banglanewspaper

করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় শ্বাস-প্রশ্বাসে। যখন রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকেন তখন চিকিৎসাধীন অবস্থায় একটা পর্যায়ে রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এক্ষেত্রে কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য ভেন্টিলেটার বড় ভূমিকা রাখে। অনেক সময় এই ভেন্টিলেটারের ওপরই রোগীর জীবন-মৃত্যু নির্ভর করে। কারণ এই ভেন্টিলেটারের মাধ্যমেই রোগীর ফুসফুসে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন জোগানো হয় এবং বের করে আনা হয় কার্বন ডাই অক্সাইড।

কিন্তু এই ভেন্টিলেটার সব সময় রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে না। তাই একটা পর্যায়ে আইসিইউতে থাকা ডাক্তাররা রোগীর ভেন্টিলেটার খুলে নেন। যখন কিনা ওই রোগীর বাঁচার মতো ন্যূনতম সম্ভাবনাও থাকে না। 

গোটা বিশ্বের মতো যুক্তরাজ্যও করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুতে বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। দেশটিতে প্রতিদিনই শত শত লোকের প্রাণহানি হচ্ছে। সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত হয়ে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। গোটা দেশে চলছে লকডাউন। 

এবার লন্ডনের রয়াল ফ্রি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রধান নার্স জুয়ানিতা নিত্তলা কথায় উঠে এসেছে সেই লোমহর্ষক সময়গুলো। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে কখন একজন রোগীর ভেন্টিলেটার চিকিৎসা বন্ধ করা হচ্ছে, ওই সময়ে রোগীর অনুভূতি কী হচ্ছে, ডাক্তারা কিভাবে সেই রোগীর পাশে থেকে তার শেষ ইচ্ছে পূরণ করছে- এইসব হৃদয় বিদারক গল্প শোনালেন নিত্তলা। [ads]

গত প্রায় ১৬ বছর ধরে ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় (এনএইচএস) কাজ করছেন দক্ষিণ ভারতে জন্ম নেয়া নিত্তলা। তিনি আইসিইউ স্পেশালিস্ট নার্স। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে অবস্থা বুঝে একজন রোগীর ভেন্টিলেটার বন্ধ করে দেয়াটাই তার কাজ। 

কিন্তু ৪২ বছর বয়সী নিত্তলার ভাষ্য- ‘ভেন্টিলেটার বন্ধ করে দেয়াটা খুবই মানসিক চাপের এবং কষ্টের মুহূর্ত। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় ওই ব্যক্তির মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। কারণ আমি নিজ হাতে ওই রোগীর ভেন্টিলেটার খুলে দিচ্ছি।’

এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহের ঘটনা। সেদিন শিফটে যোগ দিতেই আইসিইউ’র একজন ডাক্তার নিত্তলাকে বললেন কোভিড-১৯ এর এক রোগীর চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে। তার ভেন্টিলেটার খুলে নিতে। করোনা আক্রান্ত ৫০ বছর বয়সী ওই রোগীটি ছিলেন পেশায় একজন কমিউনিটি নার্স। নিত্তলা তখন রোগীর মেয়েকে গোটা প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানালেন। 

নিত্তলা বলেন, ‘আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে তার মায়ের কোনও কষ্ট হচ্ছে না। তিনি খুব প্রশান্তিতে আছেন। আমি জানতে চাইলাম- তার মায়ের কোনও শেষ ইচ্ছে আছে কিনা। কিংবা তিনি ধর্মীয়ভাবে কিছু চান কিনা। আইসিইউতে আমার চারপাশে যত রোগী আছে সবাই অচেতন। সবাই গুরুত্বর অসুস্থ। আমি তখন ওই রোগীর চারপাশ পর্দা দিয়ে ঘিরে দিলাম। একইসঙ্গে সব রকম অ্যালার্ম ও সতর্ক সংকেত বন্ধ করে দিলাম।’

আইসিইউতে নিত্তলা যখন মৃত্যুপথযাত্রী ওই রোগীর শেষ ইচ্ছে পূরণের আয়োজন করছিলেন তখন অন্য চিকিৎসাকর্মীরাও কয়েক মুহূর্তের জন্য কাজ বন্ধ রাখলেন। 

নিত্তলা বলেন- ‘সব নার্সরা কাজ ও কথা বন্ধ রাখলেন। রোগীর সম্মানে ও মৃত্যুর আগমুহূর্তে তাকে স্বস্তি দেয়াটাই তখন আমাদের অগ্রাধিকার। আমি রোগীর কানের কাছে ফোন ধরে ওপাশে মেয়েকে বললাম- ‘কথা বলুন’। আমার কাছে এটি হয়তো সামান্য একটি ফোন কল, কিন্তু ওই রোগীর পরিবারের কাছে এটা বিশাল এক পাওয়া।’

ওই রোগীর পরিবার চেয়েছিল ভিডিও কল করতে। কিন্তু নিত্তলা জানান, দুর্ভাগ্য যে আইসিইউর ভেতরে কোনও মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি নেই। [ads]


এবার রোগীর পরিবারের শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী, নিত্তলা কম্পিউটার থেকে একটা নির্দিষ্ট মিউজিক ভিডিও বাজালেন। এরপর তিনি গিয়ে ধীরে ধীরে নিজ হাতেই রোগীর ভেন্টিলেটার বন্ধ করে দিলেন। নিত্তলা বলেন-‘আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম, যতক্ষণ না প্রাণবায়ু বের হলো আমি তার হাত ধরে পাশে বসে রইলাম।’

এর পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে মাত্র ৫ মিনিট লাগে। এরইমধ্যে ওই রোগী মারা গেলেন। নিত্তলা দেখলেন আলো ফ্লাশ করছে এবং মনিটরের পর্দায় হৃদস্পন্দন থেমে যাবার যান্ত্রিক সংকেত।

এক এক করে ঘুম পাড়িয়ে রাখার যত নল রোগীকে দেয়া হয়েছিল সবগুলো খুলে দিলেন নিত্তলা। রোগীর মেয়ে যেহেতু জানতেন না যে, ভেতরে কী হচ্ছে- তাই তিনি তখনও তার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে যাচ্ছিলেন। ফোনে মাকে কিছু প্রার্থনা শোনাচ্ছিলেন।

ওই মেয়েকে তার মায়ের মৃত্যুর সংবাদটি দিতে নিত্তলার তখন খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু তারপরও ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে তাকে বলতে হলো তার মা আর নেই।

এভাবেই মহামারি করোনা ভাইরাসের এই দুঃসময়ের মৃত্যুপথযাত্রী আরও অনেকেরই হাত ধরে প্রাণবায়ু বের না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় নিত্তলাদের। তবে তিনি মনে করেন, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে একজন নার্স হিসেবে রোগীর প্রতি সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। 

তিনি বলেন, ‘একজন সহকর্মীর সাহায্য নিয়ে আমি তাকে পরিষ্কার করলাম, সাদা কাপড়ে মুড়ে তার লাশ বডি ব্যাগে ঢোকালাম আর ব্যাগ বন্ধ করার আগে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃতের কপালে এঁকে দিলাম ক্রশ চিহ্ন।’

সাধারণত অন্যান্য সময় কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বন্ধ করে দেয়ার আগে পরিবারের সদস্য কিংবা নিকটাত্মীয়দের আইসিইউতে ঢুকতে দেয়া হয় রোগীর সঙ্গে শেষ দেখা করার জন্য। কিন্তু এখন সংক্রমণের আশঙ্কায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের আইসিইউতে আত্মীয়দের ঢুকতে দিচ্ছে না বিশ্বের বহু দেশ। 

তবে নিত্তলা মনে করেন, ‘একাকী এভাবে মারা যাওয়াটা গভীর দুঃখের। এমন রোগী দেখছি যারা শ্বাস নিতে পারছেন না, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটা চোখে দেখা খুবই কঠিন এবং কষ্টের। মৃত্যুপথযাত্রীদের সাহায্য করতে পারার মধ্য দিয়ে মানসিক যন্ত্রণা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করি আমি।’

ট্যাগ: bdnewshour24