banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥
জীবদ্দশায় তার লেখালেখি আর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে লেখালিখির বদৌলতে আনিস স্যার সম্পর্কে ব্যাপক ধারনা পেলাম। তাকে নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে আমার ছিল, কলম ধরেছিলাম মৃত্যুর দিনে। থেমে গেলাম টাইপ করবে কে? আমিতো বাংলা-ইংরেজীতে বড় ধীর গতির টাইপিস্ট। একটা বিকল্প আছে যা আমি বরাবর করে আসছি অন্যকে দিয়ে করিয়ে নেয়া। ব্যবস্থাপনার একটি সংজ্ঞা হচ্ছে অন্যকে দিয়ে কিছু করিয়ে নেয়া। কিন্তু মনে হলো এত প্রতিষ্ঠিত ও খ্যাতিমানদের লেখার ভিড়ে আমার লেখা ছাপাবে কে? এ চিন্তা আমাকে পিছিয়ে দিলেও একেবারে হতোদ্যম হয়নি।

আমি কমার্সের ছাত্র। তাই লেখালেখি আমার আওতার বাইরে, তবে একটা সময় ছিল আমি যা বলতাম তাই ছাপার অক্ষরে চলে আসতো। তখন আমি প্রশংসার জোয়ারে আর নিন্দার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত ও তাড়িত ছিলাম। তাকে পাঠকের বে-শুমার সরবরাহ ছিল। সম্পাদকরা আমাকে বলতেন ‘আপনি জনসভায় যা বলেন তাই ঢেলে সাজিয়ে পাঠিয়ে দিন। আমরা তাই ছাপিয়ে দিবো। কার্যতঃ হয়েছেও তাই। দুর্বোধ্য হাতের লেখা নিবন্ধগুলো পাঠিয়ে দিলেও তারা ব্যাকরণ ও বানান শুদ্ধ করে তা ছাপিয়ে দিতেন। সে একদিন যা আজ কালের গর্ভে বিলীন, বলতে গেলে রামও নেই; অযোদ্ধাও নেই। সময়টা ছিল ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে গণ আদালত অনুষ্ঠানের কাল। প্রফেসর আনিসুজ্জামের সাথে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার সুবাদে ও মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারনে চেনা ছিল, জানা ছিল না তেমন। আমি তার সহকর্মী হলেও ছাত্র ছিলাম না, তবুও তাকে স্যার সম্বোধনে দ্বিধান্বিত ছিলাম না। আনিসুজ্জামান স্যার ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি হয়ে আর আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি হয়ে একই লক্ষ্যে মিলিত হলাম। আমার প্রস্তাবে ও রাজনীতিবিদ এবং ছাত্রদের চাপে দু’টোকে একত্রিত ও সমন্বিত করে আমার দেয়া ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মুল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ নিয়ে আমরা একত্রিত ছিলাম, যার অতি সংক্ষিপ্ত নাম ছিল জাতীয় সমন্বয় কমিটি। রাজপথে তার দেখা কম মিললেও ঘরোয়া বৈঠকে ও বক্তৃতায় তাকে নিয়মিত পাওয়া যেত।

গণ-আদালনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর তাকে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবার অনুরোধ করলে তিনি বাস্তবতার খাতিরে একজন অভিযোগকারী হিসেবে সংযুক্ত হতে ত্বরিত সম্মতি দিলেন। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত গণ-আদালতে তার বা অন্যকারো অভিযোগ ও সাক্ষ্য উপস্থাপনের সুযোগ ও উপায় ছিল না। গণ-আদালতের জন্যে গড়া মঞ্চটি বিএনপি সরকারের পুলিশ গুড়িয়ে দিল এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের সব ক’টি প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিল। ২৫শে মার্চ রাতে বন্দীত্ব এড়াতে এবং রায় লেখার প্রয়োজনে আমি তদানিন্তন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সরকারী বাসায় ছিলাম। গণ-আদালতে জনসমাগমের নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি আমাকে সেদিনের জন্যে সাভার স্মৃতি সৌধে না গিয়ে আদালত অনুষ্ঠানস্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাঠিয়ে দিলেন। আমি সরাসরি সেখানে না গিয়ে হাইকোর্টে গেলাম যেখানে গণ আদালতের সকল উদ্যোক্তাই উপস্থিত ছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাকে সর্বসম্মতিক্রমে সেখানে পাঠানো হলো। ছাত্ররাই ছিল ময়দানের প্রধান শক্তি আর মাত্র কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সলিমুল্লাহ হলের প্রভোষ্ট থাকার সুবাদে আমি তাদের মাঝে গ্রহণযোগ্যও ছিলাম। ওখানে অবস্থা দেখে আমার চক্ষু চড়ক গাছ, মনে হলো গণ-আদালত করা যাবে না। ছাত্রনেতা ও জননেতা বিশেষতঃ মায়াকে ডেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট সংলগ্ন উদ্যানের দেয়ালটি ভেঙ্গে তা দিয়ে গোটা কয়েক ট্রাক ঢুকিয়ে মঞ্চ তৈরীর অনুরোধ তৎক্ষনাত কার্যকর হলো। এ’সময়ে গণ-আদালতের সদস্যগন পুলিশ ও জনতার ভিড় এড়িয়ে ট্রাকের উপরে নির্মিত আদালত মঞ্চে উপস্থিত হতে পারেননি। কষ্টে সৃষ্টে মাত্র এক পঞ্চমাংশের মত মূল নেতাদের তুলতে সক্ষম হলেও আনিস স্যারকে ট্রাকে তুলতে পারিনি। যাক গণ-আদালতের রায় শহীদ জননী লাখ লাখ জনতার সামনে পড়ে শুনাতে লাগলেন, মাইক্রোফোন কেড়ে নেয়া হলো বলে আমরা তার ক্যান্সার আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ মুখ নিঃসৃত কথাগুলো এক মুখ থেকে অপর মুখ পর্যন্ত পৌছিয়ে দিচ্ছিলাম। আমরা গোলাম আযমের ফাঁসির কথা না বললেও তার কৃতকর্মের অর্থাৎ অপরাধসমূহ ফাঁসিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষনা দিলাম। আওয়ামী লীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমানকে চালক বানিয়ে আমি ও জাহানারা ইমাম টিয়ার গ্যাসের শেল, পুলিশের লাঠিচার্জ ও সরকারি গুন্ডাদের এলোপাথাড়ি আক্রমন পেরিয়ে কোন রকমে প্রেস ক্লাবে হাজির হলাম। প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের জন্য প্রেস রিলিজটা আমি পাঠ করেছিলাম। এই পর্যায়ে আনিস স্যারকে বলতে গেলে হারিয়ে ফেললাম, তবে হাইকোর্টে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে হাজিরা দিতে গিয়ে আমরা সবাই পরে একত্রিত হলাম। আনিস স্যারের মত বড় মাপের মানুষদের সাথে আমিও জামিন পেলেও তা নিশ্চিতকরনের জন্যে নিম্ন আদালতে যেতে হলো। ঢাকা কোর্টে আমরা ২৪ জন উপস্থিত হলেও সেদিন কোর্টে আইনজীবি, বুদ্ধিজীবি, ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমিক ও মুক্তিযোদ্ধা মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এ’সবের পরোয়া না করে এক বিচারক আমাদের প্রতি আক্রোশ হেতু সবাইকে এজলাসে হাতজোড় করে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলেন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমরা উচ্চবাচ্য না করলেও প্রচন্ড হট্টগোল, হৈচৈ-শ্লোগান ও ভাংচুরের মধ্য দিয়ে জামিনের শুনানি শুরু হলো। বিচারকের নাম ছিল নাজমুন নাহার বা নাজমুন আরা। আমরা তাকে খুঁজে বের করতে কোনদিন চাইনি তবে আমার মনে হয় তার নাম ছিল নাজমুন আরা, তিনি পদোন্নতি পেয়ে শেষমেশ সুপ্রিম কোর্টের এফিলেট ডিভিশনের বিচারক হিসাবে অবসরে যান। মৃত্যুর আগে আনিস স্যারও তার পরিচিতি উদঘাটন করতে পারেনি।

তবে গণ আদালত থেকেই আমাদের ঐক্য বাড়ে এবং তা একধরনের বন্ধুত্বে রূপ নেয়। আনিস স্যার বিখ্যাত ব্যক্তি হলেও বিভিন্ন কারনে তার কাছে অবস্থানের সুযোগ পরেও পেয়েছি। আমার আজকের লেখা গণ আদালত নিয়ে নয়, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনিস স্যারের সহকর্মী হিসাবে স্মৃতি চারণ নিয়ে নয়, কিংবা মুক্তিযুদ্ধে তার ও আমার ভূমিকা নিয়ে নয়। এমনকি তার শিক্ষাজীবন, শিক্ষাকতা, লেখালেখি, পান্ডিত্য ও অসংখ্য সম্মাননা, স্বীকৃতি বা তার বহুমুখী ভূমিকা নিয়ে নয়। এ লেখাটি তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে। বাংলা একাডেমীর সভাপতি থাকাবস্থায় তিনি বিনা আবেদনে ও বিনা তদবীরে আমাকে সম্মানীয় ফেলো হিসাবে ভূষিত করেছিলেন সে কারনে সম্ভবতঃ বাংলা একাডেমীর এই সম্মানটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তৃতীয় অবস্থানের স্বীকৃতি। এর আগে অনিচ্ছা সত্বেও আমি একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকের জন্যে কয়েকবার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছিলাম। জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের জন্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে আমি আশ্বস্ত ছিলাম যে গণ-আদালতে বিশিষ্ট ভূমিকার জন্যে তিনি আমাকে কোন না কোন চোখ ধাঁধানো দায়িত্ব দেবেন কিংবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একুশে পদক বা স্বাধীনতা পদক বা উভয়টি প্রদান করবেন। সে যাত্রায় তার কিছুই হলো না। আমি পরে জানলাম আনুষ্ঠানিক আবেদন ব্যতীত এসব কিছু হয় না। আবেদন না করার কারণে আমি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বঞ্চিত ছিলাম সুর্দীর্ঘকাল। শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারে ক্ষমতায় এলে আমি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট এর জন্যে আবেদন করলাম এবং সংকোচ কাটিয়ে একুশের পদক ও স্বাধীনতা পদকের জন্য আবেদন করতে সিদ্ধান্ত নিলাম। বলতে গেলে বন্ধুবান্ধবের চাপে পড়ে সিদ্ধান্ত নিলাম। ইতোপূর্বে আমি পরোক্ষভাবে হলেও গোলাপের সাথে টিউলিপকে তুলে ধরে মুজিব বাহিনীর শীর্ষ কিছু নেতাকে স্বাধীনতা পদক দিতে লেখালেখির মাধ্যমে তদবীর করছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল প্রথম সারিটি অতিক্রান্ত হলে কিংবা একই সাথে আমার বিষয়টিও বিবেচনায় এসে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের কালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলাম এবং একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে ভারতের দেরাদুনের মিলিটারি একাডেমীতে গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে যুক্ত ছিলাম; যদিও যোদ্ধা হিসেবে আমার কোন পরিচিতি গড়ে উঠেনি। আমাদের দেশে যোদ্ধা বলতে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণদের রোমাঞ্চকর ভূমিকার অধিকারীদের বুঝানো হয়, যাদের কথা শুনতে দর্শক বা শ্রোতা বাকরুদ্ধ নীরবতা ও উৎকর্ন হয়ে অপেক্ষা করেন। আমার অবস্থানটা কিছুটা মাঠের হলেও বিশালাংশ ছিল যোদ্ধাদের পেছনের সারিতে। আমাকে খেতাবের জন্যে মনোনয়ন দাতা কাউকে পেলাম না। ডাক্তার প্রাণ গোপাল দত্ত কিংবা কর্ণেল আবু ওসমান চৌধুরী তখনও কোন সিভিল খেতাব পাননি। বাধ্য হয়ে একুশ ও স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত কুমিল্লার মোবারক হোসেন খানের সুপারিশসহ আবেদনটি পাঠালাম। দুটো পদকের জন্যে পাঠালাম একই ব্যক্তির স্বাক্ষরে মূল্যায়ণকালে খবর ফাঁস হয়ে গেল যে আমাকে এক বা একাধিক পদক দেয়া হতে পারে। আশ্বস্ত হয়ে বসে রইলাম। অভ্যাসবশতঃ তদবিরের আশ্রয় নিলাম না। সিদ্ধান্ত যখন এলো দেখা গেল আমার নাম কোনটিতে এলো না। ক্ষানিকটা হলেও কষ্ট পেলাম। স্বাভাবিকভাবে আমার তুলনামূলক বিশ্লেষনের কারণ থাকলেও সে প্রয়াস একান্তই চেপে গেলাম। নিজের গায়ে নিজের থুথু পড়বে ভেবে আর রাটি পর্যন্ত করিনি। সম্ভবতঃ এক বছর পরে আবার আবেদন করতে মনস্থ করলাম, তখন ডাঃ প্রাণ গোপাল স্বাধীনতা পদকধারী। প্রাণ গোপাল হলো প্রথম ব্যক্তি যিনি মুজিব বাহিনীভুক্ত হয়ে স্বাধীনতা পদক পেলেন। সম্ভবতঃ যুদ্ধপরাধীদের বিচারের আন্দোলনকালে প্রাণ গোপালের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান প্রসঙ্গে বিতর্কের সূচনা করেছিল কোন এক পত্রিকা। আমি তা খন্ডন করে বিবৃতি পাঠালে উক্ত পত্রিকা ছাড়াও প্রায় সব ক’টি দৈনিকে খবর এসেছিল যে ডা: প্রাণ গোপাল মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যেদিন স্বাধীনতা পদক পেলেন আমি আনন্দিত হলাম, এই ভেবে যে অন্ততঃ মুজিব বাহিনীর একটা স্বীকৃতি এলো। আমি আরও ভাবলাম যে এবারে নিজ ঘর থেকেই সুপারিশ নিয়ে আবেদন করতে পারবো। হলও তাই। বিশাল আকারের আবেদন পত্র ডাঃ প্রাণ গোপালের সুপারিশ নিয়ে পেশ করলাম। আবারও পত্রিকায় এলো যে আমার যেকোন একটি পদক প্রায় নিশ্চিত। শেষকালে দেখা গেল সবই গরল ভেল। কারণ খুঁজে পাইনি। কাউকে জিজ্ঞেস করার মনোভঙ্গী আমার ছিল না। বাংলা একাডেমীর মহা পরিচালক এসব মূল্যবান কমিটির বরাবরই সদস্য ছিলেন। তার মুখ থেকে আমার পদক প্রাপ্তির সম্ভাবনা একাধিকবার শুনেছি। আর একবার মূল্যায়ন কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালনকারী একজনের মুখ থেকেই শুনেছিলাম যে সে যাত্রায় আমার পদক পাওয়া সুনিশ্চিত; কেননা কার্যবিবরণ ও সিদ্ধান্ত লেখার দায়িত্ব তারই ছিল। তারপরে কেমন করে তাও খসে গেল। ডাঃ প্রাণ গোপাল গভীর মনক্ষুন্নতা নিয়ে আমার আর কোন আবেদনে স্বাক্ষর করতে অনেকটা নারাজ হলেন। আমি কর্ণেল আবু ওসমান চৌধুরীর সুপারিশ নিয়ে আবারও দুটো পদকের জন্য পর্যায়ক্রমিক আবেদন করলাম। এবারও ফলাফল তথৈবচ।

ইতোমধ্যে আমি আর কোন আবেদন না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে হাত গুটিয়ে নিলাম। মনে একটা গভীর হতাশা দানা বাঁধলো। কাউকে কাউকে দেখলাম স্মারকগ্রন্থ ছাপিয়ে, পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে কিংবা হুমকি দিয়ে একুশের বা স্বাধীনতা পদক বাগিয়ে নিলেন। আশ্বস্ত হলাম তারা আমার চেয়ে বড় ম্যানেজার কিংবা ঝোপ বুঝে কোপ মারায় উস্তাদ। আমি সে সুযোগ বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছি। এমনি একটা মুহুর্তে খবর পেলাম যে আমাকে বাংলা একাডেমীর সম্মানসূচক ফেলো নির্বাচন করা হয়েছে। বারবার চেয়েও না পেয়ে বরং কোন আবেদন বা তদবীর না করে একটা কিছু পেয়ে যাওয়াতে আমি একধরনের কৃতজ্ঞতা বোধে সিক্ত হলাম।

সারাজীবনে প্রাপ্তির খাতায় মাত্র দুটো উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে। দুটোই ঘটেছিল আবেদন ছাড়া ও তদবীর ছাড়া। প্রথম মানুষটি আমার স্মৃতিতে আছেন এবং আমার প্রকাশিত একটি বইতে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছি। হয়তো এই কারণে আনিসুজ্জামানকে আমাদের একটি কনভোকেশনে বক্তা নির্বাচিত করেছিলাম। যেকোন কারণে হোক তিনি আসেননি। এই প্রথমবার তাকে মনোক্ষুন্ন হতে দেখেছি। তারপরও তিনি আমাকে সপরিবারে নিমন্ত্রণ নিয়ে খাইয়েছেন। নিমন্ত্রিতদের দেখে আমার চক্ষু চড়ক। বাংলাদেশের সকল অঙ্গনের মানুষ তথা অর্থমন্ত্রী মোহিতও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সম্পর্কের পূর্ণবাসনে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমাদের আগামী বিবাহ-বার্ষিকীতে তাকে প্রধান করে একটা অনুষ্ঠান করবো। তার কর্ম ব্যস্ততা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রিম সম্মতিও নিয়ে রেখেছিলাম। ভাবীও সম্মতি দিয়েছিলেন। হায়, সম্মতি রয়ে গেল সম্মতির জায়গায় তিনি চলে গেলেন সবাইকে ছেড়ে। অনুঘাটিত করোনার আঘাত তিনি সইতে পারলেন না। তার তিরোধান দেশ, জাতি, শিল্প, সাহিত্য, মানবিকতা ও গণতন্ত্রের জন্যে অপূরনীয় ক্ষতি। তাকে বাতিঘর বলায় গণ আদালতের অপর এক উদ্যোক্তা তার সমালোচনা করেছেন। ধর্মীয় মৌলবাদীরা তাকে একহাত দেখে নিতে চেয়েছিল। তার মৃত্যুকে ঘিরে প্রগতি ও মৌলবাদের সহ অবস্থান দেখলাম। তবে আমার ব্যালান্স সিট উল্টালে তাকে আজীবন দেখতে পাবো আর বিবাহ বার্ষিকী এলে তাকে সর্বাগ্রে স্মরণ করবো। তার মৃত্যুতেই অনুধাবন করলাম তিনি কতটা মানুষের কাছাকাছি ছিলেন। করোনা না থাকলে ঢাকা শহর নয়, সারাদেশ তার জানাজা বা শোক সভায় ভেঙ্গে পড়তো।  বেশ কিছুদিন আগে জেনেছিলাম বৈজ্ঞানিকরা আমাদের আয়ু দ্বিগুন করার মত ঔষধ পেয়ে গেছে। ঔষধটি আনিস স্যারের মৃত্যুর আগে হাতে আসলে জাতির স্বার্থেই তাকে বাঁচিয়ে রাখা যেত। জীবন সূর্যটা পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে বেশ আগেই। আমাদের তাৎপর্যহীন জীবনে নিজের ছায়াটা দীর্ঘায়িত হতে হতে হঠাৎ একদিন মিলিয়ে যাবে কিন্তু বোধজ্ঞান অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত আনিস স্যারের মতো মানুষের কথা হয়তো ভুলতে পারবো না।

* *অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী