banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে লিখিত যে কোন বই বা প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগের ৬ দফা নিয়ে কিছু না কিছু আলোচনা আছেই। কমবেশ প্রতিজন প্রতিবেদক, লেখক বা প্রাবন্ধিক ৬ দফাকে বাঙালির জাতির স্বাধীনতার পথযাত্রায় একটা অনন্য মাইলষ্টোন বলে বিবেচনা করেন। তবে ৭ জুন বা ৬ দফা দিবস সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যাদির অপ্রতুলতা আমাকে বিস্মিত করেছে। বঙ্গবন্ধু বা তৎকালে কারারুদ্ধ শেখ মুজিব বা শেখ সাহেবের লিখিত ডায়েরী থেকে তার একটা বিস্তারিত বিবরন পাওয়া যায়। বলতে গেলে ১৯৬৬ সালের ২রা জুন থেকে শুরু করে পুরো জুন মাস ব্যাপী ৭ই জুন সম্পর্কে ছোট বড় নেরেটিভ পাওয়া যায়। ৬ দফা বা বাঙালির মুক্তিসনদ  প্রদান ও তাকে জনপ্রিয় করার অভিযোগে তথা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় তিনি কারারুদ্ধ হন। তাকে ৮ মে তারিখে অন্যান্য কিছু সহকর্মী সহ গ্রেফতার করা হলে ১০ মে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ দিবস পালন করে। শাসক কূল তাতে কর্ণপাত না করায় তারই নির্দেশে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটি ২০ মে তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় ৭ই জুন ১৯৬৬ কে কারা মুক্তি দিবস হিসাবে ঘোষণা দিয়ে ধর্মঘট বা হরতালের আহবান জানায়। এই সিদ্ধান্তটি ২১ জুনের ইত্তেফাক পত্রিকায় আসে। খবরটিতে মুক্তির উপর জোর দেয়া হলেও তাতে ৬ দফার বাস্তবায়নের প্রত্যয় রয়েছে।

এখানে বলা প্রয়োজন যে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব যখন পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে ৬ দফা পেশ করলেন, তখন দেশে ইত্তেফাক, আজাদ, মর্নিং নিউজ ও অবজার্ভার পত্রিকা প্রকাশিত হতো। বলা হয়ে থাকে তাদের কারো মধ্যে ৬ দফা নিয়ে তেমন একটা উদ্বেগ ছিলনা; এমনকি সে সময়ের আওয়ামী লীগ পন্থি বলে পরিচিত পত্রিকা ইত্তেফাকও ৬ দফাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করলো না। ইত্তেফাকে ৬ দফার সংবাদটি দেওয়া হয় প্রথম পৃষ্ঠার মাঝামাঝি সিঙ্গেল কলামে মাত্র কয়েকটি লাইনে। শিরোনাম ছিল: শেখ মুজিবের ৬ দফা’। গুরুত্বের কথাটি অস্বীকার করার জো নেই। দুইটি কারন সেখানে ক্রিয়াশীল ছিল, এক, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এমন ঝুঁকিপূর্ণ আন্দোলন (যার পরিনতি হতে পারে ফাাঁসির কাষ্ট এবং যার সফলতা ছিল অনিশ্চিত) দ্বিধান্বিত ছিলেন। দুই, মানিক মিয়ার বড় ছেলে মইনুল হোসেন হিরু ও ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর অবস্থান ছিল বিপরীতমুখী। মঞ্জু ৬ দফার স্বপক্ষে থাকলেও পিতাকে প্রভান্বিত করার ক্ষমতা ছিল সীমিত। তারপরেও ইত্তেফাকের ভূমিকাকে অতূলনীয় বলা যায়। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ৩৬০ ডিগ্রি বদলে যান।

এই পরিবর্তনের কারন হলো অন্য পত্রিকাগুলোর মোসাহেবী আচরন, রাজনৈতিক দলগুলোর অহেতুক বিরোধিতা, আইয়ূব মোনায়েমের সীমাহীন অসদাচরন, ৬ দফার বিরুদ্ধে আইয়ুবের অস্ত্রের হুমকি এবং আইয়ুবের ‘প্রভু নয় মিত্র’ গ্রন্থে বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে ভিত্তিহীন, অশালীন ও অবমাননাকর উক্তি। উক্তিটি ছিল ‘বাঙালি মুসলমানরা হিন্দুর জারজ’। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল মানিক মিয়ার প্রতিক্রিয়ার দেখার। দিনক্ষণ আমার মনে নেই। আমি আরও কয়েকজন মিলে ইত্তেফাকে গিয়েছিলাম। এ’সময় মানিক মিয়া মানে ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলেন আর তারস্বরে বলছিলেন ‘শুয়ারের বাচ্ছারা পেয়েছ কি?  আমিও ছাড়ব না, আল্লাহ যা করে করবে আমি ৬ দফার পূর্ণাঙ্গ সমর্থন দেব’। তারপর থেকে তিনি যখনি যে সুযোগ পেয়েছেন স্বনামে বেনামে ৬ দফার পক্ষে কলম ধরেছেন। ২রা জুন  থেকে পুরো জুন মাসের এন্ট্রিতে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচায়’ তার কিছুটা উল্লেখ আছে। বঙ্গবন্ধু অবজার্ভার পত্রিকারও প্রশংসা করেছেন। আজাদের ভূমিকাকে একেবারে ফেলনা বলেননি। ৭ জুন সংবাদ পত্রিকার ভূমিকা ছিল অনন্য। সেদিন সবক’টি পত্রিকা সরকারী প্রেস রিলিজ ছেপে দিলেও সংবাদ ছাপেনি বরং ‘আমাদের নীরব প্রতিবাদ’ শিরোনামে সংবাদের কমাধ্যক্ষের বরাতে জানিয়েছিল ‘যে মর্মান্তিক বেদনাকে ভাষা দেওয়া যায় না; সেখানে নীরবতাই একমাত্র ভাষা। তাই গতকালকের সংবাদ প্রকাশিত হইতে পারে নাই। আমাদের এই নীরব প্রতিবাদ একটু হইলেও ইহাতে আমাদের পাঠকরা ও শরীক হইবেন, ইহা আমরা ধরিয়া লইতেছি’। তাই এই সাহসী উচ্চারনটিকে সেদিন দুঃসাহস বললেও ভুল বলা  হবে। অন্যান্য পত্রিকায় দশজন নিহতের খবর দেয়া হয়েছে এভাবে ‘এটা একটি সরকারী ভাষ্য কিংবা ওঃ রং এড়াঃ. চৎবংং ঘড়ঃব’। হারুন অর রশিদ এর ‘আমাদের বাচাঁর দাবী ৬ দফার ৫০ বছর’ গ্রন্থ থেকে উপরের তথ্য জানা যায়। সে গ্রন্থে ২৪টি আলোকচিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে। তার ২৩টি হচ্ছে ইত্তেফাক থেকে সংগ্রহীত। তার আগে ইত্তেফাকে যেসব খবর পরিবেশিত হয়েছে তার কতিপয় উল্লেখ করছি। ১২ ফেব্রয়ারি ১৯৬৬ সালে ইত্তেফাকে ১ ও ৮ পৃষ্ঠায় পরিবেশিত খবরের শিরোনাম ‘পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে ৫ কোটি মানুষের সহিত বিশ্বাস ঘাতকতা করা সম্ভব নয়, সাংবাদিকদের সঙ্গে তেজগাঁও বিমানবন্দরে লাহোর সম্মেলনের (বিরোধী দলের কনভেশন) সঙ্গে সম্পর্কবেচ্ছদের কারন বর্ণনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১১ ফেব্রুয়ারিত ১৯৬৬। পরিবেশিত খবরে সম্মেলনের কার্যবিবরণীর কিয়দাংশ তুলে ধরা হলেও কৌশলে পুরো ৬ দফাকে উত্থাপন করা হয়েছিল। দেশ রক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় কেন্দ্রের দায়িত্ব ছাড়া অন্যান্য সকল বিষয় যথা মুদ্রা ব্যবস্থা, পৃথক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, মুদ্রা পাচার রোধ, সর্বপ্রকার কর ও কর ধার্যের এখতিয়ার, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং প্যারা মিলিমিশিয়া গঠনের প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়েছিল।

‘এই দেশপ্রেমিক কে? ৬ দফার সমালোচক কারা? ওরাতো বহুরূপীঃ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশন (১৮ মার্চ, ১৯৬৬); বঙ্গবন্ধুর আমাদের বাঁচার দাবী ৬ দফা কর্মসূচী; ইত্তেফাক প্রকাশিত ১৯ মার্চ, ১৯৬৬ পৃঃ ১,৪,৮,২ ইত্তেফাকে ২০ শে মার্চ, ১৯৬৬ সালের পৃঃ ৪,৫ প্রকাশিত এসব বিশালাকায় লেখা শুধু পূর্ণাঙ্গ ৬ দফা নয়; তার বিশ্লেষণ বিরুদ্ধবাদীদের প্রতিরোধ ও সমালোচনার জবাব দেয়া হয়েছে। তারপরে ইত্তেফাকে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরাদি বিশ্লেষণ করলে এ কথা প্রমানিত যে ইত্তেফাক শুধু সহায়ক ভূমিকা নয়; অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে। মুসাফির নামে প্রকাশিত মানিক মিয়ার উপ-সম্পাদকীয় ছিল জ্ঞান গভীর চেতনা, উদ্দীপক ও আমাদের মধ্যে মৃত-সঞ্জীবনীর ন্যায়।

এখানেই শেষ নয় মানিক মিয়া ১২ জুন বন্দী হয়ে ঢাকা জেলে নীত হলেন। দৈনিক ইত্তেফাকের উপর দমন নীতির অংশ হিসাবে মানিক মিয়া ১৯৬৭ সালের ২৯ শে মার্চ পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ১৭ জুন ইত্তেফাক পত্রিকা নিষিদ্ধ হয়ে ১১ জুলাই পর্যন্ত তার প্রকাশনা বন্ধ থাকে। ১ মাস ৬ দিন পত্রিকা প্রকাশনার পর পুনরায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যূত্থানের প্রাক্কালে ইত্তেফাক পুনরায় প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের কালেও ইত্তেফাকের ভাগ্যে এমনি দুর্যোগ নেমে আসে।

ইত্তেফাকের ভূমিকার পাশাপাশি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তখনকার একমাত্র সান্ধ্য দৈনিক আওয়াজের কথা এসে যায়। আওয়াজের সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। তিনি প্রায়শ: স্কুপ বা আন্দাজ ভিত্তিক খবর পরিবেশন করতেন। আমরা সেটাকে তাই বলতাম গুলের আওয়াজ। গুল মারা অর্থ হয়ত পাঠক জানেন। কিন্তু এ পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ছিল সীমিত; তাই বলে সরকার সেটার প্রতি তেমন বিরূপ আচরন করত না। এই আওয়াজ পত্রিকাটিতে প্রথমেই ৬ দফার বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ইত্তেফাকের সাথেও জড়িত ছিলেন, মানিক মিয়ার বহু লেখার ডিকটেশন নিতেন এবং মানিক মিয়ার মতামত প্রভান্বিত করার মত ইর্ষান্বিত অবস্থানে ছিলেন।

*৬ দফা আন্দোলনের শরীক, ৭ জুনের হরতালে পুলিশের পয়েন্ট ব্লাঙ্ক গুলিতে দৈবক্রমে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবি ও বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী