banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ||
ফেইসবুক উল্টাতে উল্টাতে দেখলাম এক পাইলট এখন রাস্তার কিনারে হোটেল নিয়ে বসেছেন। এ’ দুঃসংবাদ বড্ড স্বাভাবিক। বিগত ন' মাসে সারা বিশ্বকে হাহাকার গ্রাস করেছে। এমন কোনও খাত নেই যা করোনার আঘাতে ব্যতিব্যস্ত পর্ষদস্ত বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। ব্যতিক্রম হয়ত আছে যেমন চিকিৎসা খাত। আমাদের দেশে কারো কারো ব্যাংক ব্যালেন্স স্ফীত হয়েছে ভিন্ন কারণে। এ নিয়ে বেশী কথা-বার্তা হয়নি কিন্তু চিকিৎসা খাতের স্ফীতির নমুনা ফার্মেসী বা মেডিক্যাল শিক্ষায় পড়েছে। মেডিকেলে অধিক শিক্ষার্থী ভর্তির সিদ্ধান্ত এই প্রবনতার সাথে সঙ্গতিময়। 

করোনায় ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা দীর্ঘ। তাদের সমষ্টিগত ফলাফলে বোধহয় সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ভ্রমনখাত, শিক্ষা খাত বিশেষত: বেসরকারি অর্থে পরিচালিত শিক্ষাখাত, বৈদেশিক চাকুরী ও সামগ্রিকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শিক্ষাখাত ও বিমান চলাচল। সীমিত আকারে বিমান চলাচল শুরু হয়েও আমরাসহ বহু দেশে বিমান চলাচল হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বেকারত্ব দৃশ্যমান, সম্মানজনক ও অতি পুরস্কৃত পাইলটদের চাকুরীতেও। কোনও কোনও দেশে স্বাস্থ্যবিধিতে অস্বাভাবিক বাড়াবাড়ির কারনে বিমান চলাচল বন্ধ ছিল কিন্তু কিছুটা গতি সঞ্চারের পর দেখা গেছে গতি একেবারে স্থবির হয়ে আসছে কারণ ভ্রমনে বহুবিধ বিধি-নিষেধ আরোপ করা আছে।

করোনায় প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। আমাদের দেশেও তা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে শীর্ষচূড়া স্পর্শ করতে যাচ্ছে। হয়ত আগের মত লক-ডাউনের সম্ভাবনা আমাদের দেশে তেমন প্রবল নয় কিন্তু অনেক দেশে এবং অনেক উন্নত দেশই লক-ডাউনে আবার যাচ্ছে। যেসব দেশে করোনার নামমাত্র আবির্ভাব ছিল তারাও এখন তীব্রতা অনুভব করছে। ফলে ভ্রমন শিল্প অতি সংকটে পড়বেই। আগেই বলেছি, এই ভ্রমনের সাথে বিমান চলাচল, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও চিকিৎসাখাত জড়িয়ে আছে। করোনার কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা সাধারণভাবে উপকৃত হলেও চিকিৎসা-ভ্রমন খাতটা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সিঙ্গাপুরের কথা ধরা যায়। সিঙ্গাপুরের অন্যতম আয়ের উৎস ছিল চিকিৎসা-ভ্রমন খাত। এ খাত সম্পূর্ণ না হলেও প্রায়ই স্থবির হয়ে গেছে। সিঙ্গাপুর যাবার ভিসা দেয়া হচ্ছে কিন্তু ১৪ দিনের জন্যে কোরাইন্টানে থেকেই চিকিৎসার সুযোগ নিতে হচ্ছে। এতে সিঙ্গাপুরে করোনা প্রাদুর্ভাব কমেছে ঠিকই কিন্তু ব্যাপকভাবে ভ্রমনকারী বিশেষত: চিকিৎসা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ ভ্রমনকারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই চিকিৎসাটাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় দেখা গেছে বিনোদন কেন্দ্র, চিড়িয়াখানায় প্রচন্ড ভীড়। অবস্থার চাপে এগুলো এখন প্রায় শুন্য। মানুষজন ভিন্ন পেশার দিকে ঝুঁকছে। আমাদের দেশে অনেক দিন যাবত শুনা যাচ্ছে শিক্ষকরা শিক্ষকতা ছেড়ে ভিন্ন পেশা অবলম্বন করে কোনোরকমে নাক জাগিয়ে বেঁচে আছে। যাদের এ বিকল্প নেয়, তারা সঞ্চয় ভাঙ্গিয়ে দিনাতিপাত করছে। ব্যাংকের কাজ কর্মে কিন্তু তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বলতে গেলে ব্যাংকগুলোতে তারল্যমাত্রা এত বেশী যে স্থায়ী আমানত বলতে গেলে নিন্ম-মার্গে চলে আসছে আর সেভিংস একাউন্টে সুদের হার কোথাও কোথাও শুন্যের কাছাকাছি। এ কারণে মার্চেন্ট ব্যাংকিং ও দুর্বৃত্তায়নের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। শিক্ষাখাতে আবার ফিরে আসছি। 

দেশের শিক্ষাখাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা জড়িত। শিক্ষাখাতটির অর্থায়নে ব্যক্তিক উদ্যোগ প্রাধান্য পেয়ে আসছে। সরকারী ও এমপিও ভুক্তরা বাদ গেলে প্রায় ৯০-৯৫শতাংশ শিক্ষা ব্যয় বেসরকারি খাত বয়ে বেড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে আর্থিক ক্ষমতা সংকোচনে চাকুরীর উপর প্রচন্ড চাপ পড়ছে। ইতিমধ্যে কিন্ডার গার্টেন সেক্টর খাবি খেতে খেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এই হুমড়ি অবস্থাটা আর কত দিন চলবে তা বলা যাচ্ছে না। অন-লাইন শিক্ষা কার্যক্রমে দূরবস্থার পদ-ধ্বনি দেখা যাচ্ছে। বিদেশী চাকুরী সংকুচিত হওয়ায় এবং স্বদেশে চাকুরীর বাজার সংকোচনের কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্রুত কমছে। যারা লেগে আছে, তারাও সামর্থ হারিয়ে কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। নতুন শিক্ষার্থী পাবার সম্ভাবনা আগামী ক’মাসে দেখা যাচ্ছে না, সাধারণ সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি সমাপ্তির পরই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী পেতে শুরু করে। এবারে স্বায়ত্বশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিটা কিভাবে হবে বা কবে হবে সে সম্পর্কে স্থির কোনও পূর্বাভাস প্রদান অসম্ভব হয়ে গেছে। অতএব এ’সব বিশ্ববিদ্যালয় কম ক্ষতিগ্রস্থ হলেও সাধারণভাবে শিক্ষার্থী ও বিশেষভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিদারুন সংকটে পড়ে যাবে। এক সময়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সৃষ্টিশীলতার খাতিরে স্বায়ত্বশাসনের ধারনাটি সবাই পোষন করতেন। এখন সৃষ্টিশীলতা বিদায় নিয়েছে। স্বায়ত্বশাসনের পাশাপাশি জবাবদিহিতা প্রাসঙ্গিক হয়েছে বলে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ এবং তাদের পোষ্যগণ ছাড়া অন্য কেউ তেমন গভীরভাবে স্বায়ত্বশাসনের ধারনাকে সমুন্নত রাখতে চায় কি না জিজ্ঞাস্য। স্বায়ত্বশাসন শব্দের অর্থ যদি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আর একটি রাষ্ট্র, কিংবা নিজের ইচ্ছেটা সবারই উপর ছাপিয়ে দেয়া এবং আমলাদের সাথে পাল্লা দিয়ে সুযোগ লুফে নেয়া কিংবা সুবিধার উত্তরোত্তর ক্ষেত্র সৃষ্টি, তাহলে যে জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে জনগণ প্রশ্ন করতেই পারে। করোনার অজুহাতে ক্লাশ না নিয়ে শতভাগ বেতন ভাতা ভোগ করেও একই শিক্ষকমন্ডলী ভর্তি পরীক্ষার মহাযজ্ঞ সারাদেশে সম্প্রসারিত করে কি নিজেদের প্রশ্নবোধক করছেন না? সময় আসছে তাদের ভাবার। এত বিশাল সংখ্যক অধ্যাপক বানিয়ে এখন অধ্যাপকদের উপ-সচিবের পদ মর্যাদা নামিয়ে দিয়েছে আর উপাচার্য, প্রো-উপাচার্য ও কোষাধ্যকে যথাক্রমে সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্মসচিবের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে, তা কি দেখছেন? সৃজনশীলতা যখন উঠে যাচ্ছে, জনগণের পক্ষে যখন কথা বলার শিক্ষকের আকালবস্থা, যখন গবেষনা শুন্যের কোঠায় আর শিক্ষাদানই মুখ্য লক্ষ্য, তখন স্বায়ত্বশাসনের আদৌ প্রয়োজন আছে কি? বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৭ ভাগ ব্যয় যখন জনগণের পকেট থেকে আসছে, তখন জবাবদিহিতার প্রশ্নটি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচিত হবে বলে বিশ্বাস। সরকারি অর্থে যারা পরিচালিত তারা শতভাগ স্বাধীনতা ভোগ করছে, আর নিজেদের অর্থে পরিচালিত তারা দুঃশাসন ও নিগ্রহের শিকার এমন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আসন্ন। তাহলে অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে যে সেবাখাত বিশেষত: শিক্ষা-চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিদেশে কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, হচ্ছে ও হবে। বিনোদন শিল্পেও ধ্বস আসছে। সিনেমা হল মালিক ও প্রযোজকরা ভারতীয় ফিল্ম প্রদর্শনের মাধ্যমে গতি সঞ্চারের সূচনা করতে চাচ্ছে। 

এমতাবস্থায় কৌশলগত কি ব্যবস্থা নেয়া যায়, তা এখন গভীরভাবে চিন্তনীয়। এ’ব্যাপারে ব্যক্তিখাত ছাড়িয়ে সরকারি খাতকে নবতর ভাবনা নিয়ে আসতে হবে। বৃহৎ শিল্প খাত সরকারের অনুদান নিয়ে এখন তা ফেরত না দেবার পায়তারা করছে। ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতের দৌবল্যের কারণে চাকুরী বাজার সংকুচিত হয়েছে। ক্রয় ক্ষমতায় এ’সব ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তাই নীতি নির্ধারকের উল্লেখিত তিন খাতে একক কিংবা যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী