banglanewspaper

অনলাইনে পণ্য কেনার ‘দ্য জেড বয়’ নামে চ্যাট বট উদ্ভাবন করে পশ্চিমা দুনিয়ায় সাড়া ফেলেছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক নাজমুস সাকেব নাঈম। জারস সলিউশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী নাঈম পেশায় আইটি বিশেষজ্ঞ। একইসঙ্গে থাইল্যান্ডের একটি ইউনিভার্সিটির অতিথি শিক্ষক হিসেবেও সুনাম কুড়িয়েছেন। সম্প্রতি এই নাঈম আবারও আলোচনায়। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তাকে ভয়ংকর প্রতারক হিসেবে শনাক্ত ও গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

তারা জানান, নাঈম নিঃসন্দেহে একজন মেধাবী ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন। প্রথমদিকে তার মেধা কল্যাণের জন্য ব্যবহার করলেও পরবর্তী সময়ে তিনি প্রতারণার কাজে ব্যবহার করতে থাকেন। ইতোমধ্যে প্রতারিত একজন ব্যবসায়ীর সন্ধান পাওয়া গেছে। আরও কেউ প্রতারিত হয়েছেন কি-না, খোঁজা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পাপুয়া নিউগিনিতে বসবাসকারী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী এম এ ওয়াহেদের ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড হ্যাক করে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেন নাঈম। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের পুলিশ প্রায় ৮ মাসের দীর্ঘ তদন্ত শেষে নাঈমকে ভয়ংকর আইটি প্রতারক হিসেবে শনাক্ত ও গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাপুয়া নিউগিনিতে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াহেদের ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড হ্যাক হয় ২০১৪ সালে। এ সময় তার কার্ড থেকে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা খোঁয়া যায়। ২০১৪ সালের ২১ জুলাই থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৮০ দিনে ১ হাজার ৪৭২টি লেনদেন ও অনলাইন কেনাকাটার মাধ্যমে এই অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। প্রতারকের পরিচয় আড়াল করতে বিশ্বের ৯টি দেশ থেকে অনলাইনে এই কেনাকাটার কাজ করা হয়।

তেজগাঁও বিভাগের পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ২০০৭ সালে পাপুয়া নিউগিনির ব্যাংক সাউথ প্যাসিফিক লিমিটেডে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট খুলে ভিসা ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড নিয়েছিলেন ওয়াহেদ। ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসের শেষ দিকে ব্যবসায়িক কাজে সিঙ্গাপুরে যান তিনি। ব্যবসায়িক কাজ শেষে সিঙ্গাপুরের পার্ক রয়েল হোটেলের বিল পরিশোধ করতে হোটেলের পজ মেশিনে নিজের ভিসা ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড প্রবেশ করাতেই মেশিনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, রেস্ট্রিকটেড। কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। 

পরে তিনি নিজের কাছে থাকা নগদ ও ঘনিষ্ঠজনদের সহায়তায় পাপুয়া নিউগিনিতে ফিরে যান ওয়াহেদ। এরপর ব্যাংক সাউথ প্যাসিফিক লিমিটেডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ জানায়, প্রতারণামূলক বৈদেশিক লেনদেন সন্দেহে তার ভিসা কার্ডটি ‘রেস্ট্রিকটেড’ করা হয়েছে। তবে ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ প্রতারণামূলক এই লেনদেনের দায় চাপায় ওয়াহেদের ওপর। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করে, ওয়াহেদ তার কোনো আত্মীয়-কর্মচারীকে কার্ডের তথ্য সরবরাহ করেছেন। তারা জালিয়াতি করে টাকা হাতিয়েছে।

এখন ব্যাংকের ওপর দায় চাপিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করছেন ওয়াহেদ। পাপুয়া নিউগিনির ব্যাংক সাউথ প্যাসিফিক লিমিটেডের কাছ থেকে এমন বক্তব্য পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওয়াহেদ। ক্ষতিপূরণ আদায়ে ও ব্যাংকের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণে আইনি লড়াই শুরু করেন তিনি। আইনজীবী পিটার বেশইউকের মাধ্যমে তিনি যেসব দেশ থেকে তার কার্ড হ্যাক করে অনলাইনে কেনাকাটা হয়েছে, সেসব দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা চান।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, হংকং, চীন ও থাইল্যান্ডে তার কার্ড থেকে এই প্রতারণামূলক বৈদেশিক লেনদেন বিষয়ে আইনগত সহায়তা প্রার্থনা করেন তিনি। টাকা উদ্ধারে তিনি নিজের আইনজীবী নিয়ে চারটি দেশেও গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সব দেশ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি আইনগত কোনো সুবিধা পাননি। পরবর্তী সময়ে ওয়াহেদ ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) শিল্পাঞ্চল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা করেন।

প্রায় ৮ মাস তদন্তের পর হ্যাকিং ও জালিয়াতি-সংক্রান্ত নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে গত ২৫ আগস্ট সাকেব ও তার সহযোগী মইনুল ইসলাম মামুনকে রাজধানীর ডিওএইচএস থেকে গ্রেফতার করে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ। পরে আদালতের নির্দেশে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে সাকেবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মো. সাতারুজ্জামানের আদালতে হ্যাকিং ও জালিয়াতির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সাকেব। 

পাপুয়া নিউগিনিপ্রবাসী আবদুল ওয়াহেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, এত হাই এন্ড টেকনোলজি ইউজ করে যে প্রতারণার ঘটনাটি ঘটিয়েছে তা ডিটেক্ট করে বাংলাদেশের পুলিশ। দেশের পুলিশ সদস্যরা আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত করে সেই প্রতারককে আটক করতে সমর্থ হয়েছেন। আমি তাদের স্যালুট জানাই। অতি উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে মামলা করলেও সেসব দেশের পুলিশ এর রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। আমি বাংলাদেশ পুলিশের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকব। 

তিনি আরও জানান, তার কার্ডের তথ্য হ্যাক করে বাংলাদেশ থেকেও কেনাকাটা করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এসে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করি। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পাপুয়া নিউগিনির ব্যাংকের যাবতীয় স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণ করা হয়। তারপর অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়েতে ওই কার্ডের ব্যাপারে তথ্য খুঁজে নাঈমকে শনাক্ত করা হয়।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার হাফিজ আল ফারুক বলেন, ‘প্রতারক নাঈম তার নিজের পরিচয় আড়াল করার জন্য বিভিন্ন দেশে গিয়ে কেনাকাটা করেন। যাতে ভবিষ্যতে কোনো তদন্তে তার নাম বেরিয়ে না আসে সে জন্য তিনি প্রযুক্তিগত নানা কৌশল ব্যবহার করেন। তার ধারণা ছিল তদন্তকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের কাজ হিসেবে মনে করে তাকে আর ধরতে পারবে না। অনলাইনে লেনদেনের সময় তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করতেন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসায়ী ওয়াহেদের মতো আরও কোনো ভুক্তভোগী আছেন কি-না, তাও খোঁজা হচ্ছে।’

কে এই নাঈম : ১৯৮৫ সালে ময়মনসিংহে জন্ম নেয়া নাঈম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার পর অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন, এন্ট্রি ফ্রড সুইট, কাউড অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটিং ও ডিপ লার্নিং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ের ওপর দক্ষতা অর্জন করেন। তার তৈরি পেখম অনলাইনে হোটেল বুকিংয়ের জন্য প্রসিদ্ধ। বাংলাদেশের ৩৫০টির বেশি হোটেলের রুম ইনভেন্টরি বুকিং ডটকম ও এক্সপেডিয়ায় অটো আপডেট করার ব্যবস্থা করেন তিনি। 

ইজিপেওয়ে (পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিস প্রোভাইডার) প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ব্ল্যাকবাস্টার ও সিলভার সিনেপ্লেক্সের ডিজিটাল টিকিট ব্যবস্থার প্রবর্তকও তিনি। থাইল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি সিভিল ব্যাংক অব নেপালের ডিপ লার্নিং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ের কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। নাঈম নন্দন গ্রুপের হেড অব আইটি, কডেরো লিমিটেডের সিইও, এসএসএলের ওয়্যারলেসের হেড অব ই-কমার্স ও জারস সলিউশনের সিইও হিসেবে রয়েছেন।

ট্যাগ: bdnewshour24