banglanewspaper

॥ অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥ সারাদেশে ধানকাটা শুরু হয়ে গেছে অথচ সরকারি প্রয়াস সত্ত্বেও ধানকাটার শ্রমিকের অভাব লেগেই আছে। এমতাবস্থায়, যান্ত্রিক উপায়ে ধানকাটার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তারপর মাঠ থেকে ধান তুলে আনা এবং ধান মাড়াইয়ের জন্যে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ শ্রমিকের অভাবটা থেকেই যাচ্ছে। 

ইতোমধ্যে ঝড় বৃষ্টির আভাস ও পাহাড়ী ঢলের সম্ভাবনায় শুধু চাষী নয়, সারাদেশের মানুষ এক ধরনের আতংকে রয়েছে। কেননা, সারাবিশ্বে ২৮ কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে পড়ে তিন কোটি মারা যাবার আশংকা রয়েছে। অতীতে আঞ্চলিক পর্যায়ের খাদ্যাভাব উদ্বৃত্ত এলাকা থেকে আমদানীর মাধ্যমে মোকাবিলা করা যেত। এবারে একটি অতি ব্যতিক্রমী অবস্থা বিশ্বব্যাপী বিরাজমান। 

গতানুগতিক উদ্ধৃত এলাকা, অঞ্চল বা দেশ খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হতে পারে। কেননা পৃথিবীর সর্বত্রই করোনা আর অধিকাংশ মানুষই গৃহবন্দী। এই গৃহবন্দীত্ব ও চলাচল সীমিতকরণ ও আমাদের দেশে সময়মত ধান কেটে ঘরে তোলার পথে তা এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। অবস্থা আমাদেরকে বলে দিচ্ছে আমাদের খাদ্যের দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে। দেশে ধানের ফলন ভালো হয়েছে, তবে সে ধান ঘরে না তুলতে পারলে আমাদের দেশেও দুর্ভিক্ষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দেবে। টাকা হাতে থাকলেও আমদানী করা যাবে না। এই অবস্থায় ধান কাটার কেন্দ্রীয় দেখভালও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে ঠিকই, তবে সরকারী প্রয়াসকে আরও বেগবান, ফলপ্রসু ও সময়োপযোগী করার জন্যে কতিপয় রীতিবিরুদ্ধ পদক্ষেপ নেয়া 
বিবেচনা করা যেতে পারে। এখন ধানকাটার জন্যে আরও অধিক পরিমানে যন্ত্র সরবরাহ করা রাতারাতি সম্ভব হবে না, তবে দ্রুত শ্রমিক সরবরাহ বাড়ানো যেতে পারে। 
এই শ্রমিকের উৎস হতে পারে রিকশা চালক, ভ্যান চালক, মিস্ত্রি, ঠেলা গাড়ি চালক ও কারনে অকারনে বেকার জনগোষ্ঠী। 
তাদেরকে অধিক হারে মজুরী ও স্বাস্থ্য সুবিধা দেয়া যায় তাহলে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ শ্রমিকের চাহিদা তাদের দিয়ে মিটানো যেতে পারে। সরবরাহ বাড়াতে হলে এক জায়গায় সরবরাহ নিরুৎসাহিত করে আর এক জায়গায় সরবরাহ বাড়াতে হবে। আমি মনে করি উপরিউক্ত ব্যক্তিগণ একজন দৈনিক যত আয় করে তার দ্বিগুণ মজুরী তাকে ক্ষেত শ্রমিক হিসেবে দেয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে কৃষকদের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। তবে শহুরে প্রণোদনার দিকে তাকালে নিশ্চয় তার একটা সমাধান রয়েছে। 
ব্যবসায়ীদের আর্থিক প্রণোদনার জন্য ব্যাংকগুলোকে ৯ শতাংশ হারে ঋণ বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই ৯ শতাংশের অর্ধেক সরকার বহন করবে। একইভাবে ধানকাটা শ্রমিকদের বেতন যদি আগের তুলনায় দিগুনও তাহলে তবে তার অর্ধেক সরকারী ভর্তুকি হিসেবে প্রদান একটা ফলপ্রসু প্রয়াস হতে পারে। এখন শহর এলাকার নিয়ন্ত্রিত মূল্যে পণ্য বিক্রি ও বিনা খরচায় খাদ্য বিতরণের কাজটা একটু পুর্নবিন্যাস করা প্রয়োজন। এগুলো পর্যায়ক্রমে ধান উৎপাদনকারী এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ঠেলে দিতে হবে। আমার ধারনা বাড়তি মজুরীর পাশাপাশি স্বল্প মূল্যে পণ্য সরবরাহ দক্ষ বা আধাদক্ষ শ্রমিকের স্থান পরিবর্তন বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে। বর্তমানে বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করে করোনার বিস্তারটা বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে যদিও তা মানবিক কারণে করতেই হবে। তবে এটাকেও পূর্নবন্টন সম্ভব হতে পারে যদি কৃষি শ্রমিকদের জন্যে বিনামূল্যে খাদ্যেরও আয়োজন করা যায়। 
এসব শ্রমিকদের গমনাগমন একটি সমস্যা হতে পারে। দূরদূরান্তের অজ এলাকা ছাড়া এখন দেশে কয়েকশত মিটারের মধ্যে কোন না কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে এসব স্কুলগুলো এখন কোন কাজে লাগছে না। এইসব স্কুল, কলেজ মাদ্রাসা ও মক্তবগুলো শ্রমিকদের থাকা-খাওয়ার জন্যে নিয়োজিত করা যায়। সাথে স্বাস্থ্য সেবাটা বাড়ালে শহর এলাকায় চাপটা সহনীয় হতেও পারে। 

অন্য আর একটি উপায়ে শ্রমিক সরবরাহ বৃদ্ধি করা যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার ঈঙ্গিত দিয়েছেন। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজের ছাত্ররা এখন একান্তই বেকার। তারা যদি অচল মানসিকতা পরিহার করে ধান কাটায় সহায়ক ভূমিকা নেয়, তাহলে চাষী পরিবার উপকৃত হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষকরাও এ ব্যাপারে আদর্শ ভূমিকা পালন করতে পারেন। মানসিকতার একটা পরিবর্তন দিয়ে যদি দুর্ভিক্ষ ঠেকানো যায়, তাহলে এই পরিবর্তন কাম্য ও বাঞ্ছনীয়। 

আর একটি বিষয়ের অবতারনা করতে চাচ্ছি। এটাও এক ধরনের অগতানুগতিক পদক্ষেপ হবে। আমাদের দেশের মানুষকে ঘরে কোনভাবেই আটকে রাখা যাচ্ছে না। কোন না কোন উছিলায় তারা ঘরের বাইরে চলে আসছে। তাদের বর্হিগমন প্রতিহত করতে বিভিন্ন নামের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গলদঘর্ম হচ্ছে এবং নিজেদেরকে করোনার মুখোমুখি ঠেলে দিয়েও সফল হচ্ছে না। আমার মতে একই ব্যক্তিকে যদি পরপর দু’বার কারণে অকারণে ঘরের বাইরে পাওয়া গেলে বাধ্যতামূলকভাবে ধান কাটার জন্যে পাঠিয়ে দিলে এই মানুষ সামলানোর কাজটা সহজ হবে। আরও যাদেরকে বাধ্যতামূলক ধানকাটায় পাঠানো যায় তারা হলো রিলিফ চোর ও সামাজিক উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি বা সমষ্টি। তবে প্রণোদনা দিয়ে হোক কিংবা শাস্তিস্বরূপ ধান কাটাতে পাঠানোর কাজটা সফল করতে হলে সংশ্লিষ্টদের স্বাস্থ্য সেবার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। তা নাহলে এই মানুষগুলোই বিদেশ প্রত্যাগত কিংবা অকারণে জানাজায় শরিক কিংবা বারবার কর্মস্থলে, আগমন-নির্গমন কারীদের মত দেশের সর্বত্র করোনার বিস্তারটা সুগম করে সারা দেশটাকে করোনায় ভরে দিতে সক্ষম হবে।  

ধানচাষীদের ধানকাটায় এক ধরনের অনীহায় শ্রমিক সরবরাহে বাধা হতে পারে। এই মৌসুমে মজুরী সাধারনত এতো বেশি থাকে যে চাষাবাদের খরচ মিটিয়ে এবং ধানকাটা, মাড়ানো ও রক্ষনাবেক্ষন সামলিয়ে কৃষকের হাতে তেমন কোন লাভ থাকেনা। অনুপস্থিত চাষী বা নির্লিপ্ত চাষীদের সমস্যাটি বিবেচনায় রাখা যায়। সরকার এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারে। এ্যাপস (Apps) এর মাধ্যমে ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্তটি প্রশংসনীয় তবে এ কাজে জড়িতরা সাধারনত বড় চাষী বা আড়তদারের পক্ষ নিয়ে থাকে। তাই ধানের যাতে ন্যায্য মূল্য ছোট বড় চাষীরা পেতে পারে তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। মূল্যের মৌসুমী হেরফের নিয়ন্ত্রনের কৌশল ও তার নির্মোহ প্রয়োগে কৃষি মন্ত্রনালয় বা অন্যসব মন্ত্রনালয়কে এগিয়ে আসতে হবেই। ধানকাটা শেষ হবার সাথে সাথে আম-লিচু তোলার সময়ও চলে আসবে। এই ক্ষেত্রেও এবারে শ্রমিক সংকট ও পরিবহন সংকট অনিবার্য। অগ্রিম ব্যবস্থা নিলে তাও নিয়ন্ত্রনে রাখা যাবে। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ। 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী