banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥

করোনার রাহু গ্রাস শুরুর আগে আমি ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে তিনটি ঘটনা নিজ চোখে দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরার সম্প্রসারিত প্রকল্পের কোল ঘেষে একটি সনাতন গ্রাম সংলগ্ন মসজিদে। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের স্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে মাইল খানেক পূর্ব-উত্তরে এমন মজার বিষয় অবলোকন করবো তা আমি ভাবিনি। সেদিন ছিল শুক্রবার। জুম্মার নামাজ পড়তে আমি সেই মসজিদে পা রাখলাম। ওযু সেরেই নিয়েছিলাম, তাই শুধুমাত্র জুতা জোড়া হাতে নিয়ে এগিয়ে যেতেই কিছু স্বেচ্ছাসেবক বললেন যে, ‘আমাদের মসজিদে জুতা রাখার কোন নির্দিষ্ট জায়গা নেই। আপনি জুতাগুলো বাইরে রেখে দিন’। আমি আপত্তি তুললাম। তারা আমাকে নিশ্চয়তা দিলেন যে এই গাঁয়ে কোন জুতো বা সেন্ডেল চোর নেই। আমি দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে জুতা বাইরে রেখেই মসজিদে ঢুকলাম। ফিরে এসে আমার জুতা জোড়া অবিকৃত পেলাম আর অন্য সবাই মসজিদের বাইরে রাখা স্তুপ থেকে নিজ নিজ জুতা-সেন্ডেল খুঁজে নিলো। আমি একটু তাজ্জবই হলাম। সাথে সাথে আমার মনে পড়ে গেল বহুদিন আগের আর একটি ঘটনার কথা। 

তখন আমি ঢাকা বিশ্বদ্যালয়ের পড়াচ্ছি এবং মাঝে মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজে যেতাম। সেদিনে তো বটেই, এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব মসজিদে জুতা রাখার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল এবং এখনও আছে। চোর-ছ্যাচ্চার থেকে জুতা বা সেন্ডেল রক্ষার জন্যে সেজদার সামনেই হয় বাক্স বানিয়ে বা অন্য কোন ব্যবস্থায় জুতা সংরক্ষনের ব্যবস্থা আছে। কোন কোন মসজিদে তারপরও নির্দেশ আছে ‘জুতা সেন্ডেল নিজ দায়িত্বে রাখুন’। 

বিষয়টি আমি তেমনটা পছন্দ করিনি কোনদিন। আমার মনে হতো আল্লাহকে সেজদা না করে (আস্তাগফিরুল্লাহ) আমরা যেন আমাদের জুতা সেন্ডেলকেই সেজদা করছি। উপায় ছিল না, তাই আমি অনিচ্ছায় জুতা জুতার বাক্সে রাখতাম কিংবা আমার পাশে রাখতাম। সেদিন আমার এক জোড়া নতুন সেন্ডেল ছিল, তাই গুরুত্ব বিচারে আমি সেন্ডেল জোড়া অতি কাছে রেখেছিলাম। সেন্ডেল দু’টার প্রতি অতি সতর্কতার কারনে আমার নামাজে আত্ম-নিবেদন বা নিমগ্নতা সম্ভব হচ্ছিল না। তবুও দু’রাকাত নামাজ শেষে ইমাম যখন ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বলছেন আমি তখন ক্ষানিকটা অসতর্ক হয়ে পড়লাম। এই সুযোগে আমার পাশে বসা ব্যক্তিটি আমার সেন্ডেল জোড়া নিয়ে দিল ছুট। সবাই নামাজে, আমি আর কি করি। সেন্ডেল হারালাম আর মনে মনে বললাম অভাব বা স্বভাব মানুষকে খোদা ভীরুতা থেকেও বিরত রাখে না। আমার স্থির ধারনা হলো যে নতুন সেন্ডেলটি বিক্রি করে সে ধার্মিক বেশী চোর অধিক দাম পাবে বলেই আখেরাতের তোয়াক্কা না করে আল্লাহর ঘর থেকে চুরি করে ছুট দিল। অভাবের তাড়নায় যে এক মুহূর্ত তার ঝুঁকির কথা ভাবেনি। 

অভাব তো এই দেশে দীর্ঘদিন ঝেঁকে বসেছিল। ছোট বেলার একটা গল্প বলি, আমি তখন সম্ভবতঃ ক্লাশ টু’তে পড়ি। বছর খানেক আগে আমার বাবা মারা গেছেন; ক্যানসারে মারা গেলেন, বিনা চিকিৎসায়। তখন ক্যানসারের চিকিৎসা ছিল না। ছিল না কলেরা বা ওলাওঠার চিকিৎসা। কলেরাকে স্ব-নামে উচ্চারন ছিল রীতি-বিরুদ্ধ, বলা হতো ওলাবিবির আগমন। এই ওলাবিবির কারনে গ্রাম কি গ্রাম উজার হয়ে যেত। ঝাড়ফুঁক থেকে শুরু করে হেন অপকাজটি নেই যা গ্রামের মোল্লা বা অন্য ধর্মের ধর্মগুরুরা করতো না। কতো গাল গল্পের উৎস ছিল সেই ওলাবিবি। কেউ কেউ আজকের করোনার মতোই সেই ওলা বিবির সাথে কথাও বলতো এবং জেনে নিতো কবে সে চলে যাবে। চোখ বুঁজে রায় দিত যে অমুক দিনে ওলা বিবি চলে যাবে। এ দিয়ে অনেকে আর্থিক ও সামাজিক সম্মান সূচক ফায়দা লুটতো। তখন গ্রামে আরও ছিল গুটি বসন্ত যার কোন চিকিৎসা ছিল না। আমার বড় বোনের গুটি বসন্ত হয়েছিল। তিনি সেরে উঠেছিলেন কিন্তু তার মুখে চিরদিনের জন্য গুটি বসন্ত চিহ্ন এঁকে দিয়েছিল। অল্পের জন্যে তার চোখ দু’টি রক্ষা পেয়েছিল। তখন কালাজ্বরের একমাত্র চিকিৎসা ছিল ধনীর জন্যে ব্রহ্মচারী ইনজেকশন আর দরিদ্রদের জন্য মাথায় পানি ঢালা, আল্লাহ বা ভগবানের নাম জপা আর মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করা।  তখন ম্যালেরিয়া ছিল, তবে ম্যালেরিয়ার জন্য কিছু চিকিৎসাও ছিল। আমার বড় চাচা ডাঃ আদম আলী ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা করতেন- সর্বোচ্চ আট আনা (বর্তমানে ৫০ পয়সা) ফি নিতেন, অধিকাংশ সময় গরীব মানুষের থেকে কোন ফি নিতেন না। সময় সময় ফি তো দূরের কথা নিজের গাটের পয়সা দিয়ে রোগীদের ঔষধ বানিয়ে দিতেন। ঔষধ বানাতেন বিভিন্ন অনুপান (উপকরণ) মিশিয়ে হামান দিস্তায়। আমার মা তাতে সাহায্য করতেন। কার্যতঃ মা ছিলেন বড় চাচার কম্পাউন্ডার। ডাক্তার চাচার এমন মনোভঙ্গীর কারনে তিনি কোনদিন স্বচ্ছল হতে পারেননি। দরিদ্রতা নিয়েই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন তো গাও-গেরামে প্রায় নব্বইভাগ লোকই ছিল দরিদ্র। এত দরিদ্র মানুষের ডাক্তারের ফি দেয়া আর ঔষধ কেনার সামর্থ ছিল না। পেটে ভাতেও কাজ পাওয়া যেত না। খোদাভীরুতা প্রবল ছিল বলে চুরি, ডাকাতি কম ছিল, তবে যারা চুরি ডাকাতি করতো তারা প্রথমে জান বাঁচাতে, পরে নেশায় এবং সবশেষে স্বভাবে পেশাদার হয়ে যেত। তখন প্রবাদ ছিল ‘যক্ষা হলে রক্ষা নেই’। যক্ষাকে বোধ হয় এখনও ক্ষয় রোগও বলে। আমার বাবার ক্যান্সারের কথা বললাম আসলে তার ক্যান্সার হয়েছিল কিনা তা বুঝেছি বহু পরে। ঝড়ে আমার বাবার পায়ে একটি মাদার গাছ পড়েছিল। কাঁটাযুক্ত এই গাছটি তার পায়ে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। সে ক্ষতটি আর শুকায়নি। তিনি একটি বড় এবং বলতে গেলে নিঃস্ব পরিবারের ভার আমার মায়ের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে চলে গেলেন। আমার বাবা পড়াশুনার ছেলে রাজনীতি বেশী পছন্দ করতেন। কংগ্রেস করতেন আর পাশাপাশি খিলাফত আন্দোলনেরও যুক্ত ছিলেন। কুমিল্লায় অভয় আশ্রমে ঘাঁটি গেড়ে থাকা বড় বড় রাজনৈতিক নেতার সাথে তার চেনাজানা ছিল। রাজনীতি করলে জনকল্যাণ ছাড়া আত্মকল্যান করতে হয়, তা তার জানা ছিল না। তাই যখন তিনি বিয়ে করেন তখন তার কাছে বিত্ত বলতে পিতৃ প্রদত্ত সামান্য কিছু জমি-জমা, গাই-গরু ও নগদ ফসলি উঁচু জমি ছিল। ধানের জমি গুলো ছিল নিম্নাঞ্চলে। গরু বাছুরের কোন চিকিৎসা ছিল না। তাই প্রতি বছরে আমাদের গাভী বা বাছুরের সংখ্যা ছিল কমতির দিকে। বাবা মারা যাবার পর আমার মা সবকিছুর দায়িত্ব নিতে চাইলে আমার বিত্তবান ও প্রভাবশালী নানা মাকে তার কাছে নিয়ে যেতে চাইলেন। ইসলামের বিধানমত তার সম্পত্তির একটা অংশ মায়ের পাওনা ছিল। নানা প্রলোভন দেখালেন। মা নানার মতলব বুঝতে পারলেন। আটাশ কি উনত্রিশ বছর বয়সে মা বিধবা হয়েছেন বলে তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার ধর্ম পালনের সুযোগ দিতে নানা এসেছিলেন। আমার মা বেঁকে বললেন, কোন অবস্থায় আমাদের মানে আমার পাঁচজন বোন ও আমাকে নিয়ে তিনি স্বামীর ভিটায় স্থিতি হলেন। আমি তখন নানার প্রাইমারী স্কুলেই ভর্তি হলাম। কিন্তু মায়ের ভালো লাগতো না বলে তিনি আমাকে কাছে নিয়ে এলেন। বাড়ির কাছে দক্ষিন চর্থার থিরাপুকুর পাড় প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। একবার প্রথমে খরায় ও পরে প্রবল বন্যায় আমাদের উঁচু জমি ও নীচু জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেল। দেশেও দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হলো। অতীতেও দেখেছি এমন অবস্থায় কারো সর্বনাশ ও কারো পৌষ মাস অবস্থা। টাউট বাটপারদের পৌষমাস আর গরীবদের সর্বনাশ। ইউনিয়ন কাউন্সিলের তদানিন্তন প্রধানকে তখন বলা হতো প্রেসিডেন্ট আর ওয়ার্ডের নির্বাচিত প্রতিনিধিকে বলা হতো মেম্বর। সৌভাগ্য আমার, আমাদের তখনকার চৌয়ারা ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আমার ফুফাতো ভাই সম্পর্কিত আর বামিশা এলাকার মেম্বর ছিলেন আমার মামা। নানার বখে যাওয়া ছেলে আবদুল আজিজ লোকে আড়ালে আবডালে যাকে আইজ্জা ডাকাত বলতো। তিনি আমার মায়ের সৎ ভাই ছিলেন। আমার নানার তৃতীয় পক্ষের একমাত্র সন্তান ছিলেন আমার মা, প্রথম পক্ষের স্ত্রী নিঃসন্তানে প্রয়াত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর গর্ভে আমার পাঁচ মামা ও এক খালা ছিলেন। আমার নানার দ্বিতীয় পক্ষের শ্বশুর ছিলেন ওয়াহাবি আর আমার নানা ছিলেন সুন্নী। আমার বুঝ হবার পরও দেখেছি উভয় পক্ষ মারামারি করতে লাঠিয়াল পালন করতেন। নানার লাঠিয়ালদের হুন্দবী বলা হতো। আমাদের কাছে তাদেরকে ভালো মানের মানুষ বলে মনে হতো না। এ লোকগুলো ছিল সন্দীপের আদি বাসিন্দা। নদী ভাঙ্গনে নিরুপায় লোকগুলো দলবদ্ধ হয়ে এসে নানার আশ্রয়ে চাষাবাদ ও লাঠিয়ালের দায়িত্ব নিয়েছিল। আমার জানামতে তাদের কেউ কেউ আইজ্জা ডাকাতের নিকট সঙ্গীও ছিল। ধান ভানতে শিবের গীত ছেড়ে এবার আসল কথায় আসছি। 

সেবারের খরা ও বন্যায় ফসল ক্ষতির পর আমরা প্রথমবারের মতো চরম দরিদ্রের কোঠায় চলে গেলাম। মাঝে মাঝে আমাদের অনাহারে থাকতে হতো। আজকের মধ্যবিত্তদের মতো অভাবেও মুখ খুলে কারো কাছে কিছু চাইতে অন্ততঃ আমার মায়ের প্রবল অনীহা ছিল। আমি জানিনা তিনি কেন এমন আত্ম মর্যাদা লালন করতেন আর সেটা যে আমার মাঝে সংক্রমিত হয়েছিল সে কথা অন্য কোনদিন বলবো। তিনি বলতে গেলে প্রায়শঃ লুকিয়ে লুকিয়ে আধপেটা থাকতেন। বয়সে ছোট হলেও বিষয়টি আমার দৃষ্টিতে এড়িয়ে যেত না। একদিন চুপিচুপি আমি রিলিফের চাল বা গম পেতে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। সবার সাথে আমি প্রতিবেশি ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টের বিশাল গোদাম ঘরের সামনে লাইনে দাঁড়ালাম। সাহায্য প্রার্থীদের লাইন থেকে আমাকে অন্যেরা ঠেলেঠুলে আরও পিছনে ফেলে দিচ্ছিল। কিছু না বলে বরং মুখ লুকোতেই আমি ব্যস্ত ছিলাম। কারন, তা না হলে চাউর হয়ে যাবে যে অমকের ছেলে বা অমকের নাতি রিলিফের জন্যে লাইনে দাঁড়িয়েছে। খবর জানাজানি হলে মা আমাকে বেদম না হলেও, প্রচুর পিটুনি দেবেন। বেলা গড়িয়ে পড়ার পর আমার রিলিফ প্রাপ্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি হলো। টাউট বাটপারদেরকে পার্শ্ব প্রতিদানের বদলে আগেই কিছু রিলিফ সামগ্রী অন্যেরা পেল। আমার হাতে কোন পয়সা ছিল না। তাই আমার অন্যকে কি দিয়ে ম্যানেজ বা সামলানোর উপায় ছিল না। সারাদিন না খেয়ে থাকায় আমার মেজাজটা চরম তিরিক্ষে ছিল। দুর্ভাগ্য আমার, আমার মুখের সামনেই গোদামের দরজা বন্ধ করে আমাকে পরের দিন ধর্না দিতে বলা হলো। এবারে প্রবল বাধা এড়িয়ে আমি ইউনিয়ন কাউন্সিলরের প্রেসিডেন্ট ও মেম্বরের সামনে হাজির হয়ে রিলিফ দাবি করলাম। প্রেসিডেন্ট সাহেব আমাকে চিনেও না চেনার ভান করলেন; অবশ্য মামা আমাকে এড়াতে পারলেন না। সৎ ভাই হলেও তিনি আমার মাকে বড্ড আদর করতেন এবং আমাদের ব্যাপারে তিনি অতি স্নেহের ব্যবহারই করতেন। একবার আমার হাত থেকে মাগুর মাছ ফসকে গিয়ে তার হাতে গেঁথে বসলো। সেদিন আইজ্জা ডাকাতের স্বরূপ দেখার সুযোগ হয়েছিল। তার রক্তাভ চোখ আর তর্জনগর্জন দেখে আমি এতটা ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলাম যে আমি আমার প্রস্রাব ধরে রাখতে পারিনি। ক্ষানিক পরে তিনিই বললেন যে ‘অমুকের ছেলে বলে আজ তুই বেঁচে গেলি’। সেই আজিজ মেম্বারের সম্মুখীন হলাম। তিনি আমাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। অতি সন্তর্পনে বাড়ি ঢুকলাম। মা রেগে থাকলেও আমার শুকনো মুখ দেখে কিছু বললেন না। নিজে না খেয়ে আমার জন্যে তুলে রাখা খাবার গুলি আমাকে খাওয়ালেন। ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছিল, চোখের পানি সামলাতেও কষ্ট হচ্ছিল। তবুও আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম একারনে যে ভিক্ষুকের লাইনে দাঁড়িয়ে রিলিফ প্রার্থনার কথা তিনি তাৎক্ষনিক তিনি জানতে পারেননি। বেদম পিটুনী থেকে বেঁচে গেলাম। তবে এ’কথা বহুদিন পরে আমার মা জানতে পেরেছিলেন। আমার এক আত্মীয়ের পরামর্শে আমি মামাদের কাছে জাকাত চাইলাম। মার সামনেই আজিজ মামা আমাকে জাকাত পাবার অযোগ্য বলে ঘোষনা দিলে এবং রিলিফ সামগ্রীর জন্যে আমার লাইনে দাঁড়ানোর গল্পটা ফাঁস হয়ে গেলো। মা তার ভাই ও আত্মীয়দের সামনে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়লেন না ঠিকই, কিন্তু বারণ করে দিলেন আমি যেন কোনদিন আর ভিক্ষুকের মতো কারো কাছে হাত না পাতি। কি মোক্ষম শিক্ষা, আর কি স্বার্থক শিক্ষিকা। তার আমি জীবনে কারো কাছে কদাচিত হাত পাতিনি। নবীন শিক্ষার্থীদের পরিচিতি সভায় সামনে আমার ডান হাতটি চিত করে বলি ‘এটা ফকিরের হাত’ আর উপর করে দেখাই ‘এটা ভিক্ষুকের হাত’। তাদেরকে উপর করা হাতের অধিকারী হতে শিখাই। মায়ের শিক্ষার নিবেদিত অনুশীলন। পরে সংসার চললো কিভাবে তা বলতে গেলে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে; তাছাড়া কারন আমি এমন কেউ কেটা পরের জীবনে হইনি যে আমার কথায় কেউ শিউরে উঠবে বা আহা উঁহু করবে। তবে বিকল্প খুঁজে নিয়েছিলাম, চুরি বা ডাকাতি নয়, সমাজ স্বীকৃত কঠোর জীবন ও জীবিকা দিয়ে। তারপর থেকে আমি দারিদ্রের শৃঙ্খল ভাঙ্গার চেষ্টা করেছি। 

দরিদ্রকে নয় দারিদ্রতাকে প্রচন্ড ঘৃনা করেছি এবং তাকেই বিমোচনে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধকালে বহু প্রাপ্তির কথা মনে দোলা দিত, দারিদ্র বিমোচন অন্যতম ছিল। আরও ছিল রোগমুক্ত, কুসংস্কার মুক্ত সমাজ। তাইতো বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকাবস্থায়ও সুখের দিনে মুক্তিযুদ্ধে চলে গিয়েছিলাম। প্রত্যাশা ছিল- একদিন দারিদ্র আমাদের ছেড়ে যাবে। দেশ শত্রুমুক্ত হলো, বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে ফিরে এলেন। অনেক কাজের মাঝে দারিদ্র মুক্তির ইরাদা নিয়ে যখনই আগাচ্ছিলেন, তখনই কুচক্রীমহল তাকে স্বপরিবারে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল। আমার প্রত্যাশা ছিল বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে ১৯৮২ কি ১৯৮৩ সালে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা শতকরা বিশ ভাগে নেমে আসবে। আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে স্বশাসিত হয়ে দু’বেলা দুমুঠো ভাত খাওয়া, মাথা গোজার ঠাঁই, রোগে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে গা ঘেষাঘেষি করে সকলের সাথে বসবাস করা। চেষ্টা করেছি অনেক। একবার দেশে তিষ্টিতে না পেরে বিদেশ চলে গেলাম। কিছুটা তিষ্টের অধিকারী হলাম। নিজের সীমিত সামর্থ নিয়ে দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠা করলাম। আন্দোলন সংগ্রামে জড়িয়ে ছিলাম। উদ্দেশ্য ছিলো বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আর তার উত্তসূরীদের ক্ষমতায় এনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তাদের দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন- সর্বাগ্রে দায়িদ্র বিমোচন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা তিমির আধারের বুক চিড়ে ক্ষমতায় এলেন। বঙ্গবন্ধুর মতো তিনি অনেক কিছুর সাথে দারিদ্র বিমোচনে হাত দিলেন ও ক্রমান্বয়ে ক্ষমতাসীন থেকে আশিভাগ দারিদ্রতাকে প্রায় বিশ ভাগে নামিয়ে আনলেন; যার কারনে চুরি চামারি কমে এলো; যার কারনে ঢাকার অভ্যন্তরেও মসজিদ থেকে জুতা সেন্ডেল চুরি প্রশমিত হলো, গ্রামে ফকির উড়ে গেল। স্বভাবের কারনে বা ব্যবসায়ের ফিকিরে তারপরও ঢাকা শহরে কিছু ফকির দেখা যেত। এসব ফকিরকে পয়সা কম দিলে ছুড়ে ফেলে দিত কিংবা কটূকথা শোনাতো। তাই আমি অন্ততঃ এক টাকা, দু’টাকা ভিক্ষা দিতাম না। আমি ভিক্ষুকদের সাবলম্বী হবার পরামর্শ দিতাম; পারলে একটু বড় অংকের অনুদান দিতাম।  
করোনার দৌরাত্ম শুরুর আগে কুমিল্লা গেলাম তিন বার। প্রতিবারেই হাতে কিছু ভাংতি টাকা নিলাম যাতে সেখানে ফকির মিসকিনকে দিতে পারি। প্রথমবারে একটি রেস্তোরায় সপরিবারে খাবার খেয়ে আমি ফকির খুঁজতে শুরু করলাম। ধারে কাছে কাউকে না পেয়ে একটি ছেলে নজরে পড়লো যে লাঠি ভর করে হাঁটছে। আমি তাকে সাহায্যপ্রার্থী ভেবে কিছু টাকা দিতে গিয়ে বেকুব বনে গেলাম। ছেলেটি বললো ‘আমি ভিক্ষুক নই, পায়ে ব্যথার কারনে লাঠি ভর করে হাঁটছি’। 

তারপরের সপ্তাহে আবারও কুমিল্লা যেতে হলো। বামিশায় বসবাসরত আমার খালাতো ভাইয়ের জানাজায় শরীক হতে কুমিল্লার পথে যাত্রা শুরু করলাম। জানাজার পর কিছু গরীব ফকির মিসকিন আসবে জেনে কয়েক হাজার টাকা খুচরা হাতে করে নিলাম। প্রতিটি মান ছিল পঞ্চাশ কি একশ টাকা। আমার মনে বোধ ছিল কম টাকা ফকির মিসকিনরাও নিবে না। 

যাক রামিশায় পৌছলাম এবং জানাযার নামাজের জন্য জুতো জোড়া খুলে মসজিদে প্রবেশে উদ্যত হলাম। অভ্যাসবশতঃ জুতো জোড়া খুলে হাতে নিয়ে সুনির্দিষ্ট বাক্সে ফেলে রাখবো ভেবে জুতায় হাত রাখলাম। বেশ ক’জন ছুটে এসে বললো, ‘আমাদের এখানে জুতোর বাক্স নেই, জুতা আমরা মসজিদের বাইরে রাখি এবং জুতো চুরি হয় না’। আমি অবিশ্বাস নিয়েও ঢাকার উত্তরার পূর্ব বর্ণিত ঘটনাটির কথা স্মরণ করে জুতোজোড়া রেখে নামাজ পড়লাম এবং ফিরে এসে আমার জুতো জোড়া পেয়ে গেলাম। বিস্মিত হলাম বৈকি। আশে পাশে ভিক্ষুক খুঁজেও কাউকে পেলাম না। ভাবলাম হয়তো তারা খবর পায়নি। 

সেহেলামে গিয়েও জুতা চোর পেলাম না। ভিক্ষুকও পেলাম না। এবারে কাউকে ফিস ফিসিয়ে কারন জিজ্ঞেস করলাম। তারা বললো দেশে এখন আর ছোটখাট বা ছিটকে চোর বা ফকির নেই। দেশ বলতে সব বাঙালির মতো তারা নিজের গ্রাম ও পারিপার্শ্বিতাকে বুঝিয়ে ছিল। আমি ভাবলাম আল্লাহ মেহেরবান। তারই করুনায় শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছে এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে অন্ততপক্ষে দারিদ্র ও ছোট খাট চুরি চামারি নিয়ন্ত্রনে এনেছে। 

এ ঘটনা গুলোর মাস খানেকের মাথায় করোনা নামে মহা বিপর্যয়ের সম্মুখীন আমরা হয়েছি। মানুষের আয় রোজগার থেমে গেছে। দীনহীনরাা তো বটেই, ছোট বেলায় আমাদের মতো টনটনে মান-মর্যাদা মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্তরাও সরকারী সাহায্য পাচ্ছে ও নিচ্ছে। টাকা বা সামগ্রীর বিচারে এই সাহায্য একেবারে কম নয়। তবুও দানের সামর্থ কিন্তু কমছে। আয় উপার্জন সংকুচিত হচ্ছে, সরকারি কোষাগারেও একদিন টান পড়বে। আমার মা বলতেন আয় উপার্জন ছাড়া খুঁটে খুঁটে খেলেও রাজ-ভান্ডারে একদিন টান পড়বেই। 

পরের ঘটনা, গত ক’দিনের চুরি চামারির সংখ্যা বাড়ছে বলে শুনেছি, ভিক্ষুকের সংখ্যাও বাড়ছে। নিজ চোখে দেখলাম ভিক্ষুকের ভিড় আর ভিক্ষা সামগ্রী লুফে বা লুটে নিতে করোনাকে তোয়াক্কা না করে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্য। বন্ধু বান্ধবদের কাছে শুনলাম ঢাকা শহরে তো বটেই গ্রামও ভিক্ষুকের সংখ্যা ক্রম বর্ধমান। এই সংখ্যাটা যদি বাড়তে বাড়তে আমার শৈশবের অবস্থায় পৌছে যায়, তাহলে মরেও শান্তি পাবো না। ভিক্ষাবৃত্তির সাথে সাথে অন্যান্য সামাজিক দুবৃত্তপনা বাড়বে নিঃসন্দেহে। আমার ধারনা আমার পূর্বসূরী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ বাংলার সুহৃদগণ স্বর্গে বসেও অস্বস্তিতে ভুগবেন। তাহলে এখন আমরা করবো কি !  


*ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিলেকশান গ্রেড প্রফেসর, অনন্য মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24