banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥

অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশের ৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করছে না। তাদের অল্প ক’টি ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত। সার্বিক ভাবে তাদেরকে স্বায়ত্ব-শাসিত বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়ে থাকে। বাকীদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বলা যেতে পারে যার সংখ্যা ৪০ এর মতো। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব আইন রয়েছে। তারা সরকারি অর্থে অর্থাৎ জনগণের অর্থে পরিচালিত এবং স্বায়ত্ব-শাসিতদের ন্যায় প্রায় সম পরিমান স্বায়ত্ব শাসিত। তাদের নিজস্ব নীতি নির্ধারণের অবাধ ক্ষমতা রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্ব শাসনের নামে বরং স্বাধীনতাই ভোগ করে। আমিও বহু বছর এই স্বাধীনতা ভোগ করেছি বলেই শিক্ষক হয়েও অনেক কিছু করতে পেরেছিলাম। তবে এই স্বাধীনতার কারনেই এ’সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জবাবদীহিতার প্রশ্নটি অতি গৌন। জবাব গ্রহীতার মধ্যে মুখ্য দু’জন যথা- উপাচার্য এবং ডীনগণ শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত হন। ইলেকট্রোরেল কলেজ বা শিক্ষক ভোটারদের ভোটে তারা নির্বাচিত হোন বলে তারা ভোটারদের নিয়ন্ত্রণ অপেক্ষা উল্টো ভোটারদের নিয়ন্ত্রণে থাকেন।  

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের দুর্বল এই দিকটির প্রতি আমি কিন্তু তোফায়েল আহমদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নজরে এনেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে পুনঃযোগদানের পরই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশটি যখন তৈরী হয় তখন আমি সেই ১৯৭১ সালের মতোই বিভিন্নভাবে নীতি নির্ধারক ও বঙ্গবন্ধুর সাথে যোগসূত্র রক্ষা করেছিলাম। এই অধ্যাদেশের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত অনেকেই পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ অলংকৃত করেছিলেন। তাদের কারো কারো একাধিক তৃতীয় বিভাগ ছিল কিংবা যিনি অনার্স পড়তে গিয়ে ‘পাস’ পেয়ে পরবর্তীতে উচ্চতর প্রশ্নবোধক ডিগ্রি নিয়েছিলেন, তিনিও উপাচার্য হয়েছিলেন। এই অধ্যাদেশের বলে গ্রেস মার্কে ২য় শ্রেনী প্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা দ্বিতীয় শ্রেনীতে ৮৬ তম অবস্থানের ব্যক্তিটিও ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন। এ জাতীয় ফিরিস্তির বিশাল ভান্ডার আমার কাছে আছে তবে সেসব স্থগিত রেখে এটা বলা যথেষ্ট যে স্বায়ত্ব শাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই ইউজিসির নির্দেশ অমান্য বা পাশ কাটিয়ে চলার যথেষ্ট উপায় ও উপকরণ হাতে পেয়েছে; আইন ছাড়াও উছিলার ব্যবহারে সমর্থন পেয়েছে। এমন একটি উছিলা দিয়ে তারা সারাদেশে কাঙ্খিত অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে এড়িয়ে যাচ্ছে। আমি আগে লিখেছিলাম যে অন্যান্য স্বাভাবিক মানুষের দুটো হাত থাকলেও বাঙালির হাত কিন্তু তিনটি- ডান হাত, বাম হাত ও অজুহাত। এই তৃতীয় হাতটি ব্যবহার করে তারা সামগ্রিক জাতীয় মঙ্গলদায়ক কর্মকান্ডকে হয় প্রতিহত করছে বা পিছিয়ে দিচ্ছে।

তাদের মতে অনলাইন কার্যক্রমের প্রধান বাধা নাকি সুদূর গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় বিত্তহীন শিক্ষার্থীদের বর্তমান অবস্থা। আমি জানিনা তারা আসলে কি কোন সমীক্ষার ভিত্তিতে তা বলছেন ? আমি যতদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম ততদিন ভর্তির প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলাম এবং আমার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর প্রথম ভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিচ্ছুদের কিছু রীতিমত বিশ্লেষণ করতাম। আমি দেখেছিলাম দেশের বিত্তবানদের সাথে মেধাও এখন রাজধানী বা বড় শহর কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। যাদের পিতামাতা বা অভিভাবকরা বিত্তের অধিকারী, তারা একাধিক প্রাইভেট টিউটরের নিয়োগ নিশ্চিত করে আপন সন্তান বা নির্ভরশীলদের ভালো ফল নিশ্চিত করছে। আমি মনে করি এই অবস্থার গুণগত পরিবর্তন তেমন একটা এখনও হয়নি। তাই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিশালাংশ গ্রামের বা এখন গ্রামেই আছে কিংবা তাদের অধিকাংশই এমন বিত্তহীন যে তারা অনলাইন কার্যক্রমের জন্যে নিজস্ব বা সরকার প্রদত্ত কোন সুবিধাদির নাগাল পাচ্ছে না বলাটা কতটা তথ্য নির্ভরযোগ্য এটা শুধু সামর্থ বা সাধ্যের কথা নয় সরকারের গৃহীত তথ্য প্রযুক্তি বিস্তার তত্ত্বের সরাসরি চ্যালেঞ্জ এবং ইউজিসির বিডিরেন বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এটুজেড কার্যক্রমের নিস্ফলতার কল্পিত সমালোচনা। আমার ছাত্র এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা পরিচালক সূত্রে জানলাম যে, কেবল ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অবকাঠামোগত সুবিধা তথা বিদ্যুৎ বা কম্পিউটার থেকে বঞ্চিত। সদ্য প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয় যদি কায়ক্লেশে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে পারে, তাহলে দেশের সবচে খারাপ অবস্থায় নিপতিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টিও তার অনলাইন কার্যক্রম চালু করতে পারে। আসলে ‘ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়’, এই প্রবাদটি ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়েছে। ইচ্ছে করলে আমরা প্রমাণ রাখতে পারতাম যে আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের প্রসূতি হচ্ছে পারিপার্শ্বিক বৈরী অবস্থা।

সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের ভিত্তিহীন অপপ্রচার ও দলবাজিতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্থ বা প্রভান্বিত হচ্ছে। তাদের শিক্ষকরা রাজনীতি করতে পারে তাই রাজনীতিবিদদের ন্যায় দ্বিধাহীন আচরণ করতে পারে। সংগঠিত হয়ে তারা কেউ কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনলাইন থেকে সরে আসার প্ররোচণা দিচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে দিতে শিক্ষার্থীদের উপর বহুবিধ কাল্পনিক চাপের কথা আবিষ্কার করছে যদিও প্রথম থেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি তাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি অতিশয় নমনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।

সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কেউ শিক্ষা কার্যক্রমে হিউম্যান টাচ বা মানবিক স্পর্শের অনুপস্থিতির কথা বলছেন। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে এমন দুর্বলতা আমি একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছি না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই মানবিক স্পর্শের কথা কতটা প্রযোজ্য? উচ্চ শিক্ষায় বিশালাংশ শিক্ষার্থী নিজেরাই পরীক্ষায় ভালো ফল ও জ্ঞানার্জন করে থাকে। আমি এমনও দেখেছি বহুবের পর যে শিক্ষক ক্লাশ এড়িয়ে গেছেন তারই কথিত ছাত্র-ছাত্রীরা স্বউদ্যোগে প্রস্তুতি নিয়ে মুখোমুখি শিক্ষাদাতা শিক্ষকদের চেয়েও বিষয়ভিত্তিক ভালো ফলের অধিকারী হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষকের অবহেলার কথাটা কর্তৃপক্ষের কাছে না তুলেও তারা নিজেরাই কোর্স ও সিলেবাস শেষ করে ভালো রেজাল্ট করেছে। প্রাইমারী ও সেকেন্ডারী পর্যায়ে হিউমান স্পর্শ অনেকটা প্রাসঙ্গিক। অবস্থার চাপে সে পর্যায়ে যদি ৮০-৮৫ ভাগ শিক্ষার্থীকে অনলাইন ব্যবস্থায় আনতে হয় তখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্থাপিত দুটো অসুবিধাকে বরং খোড়া যুক্তি বলে চিহ্নিত করা যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম পূর্নঃবিন্যাস করলে শিক্ষার্থী অপেক্ষা শিক্ষাদাতারা বেশি উপকৃত হবেন। একজন শিক্ষকের কাছে কোর্স সমাপ্ত করা আর শিক্ষার্থীর কোর্স সমাপ্ত করা অন্ততঃ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভিন্ন কথা, সেই ষাটের দশকে ড. ওসমান গনির মতো বাঘা উপাচার্যকে এই যুক্তি দিয়ে আমি পরাভূত করেছিলাম। সেকালের মত এখনও একজন শিক্ষকের কাছে বিভিন্ন মেধার শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক যদি শুধুমাত্র পাঁচ বা দশ ভাগের প্রতি দৃষ্টি রাখেন তাহলে কোর্স কারিকুলাম ও পরীক্ষা শেষ করতে যে সময় প্রয়োজন, সকল শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে অনেক বেশি বিবেচনায় নিলে সময় ও পরিশ্রম প্রয়োজন। আধা খোড়া হয়তো কিছু করতে গেলে সে বিবেচনার দরকার কি?

আমি দেখেছি সেশনজট হলে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকগণ যতোটা ক্ষতিগ্রস্থ হোন, তার চেয়ে বেশি হয়তো উপকার ভোগ করেন যারা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন ভাতা গ্রহণ করেন। নির্দিষ্ট সময়ে না পড়িয়ে, পরীক্ষা না দিয়েও ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত রেখে তারা শতভাগ বেতন ভাতাদি পান। তাদের অখন্ড অবসরটা তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান কিংবা অন্যত্র পরামর্শক বা রাজনৈতিক দায়িত্ব স্বচ্ছন্দে পালন করতে পারেন। তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যতই সমালোচনা মুখর হোন না কেন, অনেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বদৌলতে প্রচুর বিত্ত বৈভবের অধিকারি। কেননা তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নিষ্ঠার সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে দেদারছে পড়াচ্ছেন। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত সময় দানের জন্যে তারা অতিরিক্ত অর্থও পাবেন। এই অর্থটা জনগনের। করোনার কারনে সেশনজট হলে শিক্ষাদাতাদের কোন ক্ষতি নেই। করোনার এই দুর্দম অগ্রযাত্রায় হাত গুটিয়ে বসে থেকে পরে মেক আপ ক্লাশ, সকাল বিকাল ক্লাশ বা অন্য প্রক্রিয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নেবার যে পরিকল্পনা তারা নিয়েছেন, তা একটা জাতির জন্য ভ্রান্ত পদক্ষেপ। তাদের চিন্তা ও সিদ্ধান্তের পুর্নঃবিবেচনা প্রয়োজন। আসুন দেশ ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ইতিবাচক আচরণ করি।

*ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিলেকশান গ্রেড প্রফেসার, মুক্তিযোদ্ধা ও চলমান অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে জড়িত একজন।

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী