banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী*

‘ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে কোরবানীর পশুর হাট নয়’ শিরোনামের খবরটির প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। জাতীয় কারিগরী পরামর্শক কমিটির এই সিদ্ধান্তটি আগেই আসা উচিত ছিল। আরও একটি সাহসী পদক্ষেপ হতো যদি তারা বলতে পারতো যে সৌদি আরবের ন্যায় আমাদের দেশেও মাত্র ১০০০ জনের মধ্যে কোরবানী সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। কোরবানী হচ্ছে হজ্ব পালনকারীদের জন্যে ফরজে কেফায়া বা ওয়াজিব, আর অন্যান্য মুসলমানের জন্য সুন্নাতে ইব্রাহিম। আফ্রিকার অন্ততঃ দুটো দেশে আমি অবলোকন করেছি যে রাজা বা দেশ শাসক জনগনের পক্ষ হয়েই সার্বিক কোরবানীর কাজটা করে থাকেন। মরক্কো ও তিউনেসিয়ায় ব্যক্তি বিশেষ যত সামর্থবান হোক না কেননা, তারা ব্যক্তি উদ্যোগে কোন কোরবানী দেন না। আমাদের দেশে কোরবানীর সাথে জড়িত অংশীজনের কথা বিবেচনায় নিয়ে তাদের মতামত নিয়ে কোরবানীটা অন্ততঃ এ বছরের জন্যে একান্ত সরকারি নিয়ন্ত্রনে আনার সময় এখনও চলে যায়নি। কোরবানীর সাথে জড়িত অংশীজনরা হচ্ছে বিত্তশালী মুসলমান, কোরবানীর, পশু পালনকারী কিংবা বৈধ-অবৈধভাবে আমদানীকারক, চামড়া ব্যবসায়ী, চামড়া শিল্প, গরীব জনগন ও কোরবানীর পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর সাথে জড়িতগণ। এসব স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট এক বা একাধিক পক্ষকে নিয়ে 

আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা এই কোরবানীর সাথে সম্পর্কিত। পশুর ব্যাপারীদের কথা বাদ দিলাম। গৃহ পর্যায়ে বহু মানুষ একটা সুসময়ের আকাঙ্খা নিয়ে গরু, ছাগল বা মহিষ কোরবানী উপযোগী করে তৈরী করতে বহু বিনিয়োগ, সময় ও শ্রম দিয়ে থাকে। তাই চট করে কোরবানীটা সীমিত করে ফেললে বহুপক্ষ ক্ষতিগ্রস্থ হবেন যাদের মধ্যে বহু শক্তিমানরাও রয়েছেন। সে কারণে কমিটি শুধুমাত্র পরখ করে দেখার জন্যে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারতো যে এ বছর যেহেতু কেউ হজ্জ্বে যায়নি এবং সবাই দেশের অভ্যন্তরে রয়েছে তাই তাদের সবারই এবারে কোরবানীর প্রয়োজন নেই। এ জাতীয় একটা আহবান জানিয়ে তার প্রতিক্রিয়া অবলোকনপূর্বক সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। এত গেল অংশীজনদের এক পক্ষের কথা। অন্যান্য যে পক্ষ রয়েছে তাদের স্বার্থ কিভাবে রক্ষিত হবে? আমার কাছে আপাততঃ উদ্ভট একটা পরিকল্পনা রয়েছে যা সবার সাথে শেয়ার কতে চাই। 

সারাদেশে কোরবানী প্রদানে সমর্থ মানুষের সংখ্যা সরকারের পক্ষে জানা কোন অসম্ভব ব্যাপার নয়। বিভিন্নস্তরের গণ-প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তা জানা সম্ভব। তাদের কে কত টাকা কোরবানীর জন্যে বরাদ্দ রাখছে তাও জানা সম্ভব। তাদের প্রত্যেকের টাকাটা জনপ্রতিনিধিদের হাতে প্রদানের আহবান জানানো যায়। সংগৃহীত টাকা দিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে অনলাইন পশু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাহিত সংখ্যার পশু কিনে তা জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে নিরাপদ স্থানে কোরবানী দেয়া যেতে পারে। মাংস বন্টনের দাযিত্বটা কেন্দ্রীয়ভাবে করা যায়। কেন্দ্রগুলোতে এলাকা ভিত্তিক চিহ্নিত করা সম্ভব। তাতে কিন্তু সকলপক্ষের স্বার্থই রক্ষিত হলো। ধর্মীয় চেতনা বা বাধ্যবাধকতার ব্যাপারটি কিন্তু অবহেলিত হলো না। যদি তা-না করা যায় তাহলে আমাদের পরিনামের জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে। যতই স্বাস্থ্যবিধি বা নিরাপদ দুরত্বের কথা বলা হোক এই বর্ষাকালে পশুর হাটে ক্রয়-বিক্রয় ও কোরবানীতে জড়িত আনুষ্ঠানিকতা পালনে সে সব বিধি বা দূরত্ব বজায় একেবারে অসম্ভব ব্যাপার। সে কারণে কোরবানী উপলক্ষ্যে করোনার অবাধ প্রসার অনেকটা নিশ্চিত।

করোনা নিয়ে আমরা যে পর্যায়ে আছি সেটার দৌরাত্ম অনেকেই অধিক অবলোকন করবেন এই মাসের শেষের দিকে। তাই তার যৌবনত্ব বা পরিপুষ্টায়নে আমাদের ভূমিকা শূণ্যতে নিয়ে আসা উচিত। শুধুমাত্র ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ বা গাজীপুরে সাবধানতা অবলম্বন সারাদেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে না, বিষয়টা গভীরভাবে বিবেচ্য। অতীত অভিজ্ঞতার অভাবে করোনা ব্যবস্থাপনায় কিছু দীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখন আমাদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমাদের মত জনবহুল ও 
অনন্য জনঘনত্বপূর্ণ সমাজ ও তত উৎসারিত সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে আমাদের সরকার যে পরিমাণ দক্ষতা নিয়ে করোনাকে পোষ মানাচ্ছে তা অকল্পনীয় ও প্রশংসনীয়। জনমানুষের কল্যাণে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার ঐতিহ্য শেখ হাসিনা সরকারের রয়েছে। আমি বলবো না 
সারাদেশে অন্ততঃ এ বারের জন্যে কোরবানী পরিহার করা হোক। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন হবে তার সূদুর প্রবাসী রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। তবে সরকার 
অন্ততঃ এ বছরের জন্যে কোরবানীটাকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার পথ খুঁজতে পারে। আমাদের দেশের মানুষ কূটচালক হলেও আপন বুঝ পাগলেও বুঝে। তাই সামগ্রিকভাবে করোনার মহামারীর ব্যাপকতা ঠেকাতে কেন্দ্রীয়ভাবে কোরবানী ও মাংস বন্টনের কথা কি চিন্তা করা যায় না? 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

ট্যাগ: bdnewshour24