banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ||

আমরা বহু সৌভাগ্যবান জাতি। পৃথিবীর অন্য কোন জাতির এতসব রক্তাক্ষারে লেখা স্মরণীয় দিন আছে বলে আমার জানা নেই। আমাদের আছে স্বাধীনতা দিবস যা ২৩ বছরের সংগ্রামের ফসল। বঙ্গবন্ধু প্রথমে ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বাঙালিদের জন্যে আর ২৬ শে মার্চ সারাবিশ্বের অবগতির জন্যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেদিন পাকিস্তান আর্মি যদি আত্মসমর্পন করত কিংবা সংগোপনে আমাদের মাটি ছেড়ে যেত, তাহলে আমাদেরকে রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামে লিপ্ত হতে হোত না। আমরা যুদ্ধে জয়ী হলাম স্বাধীনতা ঘোষণার প্রায় ৯ মাস পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশ্বের তথাকথিত দুর্দুর্ষ সেনা বাহিনী, মিত্র বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্ম-সমর্পনের পর আমাদের বিজয় নিশ্চিত হলো। সে কারণে ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। তবে কেমন করে বিজয় এলো তা আমাদের প্রজন্ম জানলেও বর্তমান প্রজন্মের জন্য এই নিবন্ধ।
 
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান আমাদের উপর ক্র্যাকডাউন করল অর্থ্যাৎ অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। এক অর্থে আমরা এই দিবসটির অপেক্ষায় ছিলাম যাতে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি-নীতি লংঘন না করেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন। পাকিস্তানের অপারেশন সার্চ-লাইটের অর্থ্যাৎ ক্র্যাকডাউনের সাথে সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে নেমে পড়া ছাড়া আমাদের উপায়ন্তর ছিল না। এমন যে নৃশংশ হত্যযজ্ঞ হতে যাচ্ছে সে কথা বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জানতেন। তবে আমরা তার মুখ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে (১৯৭১) এ’কথা জানলাম। সেদিন আমি ও শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর অফিসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডের আলোচনার সারমর্ম জানতে গিয়েছিলাম। সেখানে জানলাম যে ফারল্যান্ড প্রথমে আমাদের নিঃশর্ত সমর্থনের কথা বললেও পরবর্তীতে তার সুর বদলিয়ে যায়। শর্ত সাপেক্ষে সাহায্য দানের কথায় বঙ্গবন্ধু রেগে যান এবং আমাদেরকে সশস্ত্র যুদ্ধ ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন অসম্ভব বলে জানালেন। বঙ্গবন্ধু ফারল্যান্ড এবং ইয়াহিয়াকে হুশিয়ার করে দিয়ে বললেন- "Nothing shall go unchallenged"। 

পরের দিনে ইয়াহিয়ার ভাষণ বা বিবৃতির জন্যে প্রস্তুত থাকতে বলে জঙ্গী মিছিলের নির্দেশ দিলেন। তাই মার্চ মাসে শুধু পাকিস্তান প্রস্তুত নিচ্ছিল, আমরা হাত গুটিয়ে বসে ছিলাম; সে কথা বলা হবে সত্যের অপলাপ। পাকিস্তান যখন আলোচনার ছদ্মাবরণে সশস্ত্র আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছিল আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেই ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখেই সারাদেশের মানুষ তা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বুঝলেন ও আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তা বুঝলাম সহজভাবে। ছাত্ররা যখন ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করল; আমরা শিক্ষকরা ৩রা মার্চ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ৬ দফার বদলে এক দফার প্রস্তাব পাশ করিয়ে নিলাম। আমি স্বকন্ঠে তারস্বরে সে প্রস্তাব পড়ে শুনালাম। যার ফলে হয়ত বিকালে ছাত্ররা স্বাধীনতা ঘোষণার ব্যাপারে দ্বিধাহীণ ছিল। সেদিন পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে পতাকা উত্তোলন করল, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করল, সভার শুরুতে ও শেষে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, সংগীত গাওয়া হোল, গান সেলুট দেয়া হোল, তখন আসল বার্তা সারাদেশে পৌঁছে গেল। তারপর শুধু প্রতীক্ষার পালা, কখন তারা আঘাত হানে, তাহলে প্রতিঘাত হানাটা আর অপরাধ হবে না। এরই নামে আলোচনার নামে এই ইদুর-বিড়াল খেলাটা চলল ২৩ মার্চ পর্যন্ত যেদিন পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসেও পাকিস্তানী পতাকা কোথাও উত্তোলিত হলো না, উত্তোলিত হলো স্বাধীন বাংলার পতাকা। পরবর্তী ক’দিন উভয় পক্ষ জয়-জয় ভাব নিয়ে আলোচনায় অগ্রসর হলো। কোনোরকমে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার প্রত্যাশায় ইয়াহিয়ার দল ৬ দফার অন্তত: চারটি দফা মেনে নিল। বঙ্গবন্ধুর দল কৃট কৌশল হোক কিংবা নির্মম রক্তপাত এড়াতে তাতে নিমরাজী হলো। এর পরই ৪ দফার সাথে আরও দুটো দফার কথা জানালেন বঙ্গবন্ধু। এই দুটো দফার একটি ছিল স্বতন্ত্র অর্থ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দু’প্রদেশে দু’জাতীয় মুদ্রা ও দুটো কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর অপরটি ছিল এক লক্ষ আধা সামরিক বাহিনী গঠনের বিধান। ইয়াহিয়া এই প্রস্তাবের মমার্থ বুঝেই গুলি মেরেই সমস্যা সমাধান করার পথ নিল। বঙ্গবন্ধুও দেখলেন ৪ দফা গৃহীত হলে এক ধরনের কনফেডারেশন হবে, তবে স্বাধীনতা বিলম্বিত হয়ে যাবে কিংবা অবস্থার চাপে পড়ে তা কোনোদিন অর্জিত নাও হতে পারে। তাই তুরূপের দুটো কার্ড তিনি শেষেই খেললেন। পরিণতি জেনেই তিনি স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাটি ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের মাধ্যমে বলদা গার্ডেন থেকে প্রচার করালেন। ক্র্যাকডাউনের বেশ পরে নায়েক সুবেদার শওকত আলীর মাধ্যমে দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি পাঠালেন। এই দুটো ঘোষণা বিভিন্ন মাধ্যমে ভর করে দেশময় ও বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিরোধ যুদ্ধ ছড়িয়ে গেল সর্বত্র।

প্রতিরোধ যুদ্ধে সবচে বেশী ভূমিকা রাখল বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স যা ১৯৬১ সালে গঠিত বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের রপান্তরিত নাম। লিবারেশন ফোর্স থেকে মুজিব বাহিনী গঠনের ব্যবধান খুব বেশী দিন ছিল না। অন্যেরা প্রতিরোধ যুদ্ধ জুন মাস পর্যন্ত চালিয়ে জুলাই আগষ্ট মাস শেষে একেবারে স্তিতমিত হয়ে পড়লেও বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর যোদ্ধারা সীমান্ত অতিক্রম করে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক ভারতে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রের যোগান নিল। দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ শুরু করল। তারপরে আমাদের নিয়মিত যোদ্ধা ও অন্যান্য গণযোদ্ধারা গেরিলা কায়দায় পাকিস্তানকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। ভারত থেকে আক্রমন ঠেকাতে পাকিস্তান সীমান্তের দিকে অগ্রসর হলো। ইত্যবসরে নিয়মিত বাহিনীর সাথে মুজিব বাহিনীর সমঝোতার অংশ হিসেবে শেষোক্ত বাহিনী সীমান্ত এলাকা থেকে ২০ মাইল গভীরে তৎপরতার দায়িত্ব নিল। এ’জন্যে তাদের অতি উচ্চ-শিক্ষিত গেরিলা দল অতি উন্নতমানের হাতে বহনযোগ্য অস্ত্র নিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল। দেরাদুনে ও হাফলং এ প্রশিক্ষণে প্রায় ১০ হাজার গেরিলা অংশ নিল। দেশে ঢুকেই প্রত্যেক যোদ্ধা আরও দশজন গেরিলা যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে হিট এন্ড রান পদ্ধতিতে পাকিস্তানীদের একাংশের ঘুম ও বিশ্রাম হারাম করে দিল। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর নিজস্ব গেরিলা যোদ্ধা ছিল। তারাও দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ সম্প্রসারিত করল। সশস্ত্র বাহিনী মোট দশটি সেক্টরে বিভক্ত হয়ে ভারতীয় সেনাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় যুদ্ধের গতি ফিরিয়ে আনলো। এক পর্যায়ে যৌথ বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত হলো। আমরা অনেকটা অনিচ্ছা সত্বেও যৌথ বাহিনীভূক্ত হলাম। নভেম্বর মাসের দিকে মুজিব বাহিনী বা বিএলএফ যোদ্ধাদের নিয়ে চাটগাঁ অভিমুখে যাত্রা করলে শেখ ফজলুল হক মনি তিনি আমাকে পূর্বাঞ্চল মুজিব বাহিনীর দায়িত্ব দিলেন। শেখ মনি ও জেনারেল ওবান ভারতীয় বা অন্য কোন বাহিনীর সহায়তা ছাড়ায় চাটগাঁ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ণরুদ্ধার করে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল। ৩রা ডিসেম্বর থেকে যৌথ বাহিনীর প্রচন্ড আক্রমনে বাংলাদেশের প্রায় সকল এলাকায়ই পাকিস্তানের কব্জামুক্ত হতে লাগল। পরাজয় নিশ্চিত জেনে সমূহ ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পাকিস্তানী যুদ্ধরাজরা আত্ম-সমর্পনে রাজী হলো। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪.৩১ মিনিটে পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্ম-সমর্পন করার মধ্য দিয়ে আমাদের বিজয় নিশ্চিত হলো।
 
এ'হলো অতি সংক্ষেপে আমাদের বিজয় কেমন করে এলো তার ইতিহাস। যুগ যুগের পরাধীনতার জাল ছিন্ন করে আমরা সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। কয়েক দিনের মাথায় আমি আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকুরীটা ফেরত পেলাম এবং পূর্ণযোগদান করলাম।
 
*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী,

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর বর্তমান উপাচার্য।

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী