banglanewspaper

করোনা নিয়ে নানাজনের নানা মত বিরাজ করছে। কেউ বলছেন আগে জীবন তারপর জীবিকা। এই অবস্থান থেকেই কঠোর আইসোলেশান ও লকডাউনের সূচনা। কঠোর লকডাউন ও স্বাস্থ্য বিধি পালন করে এবং আত্ম-সংযমের মাধ্যমে কেউ কেউ সুফলও পেয়েছে। বাস্তবতার কষাঘাতে কেউ বলছে যে জীবন ও জীবিকা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল হচ্ছে।

আমাদের সংস্কৃতিও তা সমর্থন করছে। আমাদের দেশে কেউ কেউ বলছেন যে বাঙালিরা স্বর্গবাসী হলেও মাঝে মাঝেই নরকে কি ঘটছে তা দেখতে যাবে। অন্ধ ধর্ম বিশ্বাস লকডাউন না মানার অন্যতম কারন। এখন অনেকেই করোনাকে সক্ষমতা দিয়ে সামলানো এবং করোনাকে প্রতিবেশী হিসেবে সাথে নিয়ে বাঁচতে পরামর্শ দিচ্ছে। বেশ ক’দিন আগে আমিও সেকথা বলেছি। এক টেলিভিশন টকশোতে আমি বলেছিলাম যে আইসোলেশনের ব্যাপারে আমাদের সতীত্ব যখন বিনষ্ট হয়েই গেছে তখন তাকে আর পুনরুদ্ধারের প্রয়াস বৃথা; বরং মিশ্র অর্থনীতির দেশে এখন করোনার ব্যাপারেও মিশ্র নীতি অনুসরনই বাঞ্ছনীয়। সংক্রমনের হার, মৃত্যুর হার ও বিদ্যমান সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে ও প্রয়োজনের তাড়নায় আমাদেরকে লকডাউন শিথিল করতেই হবে। ফ্রান্স ও ইতালীসহ বেশ কিছু দেশ অশেষ ক্ষয় স্বীকার করেও এ পথ ধরেছে। ট্রাম্প নির্বাচনে হারার শংকা নিয়ে শিথিল লকডাউন মেনে নিয়েছে, তার ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রয়োজনেও আইসোলেশনে যাচ্ছেন না, আমাদেরকে অবশ্য অত শিথিলতা টানতে অন্ততঃ করোনার প্রতিষেধক বা প্রতিরোধক প্রাপ্তি বিবেচনায় নিতে হবে। আমার ধারনা শীঘ্রই বাজারে ফলদায়ক ইনজেকশন বা ট্যাবলেট চলে আসবে। বাংলাদেশের রেমডিসির উৎপাদন হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন সাপেক্ষে সুলভে এই ইনজেকশান বাজারে আসছে প্রায়। আরও কিছু ঔষধ বা ইনজেকশান আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় দেশের মানুষের বর্হিমুখী প্রবণতা, ধর্মচেতনা ও জীবিকার বহুমুখী সংকটের কথা মাথায় নিয়ে আমাদের লকডাউন শিথিল করতেই হবে। আমরা যে স্থানে এসে পৌঁছেছি সেখান থেকে উৎপত্তিস্থলে ফিরে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। যা হয়ে গেছে তাকে ভিত্তি ধরেই আগাতে হবে। আগানো হচ্ছে ও যেমন আগাচ্ছে মন্ত্রণালয়, বিচার বিভাগ, রেস্তোরা, দোকানপাট, শপিং মল। 

আমাদের শিক্ষাঙ্গনও খুলে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে সংগত অসংগত সমালোচনা হচ্ছে।  ইউজিসি প্রণীত ও জারিকৃত নির্দেশিকার অন্ততঃ কিছু ধারার বাস্তবায়িত হলে ১৯৩৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে সিজর ক্রাইসিস বা কাঁচি সংকটের মতো কিছু জন্ম হতে পারে। কারণ ইউজিসির সাধারণ নির্দেশনার তিন ও চার ধারা বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক। প্রথমটিতে বলা হয়েছে শিক্ষক, কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা অব্যাহত রেখে এবং কাউকেও ছাঁটাই না করে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হবে। পরের ধারাটিতে বলা আছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি’য়ের জন্য কোন চাপ দেয়া যাবে না এবং তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ অবধারিত রাখতে হবে। অন্য ধারাগুলো আলোচনা না করেও বলা যায় এই দুটো ধারার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় কাঁচি সংকট অবধারিত হবে যদি না ইউজিসি বা সরকার স্বল্প মেয়াদের জন্য হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়নে এগিয়ে আসে। তারপরও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব ও কল্পিত সীমাবদ্ধতার কথা আসবে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পর শিক্ষায় হিউম্যান টাচ বা মানবিক স্পর্শের কথা এসেছে, মূল্যায়নের স্বচ্ছতার-অস্বচ্ছতার কথা এসেছে। এর মাঝে অজ্ঞতা, পশ্চাদপদ মানসিকতা ও অপতৎপরতার কথা এসে যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে কেউ কেউ অন্ততঃ শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার কথা বলছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টানছেন কেউ কেউ। প্রধানমন্ত্রী স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাঙ্গন সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লকডাউনের কথা বললেও তিনি অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা স্পষ্ট করে বলেননি। তারপর বিভিন্ন ধারার পানি বিভিন্ন দিকে গড়াচ্ছে। কতিপয় সংকট ঘনীভূত হচ্ছে যেগুলো সামলানো কভিড সামলানোর চেয়ে কম গুরুত্বের নয়, ভান্ডারের স্ফীতি না বাড়ানো ক্রমশঃ রাজ ভান্ডারও ফুরিয়ে যায়। 

আমাদের অনেক কিছু ক্ষয়িঞ্চু হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন পর খাদ্য সংকট ছাড়া অন্যান্য ভোগ্য পন্যের ঘাটতি দেখা যাবে, বাগানে আম ও লিচু পচে যাবে; রফতানি বাজার হাত ছাড়া হয়ে আগের মতই ভিক্ষুকে ভিক্ষুকে দেশ ভরে উঠবে; বেকারত্ব অসহনীয় হয়ে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি এমনকি জঙ্গীবাদ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যেতে পারে। এসব অবস্থা সামলাতে ও করোনাকে সহনীয় করতে হলে লকডাউনে শিথিলতা আনতে হবে এবং শিক্ষাঙ্গনে তার সূচনা পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা গ্রহণ করা যাবে। তবে স্বাস্থ্যবিধির প্রতি গতানুগতিক অনীহা শিথিল না করলে লকডাউনে শিথিলতা আমাদের হলে কাল হয়ে দেখা দিতে পারে।

 

* শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

 

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী