banglanewspaper

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘পাপিয়ার পরিচয় যা-ই হোক, তার পাপের বিচার হবে। অপরাধী অপরাধ করে পার পায় না, এটা আমরা প্রমাণ করেছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া আছে, যেখানে অপরাধীকে পাবে, আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

আজ সোমবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে গত পরশু রাজধানী থেকে আটক নরসিংদী যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়াকে নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ওবায়দুল কাদের এ কথা বলেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তাঁর (পাপিয়া) বিরুদ্ধে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দল থেকে তাঁকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ধরনের যদি আরো অপরাধী থাকে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। আমাদের সরকার অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয় না।’

পাপিয়ার অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে কিনা জানতে চাওয়া হলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কেউ রেহাই পাবে না। এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত সবাইকেই আইনের আওতায় আনা হবে এবং আদালত স্বাধীনভাবে তাদের বিচার করবে।’

এ ঘটনা সরকার জানত কিনা প্রশ্ন করা হলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যখনই জেনেছি, তখনই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকার আগে থেকে জানত না।’

গত শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে নয়াদিল্লি যাওয়ার সময় বহির্গমন গেট থেকে পাপিয়ার স্বামী মফিজুর রহমান (৩৮) ও ব্যক্তিগত সহকারী সাব্বির খন্দকারকে (২৯) গ্রেপ্তার করা হয়। এর পরে তাঁদের তথ্যমতে, হোটেল ওয়েস্টিন থেকে পাপিয়া ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী শেখ তায়্যিবাকে (২২) গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে জানান, হোটেল ওয়েস্টিনের ২১ তলার প্রেসিডেন্ট কক্ষটি গত নভেম্বরে ভাড়া নেন পাপিয়া। তিনি গত তিন মাসে ওই কক্ষের ভাড়া পরিশোধ করেছেন প্রায় ৮৮ লাখ টাকা। ১৯ তলায় একটি বার রয়েছে, যেটি তিনি পুরোটাই বুক করে নিতেন। সেখানে প্রতিদিন তিনি আড়াই লাখ টাকা মদের বিল পরিশোধ করতেন। সব মিলিয়ে দেখা যায়, গত তিন মাসে তিনি প্রায় তিন কোটি টাকা বিল পরিশোধ করেছেন হোটেল কর্তৃপক্ষকে।

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক বলেন, “পাপিয়ার আয়কর ফাইল তলব করে দেখা গেছে, সেখানে তিনি বছরে ২২ লাখ টাকা আয় দেখিয়েছেন। অথচ তাঁর প্রতিদিন বারের বিলই আসে আড়াই লাখ টাকা। এত টাকার উৎস কোথায়? জানতে চাইলে পাপিয়া র‌্যাবকে জানিয়েছেন, যাঁরা হোটেলে আসতেন, তাঁদের কাছে মেয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এরপর অশ্লীল ভিডিও তুলে ওই সব ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হতো। লোকলজ্জার ভয়ে কেউ মুখ খুলত না। এ রকম সাতজন উঠতি বয়সী তরুণীর সঙ্গে র‌্যাবের কথা বলা সম্ভব হয়েছে। যাঁদের মাসে ৩০ হাজার টাকা করে দিতেন পাপিয়া। বিনিময়ে তাঁদের ব্যবহার করা হতো। কেউ রাজি না হলে তাঁদের লাঠি দিয়ে পেটাতেন পাপিয়া। আবার কোনো কোনো মেয়ের আপত্তিকর ছবি ‘বড়লোক কাস্টমারদের’ মুঠোফোনে পাঠিয়ে দিয়ে আগ্রহ তৈরি করতেন। এরপর ওই লোকগুলো এলে তাঁদের জিম্মি করা হতো।”

শাফী উল্লাহ বুলবুল আরো বলেন, “পাপিয়া পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তেজগাঁও এফডিসি গেটসংলগ্ন এলাকায় অংশীদারত্বে তাঁর একটি ‘কার এক্সচেঞ্জ’ নামক গাড়ির শোরুম আছে। এ ছাড়া নরসিংদী জেলায় তাঁর ‘কেএমসি কার ওয়াশ অ্যান্ড অটো সলিউশন’ নামে একটি গাড়ি সার্ভিসিং সেন্টার আছে। এসব ব্যবসার আড়ালে তিনি অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি সমাজসেবার নামে নরসিংদী এলাকায় অসহায় নারীদের আর্থিক সহযোগিতার নামে তাঁদের অনৈতিক কাজে লিপ্ত করতেন। বছরের অধিকাংশ সময় তিনি নরসিংদী ও রাজধানীর বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করেন। নরসিংদী এলাকায় চাঁদাবাজির জন্য তাঁর একটি ক্যাডার বাহিনী আছে। এ ছাড়া তাঁর স্বামীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি নরসিংদী ও ঢাকায় একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লটসহ বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন। গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কাছ থেকে জাল টাকা, ডলারসহ প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।’

পরদিন রোববার দুপুরে পাপিয়ার ফার্মগেটের বাসা থেকে অস্ত্র, মদসহ বিপুল অবৈধ টাকা উদ্ধার করে র‍্যাব। পরে বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে
এক সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, ‘আজ দুপুরে রাজধানীর ফার্মগেটে পাপিয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০টি পিস্তলের গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ ও নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘রাজধানীর গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে প্রেসিডেন্ট স্যুট নিজের নামে সব সময় বুক করে নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন পাপিয়া। যিনি হোটেলটির বারে বিলবাবদ প্রতিদিন পরিশোধ করতেন আড়াই লাখ টাকা। এ ছাড়া নারীদের দিয়ে অবৈধ কাজ করাতেন। যাদের মাসিক আট হাজার থেকে  ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হতো। এ ছাড়া পাপিয়ার কথা কেউ না শুনলে তাদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে নির্যাতন করা হতো।’

জাল টাকার মামলায় গ্রেপ্তার শামীমা নূর পাপিয়াসহ চারজনকে ১০ দিন করে রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশ। আজ সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ উর রহমানের আদালতে এ রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) মাহমুদুর রহমান।

ট্যাগ: bdnewshour24 ওবায়দুল কাদের