banglanewspaper

সেনাপ্রধান এমএম নারাভানেকে নিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং শুক্রবার (৩ জুলাই) লাদাখ সফরে যাবেন, এমনটাই ঠিক ছিল। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে সে সফর স্থগিত করা হয়। কিন্তু তার বদলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই লাদাখে গিয়ে সবাইকে চমকে দেবেন, কেউ ভাবেনি। হিমালয়ের ১১ হাজার ফুট উচ্চতায় সিন্ধুতীরবর্তী নিমুতে সেনাদের উদ্দেশে বলিষ্ঠ ভাষণ দেবেন; তা কেউ ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি।

প্রধানমন্ত্রী যে লাদাখে যেতে পারেন, তার কোনো ইঙ্গিত বৃহস্পতিবার রাতেও ছিল না। এর আগে বরং ঠিক ছিল, শুক্রবার লাদাখে যাবেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। বৃহস্পতিবার রাতে সরকারিভাবে রাজনাথের সফর দুদিন পিছিয়ে গেছে জানানো হলেও প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখা হয়। সেনাপ্রধান ছাড়াও মোদির সঙ্গে এই সফরে উপস্থিত ছিলেন চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ বিপিন রাওয়াত। লেহতে থাকাকালীন মোদী গলওয়ান সংঘর্ষে আহত চিকিৎসাধীন জওয়ানদের সঙ্গেও দেখা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর লাদাখে এই অঘোষিত সফর যে ভারতীয় সেনাদের মনোবলকে আরও চাঙ্গা করে তুলতেই ছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। গত ১৫ জুন লাদাখের গালওয়ান ভ্যালিতে চীনা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়। এরপর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ভারতীয় বাহিনীর জন্য খুব দরকার ছিল। সামরিক বিশেষজ্ঞ ও স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষকরা সে কথাও বলছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়।

প্রধানমন্ত্রী মোদী লাদাখে এদিন তার আগ্রাসী বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষায়, সেনা সদস্যদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় এবং আক্রমণাত্মক ভাষণে পরিষ্কার এই বার্তাই দিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে সংঘাতকে ভারত আর চুপচাপ হজম করে নেবে না। চীনের নাম না-করেও কড়া নিন্দা করেছেন তাদের ‘বিস্তারবাদে’র, যার মাধ্যমে এই প্রথমবারের মতো তিনি কার্যত মেনেও নিয়েছেন চীন ভারতের জমি অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে। যদিও এর আগে ভারতের ভূখণ্ডে চীনের আগ্রাসনকে সরাসরি অস্বীকার করে আসছেন। ওই ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ পর অবশেষে কিছুটা হলেও ‘স্বীকার’ করলেন?

এটা সন্দেহ নেই যে চীনের নামোচ্চারণ না করলেও প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা পুরোপুরি উত্তরের প্রতিবেশীর প্রতি। লাদাখে চীন নতুন করে ভারতীয় জমি কবজা করেছে, সে কথা মোদি ও ভারত সরকার এখনো স্বীকার করেনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ‘সম্প্রসারণবাদের’ উল্লেখ সেই সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করে। 

লাদাখের সেনা সমাবেশে চীনের নাম না করেই মোদী বলেন, ‘সারা বিশ্বে ‘সম্প্রসারণবাদীদের’ দিন শেষ হয়ে গেছে। শুরু হয়েছে বিকাশবাদের দিন। ইতিহাস সাক্ষী, সম্প্রসারণবাদীরা হয় পরাস্ত হয়েছে, নয় বাধ্য হয়েছে পিছু হটতে।’

মোদী বলেন, ‘বিশ্বের কোনো দেশের কাছেই ভারত মাথা নোয়ায়নি, নোয়াবেও না। আপনাদের সাহস ও আত্মোৎসর্গ তুলনাহীন। যে অবস্থানে আপনারা রয়েছেন, আপনাদের মনোবল ও দৃঢ়তা তার চেয়েও অনেক উঁচুতে। আপনাদের চোখে ভারতমাতার শত্রুরা সেই আগুন ও ক্ষিপ্রতা দেখেছে। আপনারা পাহাড়ের মতো কঠিন ও শক্তিশালী, আপনাদের আস্থা ও আত্মবিশ্বাস হিমালয়ের মতো অটল।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গালওয়ানে যে পরিস্থিতিতে আপনারা দেশরক্ষায় ব্রতী, তা বিশ্বের কঠিনতম এলাকা। ভারতের সেনাবাহিনী যে বিশ্বের সেরা, বারবার সে প্রমাণ আপনারা রেখেছেন। এখানে যে দৃঢ় বার্তা আপনারা দিয়েছেন, তা বিশ্বের কোণে কোণে পৌঁছে গেছে।’ 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাতৃভূমির জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের এবং আপনাদের আমি সেলাম জানাই। লাদাখের প্রতিটি নদী, নুড়িপাথর, প্রতিটি কোনা জানে এটা ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।’

এই সফরের আগে শুক্রবার চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরের কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছিল। একই দিনে জানানো হয়েছিল, রাশিয়া থেকে ৩৩টি নতুন যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্তের কথা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান শুক্রবার বলেছিলেন, দুই দেশের আলোচনা অব্যাহত। এই অবস্থায় দুই দেশেরই এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে ওঠে। এখন দেখার, মোদির লাদাখ সফর ও সম্প্রসারণবাদ প্রসঙ্গে চীন কী প্রতিক্রিয়া দেয়।

গলওয়ান-উত্তর পরিস্থিতিতে লাদাখে গিয়ে মোদি কোন বার্তা দিতে চাইলেন চীনকে? কূটনৈতিক মহলের ধারণা, সামরিক স্তরে উচ্চপর্যায়ের তিন তিন দফা আলোচনা সত্ত্বেও চীন গালওয়ান উপত্যকায় মে মাসের পূর্ববর্তী অবস্থানে ফিরে যায়নি। জুন মাসে তিন-তিনবার আলোচনা সত্ত্বেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার স্থিতাবস্থা রক্ষায় সম্মত হয়নি। বরং তাদের অবস্থান পোক্ত করতে চাইছে। এটা ভারত যে বেশি দিন বরদাশত করবে না, সফরের মধ্য দিয়ে মোদি সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন। ভারত যে শান্তি চায়, তা বোঝাতে মোদি তার ভাষণে বলেন, ‘দুর্বলতা শান্তি আনতে পারে না। সাহসীরাই পারে। আমরা বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণকে যেমন মান্য করি, তেমনই সুদর্শন চক্রধারী কৃষ্ণও আমাদের আরাধ্য। বিশ্বে শান্তি স্থাপন ও মানবতার প্রসারে ভারত সব সময় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে।’

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সৌমিত্র রায়ের মতে, প্রধানমন্ত্রী এই সফরের মধ্য দিয়ে অনেককে অনেক বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এই সফরে চীনকে বোঝালেন, ভারত কিন্তু ১৯৬২তে থমকে নেই। শান্তিকামী, কিন্তু দেশরক্ষায় একাগ্র। আবার চীনের নাম না করেই গালওয়ান থেকে তাদের পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগও তিনি দিয়ে রাখলেন। ফরওয়ার্ড ঘাঁটিতে গিয়ে বাহিনীর মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রবলভাবে। আর গোটা বিশ্বকে বোঝালেন, চীন আগ্রাসী। গালওয়ানে তাদের আগ্রাসন ভারত মেনে নিচ্ছে না। এর সমাধান হওয়া জরুরি। এই সফরের মধ্য দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠনেও তিনি সক্রিয় হলেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বয়কট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নানাবিধ অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক প্রস্তুতির মুখে চীন সমঝোতা মেনে পূর্ববর্তী অবস্থানে ফিরে যায় কি না, সেটাই দেখার।

এদিনই ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রাশিয়া থেকে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত সামরিক সম্ভার কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। কেনা হবে ২১টি মিগ-২৯ ও ১২টি সুখোই-৩০ এমকেআই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। এ ছাড়া ৫৯টি মিগ-২৯ বিমান উন্নত করা হবে। দুই বছর আগে ২০১৮ সালে প্রায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার বিষয়ে ভারত চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। রাশিয়া থেকে আরও যুদ্ধবিমান কিনে ভারত সামরিক প্রস্তুতিতে ভারত অবশ্য কোনো খামতি রাখছে না। 

তাহলে কী ভারত চীনের সঙ্গে, সীমিত আকারে হলেও, একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী মোদীর এদিনের অপ্রত্যাশিত লাদাখ সফরের পর এই প্রশ্নটাই জোরেশোরে উঠতে শুরু করেছে। যার উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে।

দিল্লির নিরাপত্তা কৌশল বিশ্লেষক কৌশিক মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী মোদীর  বক্তব্যকে পুরোপুরি ‘ওয়ার বিউগল’ বা রণভেরী বাজানোর সংকেত হিসেবেই দেখছি। তার কথাগুলোর যদি ‘বিটুইন দ্য লাইনস’ পড়া যায় তাহলেই দেখবেন তিনি শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্রধারী রূপের কথাও বলেছেন, অর্থাৎ তার সংহার মূর্তির কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। দেশের জন্য আত্মত্যাগের গরিমাকে তুলে ধরেছেন। 

এছাড়াও আহত সেনাদের হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ‘বীর মাতা’দের জানিয়েছেন শত শত প্রণাম– যারা তাদের সন্তানদের দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে পাঠিয়েছেন অবলীলায়। অর্থাৎ আসন্ন যুদ্ধে আরও বহু সন্তানকে জীবন দিতে হতে পারে, তার কথায় সেই ইঙ্গিতও ছিল স্পষ্ট। যুদ্ধ হলে কী হবে, কোন আকারে হবে সেগুলো পরের কথা– তবে ভারত যে চীনের আগ্রাসন ও বিস্তারবাদের জবাব দিতে তৈরি হচ্ছে, সেটা তিনি পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন।

ভারতের সাবেক সেনা কর্মকর্তা, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মারুফ রাজা বলেন, লাদাখের অপারেশনাল পরিস্থিতিটা ঠিক কী, লাদাখে গিয়েই প্রধানমন্ত্রী সরাসরি মিলিটারি কমান্ডারদের কাছ থেকে প্রথম সেই ব্রিফিংটা পেলেন। প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলারা নন, তাকে এই ব্রিফিংটা দিলেন সেই সেনা অফিসাররা, যারা পূর্ব লাদাখে রোজ চীনা বাহিনীর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। 

তিনি আরও বলেন, এটা নিশ্চিত যে আলোচনার মাধ্যমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যে চীনকে সরানো যাবে না, প্রধানমন্ত্রী মোদি সেটা এবার বিলক্ষণ বুঝে গেছেন। সেই নেহরুর প্রতিরক্ষামন্ত্রী কৃষ্ণ মেননের সময় থেকেই ভারত এই ভুল করে এসেছে– চীনকে এক ইঞ্চিও সরানো যায়নি। ফলে ভারতকে যে এবার নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সীমিত আকারে হলেও চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে হবে, সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।

ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক  স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি বলেন, এই মুহূর্তে ভারতের যুদ্ধ না-করে কূটনৈতিক পথে বা আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের উপায় প্রায় নেই বললেই চলে। আর একটা রাস্তা হতে পারে, চীন এই মুহূর্তে গালওয়ান, হট স্প্রিং বা প্যাংগং লেকের ধারে যেসব এলাকা দখল করে বসে আছে, ভারত বলতে পারে ‘সেগুলো কখনোই আমাদের ছিল না– কাজেই বিতর্কেরও কোনও অবকাশ নেই।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি হয়তো ভাবছেন সেটা তার জন্য ‘রাজনৈতিক আত্মহত্যা’র শামিল হবে। 

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, মোদীর এদিনের মুভমেন্টগুলো দেখেও মনে হচ্ছে, ভারত একটা পুরোদস্তুর মিলিটারি কনফ্লিক্টের জন্য সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে। অচিরেই হয়তো চীন সীমান্তের পুরো ২০০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়েই ভারত বাড়তি সেনা মোতায়েন করবে, যেটা সে দেশের অনেক বিশেষজ্ঞই পরামর্শ দিচ্ছেন। লাদাখ সীমান্তে চীন এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, তারপরেও হয়তো ভারতকে একটা এসপার-ওসপার করার চেষ্টা করতেই হবে, তার দখলকৃত জায়গা ফেরাতে।

ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিস্টিংগুইশড ফেলো মনোজ জোশী বলেন, আমি এখনও বিশ্বাস করি, ভারত ও চীন কোনও পক্ষই সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চায় না– কারণ তার পরিণতি দুটো দেশের জন্যই হবে মারাত্মক। হ্যাঁ, সীমিত আকারে সীমান্ত সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা আছেই– তা ছাড়া লাদাখ ছাড়াও সংঘাতের থিয়েটারটা অন্যত্র সরে গেলেও (যেমন সাউথ চায়না সি) অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। 

সেনাবাহিনীর ‘মর‍্যাল’ চাঙ্গা রাখতে প্রধানমন্ত্রী লাদাখে তাদের যা বলার বলেছেন। কিন্তু ভারতের নীতি-নির্ধারকরা আসলে এখনও বিশ্বাস করেন, চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি হতে পারে আলোচনার মাধ্যমেই। যদিও সতেরো বছর ধরে আলোচনায় কোনও লাভ হয়নি, তার পরেও। তবে বিতর্কিত সীমান্তের অনেকগুলো স্ট্র্যাটেজিক জায়গা নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেওয়ার পর চীনও হয়তো এখন আলোচনায় রাজি হবে, কারণ তারা সেখানে এগিয়ে থেকে শুরু করবে, বলছিলেন মি. জোশী। 

ট্যাগ: bdnewshour24