banglanewspaper

রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষক মজনুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) ঢাকার নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম মোসাম্মৎ কামরুন্নাহানের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। 

বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর মাত্র ১৩ দিনের মধ্যেই শুনানি শেষ করে বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা হলো। রায় ঘোষণার পরপরই মজনুকে কাশিমপুর কারাগারে নেয়া হচ্ছে। 

গত ১৬ মার্চ ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক আবু বকর। 

গত ২৬ আগস্ট ঢাবি শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনার মামলায় ধর্ষক মজনুর বিরুদ্ধে চার্জগঠন শুনানির মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকাজ শুরু হয়।

২০ সেপ্টেম্বর একই আদালতে সাক্ষ্য দেন ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর বাবা। ০৫ নভেম্বর ধর্ষক মজনুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ওইদিন তিন সাক্ষী মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবু সিদ্দিক, পুলিশ পরিদর্শক মনিরুজ্জামান ও সুবেদার শওকত আলীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলায় মোট ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ২০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। 

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ১২ নভেম্বর এ মামলায় আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য করেন আদালত। 

অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামি মজনু ঢাকা ছাত্রীকে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণ করে। এছাড়া শারীরিক নির্যাতন করার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ মামলার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে কারাগারে আটক রাখারও আবেদন জানান চার্জশিট দাখিলকারী মামলার এই তদন্ত কর্মকর্তা।

গত ৫ জানুয়ারি ক্লাস শেষে বিকেল সাড়ে ৫টায় রাজধানীর শেওড়ায় বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাসে উঠেন ওই শিক্ষার্থী। উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া। আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভুল করে শেওড়ার আগে কুর্মিটোলায় বাস থেকে নেমে যান ওই ছাত্রী। এরপর ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ অজ্ঞাত পরিচয় কয়েজন তার মুখ চেপে ধরেন। তৎক্ষণাত সে অচেতন হয়ে পড়লে অদূরেই ঝোঁপের ভেতর নির্জন স্থানে তাকে তুলে নিয়ে পালাক্রমে কয়েকজন মিলে ধর্ষণ করে। চেতনা ফেরার পর আবারও তার ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। 

রাত ১০টার দিকে জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর ওই ছাত্রী দেখতে পায় একটি নির্জন স্থানে পড়ে আছে সে। এর পর সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে বান্ধবীর বাসায় যায় এবং বান্ধবীকে পুরো ঘটনা জানায়। খবর পেয়ে সহপাঠীরা প্রথমে তাকে ক্যাম্পাসে পরে হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত সাড়ে ১২টার পর ওই ছাত্রীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়। 

শিক্ষার্থী ধর্ষণের খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো রাতেই ক্যাম্পাকে বিক্ষোভ মিছিল করে। পরদিন ৬ জানুয়ারি সকাল থেকে ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। টিএসসি চত্বরে বিক্ষুদ্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঢল নামে। মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীরা। 

ঘটনার পর দিন ৬ জানুয়ারি রাতে ঢামেকে চিকিৎসাধীন মেয়েটির খোঁজখবর নিতে যান এবং মেয়েটির সঙ্গে হাসপাতালেই রাতযাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। রাতে তিনি মেয়েটির সঙ্গে কথা বলেন। ড. সাদেকা হালিমের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে ঘটনার বিবরণ জানায় মেয়েটি। 

পরদিন ৭ জানুয়ারি ভুক্তভোগী মেয়েটির বরাত দিয়ে ড. সাদেকা হালিম গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘ওর সামনে পরীক্ষা। তাই কিছু বই, বাড়তি পোশাক ও কিছু নোটস নিয়ে সে বান্ধবীর বাসার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। মেয়েটির বিবরণীতে ধর্ষক একজনই ছিল।’

ধর্ষকের চেহারা মনে আছে কি-না কিংবা দেখতে কেমন ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সাদেকা হালিম বলেন, ‘ওর কাছে দেখে মনে হচ্ছিল সিরিয়াল কিলার। যে ঠান্ডা মাথায় একাধিকবার ধর্ষণের মতো অপরাধ ঘটিয়েছে। মেয়েটিকে জোর করে পোশাকও পরিবর্তন করিয়েছে, পরে আবার ধর্ষণ করেছে। ধর্ষক বারবার মেয়েটির পরিচয় জানতে চেয়েছে। মেয়েটি আন্দাজ করেছিল- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয় পেলে তাকে মেরে ফেলতে পারে। তাই সে মুখ খোলেনি।’

ঘটনার পরদিন ৬ জানুয়ারি রাতে ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর বাবা ক্যান্টনম্যান্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। প্রাথমিক তদন্ত ও অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে রাতেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় মামলাটি তালিকাভুক্ত করে থানা কর্তৃপক্ষ।

ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর মোবাইলের সূত্র ধরে ৮ জানুয়ারি রাজধানীর শেওড়া রেলক্রসিং এলাকা থেকে ধর্ষক মজনুকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) সদস্যরা। এসময় তার কাছ থেকে ওই ছাত্রীর ব্যাগ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। 

৯ জানুয়ারি পুলিশের করা ১০ দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি নিয়ে মজনুকে ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠায়  ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম সারাফুজ্জামান আনছারীর আদালত। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে মজনু।

সবশেষ গত ১৬ জানুয়ারি ধর্ষক মজনু আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ধর্ষণের দায় স্বীকার করেন।

ট্যাগ: bdnewshour24