banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥
আমার জীবনের বহুকাল পার হয়ে এখন করোনায় এসে থেমেছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে আমি বহু কিছু দেখলাম। দেশ ও সমাজ বিভক্তি দেখলাম, রক্তের হলি খেলা দেখলাম, তথাকথিত খাঁটি মুসলমানের সাথে শংকর মুসলমানদের বসবাস দেখলাম, ভাষাভিত্তিক বিভক্তি দেখলাম, দ্বি-জাতি তত্ত্বের  প্রবক্তাদের কারণে দুই অর্থনীতির শাসনের নামে শোষণ দেখলাম, নির্যাতন দেখলাম, গণহত্যা দেখলাম। উপায়ন্তর না দেখে রক্তস্নানে আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করলাম।

শত্রুর জাল ছিড়ে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলেন, বাঙালিত্ব প্রতিষ্ঠায় নামলেন অর্থাৎ সুশাসন চিরায়ত করার পদক্ষেপসহ অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পা ফেললেন। রোগের প্রকৃত চিকিৎসা শুরুর অপ-চিকিৎসার অজুহাতে তাকে স্বপরিবারে হত্যা করেছে। তার প্রবর্তিত বাকশাল শেকড় গাড়তে পারলে দেশটা বহু আগেই ২০১৯ সালের অবস্থানে এসে পৌঁছাত। দেশের সব মানুষ হতো দেশটির মালিক। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন ক্ষমতাহীনদের ক্ষমতায়ন, আমলাদের পাশে জনপ্রতিনিধিদের সম্মানজনক অবস্থান, জোতদারের পাশে ভূমিহীন ও নিরন্নদের খাদ্যের নিশ্চয়তা, পূঁজিপতি ও মুৎসুদ্দিদের পাশে খেঁটে খাওয়া মানুষের সব অবস্থান। তাকে হত্যা করে মানুষে মানুষে ফারাক বিস্তৃত করা হলো, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশটাকে বাংলাদেশী ও বাঙালীতে বিভাজন করা হলো। তারা জিন্দাবাদের ভঙ্গুর প্রাচীর টেনে জয় বাংলাকে আড়াল করতে চেয়েছিল, দৃশ্যপটে সেই সাবেকী মুখায়ব নিয়ে আবির্ভূত হতে লাগলো জোতদার, পূঁজিপতি, মুৎসুদ্দী, আমলাসহ আরও অনেকে। যাদের জনগনের সেবক হবার কথা ছিল তারা শাসক, শোষখ ও দন্ডমুন্ডের স্বঘোষিত নিয়ামক হলেন? এরপর অনেক জল গড়িয়ে গেল পদ্মা, মেঘনা, বুড়িগঙ্গায়। বহু তেল খড় পুড়িয়ে, বহু সংগ্রাম, ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে জনগনের ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলেন। তার পিতৃ প্রদত্ত ওয়াদা মাফিক তিনি জনগণের ভাত, কাপড়, বাসস্থানের সংস্থান এবং শিক্ষা ও চিকিৎসার উন্নয়নে ব্রতী হলেন। পূর্বে সৃষ্ট বিভাজন ক্রমশঃ স্বল্প পরিসরে স্থিতি পেল। করোনা ভাইরাসের তান্ডব শুরুর আগে উন্নয়নের বহু সূচক বিশ্লেষণে দেখেছি মানুষের মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ু বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, দারিদ্র কমেছে, মাতৃ মৃত্যু ও শিশু মৃত্যু কমেছে, ভিক্ষুক কমেছে, অভাবের তাড়নাজাত চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি কমেছে। দেশ ও বিশ্বকে বিস্মিত করা আরো বহু কিছু ঘটেছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। পাঁচ কোটি মানুষ নিঃস্ব ও নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবৃত্তের বলয়ে প্রবেশ করেছে, মঙ্গা ইতিহাসে আশ্রয় নিয়েছে। আরও উদাহরণ দেয়া যায়, তবে উপসংহার একটাই; আমরা ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছি। অবশ্য কিছু মানুষ মানুষ হবার সুযোগ পেয়েও হয়েছে শোষক, অত্যাচারী, অধার্মিক ও দাম্ভিক। দুর্বৃত্তপনা বেড়েছে অনেক। কিছু চক্র তৈরী হয়েছে। তারপরও দুর্বৃত্তায়নের অর্থনীতিটি বলতে গেলে চোখে পড়েনি কেননা মানুষের কাজ ছিল, পেটে ভাত ছিল, কাপড় ছিল, এমনকি কাজ না থাকলেও ভাতের কমবেশী নিশ্চয়তা ছিল। একটা ছন্দময় জীবন ছিল। দুঃখ-বঞ্চনার বোধটা তীব্র ছিল না। তাই দৌরাত্ম, অর্থ পাচার, বেগম পাড়ার কৃত্তিমান স্বামীদের কর্ম ও কথা তেমন চোখে পড়েনি বা মনে ধরেনি। দিনরাত কর্ম নিমগ্নতার কারনে বহু মানুষ এক বা অভিন্ন স্রোতে মিলেছিল তাই তারা অনেক কিছু দেখেও দেখেনি, কানে শুনলেও মনে ধরেনি। ভিত্তিহীন প্রপাগন্ডা এড়িয়ে গেছে, হরতালে যোগ দেয়নি। কিন্তু করোনা এসে পুরো দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে; আরও দেবে। এখন বহু মানুষ এক ছাদের নীচে কিংবা ক্ষুদ্র বস্তিতে কারারুদ্ধ। হাতে অখন্ড অবসর, গণমাধ্যমের বদৌলতে পরস্পরের মিথসক্রিয়া সম্প্রসারিত ও নিজের সাথে অপরকে মিলানোর সুযোগ অবধারিত। তারা দেখছে মধ্যবিত্তরা কি দ্রুত গতিতে নিম্নবিত্ত হয়ে যাচ্ছে; নিম্নমধ্যবিত্তরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, আর চরম দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস কারীরা সর্বহারায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধার তাড়না তেমন বোধ না হলেও দেশ ও বিদেশের পরিস্থিতি তাদের ভাবিত করছে, তাড়িত করছে, আতংকিত করছে। অতীতে এড়িয়ে যাওয়া অনেক কিছুতেই তারা এমন চোখ মেলছে বা ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য করছে, কান খাড়া করছে, পক্ষ ছেড়ে ক্রমশঃ নিরপেক্ষ অবস্থানে এসে গেছে প্রায়। বিরূপ প্রচারনায় এবং কখনো কখনো প্রাপ্ত বাস্তবতায় তারা বিগড়ে যাচ্ছে, বিরুদ্ধ বাদীদের কথায় সায় দিচ্ছে। শীঘ্রই তারা শুধু ভাবতে নয়, বলতে শুরু করবে যে তাদের বদৌলতে মাটির হাড়ি সোনার হাড়িতে রূপ নিয়েছে; তাদের শ্রমে আর ঘামে কারা কিভাবে গায়ে গতরে বাড়ছে তাদেরকে চিনতে শুরু করছে এবং ক্রমশ বিভক্ত সামাজিক দ্বীপ সদৃশ বিচ্ছিন্ন বলয় তৈরী করছে। সামাজিক মিডিয়া কিংবা গণ মিডিয়ার কারণে তাদের কিছু পূর্ব-ধারণা বা অনুমিতি চাঙ্গা হচ্ছে বা সত্যি বলে প্রমাণিত হচ্ছে। 

হয়তো অপরাজনীতির কারণে বঞ্চনার কল্পিত বোধটি আড়মোড় ভাঙছে। করোনার তান্ডবে খাদ্যের ঘাটতির সম্ভাবনা দেখছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্ব যাত্রা দেখছে, গরীবের হক ও সামনে বাড়ার ইতিবাচক আবহ বিনিষ্ট হচ্ছে।  পরিনামে বিভাজন বাড়বে, ঐ যে অতি প্রাচীন ও অতি কদর্য হ্যাভ আর হ্যাভনট অর্থাৎ বিত্তবান-ক্ষমতাবান এবং বিত্তহীন-ক্ষমতাহীনদের সংঘাত বাড়বে। তাকে উপজীব্য করে বিভক্তি ও বিভাজন সৃষ্টির খলনায়করা তৎপর হচ্ছে। সমান্তরালে বাড়বে বিভেদ, বৈষম্য, শোষন, নির্যাতন দুর্বৃত্তায়ন, মাদকের অনুপ্রবেশ, জঙ্গীর উত্থান। ক্ষোভ বিক্ষোভে রূপ নেবে, বিক্ষোভ আন্দোলনে বা অন্য কোন রূপে নেবে। তাই শিখাটা দাবানলে রূপ নেবার আগেই ব্যবস্থা চাই। লক ডাউন শিথিল হচ্ছে, আরও পরিকল্পিত শিথিলতা কাম্য। বেকারত্ব ঠেকাতে বা বিদেশী বাজার ধরে রাখতে কিংবা বিদেশ প্রত্যাবর্তনের পুর্নবাসনে এই শিথিলতা আরও প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে, তাই অভাবী মানুষের কাছে খাদ্য সামগ্রীসহ নিত্য প্রয়োজনয়ি দ্রব্যের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে আরো বহুদিন। গৃহে আবদ্ধ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষামুখী করতে হবে। অব্যবহৃত ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুলভে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। কৃষকের পণ্যের কাঙ্খিত মূল্য দিতে হবে, বাজারে চাহিদা ও সরবরাহে সামঞ্জস্যতা আনা প্রয়োজন। আম ও লিচুগুলোর পচনের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। এ’সবে ও খাদ্যে রাসায়নিক ব্যবহার কঠোরভাবে দমন করতে হবে। জিডিপিতে ও কর্মসংস্থানে ব্যাপক অবদানকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পুঁজি বাজারটা সচল করে তাকে নিস্কলস ও গতিশীল করতে হবে। অপকর্মের অপসায়ন এক আবারও বলছি, বহু মানুষ এ’কদিনে দরিদ্র হয়ে গেছে। চিকিৎসার দুর্বলতা গুলো স্পষ্ট হচ্ছে। অভিযোগ আসছে মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে, চিকিৎসা ও খাবার নিতে গিয়ে অশোভন আচরনের শিকার হচ্ছে। এসব কিছুকে মিথ্যা, কল্পিত বা ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিলে ক্ষতির পরিমান বাড়বে। সরকারের কথিত সিদ্ধান্তহীনতা, দৌদল্যমানতা ও নিস্ক্রিয়তার আমলাতোষনকে তথ্য, যুক্তি ও কাজ দিয়ে মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে। কাজ করেও মজুরী পাচ্ছে না, কাজের যথোপযুক্ত মজুরী, চাকুরীর নিশ্চয়তা, ভাড়া বাড়ি থেকে উচ্ছেদ প্রতিহত করতে হবে। তবে বিপরীতে অবস্থানকারীদের সত্যি ও যৌক্তিক অভাবগুলোতে দৃষ্টিদান আবশ্যক হবে। এসব যে শুধু সরকার করবে, তা কেন হবে, সরকারের ফ্রন্ট লাইন সুবিধাভোগীরা কেন আরও সজাগ আরও যত্নবান বা ক্রিয়াশীল হচ্ছে না? বিত্তবানদের এমন ভাবে এগিয়ে আসতে হবে যেন তাদের শোষক, লুটেরা চেহারাটা দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বরূপ ও মাত্রা বাড়াতে হবে। ইচ্ছে করলে তারা কিন্তু লোকচক্ষুর বা চক্ষু লজ্জায় আক্রান্তদের জন্যে সহায়তার হাত বাড়াতে পারেন। একজন সামান্য রিকশাচালক বা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা যদি তার সামগ্রিক সামর্থ জনকল্যাণে তুলে দিতে পারেন, তখন বিত্তশালীরা চিরাচারিত কারুনের অবস্থান ছেড়ে হারুনের অবস্থানে চলে আসতে পারেন।

এই সংকট সহসা যাবে না, প্রবৃদ্ধির চালক যে নিম্নগামী হবেই। চাকুরী-বাকরিতে ভাটার মাত্রা আরও বাড়বে, সাথে সামাজিক অস্থিরতা ও কম্পন বাড়বে। আমরা তো হিমবাহের শীর্ষ ভাগ দেখছি মাত্র। তার আকার আকৃতি আরও বাড়তে পারে। সারা বিশ্বের ক্ষতি কেউ বলছেন তিন হাজার কোটি ডলার আর কেউ বলছেন নয় হাজার কোটি ডলারের উপরে। অনুমান যাই হোক না কেন, আমাদের সর্বোচ্চ ক্ষতি মোকাবেলার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। ক্ষোভ-বিক্ষোভ ক্রোধ বা বিদ্রোহকে প্রশমিত করার উপায় হচ্ছে কর্ম সংরক্ষন, কর্মসস্থান সম্প্রসারন। ভিত্তিহীন প্রচার প্রপাগান্ডার লাগাম ধরে রাখতে হবে।

এখন রাজনীতিবিদদের নির্বাচনী এলাকা পূর্ণকর্ষনের অপূর্ব সুযোগ। দুর্দিনে পাশে থাকার কথা দুর্গত ও দুস্থরা বেশি মনে রাখেন। নিজেরাই অভাবীদের হাতে শ’টাকা তুলে দিয়ে সহস্র টাকার কৃতজ্ঞতা ভরা চাহনী দেখছি। অতীতে বড় অংক তুলে দিয়েও এমন অভিব্যক্তি দেখিনি। 

রাজনীতিবিদদের বলি, করোনা আপনাদের মানুষের কাছে যাবার, থাকার ও সেবার অপূর্ব সুযোগ করে দিয়েছে। সজাগ হতে, বিবেচক হতে, সবশেষে সবাইকে মানবিক হতে বলছি। এটা হবে বাঙালিত্ব ধরে রাখার ও এগিয়ে দেবার মোক্ষম বিনিয়োগ।

 

*শিক্ষাবিদ, অনন্য মুক্তিযোদ্ধা ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী