক্তি ছিল ছাত্রদের। তাদের সম্মুখ ভাবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার অধিভুক্ত কলেজ সমূহে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের ভূমিকা। এই প্রতিরোধে সেনাবাহিনী, আনসার, ইপিআর বাহিনীর সাথে প্রশিক্ষিত মুজিব বাহিনী (সাবেক বিএলএফ) ও জয় বাংলা বাহিনীর সংযুক্তি হলেও এপ্রিলের প্রথম ভাগেই প্রতিরোধ অনেকটা ভেঙ্গে পড়ে। 

এপ্রিলের পর যুদ্ধটাকে চাঙ্গা রাখতে গণমাধ্যমের আশ্রয় নেয়া হয়। পূর্বাঞ্চল থেকে ‘বাংলাদেশ’ পত্রিকা ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে যাদের প্রিন্টার লাইনে সম্পাদক হিসাবে আবুল হাসান চৌধুরী ও রহমতউল্ল্যাহর নাম প্রদর্শিত হয়। এ দুটো ছিল ছদ্মনাম। প্রথমোক্ত জন হলেন আবদুল মান্নান চৌধুরী ও শেষোক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র গুল হায়দার। পরবর্তীতে জয় বাংলা পত্রিকার সম্পাদক আবদুল মান্নানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এমনকি বাংলার বাণী সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক যথাক্রমে শেখ ফজলুল হক মনি ও আমির হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। অন্যান্য গনমাধ্যমের প্রায় সব সম্পাদক ও সেবক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রবৃন্দ। গনহত্যা শুরু হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পাকিস্তান সরকারের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে বিদেশে বাংলাদেশ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। পরে তিনি অবশ্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন। 

২৫ মার্চের ক্র্যাক ডাউনের পর ব্যাপক মানুষজন সীমান্ত অতিক্রম করতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬৮ লাখ শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় পেলেও এক কোটির বাকীরা পূর্ব বাংলা থেকে পূর্বে হিজরতকারী এক কালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাছে আশ্রয় নেন। শেষোক্তগণ বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি গঠন করে আশ্রায়ন ও মনস্তাত্বিক যুদ্ধ সম্প্রসারনের কাজে নিবেদিত শরনার্থী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, স্বাধীন বাংলা বেতার কর্মীদের সার্বিক সহায়তা দেন। মুক্তির গানের সাথে কর্ণেল নুরুজ্জামানের স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুলতানা জামান জড়িত ছিলেন। ক্র্যাকডাউনের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আবদুল মান্নান চৌধুরী, অজয় রায়, মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, আবু জাফর, শহীদউদ্দিন আহমেদ সহ অনেকে সীমান্ত অতিক্রম করেন। তাদের কাউকে কাউকে ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় চাকুরী দিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত রাখা হয়। আবদুল মান্নান চৌধুরী সশস্ত্র সংগ্রামের সাথেই যুক্ত হয়ে যান। এপ্রিলের শেষভাগে শেখ মনির নেতৃত্বে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর পূণর্জাগরনের সময় থেকে তিনি মুজিব বাহিনীতে জড়িত ছিলেন। তাকে ভারতে শিক্ষকতার প্রস্তাব দেয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। 

মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর বিশাল অবদান রয়েছে। শুধুমাত্র প্রশিক্ষণে ভারতীয় বাহিনীর সহায়তা ও অস্ত্রের যোগান ছাড়া এই বাহিনীর সাথে ভারতীয় অন্য কোন বাহিনী যুদ্ধের প্রথম দিকে সংযুক্ত হয়নি। নিয়মিত বাহিনী ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সমঝোতার ক্ষেত্র হিসাবে তাদের অপারেশন এরিয়া সীমান্ত থেকে বিশ মাইল অভ্যন্তরে চিহ্নিত হয়। এপ্রিলের পর যখন পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশে সামরিক কর্তৃত্ব কব্জা করে নেয় তখন মুজিব বাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা জনযুদ্ধ চাঙ্গা রাখে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বিবৃত ও ব্যতিব্যাস্ত রাখার জন্য প্রতি ক্যাম্পের কাছাকাছি জায়গায় অন্তত: প্রতি রাতে একটি গুলি ছুড়ে দ্রুত স্থান বদলিয়ে ফেলতে থাকে। তারা যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার কাজেও ভূমিকা পালন করে। এই বাহিনীর মূল নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদ। মুজিব বাহিনীর ৮৮ জন শীর্ষ নেতার একজন হিসাবে আবদুল মান্নান চৌধুরী দেরাদুনে মিলিটারী একাডেমীতে পুনঃপ্রশিক্ষণ নেন। তবে তিনি পূর্বাঞ্চল মুজিব বাহিনীতে শেখ মনির সহযোগী হিসাবে ভূমিকা পালন করেন। শেখ মনি নভেম্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলে যাত্রা শুরুর পূর্বে তাকে পূর্বাঞ্চল কমান্ডের সার্বিক দায়িত্ব দেন। যুদ্ধ শেষাবদি তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। শেখ মনির নেতৃত্বাধীন মুজিব বাহিনী যৌথ বাহিনীর কোন ভূমিকা ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম দখল করেন। মুজিব বাহিনীর বিশালাংশ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলমান শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ সমূহের সংসদ কর্মকর্তা। ক্যাম্পগুলো পরিচালনা, চিকিৎসা ও সেবা প্রদানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা জড়িত ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতারের সাথেও তারা জড়িত ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পীদের অনেকেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক বা বর্তমান শিক্ষার্থী। 

১১ সেক্টরের নেতৃত্বে বেশ ক’জন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট। ঢাকার বুকে ক্র্যাক ফ্লাটুন যে কর্মকান্ড পরিচালনা করেছে বা দু:সাহসিক অভিযান পরিচালনা করেছে তার অধিকাংশ সদস্যই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ক্র্যাক ফ্ল্যাটুনের মোফাজ্জাল হোসেন চৌধুরী বা সাদেক হোসেন খোকার নাম সর্বজন বিদিত। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অসংখ্য যোদ্ধা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বেশ ক’জন বীরউত্তম খেতাবধারী যেমন লেঃ সামাদ, আফতাবুল ইসলাম ও খাজা নিজামউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তন্মধ্যে খাজা নিজামউদ্দিনই একমাত্র সিভিলিয়ান বীর উত্তম। 

এদিকে ঢাকা বসবাসকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর একাংশ দলাদলীতে রেকর্ড সৃষ্টি করলেও অন্য অংশ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে, চিকিৎসা দিয়েছে, চোখ কানের ভূমিকা পালন করেছে, শত্রু আবস্থান ছিনিয়ে দিয়েছে কিংবা গোপনে হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করে যুদ্ধের ধারাটা অব্যাহত রেখেছে। বেশ ক’জন শিক্ষক যুদ্ধকালীন অবস্থায় পাকিস্তানী রাও ফরমান আলীর মৃত্যু সংকেত পেলেও যুদ্ধে জড়িয়ে থাকেন। তাদের একাংশ রাজাকার আলবদর আলসামসের হাতে নির্মম ভাবে নিহিত হয়েছেন। 

মুক্তিযুদ্ধে সেনাপ্রধান এমএজি ওসমানীর এডিসি ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার কৃতি সন্তান শেখ কামাল। শেখ জামালও মুজিব বাহিনীর হয়ে প্রশিক্ষন নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। উপরাষ্ট্রপতির সন্তান সৈয়দ আশরাফও মুজিব বাহিনীর যোদ্ধা। বিদেশে কর্মরত থেকেও যারা পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করেন ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে অংশ নেন তাদের মধ্যে এ এম মোহিতের ন্যায় অনেকেই ছিলেন আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থী। 

মুজিব নগর সরকারের কার্যক্রমে বেশ কিছু শিক্ষক জড়িত ছিলেন। প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমদ, রেহমান সোবহান, সারোয়ার মোর্শেদ, আনিছুর রহমান ও আনিসুজ্জামান ছিলেন প্লানিং কমিটির সদস্য। ড. আনিসুজ্জামান ও অজয় রায় যথাক্রমে ছিলেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আমিরুল ইসলাম ছিলেন মুজিব নগর সরকার গঠন উপলক্ষে প্রণীত ঘোষনার প্রনয়নকারী। 

মুজিব নগর সরকারের রাষ্ট্রপতি জাতির জনক ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, আবদুস সামাদ আজাদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কৃতি শিক্ষার্থী। বর্ণনা দীর্ঘায়িত হয়ে যাচ্ছে তাই সম্প্রসারিত না করে সৈয়দ আবুল মকসুদের একটি উত্তি দিয়ে শেষ করা যায় তাহলো “বাংলাদেশের ইতিহাস মানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান-গরিমায় যেমন অনন্য তেমনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ও বিকাশে তার ভূমিকা ঈর্ষনীয় তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের তার ভূমিকা হচ্ছে সার্বিক। যে দেশের জাতির পিতা ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র, তাদের গর্বের ভান্ডারটি সুবিস্তৃত। এখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ভান্ডারটি আরও সমৃদ্ধশালী করা।”

 

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী,
বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা

উপাচার্য ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধা উপাচার্য ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ উপাচার্য ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

সম্পাদকীয়
৭ই মার্চ ও ২৬ শে মার্চকে নিয়ে অহেতুক বিতর্ক ও মিথ্যাচারের ডালপালা

banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী || 

কয়েক বছর আগে এ. কে. খন্দকারের সাথে সুর মিলিয়ে ক’জন বুদ্ধিজীবি পত্রিকায় লিখেছেন যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তাদের একজন বদরুদ্দীন উমর, অপরজন কাজী সিরাজ তাদের দু’জনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষী এবং নিজেরা যা লিখেন তাকে নিরঙ্কুশ সত্যি বলে বিবেচনা করেন। তাদের কথার প্রতিবাদ করলে তারা প্রতিবাদী কণ্ঠকে কখনও আওয়ামী লীগের দালাল বা বেনিফিসিয়ারী জাতীয় অভিধায় অভিহিত করেন। বদরুদ্দীন উমর একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, তিনি ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন এবং তাজউদ্দীন আহমেদের ডায়েরীকে আকর ধরে ভাষা আন্দোলনের উপর একাধিক বইও রচনা করেন। তিনি ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর কোন ভূমিকা দেখেননি। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে প্রত্যক্ষদশীর্দের কথাকে তিনি তীর্যক ভাষায় আক্রমন করেছেন। তার জবাবে যারা কিছু লিখেছেন তারাও দালাল বা সুবিধা ভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। মনে হচ্ছে তার দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের শুরু ও শেষ হোল ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি, যেদিন সংগত কারণে শেখ মুজিব উপস্থিত থাকতে পারেননি।

তার এ’সব কথা নিয়ে বেশ কিছু দিন আগে কয়েকটি সংশোধনী সংশ্লিষ্ট পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম। পত্রিকাটি শত ফুল ফুটাবার দর্শনে বিশ্বাসী হলেও আমাদের মত মালিদের এড়িয়ে যান আর মালিধিরাজদের গ্যান্দা ফুল সুবাসিত বলে চিত্রায়ন করে। লেখাটি ছিল বঙ্গবন্ধুর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালি অভিধা নিয়ে (বিবিসি’র জরীপের ফলাফল ২০০৪)। বয়োবৃন্দ বুদ্ধিজীবি প্রথমেই উল্লেখ করেন বিবিসি নাকি তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে শেখ মুজিবকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে চিহ্নিত করে। 

 এই চিহ্নিতকরন প্রক্রিয়াটি তিনি যেভাবে বর্ণনা করেছেন তাতে তার বিজ্ঞানী এবং একজন গবেষকের ভূমিকাটি খাট হয়। এটা বেশি দিনের ঘটনা নয়। এবারে তার সাম্প্রতিক লেখা নিয়ে কথা বলছি।

দুটো প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন একটি হোল স্বাধীনতার ঘোষণা, অপরটি হোল ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উচ্চারিত শব্দগুচ্ছ। তিনি যুক্তি—তর্ক, তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রমান করেছেন যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান দিয়ে শেষ করেছেন। তার কিছু সমর্থক অবশ্য জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান শুনেছেন, জিয়ে পাকিস্তান শুনেছেন কিংবা পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনিও শুনেছেন। বদরুদ্দীন উমর কতিপয় Circumstantial Evidence এর ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বঙ্গবন্ধু সেদিন জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান বলেছেন। আবুল কাশেম ফজলুল হক স্বকর্ণে ‘জয় বাংলা’ শুনেছেন আর Circumstantial Evidence টেনে বলেছেন সেদিন বঙ্গবন্ধু কোন অবস্থায়ই জয় পাকিস্তান বলতে পারেন না। সে কথার প্রতিধ্বনি মইনুল ইসলাম (প্রথম আলো, ২৯/৯/২০১৪) করলেও দৈনিক যুগান্তরে (১৪/০৯/২০১৪) দেখা যাচ্ছে উমর সাহেব খন্দকার সাহেবের কথাই মেনে নিচ্ছেন। আমি জানিনা বদরুদ্দিন ওমর সেদিন সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানে উপস্থিত ছিলেন কিনা। তিনি সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানে উপস্থিত না থাকলে জয় বাংলা ছাড়া জয় পাকিস্তান শোনার কোন অবকাশ তার ছিল না। খন্দকার সাহেব সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানে ছিলেন না, তিনি অন্যভাবে শুনেছেন। 

তাহলে বক্তব্যটি তিনি পর দিনের রেডিও বা টিভিতে শুনেছেন কিংবা কারো মুখ থেকে শুনেছেন কিংবা পাকিস্তানি দু’একটি পত্রিকায় দেখেছেন। তবে তার মত যারা জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান শুনেছেন কোন দালিলিক প্রমাণ আজও তারা উত্থাপন করতে পারেননি। তারা বলছেন যে রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রচারিত ও প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি মূল ভাষণের অংশ বিশেষ এবং সংশোধিত। আওয়ামী সমর্থকরা জয় পাকিস্তান মুছেই পরদিন তা প্রচার করে। তাহলে মাঠে উপস্থিত ছাড়া বাকী কারোরেই জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান না শোনারই কথা। বড় বড় মানুষরা ভুল করলে তা সংশোধন করেন না। তাদের অহম—বোধ এমন প্রবল যে পারলে কলম কেন বন্দুক নিয়ে তার বিরুদ্ধবাদীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তাই মাঠে উপস্থিত না থেকে যারা বঙ্গবন্ধুর ভাষণে জয় বাংলার পর, জয় পাকিস্তান, কিংবা জিয়ে পাকিস্তান কিংবা পাকিস্তান জিন্দাবাদ শুনেছেন তারা মতলবাজবাদ কিংবা বিভ্রান্তিতে ভুগছেন। এমন লোকদের নাম আরও উল্লেখ করা যায় এবং তাদের মূল মতলবটাও অনুধাবন কঠিন নয়। বিভ্রান্তিতে ভোগা একজনের নাম বিচারপতি হাবিবুর রহমান। আগেই বলেছি তিনি নিজেও স্বাীকার করেছিলেন যে তিনি ৩রা জানুয়ারিকে ৭ মার্চের সাথে গুলিয়ে ফেলেছিলেন (গাফ্ফার চৌধুরী)। তাই দ্বিতীয় সংস্করণে জয় পাকিস্তান শব্দদ্বয় বাদ দিয়েছেন (মুহম্মদ জাফর ইকবাল, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬/০৯/২০১৪)। অন্যান্য যারা উপস্থিত না থেকে বক্তৃতা শুনেছেন বা গণমাধ্যমে পরদিন জয় বাংলা জয় পাকিস্তান শুনেছেন বা দেখেছেন তাদের নাম জানা গেলেও তাদের সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্তের সময় এখন এসেছে। তাদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট হোল তারা আওয়ামী বলয়ের কিংবা দেশের স্বাধীনতার জন্যে নিবেদিত বলয়ের কেউ ছিলেন না।

এই সময়ের বিতর্কে অনেকেই যুক্ত হয়েছেন তার মধ্যে কাজী সিরাজ অন্যতম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান বিতর্কে তিনি জড়িয়ে পড়েছেন এবং বিভিন্ন জনের লেখার উদ্ধৃত্তি টেনে যা বলতে চেয়েছেন তা হোল বঙ্গবন্ধু যদি ৭ মার্চ তারিখে জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান বলে থাকেন তাহলে তিনি হাবিয়া দোজখে চলে যাবেন কেন? তিনি নিজেই জবাবটা দিয়েছেন এভাবে ‘তখন পরিস্থিতিটা পাকিস্তানিদের সঙ্গে সমঝোতার, সংলাপের, ১৫ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত মুজিব ইয়াহিয়া—ভূট্টো সংলাপও হয়েছে; সেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় কুটনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে বঙ্গবন্ধু বা অন্য কোন বাঙালি নেতা জয় পাকিস্তান স্লোগান দিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার গৌরব ক্ষুন্ন হয় না।’ কি চমৎকার! কোথায় বিক্রমপুর আর কোথায় ফরিদপুর, তারপর আমরা দু’জন প্রতিবেশী’’।

দ্বিতীয় আর একটি মতলব এখানে প্রকাশিত হয়েছে। লেখক তার নেতা মাওলানা ভাসানীকে ইনডেমনিটি প্রদান করেছেন, কারন এই সময়ে তার নেতা বহুবার স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান স্লোগান দিয়ে মুজিব সহ সকল নেতা ও জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন আর তাদের ক্ষুদে নেতারা ২৪ মার্চ ১৯৭১ সাল পর্যন্ত স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার স্বপ্ন দেখেছেন ও স্লোগান দিয়েছেন। আর একটা মতলব হয়ত ক্রিয়াশীল ছিল।

লেখক এক জায়গায় বলেছেন স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটাকেই আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা ঘোষণার দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে। হতে পারে কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের ঘেরাটপটাকে না দেখেই তা বলেন। আমি যেদিন ফেরদৌস কোরেশী বা এ’জাতীয় মানুষদের লেখায় দেখলাম যে ‘৭ মার্চের ভাষণের পর আর কি কোন স্বাধীনতার ঘোষণার প্রয়োজন আছে’, আমি তখনই প্রমাদ গুনেছিলাম যে আওয়ামী লীগকে একটা ঘেরাটপে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, যার থেকে বের হতে অনেক তেলখড়ি পোড়াতে হবে। এক আলোচনা সভায় আমি ও হাসানুন হক ইনু যারা ৭ই মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে, তাদেরকে সতর্ক করেছিলাম। কারন এ’দেশে সিরাজদের অভাব নেই। যখন কাজী সিরাজ পরবর্তীতে বলেন যে, ৭ মার্চ ছাড়া আওয়ামী লীগদের আর কিছু দেখানোর নেই, তখন বুঝে নিতে  কষ্ট হচ্ছে না যে আওয়ামী লীগকে যথার্থভাবে ঘেরাটপে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং এবারে ইঁদুরের মত পিষা হবে, যার কারনে শক্ত হয়ে তার দাঁড়াবার ক্ষমতাও হারিয়ে যেতে পারে। তারই ধারাবাহিকতায় কাজী সিরাজ এ কথাটা আমাদের দিয়ে কবুল করিয়ে নিতে চাচ্ছেন যে, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান বলে কোনো অন্যায়, অদেশপ্রেমিক কাজ করেন নি। অবস্থাই তাকে বাধ্য করেছে অর্থাৎ বদরুদ্দিন ওমর যা বলে যাচ্ছেন তিনিও তার প্রতিধ্বনি করছেন অর্থাৎ একটা মিথ্যাকে বার বার বলে সত্যি হিসাবে চালিয়ে দেবার প্রয়াস আছে। আবুল কাশেম ফজলুল হক অনেক কথা সাম্প্রতিক কালে লিখেছেন। তবে কয়েকদিন আগে অর্থাৎ ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সালে তিনি বলেছেন যে বিচারপতি হাবিবুর রহমান হচ্ছেন সবচে অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। অলি আহাদ তার বইয়ে এক কথা বলে মাঠে তার অনুরন ঘটালেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি ছিল তার অকৃতিম ভালবাসা এবং সত্যিটা বলতে ভুলেননি। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার মূল্যায়ন হোল ‘আমার ভাইয়ের মত ব্যাডা এই মূল্লুকে জন্ম নেয় নাই এবং নিবেও না (আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঘাতক দালাল প্রসঙ্গ, ২০১১)।’
আমার মনে হয় না কাজী সিরাজের বলার প্রয়োজন আছে যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। সে কথা বঙ্গবন্ধু নিজেও বলেছেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সার্থক অনুসারী যদি ‘আখ’ করলে আখাউরা বুঝে নেন কিংবা বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত চারটি শর্তকে ‘মা—বেচা দাম’ বলে মনে করেন কিংবা উপস্থিত বুদ্ধিজীবিরা তাকে ‘নয়মন তেল ও হবে না, ‘রাধাও নাচবেন না’ বলে মনে করে নেয় এবং সে মোতাবেক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন তাহলে কাকে দোষ দেব? আমার জানামতে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে সশস্ত্র যুদ্ধ ব্যতিরেকে কোন গত্যন্তর নাই। সে ভিত্তিতেই আমরা শিক্ষকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩রা মার্চ পূর্বাহ্নে ও ছাত্ররা বিকালে স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব সকল মানুষের কাছে তুলে ধরেছিল।
এবারে আসি অন্য প্রসঙ্গে। এই প্রসঙ্গটি কাজী সিরাজের ৭ এপ্রিল ২০১৩ সালের একটি লেখা। যার শিরোনাম ছিল খন্দকার কবে রাজাকার হবে (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। সেখানেই তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ কথোপকথনের অবতারনা করেন। ৮ এপ্রিল জনকণ্ঠ পত্রিকা তিনি খুলে দেখতে পারেন। সে পত্রিকায় আমি শুধু ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ কথোপকথনের উল্লেখ করিনি, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর গ্রন্থের কথাও বলেছি। এমনকি বদরুদ্দীন উমরের একটি লেখার উপর আলোকপাত করেছি। শারমিন আহমেদ রচিত ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতার’ উপর কিছু লিখেও তা প্রকাশ করিনি। কারনটা হচ্ছে থুথু আকাশে ফেললে তা নিজের গায়ে এসে পড়ে। অন্যায় করেছি বলছি, কারণ এখন যারা মুক্তিযুদ্ধের উপর লিখছেন, বঙ্গবন্ধুকে কিঞ্চিতকর করতে চাচ্ছেন তারা শারমিনের উদ্ধৃতিই দিয়ে যাচ্ছেন। ব্যতিক্রম এ.কে. খন্দকার। শারমিন যে সব মাধ্যমিক উৎসের তথ্য ব্যবহার করেছেন সে সব খন্দকারও করেছেন। 

সাথে এস. এস. মীর্জা ও মইদুল হাসানের বক্তব্য জুড়ে দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কোন ঘোষণা দেননি। উদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে তারা মুজিবনগর সরকারকে অবৈধ বলার প্রয়াস পেয়েছেন।

‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রন্থটি পড়েই পীর হাবিবুর রহমান যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন, আমার প্রতিক্রিয়াটাও তদ্রুপ। কাজী সিরাজ কি প্রমান করতে পারবেন যে আমরা দু’জন আওয়ামী লীগের সুবিধা ভোগী। সম্প্রতি জেনেছি মুনতাসির মামুনও অনুরূপ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তার অবস্থান কি দালালের? ইতিহাস বিকৃতি কাকে বলে ইতোমধ্যে শুনেছি। তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে প্রলম্বিত করে জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তানও বসিয়ে প্রচার শুরু হয়েছিল। প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞ মাহবুব জামানরা তাকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক বলে প্রমাণ করেছেন। কাজী সিরাজ যাকে ছটফটানি বলেন, অস্থির আচরন বলেন, তোলপাড় বলেন, অর্বাচিন কিংবা সুবিধা ভোগী দালালদের আচরন বলেন তখন মনে হয় ভারতের রাজকাপুর যা প্রদর্শন করেন তা শিল্প আর অন্যরা যা করেন তা নগ্নতা। 

এ.কে. খন্দকার তার পূর্বসূরী কিংবা সহ তিন কথকের মত নিয়ে যদি বলেন যে বঙ্গবন্ধু কোন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি এবং যুদ্ধের কোন দিক নির্দেশনা বঙ্গবন্ধু দিয়ে যান নি তাহলে কাজী সিরাজও হয়ত তাই মনে করেন। তা না হলে কিভাবে তিনি বলতে পারেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উচ্চারনটা নাকি আওয়ামী লীগের বড় পুঁজি। আর প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে, প্রত্যেক গ্রামে মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম গড়ে তুলুন’ কথাগুলোর মধে খন্দকার সাহেব যদি যুদ্ধের প্রস্তুতি বা দিক নির্দেশনা না দেখেন, তাহলে এ’সবের কিসের ভ্রান্তি বিলাস বলব? কাজী সিরাজ এবারে সাক্ষী মেনেছেন তাজউদ্দিন আহমদ আর কন্যার গ্রন্থে উল্লেখিত তথ্যে। শারমিন আহমদের গ্রন্থ থেকে তিনি লাইনের পর লাইন তুলে দিয়ে দেখালেন যে মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা বা দিক নির্দেশনা দেননি। সম্প্রতি শারমিনের বইয়ের সমালোচনা করেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। শারমিন তার গ্রন্থের প্রথম পর্বে ৬টি উদ্ধৃত দিয়েছেন তার তিনটিই গাফ্ফার চৌধুরীর। তিনি অন্যান্য উৎস অর্থাৎ মঈদুল হাসানের মূলধারা ৭১ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর কথোপকথন’ বা ‘আলোকের অনন্তধারা’ থেকেও উদ্ধৃত দিয়েছেন।

মঈদুল হাসান প্রসঙ্গে আসি। তার দাবী অনুযায়ী তিনি তাজউদ্দিনের অতিশয় বিশ্বস্ত ও প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার লেখার প্রাথমিক তথ্য তিনি ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংগ্রহ করেছেন তাজউদ্দিনের কাছ থেকে। সময়টা একটু বিবেচনায় রাখুন। এই সময়ে তাজউদ্দিন সাহেব অর্থমন্ত্রী। বহু ব্যাপারে তার বঙ্গবন্ধুর সাথে মতানৈক্য। তিনি বিক্ষুগ্ধ, বিড়ম্বিত ও হতাশাগ্রস্থ। শারমিনের গ্রন্থে ব্যবহৃত তথ্য উপাত্তগুলো সে সময়ে মঈদুল হাসান কর্তৃক তথ্য থেকে নেয়া। মঈদুল যুদ্ধের সময়ে এ জাতীয় কথা তাজউদ্দিনের কাছ থেকে শুনেননি, ঘুনাক্ষরে কিংবা Slip of tongue এ এমন সব কথা তিনি মঈদুলকে সে সময়ে বলেননি; বললেন ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে! যুদ্ধের সময়ে মঈদুল মুজিব বাহিনী সম্পর্কে, আওয়ামী লীগ সম্পর্কে, যোদ্ধাদের সম্পর্কে বেশ কিছু ভিত্তিহীন কথা লিপিবদ্ধ করেছেন, কিন্তু তাজউদ্দিন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে কিছু শুনেননি বা তাজউদ্দীনকে জিজ্ঞেস করেননি। তাজউদ্দিন যে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বলেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছেন সে কথা জেনেও কেন ১৯৭২ সালে প্রশ্ন তোলেননি? প্রশ্ন তুলেননি যখন মুজিব নগর সরকারের ঘোষণা পত্রে উল্লেখিত হোল যে বঙ্গবন্ধু যথাযথভাবে এবং সাংবিধানিক পন্থায় ঢাকায় ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণার প্রণয়নের সাথে তাজউদ্দিন ও রেহমান সোবহান জড়িত, তবে মুখ্য প্রণেতা হলেন ব্যরিষ্টার আমিরুল ইসলাম। শেষোক্ত দু’জন এখনও জীবিত আছেন। মুজিব নগর ঘোষণার পরে তাজউদ্দীন বা আমিরুল যে সব কথা বলেছেন সেগুলো কি আত্ম—প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচার? মুজিবনগর ঘোষণার চেয়ে বড় দলিল এই জাতির ইতিহাসে কি আর আছে?

শারমিন বাবার সাহচর্যে দীর্ঘদিন থাকতে পারেননি। কিন্তু তিনি কি হলফ করে বলতে পারবেন যে তাজউদ্দিন উল্লেখিত তথাকথিত বঙ্গবন্ধুর দৌদল্যমানতা, অনীহা, অনাগ্রহ এবং শেষ কালের উক্তি সমূহের অংশ বিশেষও তিনি নিজে শুনেছেন? আমাদের বিদগ্ধজন যথা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বা আবুল কাশেম ফজলুল হক যখন সমগ্র বইটি না পড়ে কতিপয় অধ্যায়ের ভিত্তিতে মন্তব্য করে বসেন তাহলে এমন বিদগ্ধজন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের ভাবনাটা কি হবে? শারমিনের তথ্যগুলোও যে নির্ভরযোগ্য নয় তা আমি শারমিনের গ্রন্থ থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি। 

আমি অবশ্য বলব শারমিন প্রাথমিক তথ্য বলতে শুধু কোন কান কথা বা শোণা কথাকে বুঝাচ্ছেন। বইটির তথ্য তিনি ২০০৬ সালে সংগ্রহ করা শুরু করেন। তখন তাজউদ্দিন সাহেব এ’পৃথিবীতে নেই। তিনি নির্ভর করেছেন কতিপয় প্রকাশিত গ্রন্থের উপর এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মঈদুল ইসলামের মূলধারা ৭১, আমিরুল ইসলামের জীবন স্মৃতি ও ‘মুক্তিযুদ্ধে পূর্বাপর’ কথোপকথন। এ’সব মাধ্যমিক তথ্যের পরও তিনি আমিরুলের সাক্ষাৎকার নিতে ভুলেননি, যদিও মইদুল হাসান বা খোন্দকার সাহেবের সাক্ষাৎকার নেয়া বাঞ্চনীয় ছিল। তিনি তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ, শুভাকাক্সক্ষী, আমিরুল ইসলাম, হাজী মোর্শেদ ও ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এ মর্মে আপাততঃ সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, বঙ্গবন্ধু প্রস্তুতি নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আমিরুলও তদ্রুপ কথা বলেছেন তবে বঙ্গবন্ধু এ’সব কথা তাজউদ্দিন বা আমিরুলকে কেন বলেননি সে ব্যাখ্যাই দু’জন খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

ব্যাখ্যার কথায় পরে আসছি। এখন বদরুদ্দিন ওমরের সাম্প্রতিক লেখা প্রসঙ্গে আসি। বদরুদ্দীন উমর বলেছেন- “১৯৭১: ভিতরে — বাইরে” নামে খন্দকারের বইটিতে এমন অনেক বিষয় আছে যা গুরুতর আলোচনার যোগ্য (১৪/০৯/২০১৪, যুগান্তর)। কিন্তু সেগুলোতে বাইরে রেখে শুধু দুটো বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগ মহলে মাতামাতি চলছে। প্রথমটি হল— শেখ মুজিব কর্তৃক তার ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতার শেষে জয় বাংলার পরে জয় পাকিস্তান বলা, দ্বিতীয়টি হল— শেখ মুজিব কর্তৃক ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার দাবী নাকচ করা। প্রথমটি প্রসঙ্গে Circumstantial Evidence —এর ভিত্তিতে উমর সাহেব রায় দিয়েছেন খন্দকার সঠিক বলেছেন। অথচ তিনি ও খন্দকার কেউ ময়দানে ছিলেন না। তিনি যদি গণ মাধ্যমে শুনে থাকেন তাহলে বেল্লিক আওয়ামী লীগাররা তা পরিবর্তন করেই প্রচার করেছেন? তাহলে কথা দাঁড়ায় তারা নিজ কানে বা নিজ চোখে দেখেননি, দেখেছেন অন্যের চোখে, শুনেছেন কান কথা বা অন্যের মুখে। গবেষক হিসেবে এ’সব যারা গ্রহণ করেছে—তারা কি ধরনের গবেষক?

দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসি। বদরুদ্দীন সাহেব আবারও Circumstantial Evidence —এর উপর এবং মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর কথোপকথনের ভিত্তিতে খন্দকারের অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে গেছেন যা বেদ বাক্যের মত অপরিবর্তনীয়। তিনি যে সব কথা উল্লেখ করেছেন তা মঈদুল হাসান আর তার সতীর্থদের চর্বিতচর্বন কিংবা শারমিনের গ্রন্থের সরাসরি উদ্ধৃতি। তার বইয়ে অর্থাৎ Emergence  of Bangladesh নামক গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে Declaration of Independence শীর্ষক শেষ অধ্যায়ে তথ্য—প্রমানাদির অভাব এবং Circumstantial Evidence —এর ভিত্তিতে ‘আমি (বদরুদ্দীন উমর) দেখিয়াছি শেখ মুজিব কর্তৃক ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা মিথ্যা এবং আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা ছাড়া আর কিছু না।’ এই উপসংহার তার বেশ আগের হলেও তিনি ‘মুসলমানের এক কথা হিসাবে সেগুলো ধরে আছেন। শারমিনের গ্রন্থ তিনি পড়েছেন কিনা জানিনা তবে খন্দকারের বই পেয়ে তিনি হাতে চাঁদ পেয়েছেন। তিনি তার বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করেছেন এবং সর্বাংশে তিনি খন্দকার কর্তৃক উত্থাপিত বিষয়াদির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। তিনি ওয়ারল্যাসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে পরিহাসের স্বরে উচ্চারন করেছেন এবং এই জাতীয় কাহিনী নতুন নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে এমন দাবী শেখ মুজিব ১৯৫২ সালেও করেছিলেন যা তিনি বিশ্বাস করেননি; এবারে ১৯৭১ সালেও তিনি বিশ্বাস করেন না। জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে ই পি আর ওয়্যারলেস সংবাদ প্রেরনেকে খন্দকার ও তার সতীর্থগণ অবিশ্বাস্য এবং কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তারপর তিনি প্রশ্ন তুলেছেন চিরকুটের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রয়োজন কি ছিল? তিনি যদি সবই করতে পারেন’’ তাহলে আর একটি কষ্ট করে তা কেন তদানিন্তন শেরাটন হোটেলে পাঠিয়ে দিলেন না বা তাদের নিয়ন্ত্রিত বেতারে পাঠিয়ে দিলেন না; তাহলে এতসব কথা জন্ম হোত না’’। এ’সব Hypothetical প্রশ্নের জবাব বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউ দিতে পারবেন না। তার ভক্ত অনুরক্তরা এক ধরনের ব্যাখ্যা দাঁড় করাবেন ও তার বিরুদ্ধবাদীরা ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাবে। বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন তা শারমিন তার বইতে তথ্য—ভিত্তিক উপসংহার টেনেছেন। তবে তাজউদ্দিন বা অন্য কোন নেতার কাছে তা প্রকাশ করেননি কেন সে প্রশ্ন, খন্দকারের মত শারমিন ও আমিরুল তুলেছেন। তারা তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। ব্যাখ্যা যা—ই হোক না কেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নাই এবং সেটা প্রচারিত হয়নি সে কথা কিন্তু তারা দু’জন বলেননি। অথচ সমগ্র বইটি না পড়েই বিরুদ্ধবাদীরা মন্তব্য করে যাচ্ছেন বা উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। আমার জানামতে যুদ্ধ প্রস্তুতির কিছু কথা তাজউদ্দিন ও আমিরুল আগেই জানতে পেরেছিলেন আর জেনেছিলেন চিত্ত সূতার নামের একজনের ঠিকানা।

মজার ব্যাপার হলো — আমিরুল ও তাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলী ও রহমত আলী নাম নিয়ে দিল্লী যাবার আগেই চিত্তসুতারের খোঁজে গিয়েছিলেন। তবে তাকে পাননি। চিত্তসুতারকে না পাওয়ার কারণ ঠিকানায় পরিবর্তন ও চিত্তসুতারের ছদ্মনাম ব্যবহার। সে যাক দিল্লী থেকে ফিরে এসেই তারা ৮ এপ্রিল সেই চিত্তসুতারের বাড়ী গেলেন এবং সেখানে চার যুব নেতাকে পেয়ে গেলেন। আমিরুল, শারমিন বা মঈদুলের পক্ষ বিপক্ষ নেয়া বা তাদের প্রাথমিক উক্তির চূড়ান্ত বিশ্লেষণ বা উপসংহারের পূর্বে শারমিনের বইয়ের ১৪৭ — ১৪৮ এবং ২৬৩—৩১০ পৃঃ একটু এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথনে পৃঃ ১৩১—১৩৪ পর্যন্ত পরিবেশিত মঈদুল হাসানের কথাগুলি পড়ে দেখতে বলব। আমি কেন সবাই নিশ্চিত হবেন যে বঙ্গবন্ধু সে রাতে তাজউদ্দীন চলে যাবার পরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং তা বিভিন্ন মাধ্যমে দেশ—বিদেশে পৌঁছেছে। আমি জনকণ্ঠে প্রকাশিত আবদুল কাদের ও শহীদ সুবেদার মেজর শওকত আলীর কন্যা অধ্যাপক সেলিনা পারভিনের লেখাদ্বয়ও পড়ে দেখতে বলব। যাদের কলব বন্ধ হয়ে যায়নি তারা এ’সব কথা থেকে এমন সিদ্ধান্তেই উপনীত হবেন যেমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন শারমিন ও ব্যরিষ্টার আমিরুল, হাজী মোর্শেদ, ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের পরিবার। অন্যান্য তথ্যের  কথা নাই পাড়লাম; সে সবের সংখ্যা অনেক তবুও আমাদের দিলে কলব আঁটা বুদ্ধিজীবীগণ কি স্বীকার করবেন যে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন যা তৎকালীন ই পি আর এর শওকত আলী ও নূরুল হকের ট্রান্সমিটারও পরবর্তীতে বি এইচ এফ টেলিগ্রাম ও টেলিফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব জায়গায় প্রচারিত হয়? 

শারমিন এর আগে (পৃঃ ৭১) উল্লেখ করেন যে, ২৬ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সম্প্রতি এ’কথা স্পষ্ট হয়েছে যে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে নয়, বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন (মোরসালিন মিজান, দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪)। তার পক্ষ হয়ে বহু ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু ঘোষণাটিই তারই।
শারমিন অনেকটা আফসোসের স্বরেই বলছেন যে, “বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ গত ২৬ মার্চের শুরুতে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও পরবতীর্তে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক নিয়ে যে বির্তকের সৃষ্টি হয় তা অনাকাঙ্খিত’’। 

তিনি সম্ভবতঃ সে বিতর্কের একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্যে ব্যরিষ্টার আমিরুল ইসলাম, হাজী গোলাম মোর্শেদ ও শহীদ ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের পরিবার বর্গের সাক্ষাৎকার নেন (পৃঃ ২৬৩—৩১০)। তার সিদ্ধান্ত হলো যে, বঙ্গবন্ধু যে গোপনে স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তার প্রমান হলো শহীদ ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হককে তিনি ট্রান্সমিটার যোগাড় করতে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী তিনি খুলনা থেকে ট্রান্সমিটার এনেছিলেন এবং ব্যরিষ্টার আমিরুল ইসলামের কাছে সে বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন ২৫ মার্চ মধ্যাহ্নে। পাকিস্তান আর্মি ২৯ মার্চ সকালে নূরুল হককে তার বাসা থেকে চিরতরে তুলে নেন। তার পরিবারের ধারনা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ তালিমের কারণেই তাকে তুলে নেয়া হয় এবং পরে হত্যা করা হয়।

ওদিকে ২৫ মার্চ রাত ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন আসে। ফোন কলটা রিসিভ করেন তার পার্সনাল এইড হাজী গোলাম মোর্শেদ (পৃঃ ১৪৭)। ফোন কলটি ছিল এরূপ “আমি বলদা গার্ডেন থেকে বলছি। মেসেজ পাঠানো হয়ে গিয়েছে। মেশিন নিয়ে কি করব?” বঙ্গবন্ধু হাজী গোলাম মোর্শেদের মাধ্যমে উত্তর দিলেন, “মেশিনটা ভেঙ্গে পালিয়ে যাও।’’ এ প্রসঙ্গে ব্যরিষ্টার আমিরুলের কিছু কথা সংযোজন করছি যা ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক বলেছিলেন (পৃঃ ২৬৫) ‘‘বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছিলেন একটি ট্রান্সমিটার যোগাড় করতে। আমি খুলনা থেকে এটা নিয়ে এসেছি। আমি এটা এখন কোথায় পৌঁছে দেব।’’ আমি (আমিরুল) বললাম ট্রান্সমিটার কাজ করে? উনি বললেন, হ্যাঁ এটা কাজ করে। আমি তখন বললাম আমাকে ত বঙ্গবন্ধু এ সম্বন্ধে কোন নির্দেশ দেননি। বলেননি ট্রান্সমিটার সম্বন্ধে। এ কথাতে মঈদুল হাসান এর একটি কথাই প্রতিধ্বনিতে হচ্ছে যে বঙ্গবন্ধু অনেক কাজই করতেন One to one ভিত্তিতে (মঈদুল হাসান, ‘মূলধারা ৭১’)। প্রকৌশলী নূরুল হক, ব্যরিষ্টার আমিরুলের আত্মীয় (খোকা ভাই) হওয়া স্বত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু আমিরুলকে কিছু না বলে সরাসরি তা নূরুল হককেই বললেন। নূরুল হক এই কথা পরিবারের কাউকেও জানাননি, যদিও তিনি ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে কি কঠিন কাজটি করতে হবে তা জানতেন। আমিরুল বলছেন আমার ধারণা He was the one who sent the wireless message। ই পি আর এ wireless যে সুবেদার মেজর শওকত আলী নিজস্ব ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে ই পি আর প্রধানের মাষ্ট ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধরু স্বাধীনতার ঘোষণা দেশে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তা প্রতিষ্ঠিত সত্য (জনকণ্ঠ ১৭ ও ১৮ মার্চ, ২০১৩)। 

হাজী মোরশেদকে বঙ্গবন্ধু রাত ১০.৩০ বললেন যে, ‘আমরা স্বাধীন হয়ে গেলাম’। বঙ্গবন্ধু একই কথা আতাউল সামাদকেও বলেন। কর্ণেল ওসমানী, রিজভী ও মোশাররফ হোসেন তা জানতেন। রাত ১২টার পর তিনি মোর্শেদকে বললেন, They are coming to arrest me, I have decided to stay। এর আগে সন্ধ্যার প্রাক্কালে তিনি পাশের বাসার মোশারফ এর মাধ্যমে চাটগাঁয়ে খবর পাঠালেন যে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, সেনাবাহিনী আঘাত হানতে যাচ্ছে এবং চট্টগ্রাম থেকে লড়াই শুরু করতে হবে। ইংরেজিতে তৈরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাটি জহুর আহমেদ চৌধুরী পেয়েছিলেন বলে তিনি ড. মাযহারুল ইসলামকে বলেছিলেন (পিতৃ পুরুষ, পৃষ্ঠা—১৮—১৯)। হাজী মোরশেদের বক্তব্যে আরও জানা যায় বঙ্গবন্ধু সেই দুপুর থেকেই বিভিন্ন পুলিশ ও আনসার হেড কোয়াটার্সে আর্মস বন্টনের নির্দেশ দেন। সেলিনা পারভীন অর্থাৎ ই পি আর এর সুবেদার মেজর শওকত আলীর কন্যার মতে তার পিতা বিভিন্ন জায়গায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা ও পরবতীর্ করণীয় সম্পর্কে নির্দেশ পাঠিয়ে দেন। আমরা আরও জেনেছি একই কিংবা ভিন্ন ম্যাসেজ ভি এইচ এফ —এর মাধ্যমে সারাদেশে পাঠিয়ে দেন আবদুল কাদের সহ অনেকে। সে সব থেকে অনেকে টেলিফোনে, টেলিগ্রাফে ও টেলিপ্রিন্টারে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়ে দেন, যার ফলে সারাদেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠে। এ’সবের সাক্ষী ত অনেকেই। 

প্রখ্যাত বাম নেতা নির্মল সেন তাদের একজন।
শারমিন যদি শেষোক্তদের সাক্ষাৎকার নিতে পারতেন তাহলে আরও দৃঢ়তার সহিত বলতে পারতেন যে, বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং আরও জোর দিয়ে বলতে পারতেন যে, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট ডিভিশনের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত প্রদত্ত রায় অলঙ্ঘনীয়। 
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কথা আরও বহু জায়গায় বহুভাবে উল্লেখ আছে। তারপরও শারমিন এবং আমিরুল একটা ধাঁধায় এখনও আছেন যে, কেন বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিন বা আমিরুলকে এ’সব কথা বলেননি। এ’কারণে বিভ্রান্তি হতে পারে, অন্তহীন সংঘাত হতে পারে, কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা বাতিল হয়ে যেতে পারে না। এমনটির ব্যতিক্রম হলে তাজউদ্দিন ও আমিরুল মিথ্যুক প্রমানিত হবেন এবং মুজিব নগর ঘোষণাটি মিথ্যা বলে প্রমানিত হবে। তখন আমিরুলের অবস্থানটা কোথায় দাঁড়াবে? একটা কথার পুনরাবৃত্তি করছি: মঈদুল ইসলাম ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরের আগে কেন জানতে পারেননি যে বঙ্গবন্ধু কোন স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নাই, বঙ্গবন্ধুর নামে যে ঘোষণাটা পাঠান হয়েছিল তা তাজউদ্দিন প্রণীত ঘোষণা যা যে কোনভাবে বঙ্গবন্ধুর নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি তাজউদ্দিনের সাথে সংঘাত সৃষ্টিকারী মুজিব বাহিনীর কথা জানতেন, তাজউদ্দিনকে হত্যার জন্যে শেখ মনির ষড়যন্ত্রের কথা জানতেন কিন্তু একবারও সে সময়ে জানলেন না যে, বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিনের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। এই মইদুল যখন ‘মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর’ কথোপকথনে নিন্মের কথাগুলো বলেন তখন পাঠকের কাছে কি মনে হয়? কেমন করে মুজিব বাহিনীর নেতারা এত দ্রুত ট্রেনিং এর সুযোগ পেলেন; এ.কে. খন্দকারের জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি বললেন “এর দুটি উপাদানের কথা আমি জানি, যা হয়তো আপনার জিজ্ঞাসার উত্তর কিছুটা দিতে পারে’। একটা হচ্ছে, চিত্তরঞ্জন সুতার বরিশাল থেকে এমপিএ হয়েছিলেন ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে। তখন তিনি আওয়ামী লীগ করতেন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিখন্ডিত হওয়ার পর তিনি ন্যাশনাল  আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগদান করেছিলেন। সম্ভবত ১৯৬৮ সালে শেখ সাহেবের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। দুজনই তখন জেলখানায় বন্দি। তিনি শেখ মুজিবকে তখন বলেন, তাঁর সঙ্গে ভারতীয় উচ্চমহলের যোগযোগ আছে, গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনও তাঁর চেনাজানা। তখন শেখ সাহেব বললেন, তুমি কলকাতায় যাবে, সেখানে থাকবে এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে। তারপর চিত্তরঞ্জন সুতার জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ১৯৬৮ সালের দিকে আগরতলা চলে যান। এরপর তিনি চলে যান কলকাতায়। তিনি বেশির ভাগ সময় যোগাযোগ রাখতেন শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রীর সঙ্গে। বোধহয় এই সুবাদে চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা বিভাগ ‘র’—এর ঘনিষ্ঠ একজন হয়ে ওঠেন। এই সব বিবরণ আমি চিত্তরঞ্জন সুতারের কাছেই শুনেছিলাম ১৯৮০ সালে। আমার বই লেখার তাগিদে মুজিব বাহিনী নিয়ে কিছু বিষয় পরিস্কার হওয়ার জন্য ওই বছর গোড়ার দিকে দিল্লিতে আমি পি এন হাকসারের সহায়তা চাই। আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি  আমার সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন ‘র—এর প্রধান আর এন কাওয়ের সঙ্গে। দুজনই তখন অবসরপ্রাপ্ত। কাও আমাকে বিশেষ কিছু বলেননি, কিন্তু ব্যবস্থা করে দেন উবানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার। তিনিও অবসরপ্রাপ্ত। উবান বরং অনেক তথ্যই দেন এবং কলকাতায় চিত্তরঞ্জন সুতারের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন। চিত্তরঞ্জন সুতারের কাছে ‘র’ এর সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার এই বিবরণ আমি পাই।’
‘১৯৭১—এর মার্চ মাসে পাকিস্তানি আক্রমণ শুরু হওয়ার মুখে শেখ মুজিব যুবনেতাদের চিত্তরঞ্জন সুতারের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। স্পষ্টতই একটা পূর্ব নির্ধারিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এটা ঠিক করা হয়েছিল, যার হয়তো কিছুটা আভাস পাওয়া যাবে আরেকটা যে উপাদানের কথা আমি বলতে চলেছি তার মধ্য দিয়ে।’

১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর শেখ সাহেব জেল থেকে বেরোন। ওই বছর অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে ইয়াহিয়ার শাসনামলে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। ঠিক এমন সময় ইন্দিরা গান্ধীও লন্ডনে যান। সেই সময় ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন শেখ মুজিব। লন্ডনে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে শেখ সাহেবের দেখা হয় হামস্টেড হিথের একটা বাড়িতে। সেখানে ছিলেন আই সিং নামে এক পাঞ্জাবী ভদ্রলোক। আই সিং ছিলেন লন্ডনে ভারতীয় দূতাবাসের কাউন্সিলর। তিনি আসলে ছিলেন লন্ডনে ‘র—এর প্রধান। শেখ মুজিব ও ইন্ধিরা গান্ধীর বৈঠকে ব্যবস্থা করেছিলেন আই সিং নিজের বাড়িতেই। ১৯৭২ সালে আমি যখন লন্ডনে যাই, তখন আই সিং আমার সম্পর্কে জানতেন। হয়তো পি এন হাকসার বা ডি পি ধরের সুবাধে। ডি পি ধর তখন ভারতের পরিকল্পনামন্ত্রী এবং পি এন হাকসার প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি। আই সিং নিজেই একদিন এসে আমাকে তাঁর পরিচয় দেন। এবং তাঁকে কথা বলতে উৎসুকই দেখি। পুরোনো দিনের কথা প্রসঙ্গে আই সিং আমাকে জানান, সেই ১৯৬৯ সালের বৈঠকে তিনি নিজেও উপস্থিত ছিলেন। কেননা এটা একটা সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবেই শুরু হয়। সেই বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন যে আমরা জানি, নির্বাচনে আমরা বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতব। কিন্তু ওরা আমাদের ক্ষমতা দেবে না। ঠিক ১৯৫৪ সালের মতো হবে। আবার কেন্দ্রীয় শাসন জারি করবে। ধরপাকর করবে। শেখ সাহেব আরও বললেন, ‘কিন্তু এবার আমি তা হতে দেব না। আমার কিছু ছেলেকে তোমাদের অস্ত্রপ্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর একটা বেতার যন্ত্র দিতে হবে, যেখান থেকে তারা যাতে প্রচার করতে পারে যে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।’ আই সিংয়ের এই তথ্য আমি বিশ্বাসযোগ্য মনে করি, কেননা হুবহু একই ধরনের গেম—প্ল্যানের কথা আমি শুনেছিলাম ১৯৬২ সালে, যখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেপ্তার করা হয়’’।

আই সিংয়ের ভাষ্য মোতাবেক ইন্দিরা গান্ধী সহানভূতির সঙ্গেই শেখ মুজিবকে আশ্বাস দেন যে আমরা যথাসাধ্য সাহায্য করব। ঘটনা ঘটুক, দেখা যাক। এ সময় মিসেস গান্ধী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বটে, তবে মোরারজি দেশাইয়ের সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাঁর ক্ষমতা লড়াইয়ের ফলাফল তখন অনিশ্চিত। তাঁকে একটা নির্বাচন মোকাবিলা করতে হবে ১৯৭১ সালের শুরুতে। এই নির্বাচন ছিল ইন্দিরা গান্ধীর জন্য মরা—বাঁচার লড়াই। সে বছর মার্চ মাসের মাঝামাঝি সে নির্বাচন হয়। তাতে তিনি জয়যুক্ত হন।
এই দুটো উপাদান ছাড়াও আরও নিশ্চয় অনেক যোগাযোগ ছিল, ঘটনা ছিল। ঘটনার জটিল ডালপালাও ছিল। ফলে পাকিস্তানিরা ধ্বংশযজ্ঞ শুরু করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যুবনেতারা কলকাতায় ‘র—এর সহায়তায় সমস্ত সুবিধা পেলেন এবং অক্টোবরের শেষ অবধি তা পেতে থাকলেন। এখনো এই বিষয়গুলো অজ্ঞাত ও অনুদ্ঘাটিত।

মঈদুল হাসানের সাথে আমার দু’একটি কথা যোগ করি। চিত্ত সুতারের নাম ও ঠিকানা উভয়টি তাজউদ্দিনের জানা ছিল। যুব নেতাদের একজনের সাথে (সিরাজুল আলম খান) পূর্বেই তাজউদ্দিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং সে মাধ্যমে তিনি অনেক কিছু জেনেছেন। সীমান্ত অতিক্রমের আগেই আমিরুলের ভাষায় তারা নিশ্চিত করেই জানলেন যে বিএসএফ বা বর্ডার সিকিউরিটির ফোর্স টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার ম্যাসেজ পেয়েছে এবং তারা সেটা প্রিন্টও করেছে এবং ঐ ম্যাসেজ বিভিন্নভাবে গিয়েছিল। আমিরুল আরও বলছেন ‘আমরা যখন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা করলাম তখন ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার দিন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা কার্যকরী হবে এবং বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার ভিত্তিতে তা হয়েছে। 

আই সি এর মধ্যস্ততায় ইন্দিরার সাথে মুজিবের এ সাক্ষাতকারটি হয়ত দ্বিতীয় সাক্ষাত। এর আগেই নাকি ইন্দিরা যখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন ফনিদাও তারাপদের মাধ্যমে প্রথম একটি সাক্ষাত লন্ডনে হয়েছিল (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। তবে এ বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই কিংবা ১৯৬৪—৬৬ এর কোন সময়ে শেখ মুজিব আদৌও লন্ডনে গিয়েছিলেন কিনা তা খুঁজে দেখতে হবে।

শেষ করার পূর্বে শারমিন আহমদকে আবারও টেনে আনছি, নতুবা সত্যের অপলাপ হবে। শারমিন তার বই নিয়ে বিচিত্র আলোচনায় বলতে গেলে নিশ্চুপ ছিলেন। তবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একটি মন্তব্যে যা উল্লেখ করেন তা প্রনিধানযোগ্য। সেটা আমি একটি দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে আলোচনায় তুলব।  

এ’কথা অনস্বীকার্য যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ৭ই মার্চের ভাষণে বাঙালিদের জন্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে পরবর্তীতে তিনি সর্বজনের জন্যে কোন ঘোষণা দিতে পারবেন। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে তিনি পরবর্তীতে ২৬ শে মার্চ বিভিন্ন প্রহরে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর জন্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার এই ঘোষণার ভিত্তিতে মুজিব নগর সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরী করে। তার ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে এবং এই ঘোষণার ভিত্তিতেই বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বহুদিন পর একান্তই রাজনৈতিক কারনে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল এবং এখনও বিতর্ক অব্যাহত আছে। এটা অবাঞ্ছিত এবং মহাপাতকের কাজ বলেই অনেকে অনুমান করেন; যদি এ’সব বিতর্কে ইন্দন দাতা হোন বঙ্গবন্ধুর কোন সহকর্মী কিংবা তার সহকর্মীদের সন্তান—সন্ততি। অবশ্য তাদের সংখ্যা মুষ্টিমেয়; ভুল সংশোধন করে নিলেও তাদের অন্যতম হলেন শারমিন আহমদ। 

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের কন্যা, শারমিন আহমদ ‘তাজউদ্দিন আহমদ, নেতা ও পিতা’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। ঐতিহ্য ২০১৪ সালে বইটা প্রকাশ করার পর তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বইটির একাংশে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গ টেনে আপাতত: উপসংহার টেনেছেন যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতার কোন ঘোষণা দেননি। তবে ২৬ শে মার্চ যে ঘোষণাটি বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচারিত হয়েছিল তা তাজউদ্দিন আহমদ প্রণীত এবং হয়ত তারই কোন ছাত্র, শুভাকাঙ্খি ও অনুসারী তা গণ মাধ্যমে কোন না কোন ভাবে তুলে ধরেছেন (পৃঃ ৫৯—৬০)। বইটির ৭১ পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন যে চট্টগ্রাম থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আবদুল হান্নান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তারপর অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ট্রান্স—মিটারের মাধ্যমে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাটি অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তিনিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষ থেকেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তবে জিয়াউর রহমান কত নম্বর ঘোষক সে কথা অবশ্য বলেননি। বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় যে তিনি ৫ম, ৬ষ্ঠ কিংবা ৭ম ঘোষক। এই সংখ্যা বিভ্রান্তির মূল কারন হচ্ছে সবার আগে নাকি মাইকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা রিক্সাযোগে প্রচার করেছিলেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের অফিস সহকারী নূরুল হক (ড. হাসান মাহমুদ, গণমাধ্যম ৮ই মার্চ, ২০২১)। তার সাথে যদি আকাশ বানীর কথা যুক্ত করি তাহলে জিয়ার ক্রম আবার বদলে যাবে। এর সাথে যদি ৩রা মার্চ, ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির প্রস্তাব যোগ করি তাহলে জিয়ার ক্রম পুনরায় বদলে যাবে।

স্বাধীনতার ঘোষক প্রসঙ্গে উপরের কথাগুলো শারমিন, মইদুল হাসানকে উদ্ধৃত করে বলেছেন ঠিকই কিন্তু নিজের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ভিন্ন উপসংহার টেনেছেন। শারমিনের এই বক্তব্য নিয়ে বেশ ক’জন সহমতও পোষণ করেছেন। আমার ধারণা তারা কেউই শারমিনের গ্রন্থটি পুরো না পড়েই মন্তব্য দিয়েছেন। কেউ কেউ অবশ্য পুরো বইটি পড়ে শারমিনকে বাহবা না দিলেও কেউ কেউ শারমিনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে তিনি ‘পূর্বাপর’ সংগতি বিহীণ। ঐসব কারনে কিনা জানিনা অন্তত: এটুকু জানি যে এ’ব্যাপারে খালেদা জিয়ার একটি মন্তব্যের পরই শারমিন তার বইয়ের প্রাসঙ্গিক অধ্যায় নিয়ে জন সম্মুখে হাজির হয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার জামালপুরের ভাষণের প্রসঙ্গে শারমিনের নিজস্ব বক্তব্য নিম্নরূপঃ
‘‘বি এন পি’র সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামালপুরের জনসভায় (২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪) তাজউদ্দিন আহমদ: নেতা ও পিতা বইটি থেকে আমার লেখার উদ্বৃতি (৫৯—৬০ পৃষ্ঠা) দিয়ে বলেছেন যে তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে এনেছিলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেননি। তিনি সচেষ্ট থাকেন এ কথা প্রমাণ করতে যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। (ভিডিও বক্তব্যের লিংক http://www.youtube.com/watch?v=eOev2douY30)। বক্তব্যে তিনি অনুল্লেখিত রাখেন আমার বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়গুলোর উল্লেখিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাকি অংশগুলোর বর্ণনা। বঙ্গবন্ধু আমার বাবা বা দলকে জানিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও তিনি যে ভিন্ন মাধ্যমে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা তথ্য ও সাক্ষাৎকারসহ আমার বইয়ে স্পষ্ট উল্লেখিত (তাজউদ্দিন আহমদ: নেতা ও পিতা ১৪৭—১৪৮, ২৭৪—২৯১, ৩০১—৩১০ পৃষ্ঠা)।

বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার বার্তা পাঠিয়েছিলেন, তার একমাত্র জীবিত সাক্ষী, বঙ্গবন্ধুর পারসোনাল এইড হাজি গোলাম মোরশেদ, যিনি ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার হন, তাঁর ও প্রকৌশলী শহীদ নূরুল হক, যিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে খুলনা থেকে ট্রান্সমিটার এনেছিলেন ঘোষণা দেওয়ার জন্য, তাঁর স্ত্রীর সাক্ষাৎকার আমার বইয়ে ঐতিহাসিক তথ্য হিসাবে উল্লেখিত হয়েছে। হাজি গোলাম মোরশেদের সাক্ষাৎকারে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে তথ্যটি আমার জানামতে আমার বইতেই প্রথম উল্লেখ হয়। বইয়ে আরও উল্লেখিত যে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে ২৬ মার্চ দুপুরে এবং সেই সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন (১৪৭ পৃষ্ঠা) এবং ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে পরবর্তী ঘোষণা দেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান (৭১ ও ১৪৭ পৃষ্ঠা)। আরও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, যা বইয়ে ব্যারিষ্টার আমীর—উল—ইসলামের সাক্ষাৎকারে উদ্বৃত হয়েছে, তা হলো,’....অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। অতএব, ওই দিন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা কার্যকর হবে।’’ (২৭১ পৃষ্ঠা) (প্রথম আলো ১৩/১০/২০১৪)।

এরপর কি বলা যায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা দেননি? এ কথা থেকে এটাও উদঘাটিত হয়েছে যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার তিনটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রথমটি ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে, দ্বিতীয়টি সুবেদার মেজর শওকত আলীর মাধ্যমে এবং তৃতীয়টি পুলিশের ওয়ারলেসের মাধ্যমে।

তিনটি ঘোষণা দিয়েছেন একই ব্যক্তি, একই স্থান থেকে একই দিনের বিভিন্ন প্রহরে। তাহলে এখানে যে অন্যের কোন অংশীদারিত্ব নেই বা বাইরের কেউ জড়িত নেই তা স্পষ্ট। এর ভিত্তিতে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটির রচয়িতা আমিরুল ইসলাম। এ’ব্যাপারে তাজউদ্দিন আহমদ, রেহমান সোবহান ও সুব্রত রায় চৌধুরীর কিছুটা অংশীদারিত্ব রয়েছে। তবে এই ঘোষণা পত্রের মূল মালিক বা স্বত্ব বা উৎস হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং দেশের সকল অঞ্চল থেকে হাজারো ঘোষণা পঠিত হলেও তার মূল প্রণেতা, প্রকাশক ও প্রবক্তা হচ্ছেন আইনত: কার্যত: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

এই ঘোষণার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তা করা হয়েছে আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে এবং বাংলাদেশে জনগণের জন্য সমতা, মানব মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। আরও বিশ্লেষণে দেখা যায় এই ঘোষণা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক নীতি ও আইন অনুসারে। স্বাধীনতার সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় একজনের নাম আসে তিনি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- একজন প্রকৃত জননেতা। প্রক্রিয়াটি এমন যে অন্য কোন ব্যক্তি বা নেতার নাম আসতে পারেনা এবং স্বাভাবিকভাবে আসেনি। এই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম স্বাধীনতার ঘোষণা দাতা রূপে বহু কাটা ছেঁড়ার পরও সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়ে আছে। এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে ও তার রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান সকলের কর্তব্য। একই কারণে এ’সবের যেকোন জাতীয় লংঘন পেনাল কোর্ট ১২৩ এ ও সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত মোতাবেক দন্ডনীয় অপরাধ।

এই ঘোষণার বিরাট বিস্তার ও পটভূমি বিবেচনায় নিয়ে এবং বিশেষতঃ ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে এ স্বাধীনতার ঘোষণা বা ডাক। এই ডাক শুধু একজনই দিতে পারেন এবং এক ডাক দেবার পেছনে ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব একজন ব্যক্তিরই ছিল যার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই ঘোষণা তৈরি ও ১৭ এপ্রিল এই ঘোষণা প্রকাশ্যে পঠিত হলেও তা ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ সাল থেকে কার্যকরী করা হয়েছে বলে গণ্য হয়েছে। কেননা বঙ্গবন্ধু নিজে এই ঘোষণা প্রত্যাহার করেননি এবং নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিগণ এই ব্যক্তি ও ঘোষণা ব্যতিরেকে অন্য কোন ব্যক্তি বা ঘোষণার অনুমোদন দেয়নি। অবস্থার প্রেক্ষিতে ঘোষণাপত্র ঘোষিত হয়েছে মুজিব নগরে। তবুও ঘোষণার স্থান একমাত্র ঢাকা ছাড়া অন্য কোন জায়গা নয়। সর্বাধিক সংখ্যক বার পঠিত এই ঘোষণার স্থান চট্টগ্রাম হলেও স্বাধীনতার ঘোষণায় আইনত চট্টগ্রামের কোন স্থান নেই। 

চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তাই দেখা যায় বাংলাদেশের সংবিধানে আক্ষরিক অর্থে স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হচ্ছেন ফাউন্ডিং ফাদারদের নেতা। এই ফাউন্ডিং ফাদারগণ বা প্রতিষ্ঠাতা জনগণ, সার্বভৌম জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। আবার এই প্রতিষ্ঠাতা জনকবৃন্দের নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে তিনি নির্বাচিত সদস্যদের সংসদীয়নেতা এবং ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যতঃ তিনি প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট; ২৬ মার্চ ঢাকার স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের কালে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে প্রেসিডেন্ট ও সংবিধান রচনার সময় প্রধানমন্ত্রী রূপে সবসময় এই প্রক্রিয়ায় জনকদের নেতা। এই ঘোষণা বলেই তিনি পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সুতরাং সংবিধানের মর্মার্থে ও পরবতীর্ সংশোধনীর প্রেক্ষিতে তিনি জাতির পিতাও বটে। এতে সার্বভৌম জনগণেরও সম্মতি রয়েছে।

তবে মুজিবনগর সরকার গঠনের প্রেক্ষিতে ও পরবর্তীতে তার ভিত্তিতে দেশের প্রথম সংবিধান রচনা ও রক্ষনের মাধ্যমে ২৬ শে মার্চ সর্বজনীন স্বাধীনতা ঘোষণার দিন। তবে যারা বলেন বঙ্গবন্ধু ২৬ শে মার্চ তেমন কোন ঘোষণা দেননি কিংবা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন; তারা অবৈধ ও বে—আইনী কাজটি করছেন। তাদেরকে বাগে আনার সাংবিধানিক ও আইনী দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ

পাদ—টীকাঃ এ লেখাটি মোটামুটি পুরানো তবে প্রাসঙ্গিক বলেই কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সহকারে পুন:প্রকাশ করা হলো।

ট্যাগ:

সম্পাদকীয়
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১: কেমন করে বিজয় এলো

banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ||

আমরা বহু সৌভাগ্যবান জাতি। পৃথিবীর অন্য কোন জাতির এতসব রক্তাক্ষারে লেখা স্মরণীয় দিন আছে বলে আমার জানা নেই। আমাদের আছে স্বাধীনতা দিবস যা ২৩ বছরের সংগ্রামের ফসল। বঙ্গবন্ধু প্রথমে ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বাঙালিদের জন্যে আর ২৬ শে মার্চ সারাবিশ্বের অবগতির জন্যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেদিন পাকিস্তান আর্মি যদি আত্মসমর্পন করত কিংবা সংগোপনে আমাদের মাটি ছেড়ে যেত, তাহলে আমাদেরকে রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামে লিপ্ত হতে হোত না। আমরা যুদ্ধে জয়ী হলাম স্বাধীনতা ঘোষণার প্রায় ৯ মাস পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশ্বের তথাকথিত দুর্দুর্ষ সেনা বাহিনী, মিত্র বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্ম-সমর্পনের পর আমাদের বিজয় নিশ্চিত হলো। সে কারণে ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। তবে কেমন করে বিজয় এলো তা আমাদের প্রজন্ম জানলেও বর্তমান প্রজন্মের জন্য এই নিবন্ধ।
 
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান আমাদের উপর ক্র্যাকডাউন করল অর্থ্যাৎ অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। এক অর্থে আমরা এই দিবসটির অপেক্ষায় ছিলাম যাতে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি-নীতি লংঘন না করেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন। পাকিস্তানের অপারেশন সার্চ-লাইটের অর্থ্যাৎ ক্র্যাকডাউনের সাথে সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে নেমে পড়া ছাড়া আমাদের উপায়ন্তর ছিল না। এমন যে নৃশংশ হত্যযজ্ঞ হতে যাচ্ছে সে কথা বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জানতেন। তবে আমরা তার মুখ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে (১৯৭১) এ’কথা জানলাম। সেদিন আমি ও শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর অফিসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডের আলোচনার সারমর্ম জানতে গিয়েছিলাম। সেখানে জানলাম যে ফারল্যান্ড প্রথমে আমাদের নিঃশর্ত সমর্থনের কথা বললেও পরবর্তীতে তার সুর বদলিয়ে যায়। শর্ত সাপেক্ষে সাহায্য দানের কথায় বঙ্গবন্ধু রেগে যান এবং আমাদেরকে সশস্ত্র যুদ্ধ ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন অসম্ভব বলে জানালেন। বঙ্গবন্ধু ফারল্যান্ড এবং ইয়াহিয়াকে হুশিয়ার করে দিয়ে বললেন- "Nothing shall go unchallenged"। 

পরের দিনে ইয়াহিয়ার ভাষণ বা বিবৃতির জন্যে প্রস্তুত থাকতে বলে জঙ্গী মিছিলের নির্দেশ দিলেন। তাই মার্চ মাসে শুধু পাকিস্তান প্রস্তুত নিচ্ছিল, আমরা হাত গুটিয়ে বসে ছিলাম; সে কথা বলা হবে সত্যের অপলাপ। পাকিস্তান যখন আলোচনার ছদ্মাবরণে সশস্ত্র আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছিল আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেই ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখেই সারাদেশের মানুষ তা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বুঝলেন ও আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তা বুঝলাম সহজভাবে। ছাত্ররা যখন ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করল; আমরা শিক্ষকরা ৩রা মার্চ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ৬ দফার বদলে এক দফার প্রস্তাব পাশ করিয়ে নিলাম। আমি স্বকন্ঠে তারস্বরে সে প্রস্তাব পড়ে শুনালাম। যার ফলে হয়ত বিকালে ছাত্ররা স্বাধীনতা ঘোষণার ব্যাপারে দ্বিধাহীণ ছিল। সেদিন পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে পতাকা উত্তোলন করল, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করল, সভার শুরুতে ও শেষে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, সংগীত গাওয়া হোল, গান সেলুট দেয়া হোল, তখন আসল বার্তা সারাদেশে পৌঁছে গেল। তারপর শুধু প্রতীক্ষার পালা, কখন তারা আঘাত হানে, তাহলে প্রতিঘাত হানাটা আর অপরাধ হবে না। এরই নামে আলোচনার নামে এই ইদুর-বিড়াল খেলাটা চলল ২৩ মার্চ পর্যন্ত যেদিন পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসেও পাকিস্তানী পতাকা কোথাও উত্তোলিত হলো না, উত্তোলিত হলো স্বাধীন বাংলার পতাকা। পরবর্তী ক’দিন উভয় পক্ষ জয়-জয় ভাব নিয়ে আলোচনায় অগ্রসর হলো। কোনোরকমে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার প্রত্যাশায় ইয়াহিয়ার দল ৬ দফার অন্তত: চারটি দফা মেনে নিল। বঙ্গবন্ধুর দল কৃট কৌশল হোক কিংবা নির্মম রক্তপাত এড়াতে তাতে নিমরাজী হলো। এর পরই ৪ দফার সাথে আরও দুটো দফার কথা জানালেন বঙ্গবন্ধু। এই দুটো দফার একটি ছিল স্বতন্ত্র অর্থ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দু’প্রদেশে দু’জাতীয় মুদ্রা ও দুটো কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর অপরটি ছিল এক লক্ষ আধা সামরিক বাহিনী গঠনের বিধান। ইয়াহিয়া এই প্রস্তাবের মমার্থ বুঝেই গুলি মেরেই সমস্যা সমাধান করার পথ নিল। বঙ্গবন্ধুও দেখলেন ৪ দফা গৃহীত হলে এক ধরনের কনফেডারেশন হবে, তবে স্বাধীনতা বিলম্বিত হয়ে যাবে কিংবা অবস্থার চাপে পড়ে তা কোনোদিন অর্জিত নাও হতে পারে। তাই তুরূপের দুটো কার্ড তিনি শেষেই খেললেন। পরিণতি জেনেই তিনি স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাটি ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের মাধ্যমে বলদা গার্ডেন থেকে প্রচার করালেন। ক্র্যাকডাউনের বেশ পরে নায়েক সুবেদার শওকত আলীর মাধ্যমে দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি পাঠালেন। এই দুটো ঘোষণা বিভিন্ন মাধ্যমে ভর করে দেশময় ও বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিরোধ যুদ্ধ ছড়িয়ে গেল সর্বত্র।

প্রতিরোধ যুদ্ধে সবচে বেশী ভূমিকা রাখল বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স যা ১৯৬১ সালে গঠিত বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের রপান্তরিত নাম। লিবারেশন ফোর্স থেকে মুজিব বাহিনী গঠনের ব্যবধান খুব বেশী দিন ছিল না। অন্যেরা প্রতিরোধ যুদ্ধ জুন মাস পর্যন্ত চালিয়ে জুলাই আগষ্ট মাস শেষে একেবারে স্তিতমিত হয়ে পড়লেও বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর যোদ্ধারা সীমান্ত অতিক্রম করে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক ভারতে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রের যোগান নিল। দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ শুরু করল। তারপরে আমাদের নিয়মিত যোদ্ধা ও অন্যান্য গণযোদ্ধারা গেরিলা কায়দায় পাকিস্তানকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। ভারত থেকে আক্রমন ঠেকাতে পাকিস্তান সীমান্তের দিকে অগ্রসর হলো। ইত্যবসরে নিয়মিত বাহিনীর সাথে মুজিব বাহিনীর সমঝোতার অংশ হিসেবে শেষোক্ত বাহিনী সীমান্ত এলাকা থেকে ২০ মাইল গভীরে তৎপরতার দায়িত্ব নিল। এ’জন্যে তাদের অতি উচ্চ-শিক্ষিত গেরিলা দল অতি উন্নতমানের হাতে বহনযোগ্য অস্ত্র নিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল। দেরাদুনে ও হাফলং এ প্রশিক্ষণে প্রায় ১০ হাজার গেরিলা অংশ নিল। দেশে ঢুকেই প্রত্যেক যোদ্ধা আরও দশজন গেরিলা যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে হিট এন্ড রান পদ্ধতিতে পাকিস্তানীদের একাংশের ঘুম ও বিশ্রাম হারাম করে দিল। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর নিজস্ব গেরিলা যোদ্ধা ছিল। তারাও দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ সম্প্রসারিত করল। সশস্ত্র বাহিনী মোট দশটি সেক্টরে বিভক্ত হয়ে ভারতীয় সেনাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় যুদ্ধের গতি ফিরিয়ে আনলো। এক পর্যায়ে যৌথ বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত হলো। আমরা অনেকটা অনিচ্ছা সত্বেও যৌথ বাহিনীভূক্ত হলাম। নভেম্বর মাসের দিকে মুজিব বাহিনী বা বিএলএফ যোদ্ধাদের নিয়ে চাটগাঁ অভিমুখে যাত্রা করলে শেখ ফজলুল হক মনি তিনি আমাকে পূর্বাঞ্চল মুজিব বাহিনীর দায়িত্ব দিলেন। শেখ মনি ও জেনারেল ওবান ভারতীয় বা অন্য কোন বাহিনীর সহায়তা ছাড়ায় চাটগাঁ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ণরুদ্ধার করে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল। ৩রা ডিসেম্বর থেকে যৌথ বাহিনীর প্রচন্ড আক্রমনে বাংলাদেশের প্রায় সকল এলাকায়ই পাকিস্তানের কব্জামুক্ত হতে লাগল। পরাজয় নিশ্চিত জেনে সমূহ ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পাকিস্তানী যুদ্ধরাজরা আত্ম-সমর্পনে রাজী হলো। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪.৩১ মিনিটে পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্ম-সমর্পন করার মধ্য দিয়ে আমাদের বিজয় নিশ্চিত হলো।
 
এ'হলো অতি সংক্ষেপে আমাদের বিজয় কেমন করে এলো তার ইতিহাস। যুগ যুগের পরাধীনতার জাল ছিন্ন করে আমরা সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। কয়েক দিনের মাথায় আমি আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকুরীটা ফেরত পেলাম এবং পূর্ণযোগদান করলাম।
 
*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী,

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর বর্তমান উপাচার্য।

ট্যাগ:

সম্পাদকীয়
'করোনায় যারা পথে বসেছে'

banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ||
ফেইসবুক উল্টাতে উল্টাতে দেখলাম এক পাইলট এখন রাস্তার কিনারে হোটেল নিয়ে বসেছেন। এ’ দুঃসংবাদ বড্ড স্বাভাবিক। বিগত ন' মাসে সারা বিশ্বকে হাহাকার গ্রাস করেছে। এমন কোনও খাত নেই যা করোনার আঘাতে ব্যতিব্যস্ত পর্ষদস্ত বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। ব্যতিক্রম হয়ত আছে যেমন চিকিৎসা খাত। আমাদের দেশে কারো কারো ব্যাংক ব্যালেন্স স্ফীত হয়েছে ভিন্ন কারণে। এ নিয়ে বেশী কথা-বার্তা হয়নি কিন্তু চিকিৎসা খাতের স্ফীতির নমুনা ফার্মেসী বা মেডিক্যাল শিক্ষায় পড়েছে। মেডিকেলে অধিক শিক্ষার্থী ভর্তির সিদ্ধান্ত এই প্রবনতার সাথে সঙ্গতিময়। 

করোনায় ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা দীর্ঘ। তাদের সমষ্টিগত ফলাফলে বোধহয় সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ভ্রমনখাত, শিক্ষা খাত বিশেষত: বেসরকারি অর্থে পরিচালিত শিক্ষাখাত, বৈদেশিক চাকুরী ও সামগ্রিকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শিক্ষাখাত ও বিমান চলাচল। সীমিত আকারে বিমান চলাচল শুরু হয়েও আমরাসহ বহু দেশে বিমান চলাচল হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বেকারত্ব দৃশ্যমান, সম্মানজনক ও অতি পুরস্কৃত পাইলটদের চাকুরীতেও। কোনও কোনও দেশে স্বাস্থ্যবিধিতে অস্বাভাবিক বাড়াবাড়ির কারনে বিমান চলাচল বন্ধ ছিল কিন্তু কিছুটা গতি সঞ্চারের পর দেখা গেছে গতি একেবারে স্থবির হয়ে আসছে কারণ ভ্রমনে বহুবিধ বিধি-নিষেধ আরোপ করা আছে।

করোনায় প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। আমাদের দেশেও তা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে শীর্ষচূড়া স্পর্শ করতে যাচ্ছে। হয়ত আগের মত লক-ডাউনের সম্ভাবনা আমাদের দেশে তেমন প্রবল নয় কিন্তু অনেক দেশে এবং অনেক উন্নত দেশই লক-ডাউনে আবার যাচ্ছে। যেসব দেশে করোনার নামমাত্র আবির্ভাব ছিল তারাও এখন তীব্রতা অনুভব করছে। ফলে ভ্রমন শিল্প অতি সংকটে পড়বেই। আগেই বলেছি, এই ভ্রমনের সাথে বিমান চলাচল, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও চিকিৎসাখাত জড়িয়ে আছে। করোনার কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা সাধারণভাবে উপকৃত হলেও চিকিৎসা-ভ্রমন খাতটা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সিঙ্গাপুরের কথা ধরা যায়। সিঙ্গাপুরের অন্যতম আয়ের উৎস ছিল চিকিৎসা-ভ্রমন খাত। এ খাত সম্পূর্ণ না হলেও প্রায়ই স্থবির হয়ে গেছে। সিঙ্গাপুর যাবার ভিসা দেয়া হচ্ছে কিন্তু ১৪ দিনের জন্যে কোরাইন্টানে থেকেই চিকিৎসার সুযোগ নিতে হচ্ছে। এতে সিঙ্গাপুরে করোনা প্রাদুর্ভাব কমেছে ঠিকই কিন্তু ব্যাপকভাবে ভ্রমনকারী বিশেষত: চিকিৎসা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ ভ্রমনকারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই চিকিৎসাটাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় দেখা গেছে বিনোদন কেন্দ্র, চিড়িয়াখানায় প্রচন্ড ভীড়। অবস্থার চাপে এগুলো এখন প্রায় শুন্য। মানুষজন ভিন্ন পেশার দিকে ঝুঁকছে। আমাদের দেশে অনেক দিন যাবত শুনা যাচ্ছে শিক্ষকরা শিক্ষকতা ছেড়ে ভিন্ন পেশা অবলম্বন করে কোনোরকমে নাক জাগিয়ে বেঁচে আছে। যাদের এ বিকল্প নেয়, তারা সঞ্চয় ভাঙ্গিয়ে দিনাতিপাত করছে। ব্যাংকের কাজ কর্মে কিন্তু তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বলতে গেলে ব্যাংকগুলোতে তারল্যমাত্রা এত বেশী যে স্থায়ী আমানত বলতে গেলে নিন্ম-মার্গে চলে আসছে আর সেভিংস একাউন্টে সুদের হার কোথাও কোথাও শুন্যের কাছাকাছি। এ কারণে মার্চেন্ট ব্যাংকিং ও দুর্বৃত্তায়নের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। শিক্ষাখাতে আবার ফিরে আসছি। 

দেশের শিক্ষাখাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা জড়িত। শিক্ষাখাতটির অর্থায়নে ব্যক্তিক উদ্যোগ প্রাধান্য পেয়ে আসছে। সরকারী ও এমপিও ভুক্তরা বাদ গেলে প্রায় ৯০-৯৫শতাংশ শিক্ষা ব্যয় বেসরকারি খাত বয়ে বেড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে আর্থিক ক্ষমতা সংকোচনে চাকুরীর উপর প্রচন্ড চাপ পড়ছে। ইতিমধ্যে কিন্ডার গার্টেন সেক্টর খাবি খেতে খেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এই হুমড়ি অবস্থাটা আর কত দিন চলবে তা বলা যাচ্ছে না। অন-লাইন শিক্ষা কার্যক্রমে দূরবস্থার পদ-ধ্বনি দেখা যাচ্ছে। বিদেশী চাকুরী সংকুচিত হওয়ায় এবং স্বদেশে চাকুরীর বাজার সংকোচনের কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্রুত কমছে। যারা লেগে আছে, তারাও সামর্থ হারিয়ে কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। নতুন শিক্ষার্থী পাবার সম্ভাবনা আগামী ক’মাসে দেখা যাচ্ছে না, সাধারণ সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি সমাপ্তির পরই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী পেতে শুরু করে। এবারে স্বায়ত্বশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিটা কিভাবে হবে বা কবে হবে সে সম্পর্কে স্থির কোনও পূর্বাভাস প্রদান অসম্ভব হয়ে গেছে। অতএব এ’সব বিশ্ববিদ্যালয় কম ক্ষতিগ্রস্থ হলেও সাধারণভাবে শিক্ষার্থী ও বিশেষভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিদারুন সংকটে পড়ে যাবে। এক সময়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সৃষ্টিশীলতার খাতিরে স্বায়ত্বশাসনের ধারনাটি সবাই পোষন করতেন। এখন সৃষ্টিশীলতা বিদায় নিয়েছে। স্বায়ত্বশাসনের পাশাপাশি জবাবদিহিতা প্রাসঙ্গিক হয়েছে বলে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ এবং তাদের পোষ্যগণ ছাড়া অন্য কেউ তেমন গভীরভাবে স্বায়ত্বশাসনের ধারনাকে সমুন্নত রাখতে চায় কি না জিজ্ঞাস্য। স্বায়ত্বশাসন শব্দের অর্থ যদি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আর একটি রাষ্ট্র, কিংবা নিজের ইচ্ছেটা সবারই উপর ছাপিয়ে দেয়া এবং আমলাদের সাথে পাল্লা দিয়ে সুযোগ লুফে নেয়া কিংবা সুবিধার উত্তরোত্তর ক্ষেত্র সৃষ্টি, তাহলে যে জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে জনগণ প্রশ্ন করতেই পারে। করোনার অজুহাতে ক্লাশ না নিয়ে শতভাগ বেতন ভাতা ভোগ করেও একই শিক্ষকমন্ডলী ভর্তি পরীক্ষার মহাযজ্ঞ সারাদেশে সম্প্রসারিত করে কি নিজেদের প্রশ্নবোধক করছেন না? সময় আসছে তাদের ভাবার। এত বিশাল সংখ্যক অধ্যাপক বানিয়ে এখন অধ্যাপকদের উপ-সচিবের পদ মর্যাদা নামিয়ে দিয়েছে আর উপাচার্য, প্রো-উপাচার্য ও কোষাধ্যকে যথাক্রমে সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্মসচিবের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে, তা কি দেখছেন? সৃজনশীলতা যখন উঠে যাচ্ছে, জনগণের পক্ষে যখন কথা বলার শিক্ষকের আকালবস্থা, যখন গবেষনা শুন্যের কোঠায় আর শিক্ষাদানই মুখ্য লক্ষ্য, তখন স্বায়ত্বশাসনের আদৌ প্রয়োজন আছে কি? বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৭ ভাগ ব্যয় যখন জনগণের পকেট থেকে আসছে, তখন জবাবদিহিতার প্রশ্নটি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচিত হবে বলে বিশ্বাস। সরকারি অর্থে যারা পরিচালিত তারা শতভাগ স্বাধীনতা ভোগ করছে, আর নিজেদের অর্থে পরিচালিত তারা দুঃশাসন ও নিগ্রহের শিকার এমন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আসন্ন। তাহলে অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে যে সেবাখাত বিশেষত: শিক্ষা-চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিদেশে কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, হচ্ছে ও হবে। বিনোদন শিল্পেও ধ্বস আসছে। সিনেমা হল মালিক ও প্রযোজকরা ভারতীয় ফিল্ম প্রদর্শনের মাধ্যমে গতি সঞ্চারের সূচনা করতে চাচ্ছে। 

এমতাবস্থায় কৌশলগত কি ব্যবস্থা নেয়া যায়, তা এখন গভীরভাবে চিন্তনীয়। এ’ব্যাপারে ব্যক্তিখাত ছাড়িয়ে সরকারি খাতকে নবতর ভাবনা নিয়ে আসতে হবে। বৃহৎ শিল্প খাত সরকারের অনুদান নিয়ে এখন তা ফেরত না দেবার পায়তারা করছে। ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতের দৌবল্যের কারণে চাকুরী বাজার সংকুচিত হয়েছে। ক্রয় ক্ষমতায় এ’সব ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তাই নীতি নির্ধারকের উল্লেখিত তিন খাতে একক কিংবা যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

ট্যাগ:

সম্পাদকীয়
উচ্চ মাধ্যমিকে ওপেন বুক পরীক্ষা ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা’র উমেদারি

banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

দেশের স্কুল কলেজগুলো সেই ১৭ মার্চ থেকে এক জায়গার নিথর দাঁড়িয়ে আছে। সর্বশেষ ৩রা অক্টোবর পর্যন্ত ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তারপরও প্রাপ্ত বাস্তবতায় ছুটির মেয়াদ বাড়াতেই হবে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশের প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কতিপয় কলেজ কায়ক্লেশে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেলে তাদের ফিডার হিসেবে বিবেচিত উচ্চ মাধ্যমিক ফাইনাল পরীক্ষাটার অনিশ্চয়তা কিছুতেই ঘুচছে না। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হবার কথা ছিল বিগত এপ্রিল মাসে। এখন এই পরীক্ষা যে কবে হবে তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। করোনার মধ্যেও এই পরীক্ষাসহ সমমানের পরীক্ষার জন্যে কিছু না কিছু প্রস্তুতি বোর্ড গুলোর রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস। তা না হলে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ বলতে পারেন না যে তারা কলেজ বা মাদ্রাসাগুলো খোলার ১৫ দিনের মধ্যেই পরীক্ষা নিতে পারবেন। 

এই পরীক্ষাটা একটা মহা কর্মযজ্ঞ। শিক্ষার্থী সংখ্যা মাধ্যমিকের তুলনায় কম হলেও পুরো কর্মযজ্ঞের সাথে কম করে ত্রিশ-চল্লিশ লাখ লোক জড়িয়ে যেতে বাধ্য। অর্থাৎ এই কর্মযজ্ঞ সারা দেশটাকে কোন না কোন ভাবে জড়িয়ে নিতে বাধ্য। ফলশ্রæতিতে সারাদেশে করোনার সম্প্রসারণ অবধারিত। শীত ঘনিয়ে আসছে। আশংকা করা হচ্ছে শীতে করোনার প্রাদুর্ভাব ব্যাপক ও তীব্রতর হবে। শত চেষ্টায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও পরীক্ষা বিধি মেনে আগামী এপ্রিল মাসের আগে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে আমাদের মহা সংকট লালন করেই চলতে হবে। এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী কিছু না করে এত অলস সময় কখনও কাটিয়েছে কিনা সন্দেহ। একমাত্র ব্যতিক্রম মুক্তিযুদ্ধের সময়টা। এরই মাঝে অলস মস্তিষ্ক যে শয়তানের লীলাভূমি তার কিছু প্রমাণ 

এখানে সেখানে মিলছে। যুব সমাজের পদস্থলন এবং অনাকাঙ্খিত অসামাজিক কার্যক্রমের বিস্তার তার সামান্য পরিচয় কি বহন করছে না? যুবশক্তি আমাদের বড় শক্তি, তা পচে যাচ্ছে, বখে যাচ্ছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ অলস ও অনুৎপাদনশীল কাজে জড়িত থাকছে বা বিকল্প জীবিকার ধান্দায় মেতেছে। জাতীয় জীবনে তার নেতিবাচক প্রভাবও অবশ্যম্ভাবী। এমতাবস্থায় ব্যক্তিক ক্ষয়ক্ষতির অপেক্ষা জাতীয় ক্ষয়ক্ষতি অধিকতর ধর্তব্যের বিষয়। 

দেশে প্রায় অর্ধেকের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে; বিগত দু’সেমিষ্টার শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে গিয়ে তারা মহাসংকটে নিপতিত। করোনার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হাতে গোনা ক’টি ছাড়া বাকীরা শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। শিক্ষার্থী না পেলে আয় উপার্জনের পথ বন্ধ। তাই অনেক জায়গায় অলিখিত বেকারত্ব মাথা চাড়া দিচ্ছে। মৌলিক সুবিধাদি অক্ষুন্ন রেখে শিক্ষক কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের নিয়োগ অক্ষুন্ন রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় চলতে দিলে অধিকাংশ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

এ যাবত তারা যাদের পড়িয়ে যাচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে নাম মাত্র ফি সংগ্রহ সম্ভব বলে দিন দিন সকলের ভান্ডারে টান পড়েছে। এক সময় যাদের রমরমা অবস্থা ছিল তারাও হাসফাস শুরু করছে। মাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষা না হলে তাদের চালিকাশক্তি বিলীন হয়ে অস্তিত্ব সংকটের দামামা বেজে উঠবে। এমতাবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেয়াটা ব্যক্তিক, সামষ্টিক ও জাতীয় পর্যায়ে অপরিহার্য হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা দিতে পারছে না বলে বিদেশ গমন প্রত্যাশী ও সামর্থবানের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার পথও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সব বিবেচনায় কোন না কোন ভাবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাটা নেয়া বাঞ্চনীয়। নাই মামার চেয়ে কানা মামা খুঁজে নেয়াটাও এক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ হতে পারে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রনালয় প্রতিনিয়ত চিন্তা ভাবনায় নিয়োজিত থাকলেও বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না, আমি এ ব্যাপারে একটি উচ্চাভিলাষী কৌশলের কথা বলবো। 

আমার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে প্রায় ৫৪ বছরের শিক্ষকতা ও পরীক্ষা কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিকল্প ওপেন বুক বা খোলা বই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়ার কথা বলবো। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষার্থীর আপন আবাসস্থলই হবে এক একটি পরীক্ষা কেন্দ্র। 
এই কেন্দ্রে কোন পরিদর্শক থাকবেন না, পরিবারের কর্তা ব্যক্তিকে তার মানবিকতা, মানসিকতা ও উচ্চ মানের বিবেক সংযোতা করে নিয়ে পরিদর্শকের কাজ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের পরীক্ষা শেষে পরীক্ষার খাতা নিকটবর্তী কলেজে বা সমমানের শিক্ষায়তনে পৌছিয়ে দিতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা বই খুলে হোক কিংবা অন্যের সাহায্য নিয়ে হোক পূর্বে প্রেরিত প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট সময়সীমায় পরীক্ষা শেষ করে পরিবারের কর্তাব্যক্তির কাছে পরীক্ষার খাতা সমর্পণ করবে। এবারে পরীক্ষায় বাহির থেকে কোন খাতা সরবরাহ করা হবে না। পরীক্ষার্থী তার নাম, পিতা-মাতার নাম, প্রতিষ্ঠানের নাম ও পরীক্ষার বিষয় সম্বলিত তথ্যাদি দিয়ে উত্তরপত্র তৈরী করবে। তার খাতাটি নিকটবর্তী কলেজে পৌছে দেয়ার দায়িত্ব নেবেন গৃহের অভিভাবক। একটি নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে পরীক্ষা শেষ করতে হবে। 

এ জাতীয় পরীক্ষাকে আমি ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা’র সাথে তুলনা করছি। দেশের সুধি সমাজ থেকে শুরু করে অভিভাবকগণ হায় হায় রব তুলবেন। নকলে দেশটা ছেয়ে যাবে বলে অনেকে তীর্যক অভিমত দেবেন। দেশে ও  বিদেশে আমাদের সার্টিফিকেট গৃহীত হবে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তারপরও প্রথম কথা হলো, এই ব্যবস্থাটা শুধু এক বারের জন্যে বলবত হবে। যে নকল নিয়ে প্রশ্ন উঠবে তা কি এদেশে সম্পূর্ণ উঠে গেছে? এখানে কি প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে না? আমরা আমাদের শিক্ষকতা জীবনে নকলের বিভিন্ন প্রতিরোধও বিবেচনা করেছি। পরীক্ষার হলে কড়া নজর রাখাটা নকল প্রতিরোধের প্রধান উপায় বিবেচনা করেছি। তারপরও কি নকল থেমে ছিল? সম্ভবত, সে কারনেই ইউজিসির ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও কোন বিশ্ববিদ্যালয় কেবলমাত্র মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল ভিত্তিক উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়নি। ভর্তি পরীক্ষা অন্ততঃ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত সত্য। তার মানে হচ্ছে আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা গ্রহণ যোগ্যতা আমাদের কাছেই প্রশ্নবোধক ছিল এবং আছেই। এমতাবস্থায় নকল উচ্ছেদের পথ বা পন্থা হিসেবে ওপেন বুক পরীক্ষায় সীমিত মহড়া আমরা দিয়েছি। পরীক্ষার হলে পরীক্ষার্থীদের যত সম্ভব বই বা ছোতা আনতে আদেশ দিয়েছি। শিক্ষার্থীরা মহা আনন্দিত, কিন্তু একবার পরীক্ষা দেবার পরই বুঝেছে যে ওপেন বুক পরীক্ষা কতটা তিক্ত ও ভীতিকর। আমাদের কাছে তারা দলবদ্ধ হয়ে ছুটে এসেছে এবং বলেছে যে তারা আর কোনদিন পরীক্ষায় অসদ উপায় অবলম্বন করবে না। বস্তুত প্রচলিত বন্ধ বই পরীক্ষার চেয়ে ওপেন বুক পরীক্ষা অনেক কঠিন বাস্তবতা। আমরা অন্য ধরনেরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি, তার মধ্যে পরীক্ষার ১ ঘন্টা আগে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রশ্ন বিতরন করে বই পত্র পর্যালোচনা করার সুযোগ দিয়েছি। এতে দেখা যাচ্ছে পরীক্ষার আগের এক ঘন্টার পড়াশুনায় অন্ততঃ ৫টি কি ৬টি প্রশ্নের জবাব দানের যে নিবিষ্টতা সংযোগ করেছে তাতে বাস্তব জীবনটা কিছুটা হলেও জ্ঞানের আধার হয়েছে। 

আসলে একেবারে কোন কিছু না শেখার চেয়ে সামান্য কিছু তো শেখা হচ্ছে। আমরা দেখেছি ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও ওপেন বুক পরীক্ষা কিংবা পরীক্ষার এক ঘন্টা আগে প্রশ্ন সরবরাহ করে পরীক্ষা নিলেও ভালো ছাত্ররা ভালো ফলাফল করছেই আর অন্যেরা কোন রকমে উতরে গেছে। এ জাতীয় পরীক্ষা নিলে এমনই ফলাফল হবে বলে আমার বিশ্বাস। কেবলমাত্র এই পরীক্ষাটির জন্যে গ্রেড সিস্টেমের বদলে মার্ক সিস্টেম পুনঃপ্রবর্তন করা যেতে পারে। এই মার্কের ব্যবধান দিয়ে ভালো মন্দের নিকষ পার্থক্যকরণ সম্ভব না হলেও একেবারে পার্থক্য নিরূপন করা যাবে না তেমনটি নয়। উচ্চ শিক্ষা প্রবেশাধিকারে তাদের তো ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবেই; সেখানে তারা তাদের মেধা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের সাক্ষর অবশ্যই রাখবে।  

এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা ফেইসবুক ছেড়ে শিক্ষার জগতে প্রত্যাবর্তন করবে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েই আগের মতো পরীক্ষা দিতে পারবে, করোনার হ্রাস-বৃদ্ধি তাদের ক্ষতির সম্ভবনা পূর্ববত থাকবে। শিক্ষকরা পরীক্ষার খাতা ও টেবুলেশনের মাধ্যমে অন্ততঃ কিছু আয় উপার্জন করতে পারবেন। ফেরিওয়ালা ও ফুটপাতের দোকানী না হলেও কিছুদিন চলবে। শিক্ষার্থীরা ভর্তির জন্যে সেই আগের মতো ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিবে। 
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষতঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জানে বেঁচে যাবে, জানে বাঁচবে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, তাদের বাড়ীওয়ালার বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাত। পল্লী ও শহরাঞ্চলে কিছু নতুন কর্মসংস্থানের জন্ম হবে। করোনার দৌরাত্ম এড়িয়ে সুস্থ্যতা নিয়েও পরীক্ষা দেয়া-নেয়া সম্ভব হবে বলে আমি মনে করছি। 

অন্য দৃষ্টিকোন থেকে বিষয়টা দেখা যায়। আমাদের দেশে লাখে লাখে নয় কোটি কোটি মানুষ এখন ঘরে বসে নাই  এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে বাইরে পরস্পরের সান্নিধ্যে আসছে না তাও নয়। বহু বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাদেরকে ঘরে রাখা যাচ্ছে না। তারা প্রতিনিয়ত জনারণ্য সৃষ্টি করছে। আমাদের তরুন সমাজকে এমন অবস্থায় নিপতিত করা অবাঞ্চিত বলে শিক্ষা কার্যক্রম ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়েছে। বিকল্প বহু থাকতে পারে তবে করোনার সম্প্রসারন এড়িয়ে উপরে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। এটা করলে ব্যবহারিক পরীক্ষা বিঘিœত হবে। তার বিকল্পও ইতোমধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বের করেছে। তবে কলা ও বাণিজ্যের শিক্ষার্থীদের জন্যে এটা কোন বাধা নয়। আশা করি আমার অযাচিত পরামর্শটি বিবেচনা করে কেউ কেউ দেখতে পারেন। চরম বিকল্প হিসেবে মাধ্যমিকের ফলাফল ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা বা গ্রেড ভিত্তিক ভর্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

ট্যাগ:

সম্পাদকীয়
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী*

সপরিবারে নির্মম হত্যার প্রায় ২৯ বছর পর এবং বিএনপির শাসনামলে ২০০৪ সালের ১৪ এপ্রিল মোতাবেক ১লা বৈশাখ ১৪১১ বঙ্গাব্দে বিবিসি বাংলা বিভাগের সকালের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি অভিধায় ভূষিত করে। ফেব্রুয়ারী মাসের ১১ তারিখ থেকে মার্চের ২২ তারিখ পর্যন্ত সারাবিশ্বের হাজার হাজার বাঙালি শ্রোতা চিঠি, ইমেইল এবং ফ্যাক্সের মাধ্যমে তাদের মতামত দিয়েছে। শ্রোতাদের মতামতের ভিত্তিতে দেখা যায় শীর্ষ ২০ জনের মধ্যে ক্রমের শেষাংশ থেকে আছেন যথাক্রমে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জিয়াউর রহমান, অতীশ দীপংকর, স্বামী বিবেকানন্দ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, বায়ান্নের ভাষা শহীদগণ, ড. অমৃত্য সেন, সত্যজিত রায়, লালন শাহ, মীর নিসার আলী তিতুমীর, রাজা রামমোহন রায়, মাওলানা ভাসানী, ঈশ্বরচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, জগদীশ চন্দ্র বসু, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, সুভাস চন্দ্র বোস, আবুল কাশেম ফজলুল হক, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচনের ভিত্তি নিয়ে কিছু সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী বা শিক্ষাবিদ, ঐতিহাসিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ যেসব মন্তব্য করেছেন বিবিসি তাদের প্রচারে ঐসব বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের মন্তব্য তুলে ধরেছেন। তাদের একজন জাপান থেকে মনিকা রশিদ বলেছেন, ‘আজ আমরা সারাবিশ্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যে যেখানেই বসে যা কিছু করছি যা বলছি তার কোনটাই সম্ভব হতো না যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমাদের ইতিহাসের সবচে প্রয়োজনীয় সময়টাতে না পেতাম। তিনিই বাঙালি জাতিকে প্রথম বোঝাতে সক্ষম হন যে, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সর্বোপরি বাঙালি জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইলে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে হবে। মৃত্যুভয় বা ক্ষমতার লোভ কোনও কিছুই তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী মনোভাবকে দমিয়ে দিতে পারেনি। ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রণী এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপায়ণ করেন। তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ মন্ত্রের মতো সমগ্র বাঙালি জাতিকে পৃথিবীর একটি সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে খালি হাতে লড়াইয়ে নামতে এবং সেই লড়াইয়ে জিততে উদ্বুদ্ধ করেছিল।’

তার সাথে কন্ঠ মিলিয়ে ঢাকা থেকে শহিদুল হক ‘মুজিবের ৭ মার্চের কন্ঠস্বরকে ঐশী কন্ঠস্বর’ বলেছেন এবং তার ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সাত কোটি মানুষকে ঐদিন একসূত্রে গেঁথেছিলেন। এই একই সূত্রে গাঁথা ‘মানুষগুলোর পরিচয় না মুসলমান, না হিন্দু, না বৌদ্ধ, না খ্রীষ্ঠান- তারা সবাই ছিলেন বাঙালী।’ বৃটেনের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিনাত হুদা। জিনাত হুদা আরও বললেন বাঙালি জাতির স্বপ্ন, আকাঙ্খা, সংগ্রাম আর সফলতার রূপকার হচ্ছেন শেখ মুজিব। এই জাতির ‘ভিত্তি হচ্ছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি। মুজিব তার অসাধারন নেতৃত্বে আবহমান শাশ্বত বাঙালির সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেন ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ‘মুজিব, তাঁর অসাধারন প্রজ্ঞা, মেধা, ত্যাগ, অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এই (স্বপ্ন) আকাঙ্খাকে রূপায়িত করেছেন।’

প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন ‘আমি তার নেতৃত্বের তিনটি বড় গুন দেখি। প্রথমত, তিনি অত্যন্ত সাহসী ছিলেন, দৃঢ়চেতা ছিলেন এবং আপোষহীন ছিলেন, যার অভাব আমরা আমাদের দেশের নেতত্বে বারবার দেখেছি। অন্যরা আপোষ করে ফেলেন, ক্লান্ত হয়ে যান এবং ঐভাবে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যান না। দ্বিতীয়ত, যে বৈশিষ্ট্য আমরা দেখেছি তার নেতৃত্বে সেটা হলো এই যে, তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রধান দ্বন্দ্ব কি সেটাকে খুব সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তৃতীয়ত হচ্ছে যে, ব্যক্তি হিসেবে তার মধ্যে অসাধারন গুণ ছিল, তার আকর্ষনী শক্তি ছিল যাকে ক্যারিশমা বলে, তিনি জনগণকে বুঝতেন, জনগণের সঙ্গে মিশতে পারতেন, তাদের ভাষা জানতেন, তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন। কাজেই আমরা তার মধ্যে দেখবো যে তার মধ্যে বীরত্ব ছিল এবং নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা ছিল যার একটা সমন্বয় ঘটেছিল একটি অসাধারন চরিত্রে।

রাজনৈতিক কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়িত করতে হেনরী কিসিঞ্জারকে টেনে আনেন যিনি বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির সাথে তুলনা করলেও বঙ্গবন্ধুকে বলেছেন ‘ইউ হ্যাভ ডিফাইড হিস্ট্রি’। এ ব্যাপারে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দ্বিমত পোষণ করলেও তিনি মনে করেন ‘বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সত্তার যে উদার্য উদ্ভব সেটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে অনুঘটক নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছিলেন। আনোয়ার হোসেনও কিসিঞ্জারের উপলব্ধির সমালোচনা করেছেন। শেষকালে কামাল হোসেন, আনোয়ার হোসেনের সাথে সহমত পোষণ করেন এবং কিসিঞ্জারের অজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কামাল হোসেন বলেন ‘সেই পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেন। বাংলাদেশের ধারনা তার মধ্যেই সৃষ্টি হয়ে এসেছে। তার একটা দূর লক্ষ্য সামনে ছিল। সেই দূর লক্ষ্যটাকে সামনে এনে জনগণকে অনুসারী তৈরী করেছিল এবং জনগনের ভাবনা চেতনা অভিলক্ষ্য স্বপ্ন তিনি ধারণ করতে পেরেছিলেন। তিনি সেই ১৯৫৯ সালে তার লক্ষার্জনের সময়সীমা দশ বছরে বেঁধে দিয়ে ৬ দফা দিলেন আর ৬৯ এর আন্দোলনে হলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বা আনোয়ার হোসেনের মতে পপলিষ্ট লিডার।

আতাউস সামাদ এর বক্তব্যে দেখা যায় “শেখ সাহেব সাহস করে ছয় দফা ঘোষণা করেন, তাও করলেন তিনি লাহোরে। পশ্চিম পাকিস্তানে একটি সম্মেলনে গিয়ে তিনি এই ছয় দফা ঘোষণা করলেন। যার ফলে ওনাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে যে মামলাটি হয় তাতে এক নম্বর আসামি করা হলো। তারপর ওনাকে ছাড়ানোর জন্য আন্দোলন হলো যেটা ছাত্রদের ১১ দফায় রূপ নিল। এবং ওইখান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরই তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হলো। ১৯৭০- এর নির্বাচনে শেখ মুজিব তার নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টিকে মূল বক্তব্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

সাংবাদিক আতাউস সামাদ আরও বলেন উনি নির্বাচনী যে প্রচারগুলো করেছেন তার অনেকগুলো জায়গায় আমি তার সঙ্গে গিয়েছি। উনি সবখানেই ছয় দফার কথা বলতেন এবং ছয় দফা না হলে একটা আঙুল তুলে বলতেন আমার দাবি এই’ অর্থাৎ দেশ স্বাধীন করতে হবে। সর্বোপরি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি এমন একটা বক্তৃতা দিলেন যা সবার মন ছুয়ে গেল, সবাই ওনার নির্দেশ মানতে লাগলো এবং ওনার নামেই স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে।’

তিনি ভাষা আন্দোলনে সূচনা লগ্নে ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনের একটা যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে ভাষা ভিত্তিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এদিক দিয়ে এই অঞ্চলে তো বটেই বিশ্বে তিনি একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব।

তিনি সকল ধর্মীয় সত্ত্বাকে একত্রিত এবং সমন্বিত করে একটি অভিন্ন জাতিসত্ত্বায় রূপান্তর ঘটান। এমনকি শোষনহীন, বৈষম্যহীন এক সমাজ ব্যবস্থার ছক আঁকেন।

তিনি একটি সমাজে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলন এবং পরিশেষে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তর ঘটান এবং চূড়ান্ত ফল স্বপক্ষে নিয়ে আসতে সক্ষম হোন। তিনি ছিলেন প্রতিহিংসা বিবর্জিত, মানবতাবাদী ও শান্তি প্রিয় নেতা। তাই বিশ্ব শান্তি পরিষদ তাকে জুলিও কুরি পুরস্কার প্রদান করেন। তবে শান্তির পথে তার অবদানের জন্যে তিনি পেতে পারতেন নোবেল শান্তি পুরস্কার। বিশ্ব শান্তি পরিষদ সর্বাগ্রে পদক্ষেপ না নিলে তিনিই হতেন একমাত্র বাঙালি রাজনীতিবিদ যিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হতেন।

এ’সবের মানে হচ্ছে বঙ্গবন্ধু বাঙালির ব্যক্তিক পরিচিতি ও স্বাতন্ত্রবোধের জনক। তিনিই বাঙালি জাতিকে প্রথম বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে বাংলাদেশের সংস্কৃতি সর্বোপরি বাঙালি জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীন হতে হবে এই দুরুহ লক্ষার্জনে। 

তার আগে কেউ বাঙালিকে একই সূত্রে গেঁথে নিতে পারেননি-  এ’কাজ আর কেউ কোনদিন করতে পারবে বলে আমি অন্ততঃ বিশ্বাসী নই। আমার সাথে কন্ঠ মিলিয়েছেন অলি আহাদ, তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মতো ব্যাডা এই মুলুকে জন্ম নেয়নি, আর কোনদিন জন্ম নেবেওনা।’ ওলি আহাদ এ’কথা যখন বলেন তখন তার তথাকথিত জাতীয়তাবাদীদের কন্ঠে ভিন্ন কথা, বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার জঘন্য প্রয়াস বিংশ শতাব্দী শেষপাদে বললেও আর বিবিসি কর্তৃক ২০০৪ সালে একটি সর্বসম্মত অভিধা দিলেও আমাদের অবিমূশ্যকারিতা বা অজ্ঞতা আমাদের মন ও মনন চেপে বসে আছে? আমি অনেক রাজনৈতিক নেতাকে বলতে শুনেছি ‘কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’ অথচ তারা ছাত্র জীবন থেকেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে অস্বীকার করে আসছিলেন। এ’সব নেতার অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে শতাব্দীর মহানায়ক কিংবা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতা বলে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিতে শুনেছি। তারা যখন এ’সব কথা বলছিলেন তখন আমাদের মতো কলাম লেখক, গবেষক ও বঙ্গবন্ধু প্রেমিক বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী হিসাবে চিহ্নিত করে আসছিলেন। শুধু লেখায় নয়, একবার জাতীয় যাদুঘরে এক বক্তব্যে আমি বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলে অভিহিত করলাম। সেটাও নব্বই দশকের প্রথম ভাগের কথা। যাদুঘর থেকে বের হবার সাথে সাথে এক ব্যক্তি আমার পিছু নিলেন। তিনি আমাকে থামিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনিতো বললেন বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, তাহলে নেতাজী সুভাস বোস বা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের স্থান কোথায়? আমি বললাম,“রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন কবি, দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তাই তার সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে তুলনা না করে রাজনীতিবিদের সাথে রাজনীতিবিদের তুলনা করতে গেলে নিঃসন্দেহে নেতাজী সুভাস বোস এর সাথে বঙ্গবন্ধুর তুলনা চলে আসে’। ‘সুভাস বোস বাঙালীর চেয়ে ভারতবাসীর মুক্তির আন্দোলন করেছেন এবং সশস্ত্র পন্থায় ভারতকে স্বাধীন করতে প্রয়াসী ছিলেন। কিন্তু তার প্রয়াসের অন্তিম ফলটা কি ?

‘১৯৪৭ সালে অখন্ড ভারত বিভক্ত হয়েছে, স্বাধীন হয়নি। ভারত বিভক্তিতে বাঙালিদের পরাধীনতার জিঞ্জির আবার নতুন করে পরতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এ কারনেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি যিনি বাঙালিদের মনে ও চেতনায় স্বাধীনতার স্পৃহা জাগিয়ে ক্ষান্ত হননি তিলে তিলে তিলোত্তমা গড়ার সংগ্রাম ও লড়াইয়ের মাধ্যমে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের জন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তদুপরি তিনি এমন একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন যার পরিচিতি ভৌগোলিক সীমারেখায় শুধু আবদ্ধ নয়; তার আদর্শিক ভিত্তি হচ্ছে মানবিক, গণতান্ত্রিক সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।’ আমার সেদিনের কথায় ভদ্রলোক সন্তুষ্ট হতে পেরেছিলেন কিনা আমার বোধে আসেনি। হয়তো তাকে আর বেশ ক’টি বছর অপেক্ষায় থেকে বিবিসির ভাষ্যকারের মুখে শুনতে হয়েছিল “বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী”। বিবিসির জরিপ শেষে তিনি আমার কথাটি মেনে নিয়েছিলেন না জাতীয়তাবাদী আঁতেলদের মতই কাঁধ দিয়ে ঠেলে বলে যাচ্ছিলেন যে শেখ মুজিব কিসের বঙ্গবন্ধু, কিসের জাতির পিতা, কিসের শতাব্দী মহানায়ক বা শ্রেষ্ঠ নেতা।

বিবিসি’র জরিপে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু পরিবারে জীবিত দু’সদস্য, দু’কন্যা জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা জরিপে অংশগ্রহণকারী সকল শ্রোতা এবং বিশ্বের সকল বাঙালির প্রতি অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

শেখ হাসিনা ১লা বৈশাখ বিবিসিতে জরিপের ফলাফল প্রচারের পরপরই এক বিবৃতিতে বলেন, সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতি দেয়ার গৌরব সমগ্র বাঙালি জাতির। শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে তার নিজস্ব ভাষা ছিল, কৃষ্টি ছিল, ঐতিহ্য ছিল। ছিল না একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, বীরের জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে নিজস্ব পরিচিতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালিকে দিয়েছিলেন জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। এখানেই বঙ্গবন্ধুর সার্থকতা, তার শ্রেষ্ঠত্ব।

তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধারণ করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্বপ্নকে। বাস্তবায়িত করেছিলেন তিতুমীর, সূর্যসেন, নেতা সুভাস বসু, শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীসহ মুক্তিকামী বাঙালির আকাঙ্খাকে। তাঁর নেতৃত্বেই পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গেছিল বাঙালি জাতি।

তারপর থেকে আমার মনে হয় না শেখ হাসিনা কখনও তাকে শতাব্দীর মহান নেতা কিংবা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতা বলেছেন। অথচ তারই সাথে একই মঞ্চে উপবিষ্টরা তাকে কখনও শতাব্দীর নেতা, সহস্রাব্দের নেতা নির্দ্বিধায় বলে যাচ্ছেন; নেত্রী ভাষনে বলছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, আর সঞ্চালক বলছেন ‘শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ নেতা’, বাংলাদেশ বেতার হয়তো বলছে ‘বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা’ আর টেলিভিশনে বলছে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ নেতা’। এক ঐতিহাসিক তাকে বঙ্গবন্ধু বলতে কুণ্ঠিত, আর একজন বলছেন তিনি বঙ্গবন্ধু ও শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ নেতা। এক উপাচার্য সেই ১৯৯৪ সাল থেকে তাকে পরিচয় করিয়ে আসছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে আর এক উপাচার্য বলছেন তিনি শতাব্দীর মহান নেতা। এক বুদ্ধিজীবি বলছেন তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি আর একজন বলছেন সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের আপন স্বার্থে তাঁকে এই অভিধায় অভিহিত করছেন যা মুষ্টিমেয় বাঙালীর মন্তব্য নির্ভর। কেউ বলছেন কলকাতা বা ভারতের বাঙালিদের মতামতে তাকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে অভিহিত করেছে, এটা সম্ভব কেমন করে হোল? তারা কি বিচার বিশ্লেষন ভুলে তা করেছেন? তারা নেতাজী আর বঙ্গবন্ধুর ফারাকটা বুঝেছেন। বাংলাদেশী এক আঁতেল বলেছেন, বঙ্গবন্ধু ক্রিকেট স্টেডিয়ামের কারনেই শেখ মুজিবের নাম সামনে এসে গেছেন, তাই তদানিন্তন সরকারকে দিয়ে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের স্থানান্তর সহ নাম বিভ্রাট সৃষ্টি করেছে। এ’সব বিতর্ক শুধুমাত্র বেকার মস্তিষ্কের বৃথা আস্ফালন, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাহীনতা ও বিভ্রান্তির সূতিকাগার। তাই আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধুকে আমরা জাতির পিতা বলতে পারি, স্বাধীনতার মহান স্থপতি বলতে পারি, কিন্তু তাকে একই সাথে শতাব্দীর মহান নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি আর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বলতে পারিনা।

তিনিই বাঙালিদের এমন এক রাষ্ট্র উপহার দিলেন যার ভিত্তি হচ্ছে সত্যতা, সমতা ও মানবিকতা। নিশ্চয়ই বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত করতে ন’মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রয়োজন হয়েছিল কিন্তু তার আদর্শিক ভিত্তি তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র বাঙালির উপলব্ধি ও চেতনায় প্রথিতকরণে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার প্রয়োজন ছিল। ন’মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের বহু কারণ রয়েছে। অন্যতম কারন হচ্ছে বাঙালির নির্ভুল উপলব্ধি যে পাকিস্তান কাঠামোতে তাদের বহু কাঙ্খিত ও লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন অসম্ভব।

স্বাধীনতা ও মুক্তি বাঙালির বাঞ্চিত ও কাঙ্খিত হলেও বঙ্গবন্ধুর লক্ষাভিমুখী ও কৌশলী নেতৃত্বই এটাকে বাস্তবায়িত করেছে। পাকিস্তান অর্জনের আগেও বাঙালির দেশ বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রচেষ্টা দৃশ্যমান ছিল কিন্তু বহুমুখী চক্রান্তের কারণে তা ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট অলীক স্বপ্ন বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তা প্রসারের উদ্দেশ্যমূলক পরিস্থিতি উন্মোচন হতে থাকে। ১৯৪৮ সালে ক্ষীণভাবে এবং ১৯৫২ সালে সরবে স্বায়ত্বশাসন বা স্বাধিকারের দাবী উচ্চারিত হয়। ১৯৫৪ সালে নির্বাচন পরবর্তী বাস্তবতার আলোকে ১৯৬১ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আহ্বানসহ একটি লিফলেট বিলি করেন। ১৯৬১ সালেই সমমনা রাজনীতিবিদদের কাছে এই ব্যাপারে সহায়তা কামনা করেন। নিয়মতান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতার কৌশল হিসাবে ৬ দফাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান ভিত্তিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে স্বাধীনতার দাবীকে সর্বজনীন করেন, যা পাকিস্তানীরা প্রতিহত করলে অনিবার্য মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ হিসেবে ১৯৭১ সালে যৌক্তিক পরিণতি লাভ করে।      

এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনেকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও শেখ মুজিবের অনন্য নেতৃত্বই বাঙালির আশা-আকাঙ্খাকে সর্বাধিক ব্যঙ্গময় করে তোলে। নিজের আকাঙ্খা ও আকুতিকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে ৫৪ হাজার বর্গমাইল ভূখন্ডের সকল মানুষের সাধারণ আকাঙ্খা ও আকুতিতে পরিণত করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণায়। জীবনের পথ চলতে তিনি কারো কাছে ছিলেন খোকা মিয়া, কারো কাছে মুজিব, কারো কাছে মুজিব ভাই, কারো কাছে স্রেফ শেখ সাহেব। এই শেখ সাহেবই ৬ দফা পেশের পর বঙ্গশার্দুল হিসাবে পরিচিতি পেলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী হিসাবে মৃত্যুর দোর গোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। এই মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে ১৯৬৯ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত হলেন আর ১৯৭১ সালে তিনি হলেন জাতির পিতা। ২০০৪ সালে বিবিসি পরিচালিত শ্রোতা জরিপে তিনি নির্বাচিত হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিতে।

তাই, আমাদের উচিত হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তাকে শুধুমাত্র সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে অভিহিত করা, ভুলেও তাকে শতাব্দীর মহানায়ক বা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি না বলা। তাতে নতুন প্রজন্ম বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর ইতিহাস থেকে মুক্ত হবে এবং ভবিষ্যতে ইতিহাস বিকৃতির উৎসমুখ নির্বাসিত হবে।

 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

সহায়ক গ্রন্থঃ শেখ মুজিব থেকে জাতির পিতা; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে কিছু ঘটনা ও রটনা।’ শেখ রেহানা সম্পাদিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

 

ট্যাগ: