banglanewspaper

যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে চীন।  এজন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে এখনই চলছে দেশটির জোর প্রস্তুতি। বিশেষ করে চলমান করোনা পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেই নিজস্ব অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে আরো একগুচ্ছ নীতিগত সিদ্ধান্ত হাজির করেছে চীনা সরকার। নতুন এ নীতিকে বলা হচ্ছে ‘ডুয়াল সার্কুলেশন’ বা অর্থনীতির দ্বৈত প্রবাহ। 

মোটাদাগে এ নীতিতে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ভেদে চীনের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে দুটি বৃত্তে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে আগের তুলনায় অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ব্যবসার ওপর। ডুয়াল সার্কুলেশন বেইজিংয়ের অর্থনীতিতে সত্যিকার অর্থেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কিনা অথবা ধারণাটির নতুনত্ব ঠিক কতটুকু, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা থেমে নেই। 

যেমনটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়নার সাবসিডিয়ারি হংকংভিত্তিক আইসিবিসি ইন্টারন্যাশনালের অর্থনীতিবিদরা গত কয়েক সপ্তাহে অর্থনীতির এ দ্বৈত প্রবাহ নীতির ওপর বেশকিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে একটি প্রতিবেদনে তারা আলোচনা করেছেন বিশ্বায়নের পরবর্তী ধাপে এ চীনা নীতির প্রয়োগ নিয়ে।

প্রতিবেদনটিতে অর্থনীতিবিদরা দুটি চার্ট ব্যবহার করেছেন। প্রথম চার্টে এমন এক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরা হয়, যেখানে বৈশ্বিক চাহিদা চক্রের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে দ্বিতীয় চার্টে পুরো বিশ্বকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়া এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। একই সঙ্গে দেখানো হয় যে অঞ্চলগুলো পরস্পরের মধ্যে আঞ্চলিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হবে। আর এক্ষেত্রে এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করবে চীন ও তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবাহ।

অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হাইনরিখ ফাউন্ডেশনের গবেষণা সহকারী স্টিফেন ওলসন বলেন, চীন যে আগামী দুই দশকে গত দুই দশকের মতো ব্যাপকভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারবে না, তা দেশটির ডুয়াল সার্কুলেশন নীতির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক একীভবন নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রে কৌশলগত ভুল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। 

কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, বর্তমান মার্কিন নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, একীভবনের এ নীতির ফলে চীন দারুণ লাভবান হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য তেমন সুবিধা করতে পারেনি। ফলে পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ ও সৃষ্ট বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে উভয় দেশের মধ্যে পণ্য সরবরাহ গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

এদিকে একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার। কিন্তু গত বছর দেশ দুটির মধ্যে বিরোধ বাড়লে উত্তর আমেরিকা তার শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে চীনের স্থলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখাপেক্ষী হয়। এ অবস্থায় চলতি বছর চীনের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে আসিয়ানভুক্ত (অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ এশিয়ান ন্যাশনস) দেশগুলো।

সম্প্রতি চীনের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নসংক্রান্ত সভায় দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে আমার দেশের অবস্থানের উন্নয়ন আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ হবে আমাদের সম্পর্ক। ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ আকর্ষণের জন্য চীন একটি বৃহৎ ক্ষেত্রে পরিণত হবে।

কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাণিজ্যের শীর্ষস্থান দখলের জন্য চীনকে দেশের ভেতরেও বেশকিছু সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। এর মধ্যে কিছু সমস্যা একেবারেই নতুন, যার মধ্যে অন্যতম হলো চলতি বছর দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের প্রবল বন্যা। 

এছাড়া চলমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার ক্ষেত্রেও দেশটিকে বেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা এবং বেসরকারির তুলনায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অধিক অনুকূল পরিবেশের মতো পুরনো সমস্যা তো রয়েছেই।

ফাউন্ডার সিকিউরিটিজের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইয়ান সে বলেন, বর্তমানে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর অধিকতর নীতিগত গুরুত্বারোপ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সরকারকে অবশ্যই দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা পরিবেশের উন্নয়ন করতে হবে। 

কারণ একদিকে যেমন চীনা বাজারের বৃদ্ধি ঘটছে, তেমনি আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে নিত্যনতুন সংকট। এ পরিস্থিতিতে বহু বিদেশী কোম্পানি ‘ইন চায়না, ফর চায়না’ পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপাত্ত অনুযায়ী, জুলাইয়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চীনে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ।

চায়না অ্যাসোসিয়েশন অব পলিসি সায়েন্সের দি ইকোনমিকস পলিসি কমিশনের উপপরিচালক শু হংচাই বলেন, চীনের রফতানিকে ভেতরমুখী করা সত্যিই একটি ভালো বিষয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হবে। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তবে এ চাহিদা পুরোপুরি মহামারীপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া বেশ কঠিন কাজ।

এদিকে হাং সেং চায়না ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডান ওয়াং বলেন, এ বছর কিংবা আগামী বছরে ভোক্তাব্যয় নয়, বরং অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে বিনিয়োগ ও রফতানি। অর্থনীতিতে ভোক্তাব্যয়ের অবদান বৃদ্ধি করতে চীনকে উপার্জনের ক্ষেত্রে বেশকিছু সংস্কার করতে হবে। 

তবে তার মতে, বর্তামানে দীর্ঘমেয়াদে অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর অধিকতর নির্ভরশীল হওয়ার জন্য চীনের ওপর ক্রমাগতভাবে চাপ বাড়ছে। কারণ বৈশ্বিক বাণিজ্যে চীনের গুরুত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্য দেশগুলো তাদের চীননির্ভরতা পুনরায় বিবেচনা করে দেখছে। আর এ অবস্থা মোকাবেলার জন্যই অর্থনীতিতে দ্বৈত প্রবাহ নীতি কার্যকরের চেষ্টায় রয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। খবর সিএনবিসি।

ট্যাগ: bdnewshour24