banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী*
দেশের জনসংখ্যার অন্ততঃ এক পঞ্চমাংশ শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাদের বিশালাংশ করোনায় বিধ্বস্ত, বিভ্রান্ত ও বেকার এবং আর্থিক বিপর্যয়ের শিকার। সংখ্যার বিচারে বিশেষতঃ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অবস্থাটা এতটা সঙ্গীন না হলেও অন্যান্য পর্যায়ে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী একেবারে অলস সময় কাটাচ্ছে। টেলিভিশন এর মাধ্যমে জ্ঞানাধারে তারা কিছুটা হয়তো হানা দিচ্ছে আর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শিক্ষার চেয়ে কুশিক্ষা বেশী পাচ্ছে। আমার বিশ্বাস শিক্ষাই আলো কিন্তু কুশিক্ষার চেয়ে অশিক্ষাই ভালো। 

তবে এই অশিক্ষা নিয়ে আমরা অর্জিত প্রগতিটা কতদিন ধরে রাখতে পারবো? তাই অচিরে কোন না কোন ভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা বাঞ্ছনীয়। সিঙ্গাপুরে শিশুদের স্কুলও খুলে দেয়া হয়েছে। তাদেরকে পালাক্রমে ক্লাশে উপস্থিত করে স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতার সাথে শিক্ষা কার্যক্রম প্রথমে চালানো হলেও এখন তারা পূর্ণাঙ্গ পুরো সপ্তাহ ভিত্তিক কার্যক্রম চালু করেছে। 

আমাদের দেশে শিক্ষা কার্যক্রম দিয়ে শুরু করে ক্রমান্বয়ে পরীক্ষা কার্যক্রম সচল করা উচিত। বেসরকারি খাতের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষা কাজে সংশ্লিষ্টদের আর্থিক সংকট চরমে উঠেছে। সরকারি সাহায্যের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে অচিরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষালয়গুলো সচল করা যেতে পারে। তবে তা করতে হবে ঈদের পর ২০ দিনের পর্যবেক্ষনের পর। তখন হয়তো দেখা যাবে প্রচুর শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। 

পরে পড়ার ব্যাপারটা অবশ্য আপেক্ষিক। যারা কার্যক্রম শুরুই করতে পারছে না; তাদের শতভাগ তো তাত্তি¡কভাবে ঝরে পড়েছে। তাদেরকে ফেরত আনতে ব্যাপক গণ-চেতনা সৃষ্টি সহ সামাজিক ও আর্থিক প্রণোদনার প্রয়োজন। যারা অনলাইন কার্যক্রম শুরু করেছে তারা ঝরে পড়ার দৃশ্য অবলোকন করেছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে চলমান শিক্ষার্থীদের অংশ গ্রহণ সন্তোষজনক হলেও নতুন শিক্ষার্থীর ভর্তির হার হতাশাব্যাঞ্জক। ঝরে পড়াটা এই উভয় দৃষ্টিকোন থেকে বিচার্য হতে হবে। শিক্ষা বাজেটে একটা বিরাট পরিবর্তন কাম্য, কারণ দেশের অনলাইন অবকাঠামোগত সুবিধা সৃষ্টি এবং মানসিক শিথিলতা উত্তোরনে আর্থিক প্রণোদনা দিতে গেলে বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থের প্রয়োজন হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রসাশনে জড়িতদের আর্থক সংকট বিবেচনায় নিয়ে সরকারের করণীয়ই এখন মুখ্য।

করোনার কারণে বেকারত্ব বেড়েই চলছে। দেশে বিদেশে একই চিত্র এবং যার প্রভাব নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও চলমানতা রক্ষায় পরিস্ফুট হচ্ছে। এমতাবস্থায় করণীয় বলতে সরকারকেই ব্যাপক ভূমিকা নিতে হবে যদিও দেশের শিক্ষালয়গুলোর নব্বই ভাগের বেশি বেসরকারী অর্থে পরিচালিত। বেসরকারি খাতের সক্ষমতা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। অনেক বেসরকারি শিক্ষালয়ের শিক্ষকরা বিকল্প পেশায় ঝুঁকছে; উদ্যোক্তরা ভাড়া করা শিক্ষাতন গুলো বন্ধ করে রাখছে, বিদ্যুৎ বা অত্যাবশ্যকীয় বিলগুলো দিতে পারছে না, কর্মচারী ছাঁটাই করছে কিংবা বেতনের কিয়দাংশ প্রদান করছে অর্থাৎ কোনভাবে অস্তিত্ব রক্ষা করছে। কিন্তু বেশীদিন তা ধরে রাখতে পারবে না, কেননা বিদ্যার্থীরা হয় ফি দিতে পারছে না বা দিচ্ছে না। 

এমতাবস্থায়, সরকারকে এই শিক্ষা বাজেট পরিমার্জন করতে হবে। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির সাথে সাথে ইন্টারনেটের মূল্যবৃদ্ধিটা পূর্ণমূল্যায়ন প্রয়োজন। 
আমার মনে হচ্ছে শিক্ষালয়গুলোতে ব্যবহার্য ইন্টারনেটের মূল্যবৃদ্ধি কোন ভালো সিদ্ধান্ত নয়; বিদ্যুতের দাম বাড়ানোও ঠিক হয়নি। অব্যাবহৃত বিদ্যুৎ ও অব্যাবহৃত ব্রডব্যান্ড সুবিধা বিনা খরচে বা স্বল্প ব্যায়ে শিক্ষালয়গুলোতে সঞ্চালন প্রয়োজন। তাছাড়া অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার নিম্নাঞ্চলের প্রসারের জন্য কি করা যায় তা ভাবতে হবে। করোনার প্রাদুর্ভাব না কমলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী শিক্ষাঙ্গনে ফিরিয়ে আনতে গেলে সামাজিক প্রতিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। বিকল্প হবে এসব স্তরেও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের অবকাঠামোগত ও আর্থিক সুবিধার সম্প্রসারন। তদুপরি মাননীয় শিক্ষা মন্ত্র্রীর মতো আমিও মনে করি করোনা বিদায় নিলেও অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাবে না, প্রাশ্চাত্যের অনেক দেশেই করোনার আগমনের আগেই আবাসিক সংকট, ভৌতিক অবকাঠামোর অপ্রতুল্যতা কিংবা যানজটে বা যোগ্য শিক্ষকের অভাবে। আমাদের দেশেও এসব সংকট রয়েছে। অনলাইন শিক্ষা বা দূর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকতা পাচ্ছিল। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে পথিকৃত ব্যক্তিত্ব। 

ট্যাগ: bdnewshour24