banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

দেশের স্কুল কলেজগুলো সেই ১৭ মার্চ থেকে এক জায়গার নিথর দাঁড়িয়ে আছে। সর্বশেষ ৩রা অক্টোবর পর্যন্ত ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তারপরও প্রাপ্ত বাস্তবতায় ছুটির মেয়াদ বাড়াতেই হবে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশের প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কতিপয় কলেজ কায়ক্লেশে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেলে তাদের ফিডার হিসেবে বিবেচিত উচ্চ মাধ্যমিক ফাইনাল পরীক্ষাটার অনিশ্চয়তা কিছুতেই ঘুচছে না। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হবার কথা ছিল বিগত এপ্রিল মাসে। এখন এই পরীক্ষা যে কবে হবে তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। করোনার মধ্যেও এই পরীক্ষাসহ সমমানের পরীক্ষার জন্যে কিছু না কিছু প্রস্তুতি বোর্ড গুলোর রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস। তা না হলে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ বলতে পারেন না যে তারা কলেজ বা মাদ্রাসাগুলো খোলার ১৫ দিনের মধ্যেই পরীক্ষা নিতে পারবেন। 

এই পরীক্ষাটা একটা মহা কর্মযজ্ঞ। শিক্ষার্থী সংখ্যা মাধ্যমিকের তুলনায় কম হলেও পুরো কর্মযজ্ঞের সাথে কম করে ত্রিশ-চল্লিশ লাখ লোক জড়িয়ে যেতে বাধ্য। অর্থাৎ এই কর্মযজ্ঞ সারা দেশটাকে কোন না কোন ভাবে জড়িয়ে নিতে বাধ্য। ফলশ্রæতিতে সারাদেশে করোনার সম্প্রসারণ অবধারিত। শীত ঘনিয়ে আসছে। আশংকা করা হচ্ছে শীতে করোনার প্রাদুর্ভাব ব্যাপক ও তীব্রতর হবে। শত চেষ্টায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও পরীক্ষা বিধি মেনে আগামী এপ্রিল মাসের আগে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে আমাদের মহা সংকট লালন করেই চলতে হবে। এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী কিছু না করে এত অলস সময় কখনও কাটিয়েছে কিনা সন্দেহ। একমাত্র ব্যতিক্রম মুক্তিযুদ্ধের সময়টা। এরই মাঝে অলস মস্তিষ্ক যে শয়তানের লীলাভূমি তার কিছু প্রমাণ 

এখানে সেখানে মিলছে। যুব সমাজের পদস্থলন এবং অনাকাঙ্খিত অসামাজিক কার্যক্রমের বিস্তার তার সামান্য পরিচয় কি বহন করছে না? যুবশক্তি আমাদের বড় শক্তি, তা পচে যাচ্ছে, বখে যাচ্ছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ অলস ও অনুৎপাদনশীল কাজে জড়িত থাকছে বা বিকল্প জীবিকার ধান্দায় মেতেছে। জাতীয় জীবনে তার নেতিবাচক প্রভাবও অবশ্যম্ভাবী। এমতাবস্থায় ব্যক্তিক ক্ষয়ক্ষতির অপেক্ষা জাতীয় ক্ষয়ক্ষতি অধিকতর ধর্তব্যের বিষয়। 

দেশে প্রায় অর্ধেকের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে; বিগত দু’সেমিষ্টার শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে গিয়ে তারা মহাসংকটে নিপতিত। করোনার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হাতে গোনা ক’টি ছাড়া বাকীরা শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। শিক্ষার্থী না পেলে আয় উপার্জনের পথ বন্ধ। তাই অনেক জায়গায় অলিখিত বেকারত্ব মাথা চাড়া দিচ্ছে। মৌলিক সুবিধাদি অক্ষুন্ন রেখে শিক্ষক কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের নিয়োগ অক্ষুন্ন রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় চলতে দিলে অধিকাংশ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

এ যাবত তারা যাদের পড়িয়ে যাচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে নাম মাত্র ফি সংগ্রহ সম্ভব বলে দিন দিন সকলের ভান্ডারে টান পড়েছে। এক সময় যাদের রমরমা অবস্থা ছিল তারাও হাসফাস শুরু করছে। মাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষা না হলে তাদের চালিকাশক্তি বিলীন হয়ে অস্তিত্ব সংকটের দামামা বেজে উঠবে। এমতাবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেয়াটা ব্যক্তিক, সামষ্টিক ও জাতীয় পর্যায়ে অপরিহার্য হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা দিতে পারছে না বলে বিদেশ গমন প্রত্যাশী ও সামর্থবানের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার পথও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সব বিবেচনায় কোন না কোন ভাবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাটা নেয়া বাঞ্চনীয়। নাই মামার চেয়ে কানা মামা খুঁজে নেয়াটাও এক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ হতে পারে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রনালয় প্রতিনিয়ত চিন্তা ভাবনায় নিয়োজিত থাকলেও বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না, আমি এ ব্যাপারে একটি উচ্চাভিলাষী কৌশলের কথা বলবো। 

আমার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে প্রায় ৫৪ বছরের শিক্ষকতা ও পরীক্ষা কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিকল্প ওপেন বুক বা খোলা বই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়ার কথা বলবো। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষার্থীর আপন আবাসস্থলই হবে এক একটি পরীক্ষা কেন্দ্র। 
এই কেন্দ্রে কোন পরিদর্শক থাকবেন না, পরিবারের কর্তা ব্যক্তিকে তার মানবিকতা, মানসিকতা ও উচ্চ মানের বিবেক সংযোতা করে নিয়ে পরিদর্শকের কাজ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের পরীক্ষা শেষে পরীক্ষার খাতা নিকটবর্তী কলেজে বা সমমানের শিক্ষায়তনে পৌছিয়ে দিতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা বই খুলে হোক কিংবা অন্যের সাহায্য নিয়ে হোক পূর্বে প্রেরিত প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট সময়সীমায় পরীক্ষা শেষ করে পরিবারের কর্তাব্যক্তির কাছে পরীক্ষার খাতা সমর্পণ করবে। এবারে পরীক্ষায় বাহির থেকে কোন খাতা সরবরাহ করা হবে না। পরীক্ষার্থী তার নাম, পিতা-মাতার নাম, প্রতিষ্ঠানের নাম ও পরীক্ষার বিষয় সম্বলিত তথ্যাদি দিয়ে উত্তরপত্র তৈরী করবে। তার খাতাটি নিকটবর্তী কলেজে পৌছে দেয়ার দায়িত্ব নেবেন গৃহের অভিভাবক। একটি নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে পরীক্ষা শেষ করতে হবে। 

এ জাতীয় পরীক্ষাকে আমি ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা’র সাথে তুলনা করছি। দেশের সুধি সমাজ থেকে শুরু করে অভিভাবকগণ হায় হায় রব তুলবেন। নকলে দেশটা ছেয়ে যাবে বলে অনেকে তীর্যক অভিমত দেবেন। দেশে ও  বিদেশে আমাদের সার্টিফিকেট গৃহীত হবে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তারপরও প্রথম কথা হলো, এই ব্যবস্থাটা শুধু এক বারের জন্যে বলবত হবে। যে নকল নিয়ে প্রশ্ন উঠবে তা কি এদেশে সম্পূর্ণ উঠে গেছে? এখানে কি প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে না? আমরা আমাদের শিক্ষকতা জীবনে নকলের বিভিন্ন প্রতিরোধও বিবেচনা করেছি। পরীক্ষার হলে কড়া নজর রাখাটা নকল প্রতিরোধের প্রধান উপায় বিবেচনা করেছি। তারপরও কি নকল থেমে ছিল? সম্ভবত, সে কারনেই ইউজিসির ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও কোন বিশ্ববিদ্যালয় কেবলমাত্র মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল ভিত্তিক উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়নি। ভর্তি পরীক্ষা অন্ততঃ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত সত্য। তার মানে হচ্ছে আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা গ্রহণ যোগ্যতা আমাদের কাছেই প্রশ্নবোধক ছিল এবং আছেই। এমতাবস্থায় নকল উচ্ছেদের পথ বা পন্থা হিসেবে ওপেন বুক পরীক্ষায় সীমিত মহড়া আমরা দিয়েছি। পরীক্ষার হলে পরীক্ষার্থীদের যত সম্ভব বই বা ছোতা আনতে আদেশ দিয়েছি। শিক্ষার্থীরা মহা আনন্দিত, কিন্তু একবার পরীক্ষা দেবার পরই বুঝেছে যে ওপেন বুক পরীক্ষা কতটা তিক্ত ও ভীতিকর। আমাদের কাছে তারা দলবদ্ধ হয়ে ছুটে এসেছে এবং বলেছে যে তারা আর কোনদিন পরীক্ষায় অসদ উপায় অবলম্বন করবে না। বস্তুত প্রচলিত বন্ধ বই পরীক্ষার চেয়ে ওপেন বুক পরীক্ষা অনেক কঠিন বাস্তবতা। আমরা অন্য ধরনেরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি, তার মধ্যে পরীক্ষার ১ ঘন্টা আগে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রশ্ন বিতরন করে বই পত্র পর্যালোচনা করার সুযোগ দিয়েছি। এতে দেখা যাচ্ছে পরীক্ষার আগের এক ঘন্টার পড়াশুনায় অন্ততঃ ৫টি কি ৬টি প্রশ্নের জবাব দানের যে নিবিষ্টতা সংযোগ করেছে তাতে বাস্তব জীবনটা কিছুটা হলেও জ্ঞানের আধার হয়েছে। 

আসলে একেবারে কোন কিছু না শেখার চেয়ে সামান্য কিছু তো শেখা হচ্ছে। আমরা দেখেছি ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও ওপেন বুক পরীক্ষা কিংবা পরীক্ষার এক ঘন্টা আগে প্রশ্ন সরবরাহ করে পরীক্ষা নিলেও ভালো ছাত্ররা ভালো ফলাফল করছেই আর অন্যেরা কোন রকমে উতরে গেছে। এ জাতীয় পরীক্ষা নিলে এমনই ফলাফল হবে বলে আমার বিশ্বাস। কেবলমাত্র এই পরীক্ষাটির জন্যে গ্রেড সিস্টেমের বদলে মার্ক সিস্টেম পুনঃপ্রবর্তন করা যেতে পারে। এই মার্কের ব্যবধান দিয়ে ভালো মন্দের নিকষ পার্থক্যকরণ সম্ভব না হলেও একেবারে পার্থক্য নিরূপন করা যাবে না তেমনটি নয়। উচ্চ শিক্ষা প্রবেশাধিকারে তাদের তো ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবেই; সেখানে তারা তাদের মেধা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের সাক্ষর অবশ্যই রাখবে।  

এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা ফেইসবুক ছেড়ে শিক্ষার জগতে প্রত্যাবর্তন করবে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েই আগের মতো পরীক্ষা দিতে পারবে, করোনার হ্রাস-বৃদ্ধি তাদের ক্ষতির সম্ভবনা পূর্ববত থাকবে। শিক্ষকরা পরীক্ষার খাতা ও টেবুলেশনের মাধ্যমে অন্ততঃ কিছু আয় উপার্জন করতে পারবেন। ফেরিওয়ালা ও ফুটপাতের দোকানী না হলেও কিছুদিন চলবে। শিক্ষার্থীরা ভর্তির জন্যে সেই আগের মতো ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিবে। 
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষতঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জানে বেঁচে যাবে, জানে বাঁচবে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, তাদের বাড়ীওয়ালার বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাত। পল্লী ও শহরাঞ্চলে কিছু নতুন কর্মসংস্থানের জন্ম হবে। করোনার দৌরাত্ম এড়িয়ে সুস্থ্যতা নিয়েও পরীক্ষা দেয়া-নেয়া সম্ভব হবে বলে আমি মনে করছি। 

অন্য দৃষ্টিকোন থেকে বিষয়টা দেখা যায়। আমাদের দেশে লাখে লাখে নয় কোটি কোটি মানুষ এখন ঘরে বসে নাই  এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে বাইরে পরস্পরের সান্নিধ্যে আসছে না তাও নয়। বহু বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাদেরকে ঘরে রাখা যাচ্ছে না। তারা প্রতিনিয়ত জনারণ্য সৃষ্টি করছে। আমাদের তরুন সমাজকে এমন অবস্থায় নিপতিত করা অবাঞ্চিত বলে শিক্ষা কার্যক্রম ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়েছে। বিকল্প বহু থাকতে পারে তবে করোনার সম্প্রসারন এড়িয়ে উপরে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। এটা করলে ব্যবহারিক পরীক্ষা বিঘিœত হবে। তার বিকল্পও ইতোমধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বের করেছে। তবে কলা ও বাণিজ্যের শিক্ষার্থীদের জন্যে এটা কোন বাধা নয়। আশা করি আমার অযাচিত পরামর্শটি বিবেচনা করে কেউ কেউ দেখতে পারেন। চরম বিকল্প হিসেবে মাধ্যমিকের ফলাফল ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা বা গ্রেড ভিত্তিক ভর্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর উপাচার্য।

ট্যাগ: bdbdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ