banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী* 
২৬ জুন ২০২০ সাল, জাহানারা ইমামের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ দিনে তার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির একটা খতিয়ান তৈরী নিশ্চয়ই অনেকের কাছে কাম্য। একজন রক্ষনশীল পরিবারের গন্ডি এড়ানো একজন গৃহবধূ থেকে একজন শিক্ষিকা; এবং সেখান থেকে তার উত্তরণ ঘটেছে শহীদ জননী হিসেবে। তবে তার সবচেয়ে উত্তম কৃতিত্ব হচ্ছে গণ আদালত অনুষ্ঠান। 
গণ আদালতের বিশিষ্ট উদ্যোক্তা/চেয়ারম্যান ছাড়াও তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটির আহবায়িকা। ৭২ সদস্য বিশিষ্ট এক কমিটির উদ্যোগেই ১০টি অভিযোগে অভিযুক্ত গোলাম আযমের বিচারে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণ আদালত বসেছিল। 
আন্দোলনের সূচনা পর্বে তার হয়তো আকাঙ্খা ছিল যে তদানিন্তন ক্ষমাসীন বিএনপি সরকারকে দিয়ে গণ আদালতের রায়টা তারা কার্যকরী করে দিতে পারবেন। এ ব্যাপারে বিএনপির আবদুল মান্নান ভূইঁয়া, সাদেক হোসেন খোকা ও মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিনের সাথে তার একটা নিবিড় যোগাযোগ ছিল। কর্ণেল নূরুজ্জামানের মাধ্যমে মোস্তাফিজুর রহমানের সাথেও একটা ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল। 

গণ আদালত অনুষ্ঠানের পর অনেকেই আন্দোলন থেকে ছিটকে পড়া শুধু নয় সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে চলে গেলেন। তাকে অপবাদ দেয়া হলো যে তিনি কতিপয় ব্যক্তির প্ররোচনায় আওয়ামী লীগের পকেটে চলে গেছেন। তিনি ২০০০ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতেন এবং আশান্বিত ছিলেন যে যে কোন সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে। কিন্তু ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন দূরারোগ্য ক্যান্সারে তিনি মৃত্যুবরণ পর্যন্ত বিএনপি সরকার আনীত রাষ্ট্রদ্রোাহীতার অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন। তার মৃত্যুকালে 

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একটা সুদূর প্রত্যাশা ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা শুরু থেকে এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন এবং গণ আদালত অনুষ্ঠানে সার্বিক সহায়তা দিয়ে আসছিলেন। তিনি গণ আদালতে অভিযুক্ত গোলাম আযম ও গণ তদন্ত কমিশন কর্তৃক চিহ্নিত আরও পনের জন যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের বিচারে প্রতিশ্রæত ছিলেন। 

জাহানারা ইমাম ১৯৮১ সাল থেকে ক্যান্সারের সাথে বসবাস শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে শেষবারের মতো তিনি ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। ২১শে জুন তার শেষ অপারেশন হলো কিন্তু ২৬ শে জুন তিনি সকলকে কাঁদিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। মৃত্যুর সময় তার বেদনা ছিল প্রচন্ড, আফসোস থাকতে পারে কিন্তু প্রচন্ড আশাবাদী ছিলেন যে তার সূচিত আন্দোলনের জন আকাঙ্খা একদিন পূর্ণ হবেই। তিনি পরিপূর্ণ বিশ্বাস করতেন যে একদিন এই বাংলার মাটিতে ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই। তার কাছে আন্দোলনের সহযাত্রীরা প্রতিশ্রæত ছিলেন। অন্যতম সহযাত্রী শেখ হাসিনা স্টীয়ারিং কমিটি সদস্যদের সামনেই এ ব্যাপারে তাকে আশ্বস্তও করেছিলেন। 

আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেতে অসমর্থ হয়ে শেষে জাসদের রব, জাতীয় পার্টির মঞ্জুকে নিয়ে কোনক্রমে জোড়া তালি দিয়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠনে সমর্থ হয়। এই সরকার গঠনের পর জাতীয় সমন্বয় কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুর রাজ্জাক সহ আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্কিত কেউ কেউ মন্ত্রীত্ব লাভ করেন। কেউ কেউ অন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পেয়ে যান। যার কারনে সমন্বয়ের অনেক নেতাই বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়েন। কেননা তার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীগণ বিভিন্ন মে  মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে গঠিত জনমতকে ধরে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন।  

সমন্বয়ের সহনশীল অবস্থার কারনও খুঁজে পাওয়া যায়। শেখ হাসিনা তাদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে মাত্র ৩৭ ভাগ জন সমর্থন নিয়ে কোয়ালিশন সরকার নিয়ে দেশে বিদেশে বৈরীতা ও জামাত-শিবিরের সশস্ত্র জামাতের মুখে তাদের শীর্ষ নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু অসম্ভব। ত্ইা তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সংশোধন ও ট্রাইবুন্যাল গঠনের কোন উদ্যোগকে বরং হঠকারী বলে বিবেচনা করেন। তিনি আমাদেরকে পরবর্তী নির্বাচন ও ক্ষমতারোহন পর্যন্ত অপেক্ষার অনুরোধ জানান। 
২০০১ সালে নির্বাচনে অসতর্কতা কিন্তু ষড়যন্ত্র, কিছু সুক্ষ, কারচুপি ও কৌশলগত বিভ্রান্তির কারণে পুনরায় জামাত-শিবির চক্র ক্ষমতায় ফিরে আসলে সকলের উপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। তবুও তার সহযোদ্ধারা প্রদত্ত প্রতিশ্রæতি ভুলে না গিয়ে একটা শুভ দিনের প্রতীক্ষায় থাকেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ ও তার ১৪ দলীয় জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি দফায় ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের স্বার্থহীন ঘোষনা স্থান পায়। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের কালে শেখ হাসিনা এক ধরনের ব্যতিক্রমী মুনশীয়ানার স্বাক্ষর রাখেন যাকে বরং দূরদর্শিতা ও বিশ্বাসের প্রতি একনিষ্ঠতা হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। নির্বাচনে তিনশ প্রার্থীর মধ্যে প্রায় দুই তৃতীয়াংশকে এমনভাবে মনোনয়ন দেয়া হয় যারা কোন না কোন ভাবে ঘাতক নির্মুল জাতীয় সমন্বয় কমিটির সাথে যুক্ত ছিলেন। যার ফলে সংসদের প্রথম অধিবেশনে অতিশয় স্বচ্ছন্দে ও নির্বিঘ্নে ১৯৭১ এর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল আইন সংশোধনসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল গঠন দ্রুত সম্ভব হয়। এসব ব্যাপারে যিনি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি মানে ট্যাকনোক্রেট মন্ত্রী ব্যরিষ্ট্রার শফিক আহমদ গণ আদালতের অন্যতম বিচারক ছিলেন। পরবর্তী আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের পিতা এডভোকেট সিরাজুল হক সমন্বয়ের আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। এসব কারণে পরবর্তী প্রয়োজনীয় সংশোধনী কার্যক্রম স্বাচ্ছন্দে চালান সম্ভব হয়েছিল। ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের কৃতকর্মকে মানবতা বিরোধী আখ্যায়িত করে অপরাধের ভিত্তিকে বিস্তৃত করা হয়। শত প্রতিকূলতার মাঝেও বিশেষতঃ কতিপয় পরাক্রমশালী ও পরাসংগঠনের চরম বিরোধী তার মুখে অপরাধের ভিত্তিকে বিস্তৃত করা হয়। চরম বিরোধীতা ও ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে গণ আদালতে চিহ্নিত অপরাধী গোলাম আযম ও গণ তদন্তে কমিশন চিহ্নিত প্রায় সকলকে বিচারের আওতায় আনা হয়। পাশপাশি ট্রাইবুন্যালের অধীনস্থ তদন্ত কমিটি দূর দূরান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, লুকিয়ে থাকা কিংবা ভুলে থাকা শীর্ষ মানবতা বিরোধীদের চিহ্নিত করে ট্রাইবুন্যালে সোপর্দ করতে থাকে। এখন গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, আবদুল আলিম, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মীর কাশেম আলী, কামরুজ্জামান, কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোজাহিদসহ ৫২ জন অভিযুক্ত বিভিন্ন ধরনের সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে।  

জাহানারা ইমাম যাদের কাছে আন্দোলন আমানত রেখেছিলেন তারা বিশেষতঃ শেখ হাসিনা তাকে হতাশ করেননি। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে এই সরকারের বর্তমান মেয়াদ শেষে দেশে তেমন কোন ঘৃণিত মানবতা বিরোধীদের বিচার অসমাপ্ত থাকবে না। বিষয়টি জীবিত আন্দোলনকারীদের জন্যে সুখবর ও পরলোকে থেকে যারা আমাদের দেখছেন তাদের জন্যে আনন্দদায়ক। জাহানারা ইমামের মূল লক্ষ অর্জিত হতে যাচ্ছে। জীবদ্দশায় তিনি তার আয়ুর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সজাগ ছিলেন বলেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন অপেক্ষা স্বল্প মেয়াদী ঘাতক নির্মূল আন্দোলনকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমতা এসেছে। 

 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, সদস্য সচিব, জাতীয় সমন্বয় কমিটি, মুক্তিযোদ্ধা ও উপচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

 

 

 

ট্যাগ: bdnewshour2