banglanewspaper

করোনা ভাইরাস পৃথিবীজুড়ে অদ্ভুত এক আঁধারের ছায়া নিয়ে এসেছে। চারিদিক নিরব, নিস্তব্ধ। কেউ কারও সাথে মিশছে না বা চাইছে না। যেন সবাই সবাইকে এড়িয়ে যেতে পারলেই বাঁচে। ‘বিশ্ব গ্রাম’ ধারণায় মানুষ অনেক বছর ধরেই একাকি জীবনের অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল। কিন্তু এতটা একাকি হয়তো তারা কখনোই হয়নি। যে চাইলেও তারা একে অন্যের সাথে দেখা করতে পারবে না। সবাই যেন এক যুদ্ধ কেন্দ্রীক জরুরি অবস্থায় রয়েছে।



এক করোনা ভাইরাস পুরো বিশ্বকেই যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে। অধিকাংশ দেশেই রাস্তা-ঘাট, অফিস-আদালত, শপিংমল-মার্কেট, রেস্তোরাঁ-বার ফাঁকা। যেন সব ভূতুড়ে নগরী, যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা চলছে। সবার মধ্যে ভয়, আতঙ্ক আর আশঙ্কা।

চীনের পর করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বিপর্যস্ত দেশ হলো ইতালি। সেখানকার এক ডাক্তার তার দেশের নাগরিকদের উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। সেটি হুবহু তুলে ধরা হলো-  

“আমি লিভোর্নো হাসপাতালের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ভালেন্তিনা বাতিনি বলছি। করোনা মহামারির এই যুদ্ধের দিনগুলোতে আমাদেরকে ‘বীর’ বলা বন্ধ করুন। আমাদেরকে ধন্যবাদ দেয়া বন্ধ করুন। হাসপাতালের বাইরে আমাদের প্রশংসা সম্বলিত প্লাকার্ড নিয়ে অবস্থানও বন্ধ করুন। আমরা কিন্ত ওই মানুষগুলোই, যাদেরকে সারা বছর আক্রমণাত্মক সুরে কথা বলেন আপনারা। দ্রুত রোগী না দেখার সব দোষ যেন আমাদের।” 

ডাক্তার লিখেছেন, “চিকিৎসা এবং ওষুধে আপনাদের আত্মীয় স্বজনরা নাকি সুস্থ হন না। হবেনই বা কেন? চল্লিশ বছর ধরে ধূমপান করার পর তাদের শ্বাসকষ্ট হবে এটাই তো স্বাভাবিক। আপনারা সামান্য হাতের নখে একটু ব্যাথা পেলেই হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে এসে চিৎকার চেঁচামেচি করেন। ফ্রি চিকিৎসা নেন, আবার দ্রুত সময়ে সর্বোচ্চ সেবা পেতে হৈচৈ করেন।” 

তিনি আরও লিখেছেন, “মনে রাখবেন, আমরা কিন্ত ওই মানুষগুলোই, যাদেরকে আপনারা সুযোগ পেলেই যখন তখন হুমকি ধমকি দিয়ে থাকেন। এতোকিছুর পরও আমরা সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করি, এখনও করছি এবং  ভবিষ্যতেও করে যাবো। তাই দয়া করে আমাদেরকে ‘বীর’ বলা বন্ধ করুন। দুই মাস আগে আমরা যেমন ছিলাম এখনও তেমনই আছি। বছরের পর বছর ধরে বদলে গিয়েছেন আপনারাই।” সূত্র: লা রিপাবলিকা।

এদিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ্পে কন্তে’র দেহরক্ষীদের একজন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী পুরোপুরি সুস্থ আছেন বলে জানানো হয়েছে।

ইতালির হাসপাতালগুলোর জন্য মিশর থেকে ১৫ লাখ এবং ভারত থেকে ৪০ হাজার সেফটি মাস্ক নিয়ে পৃথক দু’টি উড়োজাহাজ শনিবার ইতালিতে এসেছে। অর্ডারকৃত আরও ১৫ লাখ সেফটি মাস্ক, ১০০ ভেন্টিলেটর মেশিন সহ অন্যান্য সরঞ্জামাদির জন্য ইতালিয়ান বিমানবাহিনীর একটি ফ্লাইট চীনের পথে রয়েছে।



ইতালির প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর জিউসেপ্পে কন্তে শনিবার মধ্যরাতে নতুন করে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে করোনা মহামারীতে সমগ্র দেশে চলমান জরুরী অবস্থা ও রেড জোন নিষেধাজ্ঞায় আরো কঠোরতা আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচাইতে কঠিন সংকটকাল পার করছি আমরা। দেশের নাগরিকদের মৃত্যুর সংবাদ প্রতিদিন আমাদের বেদনা বাড়াচ্ছে। স্বজন-প্রিয়জন হারাচ্ছেন অনেকেই।”

খাদ্যদ্রব্য এবং ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ব্যতীত সব ধরনের উৎপাদন কার্যক্রম সারা দেশে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, “দেশজুড়ে আমরা উৎপাদনের চাকা মন্থর করছি তবে বন্ধ করে দিচ্ছি না। সুপার মার্কেট, গ্রোসারি স্টোর, ফার্মেসি, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, ইনসুরেন্স কোম্পানি ছাড়া সবকিছু বন্ধ থাকবে যথারীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জরুরী কেনাকাটার জন্য দৌড়ঝাপ করে লাইন ধরার কোন প্রয়োজন নেই। গণপরিবহন চালু থাকবে। বিভিন্ন সেক্টরে ‘স্মার্ট ওয়ার্কিং’ এর মাধ্যমে অনলাইন কার্যক্রম চলবে।

প্রফেসর কন্তে আরো বলেন, “লাইফস্টাইল বদলে ফেলে ঘরে থাকতে বাধ্য হওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। এর বিকল্প কিছু নেই আমাদের হাতে। এই মুহূর্তে আমাদের টিকে থাকতে হবে। স্বাস্থ্যখাতে চলমান জরুরী অবস্থার পর আমরা মোকাবিলা করবো অর্থনৈতিক জরুরী অবস্থা। রাষ্ট্র এবং সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের পাশে থাকবে। মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়াতে যা করার সবই করবো আমরা। আজকের আত্মত্যাগ, আমাদের আগামীর সুন্দর পথচলা প্রশস্ত করবে। আমরা পারবো, কারণ আমরা দেশকে ভালোবাসি। ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা সফল হবোই।”

অন্যদিকে ইতালির জাতীয় নাগরিক সুরক্ষা প্রধান আঞ্জেলো বোরেল্লি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে নতুন ৭৯৩ জনসহ দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা ৪ হাজার ৮২৫ জন। নতুন করে ৬ হাজার ৫৫৭ জনসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৫৭৮ জন। এছাড়া দেশটিতে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬ হাজার ৭২ জন।



ইতালিতে বর্তমানে ৪২ হাজার ৬৮১ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৯ হাজার ৮২৪ জনের অবস্থা সাধারণ (স্থিতিশীল অথবা উন্নতির দিকে) এবং বাকি ২ হাজার ৮৫৭ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আক্রান্তের অনুপাতে মৃত্যুর হার ৪৪ শতাংশ এবং সুস্থতার হার ৫৬ শতাংশ।

এর ফলে পুরো দেশের জনগণ আতংকিত। সীমিত করা হয়েছে আগের চলাচল একই সঙ্গে সরকার বৃদ্ধি করেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এরইমধ্যে আরও সীমিত করা হয় পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা।

এছাড়া করোনা ভাইরাসে বিশ্বজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩২ হাজার ১২৮ জনসহ মোট আক্রান্ত হয়েছে ৩ লাখ ৭ হাজার ৭২৫ জন। এর মধ্যে ৯৫ হাজার ৭৯৭ জন সুস্থ হয়েছে বাড়ি ফিরেছেন। চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ৮১ হাজার ৫৪ জন। এছাড়া চীনের বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ২৬ হাজার ৬৭১ জন। 

এ ভাইরাসে গত ২৪ ঘণ্টায় বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ৬৬৭ জনসহ মৃত্যু হয়েছে ১৩ হাজার ৫৪ জনের। এর মধ্যে চীনে মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ২৬১। চীনের বাইরে মারা গেছে ৯ হাজার ৭৯৩ জন।



বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৭৪ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৪ জনের অবস্থা সাধারণ (স্থিতিশীল অথবা উন্নতির দিকে) এবং বাকি ৯ হাজার ৩০০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আক্রান্তের অনুপাতে মৃত্যুর হার ১২ শতাংশ এবং সুস্থতার হার ৮৮ শতাংশ।

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন জানায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ৬ জনসহ মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩ হাজার ২৬১ জন। নতুন ৪৬ জনসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮১ হাজার ৫৪ জন। এছাড়া চীনে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭২ হাজার ৪৪০ জন। 

চীনে বর্তমানে ৫ হাজার ৩৫৩ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৫০৮ জনের অবস্থা সাধারণ (স্থিতিশীল অথবা উন্নতির দিকে) এবং বাকি ১ হাজার ৮৪৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আক্রান্তের অনুপাতে মৃত্যুর হার ৪ শতাংশ এবং সুস্থতার হার ৯৬ শতাংশ।

ইউরোপিয় ইউনিয়নে ইতালির পর করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে স্পেন। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে নতুন ২৮৫ জনসহ মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৩৭৮ জন। নতুন করে ৩ হাজার ৯২৫ জনসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯৬ জন। এছাড়া দেশটিতে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ১২৫ জন। দেশটির জাতীয় নাগরিক সুরক্ষা প্রধান এসব তথ্য জানান।



স্পেনে বর্তমানে ২১ হাজার ৯৯৩ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০ হাজার ৩৮১ জনের অবস্থা সাধারণ (স্থিতিশীল অথবা উন্নতির দিকে) এবং বাকি ১ হাজার ৬১২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আক্রান্তের অনুপাতে মৃত্যুর হার ৩৯ শতাংশ এবং সুস্থতার হার ৬১ শতাংশ।

ইউরোপে ইতালি ও স্পেনের পর করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে ফ্রান্স। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে নতুন ১১২ জনসহ মৃত্যুর সংখ্যা ৫৬২ জন। নতুন করে ১ হাজার ৮৪৭ জনসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৫৯ জন। এছাড়া দেশটিতে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৫৮৭ জন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানিয়েছে। 

ফ্রান্সে বর্তমানে ১২ হাজার ৩১০ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৭৮৫ জনের অবস্থা সাধারণ (স্থিতিশীল অথবা উন্নতির দিকে) এবং বাকি ১ হাজার ৫২৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদের মধ্যে ৫২৫ জনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যাদের অর্ধেকেরই বয়স ৬০ বছরের কম। আক্রান্তের অনুপাতে মৃত্যুর হার ২৬ শতাংশ এবং সুস্থতার হার ৭৪ শতাংশ।



এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান ড. টেড্রস আধানম গেব্রেইয়সুস অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকারগুলো এই বৈশ্বিক মহামারি ঠেকাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তিনি সরকারগুলোকে নিজ নিজ দেশের করোনাভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

উহান, চীনের শিল্পোন্নত এই শহর থেকেই প্রথম করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ভাইরাসটি প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসলেও চীনের বাইরে ব্যাপক হারে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।

চীনে উদ্ভূত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১৮৮টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।

ট্যাগ: bdnewshour24 করোনা