banglanewspaper

একাডেমিক গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির দায় প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিয়া রহমান জানিয়েছেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিহিংসা ও শিক্ষক রাজনীতির শিকার। 

তি‌নি তার বিরুদ্ধে হওয়া ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক এবং চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের কাছে আবেদন জানিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনেরও দাবি জানান। 

সোমবার (০১ মার্চ) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ আবেদন জানান। 

সংবাদ সম্মেলনে নিজের পক্ষে দালিলিক প্রমাণ তুলে ধরে সামিয়া রহমান বলেন, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার নামে অভিযোগ আসে যে, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে সোস্যাল সায়েন্স জার্নালে আমার আর সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজানের নামে প্রকাশিত 'A New Dimension in Colonialism and Pop Culture: A Case Study of the Cultural Imperialism' (অ্যা নিউ ডাইমেনশন ইন কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড পপ কালচার: অ্যা কেস স্টাডি অব কালচারাল ইম্পেরিয়ালিজম) প্রবন্ধটি শিকাগো জার্নালে প্রকাশিত মিশেল ফুকোর ‘The Subject and Power’ রচিত কিছু অংশ প্লেজারিজম করায়, সেই জার্নালের অ্যাডমিনিস্ট্র্যাটিভ অ্যাসিসটেন্ট অ্যালেক্স মার্টিন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ২০১৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিকাগো জার্নালের যে চিঠির ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে দীর্ঘ ৪ বছর ধরে মিডিয়া ট্রায়াল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে শান্তির সুপারিশ করেছে, ডিমোশন দিয়েছে- সেই চিঠিটিই আদতে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভুয়া, বানোয়াট। শিকাগো জার্নাল থেকে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এই ধরনের কোনো চিঠি, কোনও দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আজ পর্যন্ত পাঠানো হয়নি। অ্যালেক্স মার্টিন বলে শিকাগো জানালে কেউ কখনো কাজ করেনি। এমনকি শিকাগো ইউনিভার্সিটি এবং শিকাগো প্রেসেও অ্যালেক্স মারটিন বলে কেউ নেই। শিকাগো জার্নালের এডিটর ক্রেইগ ওয়াকার নিজে জানিয়েছেন অ্যালেক্স মার্টিন বলে কেউ কখনও শিকাগো জার্নালে কেউ ছিল না, কেউ নেই। চিঠিটি যে সম্পূর্ণ বানোয়াট, তৈরি করা বা মিথ্যা- চিঠিটির বিভিন্ন অংশ পড়লেই দেখতে পাবেন। এসময় তিনি শিকাগো জার্নালের কাছ থেকে প্রাপ্ত ই-মেইলের ছবি তুলে ধরেন। 

প্রাপ্ত চিঠি প্রসঙ্গে সামিয়া জানান, চিঠিটির (ইমেইল) ‘বিসিসি’ অংশটি দেখুন। কোনও মেইলের বিসিসি, যিনি মেইল পাঠান একমাত্র তিনিই শুধু দেখতে পারেন। রিসিভার অর্থাৎ যিনি মেইল রিসিভ করেছেন, তিনি কখনও বিসিসি দেখতে পারেন না। এটা অসম্ভব। এই মেইলের রিসিভার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, অথচ বিসিসি অংশটি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত। বিসিসিতে প্রান্তে ডিসির আইডি দেয়া এবং মেইল প্রিন্ট আউটও হয়েছে প্রো ভিসির অফিস থেকে। যাচাই করে নিতে পারেন মেইলের রিসিভারের পক্ষে কখনও বিসিসি দেখা সম্ভব কি! তাহলে চিঠিটি পাঠিয়েছে কে? আমরা যাচাই করে প্রমাণ পেয়েছি, চিঠিটি সম্পূর্ণভাবে দেশে বসেই তৈরি করা। 

নিজের পক্ষে আরও প্রমাণ তুলে ধরে সামিয়া বলেন, প্রত্যেকটা বিদেশি জার্নাল বা বিদেশি ইউনিভার্সিটির নিজস্ব ডোমেইন থাকে। এখানে কথিত অ্যালেক্স মার্টিন সেই ডোমেইনও ব্যবহার করেননি। নিজস্ব ব্যক্তিগত মেইল থেকে তিনি এই চিঠি পাঠিয়েছেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ পর্যন্ত চিঠিটির কোনও সফট কপিও আমাকে পাঠায়নি। ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত এই চিঠিটি এবং অ্যালেক্স মার্টিনকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। ট্রাইব্যুনালের সদস্য ড. জিনাত হুদা গণমাধ্যমকেই বলেছেন, অ্যালেক্স মার্টিন চরিত্রটি সন্দেহজনক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফ লাইন জার্নালের কপি কীভাবে অ্যালেক্স মার্টিনের কাছে পৌঁছালো? কিন্তু তদন্ত কমিটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে (যে তদন্ত কমিটি চার বছর ধরে মিডিয়াকে পড়ে আমার বিরুদ্ধে শুরু থেকে সমালোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন) এই বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থেকেছে। চিঠিটি ম্যানুফ্যাকচার করা সেটি গুরুত্বপূর্ণ অধিদফতরগুলোই বলছে। আপনারা চাইলে নিজেরাও যাচাই করে নিতে পারেন তাদেরকে এই মেইল দেখিয়ে।

সামিয়া আরও জানান, এধরনের অভিযোগ কখনও কোনও জার্নাল বা বিশ্ববিদ্যালয় জুনিয়র কাউকে দিয়ে পাঠায় না। সাধারনত ডিন অফিস বা প্রফেসররা এ জাতীয় অভিযোগগুলো আদান-প্রদান করেন। কিন্তু কথিত অ্যালেক্স মার্টিন একজন জুনিয়র অ্যাডমিনিসট্রেটিভ অ্যাসিসটেন্ট এবং যার কোনও অস্তিত্বই শিকাগো জার্নালে নেই। একটি মিথ্যা চিঠির ওপর ভিত্তি করে তদন্ত হলে, শাস্তি দেয়া হলে, সেই তদন্তের কার্যকারিতা কি ষড়যন্ত্রমূলক নয়? এটি কি অপরাধ নয়? উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়? দীর্ঘ ৪ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে হয়রানি করে শাস্তি দিয়েছে। চিঠির অস্তিত্বই তো মিথ্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বলুক, কেন এই মিথ্যা চিঠির ওপর ভিত্তি করে যড়যন্ত্র করে আমাকে ফাঁসানো হল? বিসিসি কেমন করে দেখা যাচ্ছে ঐ মেইলটিতে? 

চার বছর চুপ থাকা প্রসঙ্গে সামিয়া রহমান বলেন, গত ৪ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের হুমকি ধামকির চাপে ও তদন্তাধীন বিষয় বলে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম। তার সুযোগে ষড়যন্ত্রকারীরা দিনের পর দিন প্রপাগাণ্ডা চালিয়েছে আমার বিরুদ্ধে। অবশ্যই বাংলাদেশের আদালতের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে আদালতেই যাচ্ছি। যে লেখাটি আমি লিখিনি, জমা দেইনি, (আইডিয়া দেয়া আর গবেষণা এক বিষয় নয়) ডিন অফিসে আমার কাছ থেকে লেখার কোনও হার্ড বা সফট কপি জমা দেবার কোনও প্রমাণ তদন্ত কমিটি, ট্রাইব্যনাল পর্যন্ত পায়নি, রিভিউয়ারের কপিও আমার কাছে আসেনি। মারজান তদন্ত কমিটির কাছে যেখানে লিখিতভাবে স্বীকার করেছে যে, সে জমা দিয়েছে, রিভিউয়ারের কপিও সেই নিয়েছিল এবং এটি তার অনিচ্ছাকৃত ভুল, অথচ তদন্ত কমিটি বলছে দালিলিক প্রমাণ নাকি অস্পষ্ট কে জমা দিয়েছে! মারজান নিজে তদন্ত কমিটির কাছে জমা দেয়া ও রিভিউ করার কথা লিখিতভাবে বলার পরও কেন দালিলিক প্রমাণ অস্পষ্ট বলে তদন্ত কমিটি? এ সংক্রান্ত প্রমাণস্বরূপ মারজানকে দেয়া আমার মেইল পর্যন্ত তদন্ত কমিটির কাছে জমা দেয়া হয়েছিল। তদন্ত কমিটি সেক্ষেত্রেও নিশ্চুপ থেকেছে। কারণ উদ্দেশ্য আমাকে শাস্তি দেয়া।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ, অপরাজেয় বাংলার সদস্য সচিব এইচ রহমান মিলু প্রমুখ।

ট্যাগ: bdnewshour24