banglanewspaper

ঠিক একদিন আগেই ভারতের বেসরকারি আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থা স্কাইমেটের প্রধান পালাওয়াট জানিয়েছিলেন, চলতি শতকে প্রাক-মনসুন পর্বে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া অতি প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্পান প্রথম কোনও ‘সুপার সাইক্লোন’। 

তীব্রতার মাপকাঠিতে আম্পান এরইমধ্যে অনেক রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, ‘ এর আগে ২০০৭ সালের জুন মাসে আরব সাগরে সুপার সাইক্লোন ‘গোনু’ তৈরি হয়েছিল। যেটা পরে ওমানের দিকে সরে যায়। আম্পান এরইমধ্যে বাতাসে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিবেগ সঙ্গে ‘প্যাক’ করে নিয়েছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি একটি ঘূর্ণিঝড় থেকে ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে গেছে, সেটাও কিন্তু একটা রেকর্ড।’

এরইমধ্যে বুধবার (২০ মে) সকালে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতর থেকে জানানো হলো, গত ২০ বছরের মধ্যে আম্পান হতে পারে এ অঞ্চলে সবচেয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়। 

আবহাওয়া অধিদফতরের সবশেষ বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়, বুধবার (২০ মে) দুপুর থেকে সন্ধ্যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড়টি। এর কারণে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫-১০ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ।

বুধবার সকাল পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় আম্পান উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। 

বার্তা সংস্থা ইউএনবির খবরে বলা হয়েছে, সবশেষ ১৯৯৯ সালে ওডিশার উপকূলে আঘাত হানা প্রবল এক ঘূর্ণিঝড়ে ভারতে ৯ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। এরপর গত ২০ বছরে এত প্রবল শক্তি নিয়ে আর কোনও ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়নি। 

বুধবার সকাল ৬টা থেকে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এছাড়া সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর এই মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। 

আবহাওয়ার বুলেটিনে জানানো হয়েছে, অতি প্রবল শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার সকাল ৬টার দিকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর থেকে ৫৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। 

সকাল থেকে ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

এদিকে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে মঙ্গলবার রাত থেকেই হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হচ্ছে। একইসঙ্গে বাগেরহাট, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুরেও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন আম্পান আতঙ্কিত মানুষ।

মহামারি কারোনা ভাইরাসে বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতি যেখানে মুখ থুবড়ে পড়েছে সেখানে হঠাৎ সুপার সাইক্লোন কতটা ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে? করোনা আতঙ্কের মধ্যেই এমন প্রশ্ন উঁকি দিতে শুরু করেছে জনমনে। আবহাওয়া অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, আম্ফান বাংলাদেশে বড় ধরনের বিধ্বংস চালাবে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা। মানুষের প্রাণহানি থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, গাছপালা, গবাদি পশু ও রাস্তাঘাটের বড় ক্ষতি হতে পারে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে বিদ্যুৎ সরবরাহও। কারণ ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশে আঘাত হানার সময় বাসাতে এটির গতিবেগ থাকবে ঘণ্টায় ১৬৫-১৭০ কিলোমিটার কিংবা তারও উপরে।

উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে অতীতের তুলনায় বর্তমানে প্রাণহানির সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোনে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০৭ সালে সিডরের আঘাতে ৩ হাজার ৪০৬ জনের প্রাণহানি হয়। এরপরেও আরও বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে দেশে। এর মধ্যে ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার আঘাতে ১৯০ জন ও ২০১৩ সালে ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে ১৮ জনের প্রাণহানি হয়। সবশেষ গেল বছর মে মাসের শুরুর দিকে ঘূর্ণিঝড় ফণীর তাণ্ডবেও দেশে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। 

ট্যাগ: bdnewshour24