banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী বা শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় জড়িয়ে আছে। করোনার প্রভাবে বলতে গেলে তারা সবাই ঘর বন্দি, বেকার ও বিভ্রান্ত। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কিছু টিভি চ্যানেল অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখে অনেক শিক্ষার্থীদের মনে এই বোধ জাগরুক রেখেছে যে তাদের জীবন থেকে এক বা একাধিক সেমিস্টার খসে পড়বে না। একই সময়ে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বেগবান ও অব্যাহত রাখতে ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির তৎপরতায় কাজটি দ্রুতই সম্পন্ন হয়েছে। অনাকাঙ্খিত ও আত্মহননমূলক কিছু কথাবার্তা চাউর হলেও এই প্রয়াসের সম্প্রসারন সাবলীল হবে। অনলাইনে কিভাবে পড়ানো হবে বা কিভাবে পরীক্ষা নেয়া হবে বা শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে সেসব জারিকৃত নির্দেশনায় এসেছে। 

ফলতঃ উসকানিমূলক কথাবার্তায় ভাটা পড়বে এবং ভিত্তিহীন বাকবিতন্ডা ক্রমশঃ উঠে যাবে। তারপর এটাও প্রমাণিত হবে যে ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। হয়তো এমন কথাও উচ্চারিত হবে না যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফি আদায়ে চাপাচাপি করছে এবং পরীক্ষার বাহানায় অতিরিক্ত ফি হাতিয়ে তাদের ভান্ডার স্ফীত করছে। কিছু একান্ত অপারগ বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য তাদের শিক্ষক, কর্মচারী, কর্মকর্তা ও বিভিন্ন প্রকার সেবাদাতাদের ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে বকেয়া ফি প্রদানের অনুরোধ পাঠাবে। নিকট অতীতে এমন অনুরোধ করে ইতিবাচক সাড়া পেলেও সাবলীল প্রবাহটা বিরূপ প্রচার প্রপাগান্ডার কারণে সাময়িক থমকে গেছে। শিক্ষার্থীরা ভালো করেই জানে যে তাদের ফি’সের উপর অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অন্যান্য সেবাদাতাগণ নির্ভরশীল। এ কারনে বাহ্যিক চাপ থেকে নয়, এক ধরনের অন্তঃস্থিত চাপ বোধ করেই তারা এবং তাদের অভিভাবকগণ ক্রিয়াশীল হবেন।

আর একটা প্রসঙ্গের অবতারণা করছি। এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সত্যি পুনরায় উচ্চারিত হচ্ছে যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু বড়লোকের সন্তানেরা পড়াশুনা করে না, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত এমনকি একান্ত বিত্তহীনদের মেধাবী সন্তানরাও পড়াশুনা করে। প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদেরকে অকল্পনীয় ও অস্বাভাবিক ছাড় দিয়েই তা সম্ভব করছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র আয়ের উৎস শিক্ষার্থী ফি যার কিয়দাংশ দিয়ে চলমান ব্যয় নির্বাহ করে কায়ক্লেশে হলে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় অবকাঠামোগত সুবিধাসহ নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসও তৈরী করেছে। এসব সুবিধা সৃষ্টি সত্বেও তাদের শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকদের উপর কোন অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেনি। এমনকি বিদ্যমান শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে বা নতুন শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে দুই একটি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ বিনা ফি’তে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। এসব কারণে তাদের পরিস্থিতি অতীতে ‘দিন এনে দিন খাওয়ার’ মতো থাকলেও বর্তমান করোনাময় সংকট মুহূর্তে তা জটিল ও অসহিষ্ণু পর্যায়ে পৌঁছেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকগণ করোনাময় পরিস্থিতিতে সরকারি বা বেসরকারি উৎস থেকে কিছু সাহায্য সহায়তা পেলেও তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নাম ও পরিচিতির কর্তৃপক্ষের অর্থায়নের উৎস অতি সীমিত। এই বিষয়টি নীতি নির্ধারকের দৃষ্টিতেও আনতে হবে, যাতে করে তারাও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যে কোন কোন পথ খুঁজে বের করতে পারে।

করোনা ভাইরাসের গ্রাস দীর্ঘায়িত হলে ৫ কোটি মানুষকে ঘরে বসিয়ে রাখা যাবে না। এই কারণে অনলাইন শিক্ষার বিকল্পও বের করা প্রয়োজন হবে। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে বিদ্যমান ও অনাগত সমস্যাবলীর সমাধানের পথ বের করতেই হবে। ধারনা করছি সুদিনেও অনলাইনের আবেদন কমবে না। আমাদের দেশে এখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রায় ১৫ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী অনলাইন সুবিধা বঞ্চিত। যা রাতারাতি তৈরী করা যাবে না। ইউজিসি অবশ্য তাদের দিক নির্দেশনায় কতিপয় বিকল্পের হদিস দিয়েছে যার মধ্যে আছে তাদের বিডিরেন ও মাননীয় প্রধানমনন্ত্রীর এটুজেড প্রকল্পের কথা। তবে অনলাইনের বিকল্প হিসেবে একই অঙ্গনে আবদ্ধ বেকার ও বিরক্তদের অনানুষ্ঠানিক শিক্ষক হিসেবে মেনে নেয়া যায়। বর্তমানে অনেক ঘরে কিংবা পরিবারে এক বা একাধিক উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি রয়েছেন। তিনি বা তারা স্বাচ্ছন্দে নিজ গৃহে অন্তরীন শিক্ষার্থীদের শিক্ষকও মূল্যায়কের ভূমিকা নিতে পারেন। স্বাভাবিকতা ফিরে আসলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যথোপযুক্ত বিশ্লেষন ও নিরীক্ষার পর তাদের মূল্যায়িত মার্ক বা গ্রেড গ্রহণ করতে পারবে। স্বাভাবিক অবস্থা ফিরলে বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক কোর্স সমাপ্ত করেও নেয়া যাবে। অর্থাৎ আমরা হয়তো প্রমাণ করতে পারবো যে অভাবই আবিষ্কারের প্রসূতি। অতীতে এমন প্রবাদতুল্য কথা উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও উদ্দীপক হিসেবে কাজ করবে বলে আমার ধারণা।

অনেকে বলেন, স্বাভাবিক মানুষের দুটো হাত থাকলেও বাঙালির হাত তিনটি- ডানহাত, বাঁ হাত ও অজুহাত। তাই সকল অজুহাত পায়ে ঠেলে 'নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো' প্রবাদটিতে আস্থা আরোপ করতে হবে। কানা মামাকে সারিয়ে তুলতে হবে এবং নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় যেখানে শিক্ষা কার্যক্রম একান্তই শিক্ষার্থীদের ফি এর উপর নির্ভরশীল, সে জায়গাটিকে বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে এবং সেই জায়গাটির প্রতি সকলের একটু বেশী সংবেদনশীল হতে হবে।

ইউজিসির নির্দেশনায় সিজার ক্রাইসিস বা কাঁচি সংকট (যা ১৯৩৩ সালে রাশিয়ায় দৃশ্যমান ছিল) জন্ম হতে পারে। বিশেষ করে তাদের সাধারণ নির্দেশনার তিন ও চার ধারায় তার বীজ নিহিত আছে। ধারা দুইটি পরস্পরের বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক এবং তাদের মিথসক্রিয়ার ফলে অনিয়ন্ত্রনযোগ্য সিজর-ক্রাইসিস বা কাঁচি সংকটের জন্ম হতে পারে। বিষয়টিকে আশা করছি মঞ্জুরী কমিশন খতিয়ে দেখবে এবং একটি বন্ধু প্রতিম সহায়ক বা পরামর্শক হিসেবে সমাধান খুঁজে দেবে। প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ধারণা আজ যেমন আছে, ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে। সামান্য কিছু মানুষের অবহেলা সত্বেও শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রূপ নেবে।

 

*বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

 

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী