banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ॥

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আমাদের সবিনয় অনুরোধটুকু রাখুন’ শিরোনামে বিডিনিউজ২৪.কম এর মতামত কলামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মুহাম্মদ সামাদ; মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি অনুরোধ পেশ করেছেন।  তার উপক্রমনিকা দীর্ঘ হলেও অনুরোধটি প্রণিধানযোগ্য যা নিম্নরুপ : 

‘জাতীয় সংসদে যোগ দিন; আলাদা কক্ষ থেকে সকল সভায় সভাপতিত্ব করুন: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সংক্রমনমুক্ত করে ফাইল-পত্র স্বাক্ষর করুন; করোনাকালের সকল রকম স্বাস্থ্যবিধি অনুসরন করুন। আমরা আপনার সব নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলছি। আপনি আমাদের সবিনয় অনুরোধটুকু রাখুন! আপনি ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকবো; বাংলাদেশ ভালো থাকবে।’

ড. মুহাম্মদ সামাদের আগেও সাধারন নাগরিকের মধ্য থেকে দাবী উঠেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেন খাবার দাবার গ্রহণে এমনকি করোনা ভাইরাস রোধের সামগ্রী ব্যবহারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেন। তাদের ধারনা ষড়যন্ত্রকারীগণ করোনার এই সুযোগটিও নিতে পারেন। ড. সামাদ ও অন্যান্যদের উৎকন্ঠা সংগত। এসব দেখেশুনে আমার ইচ্ছে জাগছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কতিপয় বিনীত অনুরোধ জানানোর। আমার দুটো অনুরোধের একটি প্রায় সাড়ে এগার বছর আগের, দ্বিতীয়টি সাম্প্রতিক অনেকটা প্রথমটির বিকল্প।

৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে আমি অনুরোধটি রেখেছিলাম। একজন আওয়ামী লীগ ও আমাদের দুর্দিনের কথা মাথায় রেখে আমি সজীব ওয়াজেদ জয়কে নমিনেশান দেবার কথা বলেছিলাম। জয়ের সাথে আমার কোন পরিচয় আছে বা কোন দিন কথা হয়েছে বলে মনে পড়ছেনা। কিন্তু তার শিক্ষা, নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্ব ও বাচন ভঙ্গীতে আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম শেখ হাসিনা বা ড. ওয়াজেদ মিয়ার সন্তান হিসাবে নয়; বরং তার আপন বৈশিষ্ট্যে বা স্বকীয়তায় তাকে রাজনীতিতে আনা উচিত। আমি জানতাম রাজনীতিতে জয় আসলে তিনি নিজে ক্ষতিগ্রস্থ হবেন, তবে প্রথমতঃ আওয়ামীলীগ ও দ্বিতীয়ত দেশটা বিশেষ ভাবে উপকৃত হবে। আমি বলেছিলাম যে আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতা-নেত্রীর সুযোগ্য সন্তানদেরকে আওয়ামীলীগ রাজনীতিতে টেনে আনা উচিত। আমি এটা স্বজন প্রীতি বা পরিবারতন্ত্র কায়েমের কৌশল না বলে বরং মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় হিসাবে দেখেছিলাম। আমার এসব কথা সাপ্তাহিকটিতে দেখে অনেকেই বলতে শুরু করল যে আমি নাকি আওয়ামীলীগের ক্ষমতায় আসার গন্ধ পেয়েছি এবং আগের বারে কোন কিছু না পাওয়া জনিত ব না পুষিয়ে নিতে অগ্রিম মাঠে নেমেছি।
আমার প্রস্তাবনাটা ছিল আমার অভিজ্ঞতার ফসল। আমার অভিজ্ঞতা বলছে বঙ্গবন্ধুর শাহাদতের পরে আওয়ামীলীগ যে পথে চলছিল তা চলতে দিলে আজ কোথায় থাকতেন বঙ্গবন্ধু, কোথায় থাকত আওয়ামীলীগ, আর কোথায় থাকত মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ! সেই ১৯৮২ সালে শেখ হাসিনা যদি দেশে না আসতেন, যদি আওয়ামীলীগের নেতৃত্ব না নিতেন তাহলে এদেশে বার ভুঁইয়ার রাজত্বের ন্যায় বহু আওয়ামীলীগের জন্ম হতো ক্রমশঃ এসব কুচক্রীদের দলে মিশে যেত। শেখ হাসিনা দেশে প্রত্যাবর্তনের পরও আওয়ামীলীগকে মেরে কেটে খাবার  প্রবনতা ছিল। এমন কি ১৯৯১ সালে নির্বাচনের পর আওয়ামীলীগের বহু বড় নেতা বি.এন পি কিংবা ড. কামাল হোসেনের সাথে মিশে যেতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনা শীর্ষে ছিলেন বলে তাদের সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি। 

সম্ভবতঃ আওয়ামীলীগের উপর আরও এক আঘাত আসে দু বছর মেয়াদী সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। নেত্রী শেখ হাসিনা সাব জেলে নীত হলে ষড়যন্ত্র এমন ভাবে জমেছিল যে আওয়ামীলীগ বলতে গেলে এক মহাসংকটে পড়ে গিয়েছিল। এমন দুর্দিনে শেখ হাসিনা যদি আওয়ামীলীগের প্রধান না থাকতেন এবং তার নেতৃত্বের প্রতি অনুগত ও বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ প্রেমিক এক ঝাঁক তরুন না থাকত, তাহলে আওয়ামীলীগ তখনও বহু শাখায় বিভক্ত হয়ে যেত। তার পরিনতি কি হোত তা চিন্তা করলে গা শিউরে উঠে। শেখ হাসিনা না থাকলে  তারাই বঙ্গবন্ধুকে ভাঙ্গিয়ে খেতে খেতে দেশটাকে নি:শেষ করে দিত। তাই শেখ হাসিনা বা পরিবারের স্বার্থে নয় বরং বাঙ্গালীর স্বার্থে, বাংলার স্বার্থে, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের স্বার্থে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের কাউকে না কাউকে থাকতে হবে বলে আমি বলেছিলাম। 

উত্তরাধিকারের প্রশ্নটা আমার কাছে মুখ্য বিষয় ছিল কেননা শেখ হাসিনা চিরঞ্জীব হবেন না; হলে বরং খুশি হতাম। এমনকি সুস্থসবল থেকে কয়েকবার প্রধানমন্ত্রীত্বের পর হয়ত তিনি আর রাজনীতিতেও থাকবেন না। তিনি অবসরে যাবার চিন্তাও করেছিলেন। 

স্বভাবতঃ প্রশ্ন জাগে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে কে বা কারা লালন পালন করবে? পরিবারের যোগ্য  সদস্যরা যদি  পরিবারিক ঐতিহ্যের ধারক বাহক হয়, তাহলে সে ঐতিহ্য কালে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে পরিণত হয়। সে দৃষ্টিকোন থেকে যোগ্য ব্যক্তি যদি ঐতিহ্যের ধারা আসে, তাহলে তাকে পরিবারতন্ত্র বলা যাবেনা। 

তাই আমার একটি প্রস্তাব ছিল সজিব ওয়াজেদ জয়কে অবিলম্বে রাজনীতিতে নিয়ে আসা হোক। তখন নির্বাচন হয়ে জননেত্রী তিনটি আসনে নির্বাচিত হয়েছে। তাই আমার প্রস্তাব ছিল জননেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রংপুরের আসনটি ছেড়ে দিলে যে উপ-নির্বাচন হবে তাতে সহজেই জয়কে প্রার্থী করা যাবে। আমার ধারণা এ দিয়ে বহু বছর আগে তার রাজনীতিতে প্রবেশটি নিশ্চিত হয়ে যাবে এবং মায়ের সংস্পর্শে থেকে পরিপক্ষতা অর্জন করবে, যেমনটি ঘটেছিল নেহেরু কন্যা ইন্দিরার ক্ষেত্রে। আজ হোক কাল হোক  বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে তাকে আসতেই হবে। দ্বিতীয়ত শেখ হাসিনার গোপালগঞ্জের আসনটি শেখ রেহানাকে দেয়া যেতে পরে। আমি বলবনা যে শেখ রেহানা শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে কে কিভাবে থাকবেন তার রূপকল্প তৈরী কি জরুরী নয়? নব প্রজন্মের অনুপ্রেরণার বা রোল মডেলের কথাটি এখানে জড়িয়ে আছে। 

অনুপ্রেরনার কথাটায় আসি। আমাদেরকালে দেখেছি বড় বড় রাজনীতিবিদ, সাংসদ, মন্ত্রীগণের সন্তানাদি হয় যতনে রাজনীতি পরিহার করত, কিংবা বাবার- কাকার বিপরীতে অবস্থান নিত। আমরা তাদের সমালোচনা করতাম। অথচ দুর্যোগ দুর্দিনে আমরা শেখ পরিবারের সদস্যদের দেখেছি অনুপ্রেরনার আকর হিসেবে; তারা ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যদিকে ছোটাছুটি করেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে শেখ হাসিনা গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট কলেজের সংসদ নির্বাচনে ভিপি ছিলেন, তার আগেও ছাত্রলীগ রাজনীতিতেই ছিলেন। ছাত্র রাজনীতিতে তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ আমাদের জন্য অনন্ত প্রেরনার উৎস ছিল। তার বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের পরই ছাত্রী হলের সংসদে ছাত্রলীগ নির্বাচিত হতে শুরু করে যা একদিন ছিল ছাত্র ইউনিয়নের সম্পূর্ণ দখলে। ৬৯ এর গণ-আন্দোলনের সময়ে তার সরব উপস্থিতি আমাদেরকে সারাক্ষন  স্মরণ করিয়ে দিত যে শেখ মুজিবের কন্যা যখন রাজপথে নামতে পারে, আমরা বসে থাকব কি কারনে? মুক্তিযুদ্ধের কালে  ইলিয়াছ আহম্মদ চৌধুরী (দাদাভাই), শেখ ফজলুল হক মনি, সেলিম, কামাল, মারুফ ও জামালকে কাছে পেয়ে গর্ব ভরে সবাইকে বলতে পেরেছি যে বঙ্গবন্ধুর স্বজনরা যখন যুদ্ধে নামতে পারে, তখন কারো কি বসে থাকার কোন অবকাশ আছে? দেরাদুনে প্রশিক্ষন কালে জামাল ও মারুফ আমার রুমমেট ছিল। শুধু সেদিন নয়, আজও অতিশয় আনন্দ ও বেদনার সাথে সে স্মৃতি স্মরণ করে উদ্বেলিত হই। এই সব কারনে শুধু জয় কিংবা শেখ রেহানার রাজনীতির কারনে রাজনীতিতে পদার্পন নয় বরং অন্যদের প্রেরণার উৎস হিসেবে এবং দলের রূপকল্প বাস্তবায়নের জন্য একান্ত আবশ্যক। আমি আরও মনে করি, আওয়ামীলীগের সকল নেতাকর্মীর সন্তানাদি উত্তরাধিকার হিসাবে এবং যোগ্যতা নিয়েই একই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। 

জানি তারা রাজনীতিতে  আওয়ামী বলয়ের বাইরে কোথাও বিকশিত হলে তাকে সমালোচকরা বলবেন গাদ্দারীপনা, আর আওয়ামীলীগে যোগ দিলে বলবে পরিবারতন্ত্র। ওরা যাবেটা কোথায়? অযোগ্য কেউ উড়ে এসে জুড়ে বসলে তাকে পরিবারতন্ত্র বললেও যোগ্যতার মাপকাঠিতে দলমুখী হলে তাকে নি:সন্দেহে বলবো দলপ্রেম বা আওয়ামীলীগের জন্য দেশ প্রেমের নামান্তর। আমরা সবাই জানি আমার অবর্তমানে আমার জমি অন্য কেউ বেশী  ভালো ভাবে চষবে না, মায়ের চেয়ে মাসীর দরদও বেশী হবে না। তাই আমার দেশের জন্য, আমার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমতের জন্য বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য আমার সন্তানকেই মুখ্য ভূমিকা নিতে হবে। আমার স্বাধীনতা আমার সম্পদ। এই সম্পদের উত্তরাধিকার আমার সন্তানরাই হবে; বৈমাত্রের ভাইয়ের সন্তানেরা নয়। 

আমার আকাঙ্খা তখন আকাঙ্খাই রয়ে গেল। সম্প্রতি একই চিন্তার ধারাবাহিকতায় ঢাকা ১০ আসনের উপ-নির্বাচনে আমি সজিব ওয়াজেদ জয় বা সায়েমা ওয়াজেদ পুতুল কিংবা শেখ রেহানাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম। তা যখন হলো না তখন আমি বিকল্প চিন্তা লালন করছি। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি আপনার অপরিহার্যতা নিয়ে কথা বলি, লিখি এবং অন্যদের বুঝিয়ে থাকি। এই যে বর্তমান দুর্যোগ তা মোকাবিলার জন্য আপনার বিকল্প আপনি নিজেই। আপনি মৃত্যুকে ভয় করেন না, মানে অবিশ্যাম্ভাবীতা সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত ও দৃঢ় বিশ্বাসী অর্থাৎ এটা আপনার ঈমানের অংশ, তবে আজ হোক, কাল হোক কিংবা পরশু হোক আপনাকে এই পৃথিবীর মায়া, এদেশের মায়া, এদেশের মানুুষের মায়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। আপনি যদি অমর হতেন কিংবা সুস্বাস্থ্য নিয়ে শতায়ু হতেন তাহলে আমরা আমাদের স্বার্থেই আপনার বিকল্পের কথা কস্মিনকালেও ভারতাম না। সেটা যখন সম্ভব নয় এবং মৃত্যু যখন আপনাকে একদিন হানা দেবেই, তখন আমাদেরকে অসহায়, এতিম হিসাবে রেখে যেতে পারবেন না। আপনার অনবদ্য সৃষ্টি রক্ষা ও বঙ্গবন্ধুর অবিনশ্বর আদর্শ চলমান রাখার জন্যে আমি আগে আপনার উত্তরাধিকার নির্বাচন কামনা করেছিলাম। এখন বলছি উত্তরাধিকার নির্বাচন সম্ভব না হলে অন্তত: উত্তরসূরী নির্বাচন করে দিন। আপনি আপনার চোখের সামনেই আপনার চেয়ে কম বয়সীদের চলে যেতে দেখছেন। কাউকে কাউকে শেষ বারের জন্য দেখতেও গিয়েছিলেন। আমরা আতঁকে উঠেছি। এখন ছবিতে আপনাকে ক্ষানিকটা বিমর্ষ বা পরিশ্রান্ত দেখালেও অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। বর্তমান দুঃসময়ে বা দুঃসময় কেটে গেলে আপনার যদি কিছু ঘটে যায় তাহলে দেশ, জাতি ও সাধারন মানুষ কার আশ্রয়ে নীত হবে? জানি আমার এই লেখা আপনাকে আতংকিত করবে না। তবে আমাদের অনুরোধ মোতাবেক আরও একটি সতর্ক হলে কিংবা আমার অনুরোধ মোতাবেক উত্তরসূরী নির্বাচন করে তাকে বা তাদেরকে আত্মস্থ হবার সময়ও সুযোগ দিলে দোষটা কোথায়? আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী