banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী*
গণ-আদালতের অব্যবহিত পরে নঈম নিজাম ‘গ-ণ আ-দা-ল-ত’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন যা আজও প্রাসঙ্গিক। বইটির সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধের পরই তিনি নিকোলাস টেমোলিনের পর্যবেক্ষক তুলে ধরেছেন, তুলে ধরেছেন লেখক তার নিজস্ব অনুভূতি। রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে জামাত, রাজাকার, আল বদর আল শামস ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার চিত্র এঁকে তাদের ঘৃণ্য অপরাধ পার পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন ‘যেদেশের রাষ্ট্র প্রশাসন তার স্বাধীনতার শত্রু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারে না- সে দেশে জনতার আদালতের বিকল্প কোথায়? ২৬ মার্চ ১৯৯২ সালে এই আদালত বসেছিল। তার বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়টির আমি শিরোনাম দিলাম ‘গণ আদালতের পটভূমির পটভূমি’। এই অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা, পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, পোড়ামাটি নীতির বর্ণনা রয়েছে। বর্ণিত হয়েছে এ দেশীয় ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী ও তাদের সহযোগীদের বুদ্ধিজীবিসহ ৩০ লাখ মানুষকে নৃশংস হত্যা, দুই লাখ ধর্ষিতা- নির্যাতীতা মা বোনের করুন আর্তনাদ, জামাত ও দক্ষিনপন্থী দলগুলোর পদলোহিতাসহ অন্যান্য কলম চিত্র। লেখক এখানে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন ৯ মাসের দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংগ্রাম, পূর্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় বর্ণিত ১৯৭১ সালে গোলাম আযমের সামগ্রিক অপতৎপরতার চিত্র এঁকেছেন। বাংলাদেশ বাস্তবতা অর্জনের পরও সে ব্যক্তি যেসব রাষ্ট্রবিরোধী কার্যাবলী বিদেশে অক্ষুন্ন রেখেছেন তাও তুলে ধরেছেন লেখক। ১৯৭৫ সালে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যার পর ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনাবলে গোলামের বাংলাদেশে আগমন ও শিকড় গেড়ে বসা ও শেষমেশ ১৯৯১ সালের ২৯শে ডিসেম্বর জামাতের আমিরের আসনে অধিষ্ঠান প্রশ্নাতীত ভাবে যোদ্ধা ও জনতায় আলোড়ন ও শিহরণ জাগিয়ে দিল। প্রথমেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিবাদ এলো বিবৃতি আকারে। তারপরে ১০১ জন সদস্য বিশিষ্ট ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উত্থান। ২৪ জানুয়ারী গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ যার পরবর্তী নামকরণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন মঞ্চ। দুটো ধারাকে সমন্বিত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠিত হয় ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ সালে যাকে সংক্ষেপে জাতীয় সমন্বয় কমিটি কিংবা ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি নামে অভিহিত করা হয়। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও জাতীয় সমন্বয় কমিটির আহবয়কের দায়িত্ব পেলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। 

আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আন্দোলনকারী শক্তির বিরুদ্ধে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা ও অবরোধ বাড়তে থাকে। ২৬শে মার্চ ১৯৯২ সাল স্বাধীনতার ২১ তম বার্ষিকীতে গণ আদালতে গোলাম আযমের প্রতীকি বিচারের সিদ্ধান্ত নেয় জাতীয় সমন্বয় কমিটি। এই কমিটি গণ-আদালতের মডেল খুঁজতে গিয়ে ন্যূরেম বার্ণ ট্রায়ালকে সামনে এনেছে যার বর্ণনা বইটিতে আছে। আন্দোলনের সাথে সরাসরি যুক্ত হলেন সাংবাদিক নঈম নিজাম। তিনি একা নন, সাথে সহযোদ্ধা যারা ছিলেন তাদের পরিচিতিও এই বইতে মিলবে। সাংবাদিকদের মধ্যে আরও ছিলেন আমান উদ-দৌলা, সৈয়দ বোরহান কবির, আশরাফ কায়সার, শ্যামল দত্ত, সেলিম ওমর খান, মঞ্জুরুল ইসলাম, মারুফ চিনু, ফজলুল বারী ও তার সহযোগী প্রভাষ আমিন, জুলফিকার আলী মানিক, হাফিজুর রহমান কার্জন, নজরুল কবির প্রমুখ। গণ আদালতের উদ্যোক্তাদের কারো নাম এসেছে অভিযোগকারী হিসেবে, কারো নাম এসেছে সাক্ষ্য হিসেবে, কেউ বা আবির্ভূত হয়েছেন বিচারক হিসেবে, আবার কেউ নিয়েছেন পক্ষ-বিপক্ষের কৌশলীর ভূমিকা। তাদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপবাদ দিয়ে বিএনপি সরকার বিচারে সোপর্দ করেছিল, তথাকথিত অভিযুক্তগণ হলেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক মুক্তিযুদ্ধের শহীদ রুমির মা জাহানারা ইমাম, ভাষা সৈনিক গাজীউল হক, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফ, ড. বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, প্রফেসর কবীর চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আনিসুজ্জামান খান, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার লে. কর্ণেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী, লে. কর্ণেল কাজী নুরুজ্জামান, ব্যারিষ্টার শফিক আহমদ, ব্যারিষ্টার শওকত আলী, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, সাহিত্যিক-সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের, মাওলানা আবদুল আউয়াল ও মাওলানা ইয়াহহিয়া, শিল্পী কলিম শরাফী, লেখক সৈয়দ শামসুল হক, শাহরিয়ার কবির, এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা জেড-আই খান পান্না, এডভোকেট উম্মে কুলসুম রেখা, এডভোকেট নজরুল ইসলাম ও ডাঃ মোশতাক হোসেন। একমাত্র আসামী গোলাম আযম। যে ১০টি অপরাধে গোলাম আযম অভিযুক্ত সেগুলোর বর্ণনা গ্রন্থটিতে কমবেশি রয়েছে। রয়েছে গণ আদালতের রায় যেখানে উল্লেখ আছে গোলাম আযমের প্রতিটি অপরাধই মৃত্যুদন্ডতুল্য, তবে যেহেতু রায় কার্যকর করার ক্ষমতা বা এখতিয়ার গণ-আদালতের নেই; তাই দেশে প্রতিষ্ঠিত সরকারের হাতে সে দায়িত্ব দেয়া হলো। সরকারে তখন জামাত-সমর্থিত বিএনপি। তাই গণ আদালতের ২৩ জন এবং অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নানসহ ২৪ জন উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে নাগরিকক্ত মামলায় গোলাম আযমকে কারাগারে নেয়া হলো। নাগরিকত্ব মামলায় বিরোধী দলের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৪ দফা দাবি উপক্ষিত রয়ে গেল। এটর্ণী জেনারেল আমিনুল হক তার পেশাগত ও দেশপ্রেমি কের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিবিধ প্রসঙ্গের অবতারণা করলেও একজন বিচারপতি তা গ্রহণ করেননি, তবুও আন্দোলন থেমে রইলো না। গণ আদালতের রায় কার্যকর করার জন্যে ১০০ জন সংসদ সদস্যের ঘোষনা বইটিতে সংযোজিত হয়েছে। বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা হতে শুরু করে সরকারী দলের একজনের স্বাক্ষরও তাতে স্থান পেয়েছে। গণ আদালতের রায় কার্যকর করার জন্যে পথসভা, সংসদ অভিযাত্রা ও অন্যান্য মিটিং, মিছিল, ঘরোয়া আলোচনা ও গণ স্বাক্ষর কর্মসূচী সারাদেশে অব্যাহত ছিল।

তারপরই নঈম নিজামের আক্ষেপের ধরণ ও মাত্রা আমরা বইটিতে দেখি। তিনি লিখেছেন ‘গণ-আদালতের রায় এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিেেকর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার হয়নি, জামাত-শিবির, বিএনপির গণধিকৃত কার্যাবলী স্থিমিত হয়নি। এক শ্রেনীর বুদ্ধিজীবি ও সাংবাদিকের দালালীতে ভাটা পড়েনি।’ তিনি দাবি জানিয়েছেন দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্বাস আলী খান, মাওলানা ইউসুফ, শেখ আনসার আলী, আবদুস সোবহান, আলী আহসান মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, কামরুজ্জামান, আশরাফুজ্জামান খান, আনোয়ার জাহিদ, এস এম সোলায়মান, আবদুর রহমান বিশ্বাস, হুমায়ুন খান পন্নিসহ অন্যান্যদের বিচার। তার দাবির মধ্যে ১৯৭৫ সালের ঘাতক ফারুক, রশিদ, ডালিম, হুদার বিচারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বইটিতে ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গণ আদালত সম্পর্কিত কার্যাবলী লিপিবদ্ধ রয়েছে, সংগত কারনেই পরবর্তী কার্যাবলী ও ঘাতক যুদ্ধাপরাধী বা স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচারের রায়গুলোর স্থান পায়নি, সঙ্গত কারনেই হয়নি; কেননা তখন পর্যন্তও গণ-আদালতের রায় কিংবা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের কেউ ছিল না। 

জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে এবং ২০০৯ সালে ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় থেকে এই ৭১ ও পচাঁত্তরের ঘাতকদের বিচার নিশ্চিত করেছেন। অর্থাৎ আমাদের সকল প্রত্যাশাই পূরণ হয়েছে কিংবা আইনী কার্যাবলী অব্যাহত আছে। 
এখন সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আরোহন ও অধিষ্ঠিত না থাকলে তার কিছুই হতো না। আমরা এটাও উপলব্ধি করছি যে তার অনুপস্থিতিতে টেবিল উল্টে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। তারই আদর্শ ও কর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষার নিমিত্তে যোগ্য উত্তরসূরী প্রয়োজন। সাহসী সাংবাদিক নঈম নিজাম সাহস করে আমাদের হয়ে তাকে তার উত্তরসূরী বেছে নেবার কথাটা বলতে পারেন? 

বইটির দাম রাখা হয়েছে ৩৫ টাকা। উৎসর্গ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ নির্যাতিতা মা বোনদের। অতি তাড়াহুড়ায় প্রকাশিত বইটিতে কিছু মুদ্রণ সমস্যা রয়েছে। এসব সংশোধন নয়, সর্বশেষ তথ্য সংযোজন করে আর একটি গ্রন্থ রচনা নঈম নিজামের কাছে আমাদের প্রত্যাশা। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, বুদ্ধিজীবি ও জাতীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব এবং উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

ট্যাগ: bdnewshour24