banglanewspaper

॥ অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥ করোনার আগ্রাসী কবলে পড়ে বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমরাও সংকটে নিপতিত হয়েছি। বিশ্বব্যাপী করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের হার বৃদ্ধির সাথে সাথে গৃহবন্দী মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। বাড়ছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের স্থবিরতা। চরম মন্দা ও দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস মিলছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে স্বল্প মেয়াদী আর্থিক প্রণোদনাসহ বেশ কিছু স্বল্প ও মধ্য-মেয়াদী পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সমাজের প্রায় সকল শ্রেনী ও পেশার মানুষ অন্তর্ভুক্ত হলেও শিক্ষাখাত এখনও তার বাইরে রয়ে গেছে। এই খাতটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। 

জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ সরাসরিভাবে হয় শিক্ষার্থী হিসেবে কিংবা শিক্ষক, কমকর্তা ও কর্মচারী হিসেবে এই খাতে জড়িত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষা অনুরাগীদের অনুদান কিংবা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্য ফিসের উপর নির্ভরশীল। এ কথা প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাত্রা ও অনুপাতে প্রযোজ্য যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই উক্তি শতভাগ সঠিক। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ব্যাপক গালগল্প প্রচলিত থাকলেও এই খাতের একজন হিসেবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হচ্ছে যে তৃতীয় প্রজন্মের প্রায় ৯০ ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এখনও ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে পৌছাতে গলদঘর্ম হচ্ছে। প্রায় দু’মাস যাবত তারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন ফি পাচ্ছে না যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম তাদের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহায়তা নিয়ে বিরতিহীন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথম দিকে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আশাব্যাঞ্জক না হলেও এখন দূর-দূরন্তে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের প্রায় শতাংশ এই অনলাইন কার্যক্রমে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আশা করছিল যে অনলাইন পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হলে শিক্ষার্থীরা তাদের ফি পরিশোধ করবে এবং তা দিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ করা হবে।

সাধারণতঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগেই তাদের ফি পরিশোধ করে থাকে। বর্তমানে পরীক্ষা নেয়া সম্ভব নয় বিধায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায়ের পথ অবরুদ্ধ। এমতাবস্থায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মার্চের বেতন দেওয়াই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলশ্রুতিতে শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে জড়িতগণ আর্থিক সংকটে নিপতিত হবেই। আমি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বললেও দেশের প্রাথমিক স্কুল, মাদ্রাসা, মাধ্যমিক স্কুল, উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল, কলেজের পাঠদানরত শিক্ষক ও সহায়ক কর্মচারীদের বেতন ভাতাদির ব্যাপারে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি আর কতটা বিস্তৃত ও প্রলম্বিত হবে তা বলা বড্ড কঠিন। সিএনএন খবর থেকে জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষতঃ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগামী জানুয়ারী মাসের পূর্বে কোন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না। বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি যে হবে না, তা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলেও আমাদের প্রতিবেশী ভারত মে মাসের প্রথম সপ্তাহ এবং বিশ্বের অনেক দেশ মে মাসের অর্ধাংশ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। আমার ধারণা যে হারে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে তাতে ছুটির মেয়াদ আরও কয়েক মাস বেড়ে যাবে। আশংকা করছি যতই দিন যাবে ততই দেশে বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকতর সংকটে নিপতিত হবে। এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রেখে এখনই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষতঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষনা প্রয়োজন। 

আমাদের দেশে একটি প্রবাদ আছে যে শিশু না কাঁদলে মা’ও দুধ দেয় না। এটা হাতে হাতে প্রমাণিত হয়েছে। আইনজীবীদের প্রণোদনা প্যাকেজ দাবির কারনেই সরকার সে ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। আশা করা যাচ্ছে সরকার শিক্ষাখাতের বর্তমান আর্থিক সংকট ও ভবিষ্যতের ঘনায়মান আর্থিক দুরবস্থা বিবেচনা করে অতি শীঘ্রই কোন না কোন ধরনের আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে হাজির হবে। অন্যথায় এই খাতে ব্যাপক কর্মচ্যুতির সম্ভাবনা রয়েছে।

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী,

মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী