banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥

আজ থেকে ২৬ বছর আগে জাহানারা ইমাম দুরারোগ্য ব্যধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার জীবনাসন ঘটলে সারা জাতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি ঢাকায় সমাধিস্থ হয়েছেন। তাতে তার ভক্ত, অনুরক্ত দূর ও নিকটাত্মীয়গণ তৃপ্তি বোধ করতে পারেন। সেদিনের সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তার মরদেহ গ্রহণ করেছেন; তার জানাজায় লাখো মানুষের সমাহার হয়েছে কিংবা তার স্মরণ সভায় হাজারে হাজারে মানুষ উপস্থিত হয়েছে; এসবই তৃপ্তিদায়ক। কিন্তু কি অন্তহীন অতৃপ্তি নিয়ে তিনি এই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন তা তার নিকটজন হিসেবে আমরা অবলোকন করেছি। তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তিনি একজন রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জামায়াত-বিএনপি সরকার তাকেসহ অপর ২৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে এই কালো অভিধায় ভূষিত করেছিল। তার বেদনাটা কোন মাত্রার ছিল তা উপলব্ধি করতে তার মুক্তিযোদ্ধা সন্তান শাফী ইমাম রুমীর দেশের জন্যে চরম আত্মত্যাগের কথা নিঃসন্দেহে বিবেচ্য। তার বিয়োগ বেদনা সইতে না পেরে শহীদ জননী তার স্বামীকেও হারান; একজন মহিলা যার সন্তান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলেন; সেই শহীদের মাতা হলেন রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রদ্রোহী। তার বেদনার দ্বিতীয় কারণ ছিল কারো কারো বিশ্বাস ঘাতকতা। তার অতি পরিচিত একজন সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ ছিল যে সে নাকি শহীদ জননীর কোলে মাথা রেখে বরাবরই ঘাতকের পদ-সেবা করে গেছে। তার কারনেই জাহানারা ইমামের অন্তত একটি অতি ইচ্ছে প্রার্থিত রূপ পায়নি। তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন গণ আদালতের রায় কার্যকর বহু দূরের আকাঙ্খা হিসেবে রয়েছিল। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি।আন্দোলনের পরবর্তী কার্যক্রম ও সফলতা সম্পর্কে তিনি আস্থাশীল ছিলেন। এর প্রধান কারণ ছিল শেখ হাসিনার প্রতি তার অবিচল আস্থা। লক্ষ্য করে দেখবেন তিনি তার আন্দোলনের দায়িত্ব অর্পণ করে গেছেন জাতীয় সমন্বয় কমিটির উপর, যার বৃহৎ শরিক ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেত্রী এবং জাতীয় সমন্বয় কমিটির অলিখিত প্রধান পৃষ্ঠপোষক জননেত্রী শেখ হাসিনা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটির সংক্ষিপ্ত নাম ছিল জাতীয় সমন্বয় কমিটি বা ঘাতক নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি। 

জাহানারা ইমামকে এ আস্থার অবস্থানে আনতে প্রধান ভূমিকা ছিল জাতীয় সমন্বয় কমিটির স্টীয়ারিং কমিটি ৬ নেতা, যথাক্রমে- আবদুর রাজ্জাক, আবদুল মান্নান চৌধুরী, কাজী আরেফ আহমদ, সৈয়দ হাসান ইমাম, নূরুল ইসলাম নাহিদ ও অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী। এদের সবাই আওয়ামী পন্থী ছিলেন না কিন্তু তারা বিশ্বাসী ছিলেন যে গণ আন্দোলন যত ব্যাপকই হোক না কেন, প্রতিষ্ঠিত সরকার ব্যতিরেকে গণ আদালতের রায় কার্যকরী করা যাবে না। তাদের চোখে দৃশ্যমান সরকার ছিল অনাগত আওয়ামী লীগ। প্রথম জীবনে এমনকি ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রথম কিছুদিন জাহানারা ইমাম এমন একটি ঘেরাটপে ছিলেন যা ছিল আওয়ামী লীগের কট্টর বিরোধী। আমরা জাহানারা ইমামকে সেই বলয় থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম বলে জননেত্রী শেখ হাসিনা তার দলীয় সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে আন্দোলনে ও গণ আদালত অনুষ্ঠানে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছিলেন। জননেত্রী ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে প্রতিশ্রুতি ছিলেন। 

শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে কৌশলগত কারনেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে হাত দেননি। অনেকে বুঝে, অনেকে না বুঝে, তাকে অপবাদ দিয়েছিল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের পরই তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল আইন প্রণয়ন করে ঘাতক, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচারের পথ সুগম করেন। আজ পর্যন্ত বহু সংখ্যক মানবতা বিরোধীকে বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি দেয়া হয়েছে। এটা বাংলাদেশে এক সময়ে অকল্পনীয় নয়, স্বপ্নাতীত ছিল যদিও জাহানারা ইমামের চেতনায় তা প্রথিত ছিল জননেত্রী শেখ হাসিনা যা করেছেন তা কি কেউ ভাবতে পেরেছিল? বাংলাদেশে কোন শাসক গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, কাদের মোল্লা, কামরুজ্জামান, মীর কাশেম বা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী’র মতো অসীম ক্ষমতাবানদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারবে বলে আন্দোলনকারীরা মনে করেনি। বাংলাদেশে যা সম্ভব হয়েছে, জাহানারা ইমাম বেঁচে থাকলে পরম তৃপ্তি নিয়েই তবে চোখ বুজতে পারতেন। আমার ধারনা পরপারে তিনি এখন পরম তৃপ্তি নিয়েই আছেন। তার প্রতিষ্ঠিত গণ আদালতে অভিযুক্ত ও গণ তদন্ত কমিশন কর্তৃক চিহ্নিত ১৬ জন যুদ্ধাপরাধীদের বাইরেও বহু ঘাতক দালাল, যুদ্ধাপরাধী ও মানবিকতা বিরোধী গঠিত ট্রাইবুন্যাল কর্তৃক উদঘাটিত হচ্ছে এবং আইনী প্রক্রিয়ায় তাদের অন্ততঃ ৫২ জনকে নির্মূল করা ইতিমধ্যে সম্ভব হয়েছে।  

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় সমন্বয় কমিটির অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী