banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥
কয়েকদিন আগে আমি করোনা সম্পর্কে ভিন্নধর্মী কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম। তাতে দেখা যায় খ্রীষ্টান, মুসলমান ও বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের হার যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়; রংয়ের বিভাজনে দেখা যাচ্ছে প্রথমোক্ত অধিকাংশের গায়ের রং সাদা, দ্বিতীয়দের সাদা-কালোর মিশ্রন ও তৃতীয়দের রং হচ্ছে পীত। বাসস্থানের বিচারে প্রথমোক্তগণ উত্তর আমেরিকা, উত্তর ইউরোপ, নিউজিল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলে বসবাসরত। অবশ্য আমেরিকার পাশে আছে কানাডা তার আক্রান্তর হার ও মৃতের হার কম। সাদাদের মধ্যে নিউজিল্যান্ড একটি বেশি মানবিক। মসজিদে ঢুকে মুসলিম হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির অধিকাংশের প্রতিক্রিয়ায় তার প্রকাশ ঘটেছে। সাদা মানুষ অধ্যুষিত অস্ট্রেলিয়ায় আক্রান্ত ও মৃতের হারও কম।

এই লেখাটি টাইপ করতেই দেইনি, ছাপানো দূরের কথা; কারণ তাতে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ আছে। তারপরই আমি মরার উপর খাড়ার ঘা শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেছি। আমার মনে হচ্ছে কেউ সেটা হয়তো পড়েননি, কারণ লেখাটি অনলাইন পত্রিকা bdnewshour24.com -এ প্রকাশিত হয়েছিল যা বহুল প্রচারিত নয়। 

শিরোনামটি হয়তো বিভ্রান্তিকর। আমি বলেছিলাম যে করোনা নিয়ন্ত্রনের দুটো পথ খোলা রয়েছে। এক, মানুষকে সত্যিই মানুষ হতে হবে এবং পৃথিবীর আনুমানিক ১৩ লক্ষ ৪০ হাজার প্রজাপতির জীবের প্রতি মানবিক হতে হবে। আমি মানবিক কথাটা সংজ্ঞায়িত করিনি কিংবা পাশবিক শব্দটা ব্যবহার না করে অমানবিক শব্দটা ব্যবহার করেছি। আমি তারপরও সুড়সুড়ি কেটেছি। বলেছি বৌদ্ধরা পরজনমে বিশ্বাসী না হলেও ঈশ্বরে বিশ্বাসী এবং তাদের প্রধান মূল্যবোধ হচ্ছে ‘জীবে প্রেম করে যেজন, সেজন সেবিছে ঈশ্বর’। জীবের সংজ্ঞায় আমি সব জীব এমনকি উদ্ভিদকেও টেনে এনেছি এবং উপসংহার টেনেছি যে বৌদ্ধ অধ্যষিত সব ক’টি দেশে (জাপান ব্যতিরেকে) করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের হার যেকোন বিচারে খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মালম্বী দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম। ঐ লেখাটিতে আমি বলেছি যে করোনার পর প্রকৃতির দুর্যোগ ‘আম্ফান’ ও ঘূর্ণিঝড়, মরার উপর খাড়ার ঘা ছাড়া কিছু নয়। আমাদের বেপরোয়া আচরণ বিশেষতঃ ঈদের আগে ও পরে স্থান পরিবর্তন করে এমন একটা পরিস্থিতি জন্ম দিতে পারি যা মরার উপর খাড়ার ঘাঁ হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে। তাই আমার পরামর্শ ছিল গ্রাম থেকে মানুষ ফেরার পর বড় বড় শহরগুলিতে পনেরো দিন সর্বজনীন কোয়ারেন্টাইন কার্যকরী করতে হবে। তারপর আক্রান্তদের চিকিৎসা ও সুস্থদের হার্ড ইমিউনিটির জন্যে ছেড়ে দিয়ে করোনাকে আত্মীয়করণ করে জীবন ও জীবিকার মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য আনতে হবে।

সে সবই ঈদের আগের কথা। ঈদের পর আজ সকালে (৫ জুন ২০২০) আমি ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার দুটো নিবন্ধ পড়লাম। একটির লেখক সৌম্য বন্দোপাধ্যয় শিরোনাম ‘ঢের হয়েছে পাশবিকতার সংজ্ঞাটা এবার বদলাক’। অপর লেখাটি ইকবাল এহসান ও বুলবুল সিদ্দিকীর। শিরোনাম ‘পাশ্চত্যের চেয়ে প্রাচ্যে মৃত্যুহার কেন কম। শেষের লেখাটি ধরে আমি আলোচনায় অগ্রসর হবো।

লেখাটিতে তারা প্রাচ্য ও পাশ্চত্যের করোনায় আক্রান্ত ও মৃতদের পরিসংখ্যান দেখিয়েছেন যে প্রাচ্য অপেক্ষা পাশ্চাত্যই করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের হার বেশি।  মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্স, মানুষের শারিরীক বৈশিষ্ট্য (যেমন-স্থুলতা), মানুষের বদভ্যাস (যথা- ধূমপান ও মদ্যপান) করোনার প্রকোপ বাড়িয়ে দিতে পারে। তথ্য উপাত্ত দিয়ে লেখকগণ এসব ধারনার ব্যাপারে এমন বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি করেছেন যে তাদের লেখাটা আমার দৃষ্টি আকর্ষন করেছে। আমার নিজস্ব চিন্তার কাছাকাছি এসব তথ্য।  

এবারে সৌম্য বন্দোপাধ্যায়ের কাছে ফিরে আসি। তিনি শুরু করেছেন মানব আর মানবিকতার সংজ্ঞা দিয়ে। আমার ব্যবহৃত মানবিকতা শব্দের চেয়ে তার মানবিকতা শব্দের মানে ব্যাপক; মানবিকতা অর্থ মনুষ্যোচিত, মনুষ্যসূলভ, লোকহিতকর। তিনি পাশবিক শব্দের অর্থ করেছেন পশুবত। মানে পশুর মতো আচরন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে পশুদের কোন আচরণটাকে আমরা পাশবিক বলবো? তারা খাবার ভাগাভাগি করে খায়, স্বজাতির কাউকে ধর্ষণ করেনা কিংবা অযথা ও অকারণে কাউকে ক্ষত-বিক্ষত করেনা। একই সাথে তিনি পাশবিকতা নয়, অমানবিকতার দুটো উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তার একটি হচ্ছে শেতাঙ্গ পুলিশের কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যার করুন ও অমানবিক বৃত্তান্ত; অপরটি হচ্ছে লোকালয়ে আগত একটি গর্ভবতী হাতিকে আনারসের সাথে বিস্ফোরক মিশিয়ে খাইয়ে হত্যা। তার মতে দুটো কাজকে পাশবিক বললে বরং পশুদের অবমাননা করা হবে। আসলে এই দুটো ঘটনা হচ্ছে অমানবিক। ভারতে হাতি মারার এ ঘটনায় কেউ লিখেছে ‘হাতিটা মানুষকে বিশ্বাস করেছিল, সেটা ছিল তার একমাত্র ভুল’। হাতিটা মরে গেল, গল্প এটুকুই। বাকিটা লজ্জার। ‘মানুষকে এর ফল ভুগতে হবে’। ‘প্রকৃতি ঠিকই এই পাপের শোধ তুলবে’। কারো কন্ঠের শীতল ও নির্বিকার উচ্চারণ ‘করোনাই এসব মানুষের উচিত শাস্তি’। দুটো অমানবিক কাজকে সৌম্য বন্দোপাধ্যয় উল্লেখ করেই মানুষ নামক জীবটির প্রসঙ্গে কিছু কথা বলেছেন; তার মতে কিছু মানুষ নির্বিঘ্নে অন্য মানুষকে ধর্ষণ করে, এলাকা দখল করে, খাদ্যে ভেজাল দেয়, ব্যাংক লুট করে, দেশের সম্পত্তি বিদেশে পাচার করে, গায়ের জোরে অন্যের সম্পত্তি হাতায়, বর্ণ বৈষম্য, জাতিভেদ ও অন্যান্য বিভেদের আশ্রয় নেয়। এসবের মাধ্যমে যে কোটি কোটি আদম সন্তানকে অভুক্ত, নিরন্ন, বিবস্ত্র ও চিকিৎসা হীন রেখে প্রতিবছর চির বিদায় দেয়া হয় এর সংখ্যা কোটি কোটি। কোটি কোটি মানব সন্তান যদি সবাই মিলে তাদের স্রষ্টা আমাদের ভাষায় প্রকৃতির কাছে সেই সিরিয়ার স্বরণার্থী শিবিরের মৃত্যু পথযাত্রী শিশুটির মতো ‘স্রষ্টাকে সবই বলে দিয়ে থাকে’, তাহলে পরিনাম তো করোনাই হবে।

সৌম্য বন্দোপাধ্যয় উপসংহার টেনেছেন আসুন আমরা পাশবিক শব্দটি ব্যবহার না করে অমানবিক শব্দটা ব্যবহার করি।

লোভ সংবরণ করতে পারছিনে বলে আমার দুটো কথা যোগ করছি। নির্বাক প্রাণীও যে মানুষের প্রতি অনেক মানবিক তার উদাহরণ আমি একটি লেখায় তুলে ধরেছিলাম। প্রসঙ্গটি ছিল ১৫ আগস্টে শেখ রাসেলকে নির্মম হত্যার। হত্যাকারীরা কতটা অমানবিক ছিল পুরো হত্যাকান্ড বিশেষতঃ শেখ রাসেলের হত্যাকান্ড বিশ্লেষনে তা বোধগম্য। বনের একটা সিংহও যে একটা হরিণ শাবকের প্রতি কতটা মানবিক হতে পারে তা ইউটিউবে দেখলাম।  আমি লিখেছিলাম ‘কতিপয় হিংস্র সিংহ একটি হরিণ শাবককে হাতের নাগালে পেয়ে গেল। আমি ভেবেছি ‘এই গেলরে, শাবকটি শেষ হয়ে গেল।’ আমাকে বিস্মিত করে ‘হিংস্র’ সিংহটা পরম আদরে হরিণ শাবকটা চলে যেতে দিল’। তাহলে আমার ব্যবহৃত হিংস্র শব্দটির অপপ্রয়োগ হলো। বরং ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের পশু ও হিংস্র না বলে একটি শব্দই ব্যবহার করা যায় তা হলো অমানবিক যা আল্লাহ, ঈশ্বর, ভগবান কেউ সহ্য করে না বা করেনি।  

আমাদের এক সহযোদ্ধা থেকে শুনেছি যে তাদের বাড়িতে দুটো বিষাক্ত সাপ বসবাস করতো। তাদের প্রতি রোজ খাবার দেয়া হতো। সাপ দুটো কোনদিন কারো ক্ষতি করেনি; এমনকি তাদেরকে ডিঙ্গিয়ে গেলেও না। তাহলে ঐসব প্রাণীর জন্যে পাশবিক শব্দটি পরিহার করে আমরা অন্ততঃ কিছু মানুষকে অমানবিক, অধার্মিক, বক ধার্মিক বলতে পারি। এই জাতীয় মানুষের আচরনণে আমূল পরিবর্তনের আগে করোনা বিদায় হবে না। আসুন আমরা মানবিক হই; শুধু স্বজাতির প্রতি নয়, স্রষ্টার সকল সৃষ্টির প্রতি মানবিক আচরণ করি ও করোনাকে নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজি। আমাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিবেক বিশ্লেষন ও সর্বোপরি মানবিকতা দিয়েই করোনা আয়ত্বে আনার ভ্যাকসিন বা ইঞ্জেকশন আমরা পেয়ে যাব।  


* অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী