banglanewspaper

স্বজন ও বিরুদ্ধবাদীদের কটূকথার ঝুঁকি নিয়েই প্রধানমন্ত্রী ও দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তবে এটা কোন চাটূকারিতা নয়, একজন বিশিষ্ট মানুষের নিরলস পরিশ্রম আর নিষ্ঠার নির্মোহ মূল্যায়ন মাত্র। মূল প্রসঙ্গে আসার পূর্বে আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে দু’একটি কথা বলে নিচ্ছি। আমাদের সংস্কৃতি হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের প্রানীর ন্যায় দুর্নিবার আনুগত্য আর এক প্রানীর মত অনন্য হিংস্রতায় ভরা। কখনো কখনো হিংস্রতায় দিয়ে আমরা সিংহকে ছাড়িয়ে যাই। সময়মত ক্ষমতার প্রত্যাশায় যেকোন সীমা লংঘন করি। কেউ কেউ ক্ষমতার জন্যে এতটা লালায়িত যে তারা ক্ষমতায় যেতে ও ক্ষমতা পেতে নিজের পবিত্র মস্তকটা ক্ষমতার উৎসে সঁপে দিতেও দ্বিধান্বিত নন। আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই নিজের পা দুটো অন্যর কাঁধে বা মাথায় নির্দ্ধিধায় তুলে দিতে উন্মুখ।

ক্ষমতায় গেলে বা পেলে কেউ কেউ ধরাকে সরাজ্ঞান করেন। আমাদের সংস্কৃতির অপর বৈশিষ্ট হলো  সময় সময় কাউকেও ফেরেশতার আসনে বসিয়ে সামান্য দ্বন্দ্বের কারণে তাকে শয়তানের অবস্থানে ঠেলে দেই। এ’সব হচ্ছে চরম পন্থীদের কাজ। মধ্যম পন্থীদের সংখ্যা নিতান্ত কম। মধ্যম পন্থীদের সম্পর্কে রবি ঠাকুরের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে উত্তম নিশ্চিন্তে চলেন অধমের সাথে; তিনিই মধ্যম যিনি চলেন পশ্চাতে। মধ্যম পন্থীদের বৈশিষ্ট সম্পর্কে রবি ঠাকুরের বর্ণনার সাথে আমার মতের মিল নেই। আমার মতে ভালোকে ভালো বলা আর মন্দকে মন্দা বলা হচ্ছে মধ্যম পন্থা। তবে এই ভালো ও খারাপকে দুটো স্থির প্রান্ত ধরে পরিসংখ্যান বা অংকের ভাষায় অগনিত পারমুটেশন বা কম্বিনেশন হতে পারে। সে কারনে সমাজটাতে মধ্যম পন্থীদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। আমি এই মধ্যম পন্থীদের একজন হয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মূল্যায়ন করি। শিক্ষার্থীরা যখন তাকে দেশরত্ন উপাধিতে ভূষিত করেন, তখন আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে, সে উপাধিটা  সে মুহূর্তে যথার্থ কিনা। এখন মনে হচ্ছে এই অভিধা একমাত্র তারই প্রাপ্য এবং প্রতিদিন বলতে গেলে প্রতিটি কাজে তিনি তার প্রমান রেখে যাচ্ছেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে কোন একটি লেখায় আমি একবার তার এই অভিধার মূল্যায়ন করেছিলাম। ব্যতিক্রম এ’বছরটি অথচ এ’বছর তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটির আশ-পাশ ঘিরে এমন কিছু দুঃসাহসিক কাজ করেছেন যার বিরূপ সমালোচনা না করে ইতিবাচক মূল্যায়নের প্রয়োজন ছিল। আর সেটা হোত তাকে কর্মযজ্ঞে নিবিষ্ট রাখার প্রণোদনা।

এ’যাবত তিনি যেসব ভালো কাজ করেছেন, ১৯৭৫ সালের পর কে বা কারা যুগপত ভাবে তার ত্রিশ শতাংশ কাজও করেছেন? তার ভালো কাজের ফিরিস্তি দিতে গেলে অনেক কিছু এসে যায়। তাই মাত্র বিগত কয়েক সপ্তাহের কিছু কাজের একটা বর্ণনা দেব। তিনি ভুল করেন না বলব না, কিন্তু পরিকল্পিত ভুল করেন নিতান্তই কম। ভুল ত হতেই পারে; তিনি ত অতিমানব নন কিংবা ফেরেশতার বিপরীত সত্বাও নন। এই দুর্যোগ ও দুঃসময়ে অন্য কেউ ক্ষমতায় থাকলে কি করতেন তা ত অতীত ধরেই বলা সম্ভব। আমাদের স্মৃতি বড্ড ক্ষীণ আর ভালো কাজের প্রশংসা নিরন্তর অনুপস্থিত। এই ক’দিনে ঘটে যাওয়া কিছু জিনিষের প্রতি তাকান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতাকে ঝেড়ে মুছে ফেলার প্রয়াসগুলো কি প্রশংসার যোগ্য নয়? ত্রাণ আত্মসাতের অভিযোগ উঠার সাথে সাথে দলমত নির্বিশেষে যে ব্যবস্থা নিয়েছেন তাকে আমি চরম পদক্ষেপ বলব; যার বর্তমান ও সুদূর প্রসারী ফলাফল রয়েছে। এই যে ৬৪ জেলায় ৬৪ জন সচিবকে দিয়ে ত্রাণ ও কল্যাণের কাজ; মাননীয় এমপিদের টপকিয়ে জেলা প্রশাসকদের দিয়ে ঈদ কেন্দ্রিক ত্রাণ ও কাপড় চোপড়  বিতরনের দায়িত্ব কিংবা ৮ লাখ ভূয়া ত্রাণ শিকারীর টেলিফোন বাতিল ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের পদক্ষেপ কি সঠিক ও দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নয়? শেখ হাসিনা ছাড়া অতীতে এমন কাজ আর কে করতে পেরেছে? স্বল্প সময়ে এক যোগে এতগুলো জনহিতকর পদক্ষেপ কে কবে নিয়েছে? মাত্র ক’দিন আগে শ’খানেক নেতাকর্মীদের দলের ভাবমূূর্তি ভঙ্গের কারনে শীতল ঘরে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে ত বটেই পৃথিবীর কোথায় কবে নিজ দলের মানুষের প্রতি এমন শানিত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? এমন ব্যবস্থা যে কি ঝুঁকিপূর্ণ তা তার মরহুম পিতার সপরিবারে হত্যার পর কি বুঝা যায়নি?  মহান নেতার বহু ইতিবাচক পদক্ষেপের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখার আমার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হলে আমার তিন ‘বেয়াকুব’ প্রতিরোধ গড়তে রাস্তায় নেমেছিলাম। তাদের দু’জন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আর একজন ছিলেন সরকারী আমলা। ছোট বড় কাউকেও প্রতিরোধে টানতে পারিনি। তাদের কেউ কেউ খেয়ে খেয়ে এত মোটা হয়েছিলেন যে তারা ভূমি ছেড়ে দাঁড়াতে পারেননি। আবার কেউ কেউ না খেয়ে এতটা শীর্নকায় হয়েছিল যে তারাও উঠে দাঁড়াতে পারেননি। তাই প্রতিরোধ ত দূরের কথা বঙ্গবন্ধুর মরদেহের সৎকারের পদক্ষেপ না নিয়ে তারা অনেকেই চাচা আপন প্রান বাঁচার ভূমিকায় নেমেছিলেন। আমরা রাস্তায় নেমে আর এক ধরনের মানুষ দেখলাম যারা ছিল তার অতি ভক্ত-অনুরক্ত। সেদিন তাদের কারো কারো উক্তিতে বিস্মিত হয়েছিলাম বললেও কম বলা হবে। একজন সুবিধাভোগী ত বলেই বসলেন, ‘এমন এক নায়কের পরিনতি এমনই হয়’। আর একজন আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি ত এ ক’বছর দেশে ছিলে না। অতএব, তার দুঃশাসন দেখনি’। আমি স্তম্বিত হয়ে ভাবলাম মেজর ডালিম কথা বলছেন নাকি? আল্লাহ না করুক শেখ হাসিনার তেমন কিছু হলে এই যে শক্তিমান মানুষ গুলোকে ত্রান বিতরন থেকে বিরত রাখা হলো, দল থেকে গুটিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা হলো, ৮ লাখ মোবাইল টেলিফোনের প্রভাবশালী মালিকদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থাধীনে এনে বিক্ষুব্দ করা হলো; তারা কি সুযোগ পেলে শেখ হাসিনার সাথে সদয় ব্যবহার করবেন? শেখ হাসিনা তার পিতার হত্যায় কাদের অংশ গ্রহন ছিল, তার দলের কারা নির্লিপ্ত ছিল সবই জানেন। জেনে শুনে তিনি বিষপ্রানও করেছেন। জেনে শুনে বিষপ্রানকারীগনকে মহৎ ও অনন্য ছাড়াও বহু অভিধায় ভূষিত করা সম্ভব? একটু বিরূপ সমালোচনার ঝুঁকি নিয়ে তাকে প্রশংসা করতেই হবে। কারণ ভালো কাজের প্রশংসাই হতে তার কর্মোদ্দীপনার ফলধারা ও নিরন্তর নিজকে সঁপে দেবার জীবনী শক্তি। বুঝতে হবে তিনিও রক্তে মাংসের মানুষ এবং তিনিও উর্ধমূখী চালিকা শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে। তার ব্রত ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ মানে আশা’। এক স্রস্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস রয়েছে তার। সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও পিছিয়ে পড়াদের জন্যে অন্তহীন ভালোবাসা আছে। তাই তিনি বেশী এ’দিক সেদিক  না দেখেই এগিয়ে যান। মাঝে মাঝে তার বিশেষ দিনে বা বিশেষ কারনে আমি যখন তাকে শুভেচ্ছা পাঠাই। তখন আমি বলি ‘সুস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘায়িত হোন যাতে আপনি প্রতিনিয়ত আমাদের মুখোজ্জ্বল করতে পারেন’।

করোনার বিষাক্ত ছোবলে আমরা বিধ্বস্ত ও বিভ্রান্ত। তার মাঝে মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মত আম্পান এল। দিন রাত অমানুসিক পরিশ্রম ও একাগ্রচিত্তে মহাদুর্যোগের মোকাবিলা করে যাচ্ছেন। আমি মনে করি না, এমন দুর্দিন, দুঃসহ ও মরার উপর খাড়ার ঘা জাতীয় সময়ে শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কেউ আমাদের জাতিকে এত উত্তম সেবা দিতে পারতেন? শেখ হাসিনা ফিরে না আসলে আর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না হলে আমাদের কি হোত, তা নিয়ে আগে আলোচনা করেছি। সংক্ষেপে বলছি তিনি ফিরে না এলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশটা হারিয়ে যেত। শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কেউ এত দ্রুত ডুবন্ত স্বদেশকে উদ্ধার করতে পারত না। এবারে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তারিখ আর ঈদের দিনটা কাছাকাছি পড়েছে।  

প্রথমটিতে স্বশরীরে অংশ নেয়া ছিল আত্মহননের সামিল, তেমনি শেষেরটিতে স্বশরীরে অংশ নেয়া হবে তার প্রয়াসকে ভন্ডুল করার উদ্যোগ। গণমাধ্যমকে আকড়িয়ে তার মহৎ ও দুঃসাহসি কর্মের মূল্যায়ন পূর্বক ঈদের শুভেচ্ছা যুক্ত করছি। দেশরত্ন শেখ হাসিনা আপনি যথার্থই নিজেকে দেশের রত্ন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আবারও বলছি আপনি সু-স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘায়ূ হোন যেন আপনি দুখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারেন। আর আমাদের মত মানুষদের উত্তরোত্তর মুখোজ্জ্বল করে যেতে পারেন। এইটুকুু কি খুব বড় প্রত্যাশা?

*শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী