banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী || 

কয়েক বছর আগে এ. কে. খন্দকারের সাথে সুর মিলিয়ে ক’জন বুদ্ধিজীবি পত্রিকায় লিখেছেন যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তাদের একজন বদরুদ্দীন উমর, অপরজন কাজী সিরাজ তাদের দু’জনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষী এবং নিজেরা যা লিখেন তাকে নিরঙ্কুশ সত্যি বলে বিবেচনা করেন। তাদের কথার প্রতিবাদ করলে তারা প্রতিবাদী কণ্ঠকে কখনও আওয়ামী লীগের দালাল বা বেনিফিসিয়ারী জাতীয় অভিধায় অভিহিত করেন। বদরুদ্দীন উমর একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, তিনি ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন এবং তাজউদ্দীন আহমেদের ডায়েরীকে আকর ধরে ভাষা আন্দোলনের উপর একাধিক বইও রচনা করেন। তিনি ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর কোন ভূমিকা দেখেননি। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে প্রত্যক্ষদশীর্দের কথাকে তিনি তীর্যক ভাষায় আক্রমন করেছেন। তার জবাবে যারা কিছু লিখেছেন তারাও দালাল বা সুবিধা ভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। মনে হচ্ছে তার দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের শুরু ও শেষ হোল ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি, যেদিন সংগত কারণে শেখ মুজিব উপস্থিত থাকতে পারেননি।

তার এ’সব কথা নিয়ে বেশ কিছু দিন আগে কয়েকটি সংশোধনী সংশ্লিষ্ট পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম। পত্রিকাটি শত ফুল ফুটাবার দর্শনে বিশ্বাসী হলেও আমাদের মত মালিদের এড়িয়ে যান আর মালিধিরাজদের গ্যান্দা ফুল সুবাসিত বলে চিত্রায়ন করে। লেখাটি ছিল বঙ্গবন্ধুর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালি অভিধা নিয়ে (বিবিসি’র জরীপের ফলাফল ২০০৪)। বয়োবৃন্দ বুদ্ধিজীবি প্রথমেই উল্লেখ করেন বিবিসি নাকি তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে শেখ মুজিবকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে চিহ্নিত করে। 

 এই চিহ্নিতকরন প্রক্রিয়াটি তিনি যেভাবে বর্ণনা করেছেন তাতে তার বিজ্ঞানী এবং একজন গবেষকের ভূমিকাটি খাট হয়। এটা বেশি দিনের ঘটনা নয়। এবারে তার সাম্প্রতিক লেখা নিয়ে কথা বলছি।

দুটো প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন একটি হোল স্বাধীনতার ঘোষণা, অপরটি হোল ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উচ্চারিত শব্দগুচ্ছ। তিনি যুক্তি—তর্ক, তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রমান করেছেন যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান দিয়ে শেষ করেছেন। তার কিছু সমর্থক অবশ্য জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান শুনেছেন, জিয়ে পাকিস্তান শুনেছেন কিংবা পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনিও শুনেছেন। বদরুদ্দীন উমর কতিপয় Circumstantial Evidence এর ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বঙ্গবন্ধু সেদিন জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান বলেছেন। আবুল কাশেম ফজলুল হক স্বকর্ণে ‘জয় বাংলা’ শুনেছেন আর Circumstantial Evidence টেনে বলেছেন সেদিন বঙ্গবন্ধু কোন অবস্থায়ই জয় পাকিস্তান বলতে পারেন না। সে কথার প্রতিধ্বনি মইনুল ইসলাম (প্রথম আলো, ২৯/৯/২০১৪) করলেও দৈনিক যুগান্তরে (১৪/০৯/২০১৪) দেখা যাচ্ছে উমর সাহেব খন্দকার সাহেবের কথাই মেনে নিচ্ছেন। আমি জানিনা বদরুদ্দিন ওমর সেদিন সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানে উপস্থিত ছিলেন কিনা। তিনি সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানে উপস্থিত না থাকলে জয় বাংলা ছাড়া জয় পাকিস্তান শোনার কোন অবকাশ তার ছিল না। খন্দকার সাহেব সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানে ছিলেন না, তিনি অন্যভাবে শুনেছেন। 

তাহলে বক্তব্যটি তিনি পর দিনের রেডিও বা টিভিতে শুনেছেন কিংবা কারো মুখ থেকে শুনেছেন কিংবা পাকিস্তানি দু’একটি পত্রিকায় দেখেছেন। তবে তার মত যারা জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান শুনেছেন কোন দালিলিক প্রমাণ আজও তারা উত্থাপন করতে পারেননি। তারা বলছেন যে রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রচারিত ও প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি মূল ভাষণের অংশ বিশেষ এবং সংশোধিত। আওয়ামী সমর্থকরা জয় পাকিস্তান মুছেই পরদিন তা প্রচার করে। তাহলে মাঠে উপস্থিত ছাড়া বাকী কারোরেই জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান না শোনারই কথা। বড় বড় মানুষরা ভুল করলে তা সংশোধন করেন না। তাদের অহম—বোধ এমন প্রবল যে পারলে কলম কেন বন্দুক নিয়ে তার বিরুদ্ধবাদীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তাই মাঠে উপস্থিত না থেকে যারা বঙ্গবন্ধুর ভাষণে জয় বাংলার পর, জয় পাকিস্তান, কিংবা জিয়ে পাকিস্তান কিংবা পাকিস্তান জিন্দাবাদ শুনেছেন তারা মতলবাজবাদ কিংবা বিভ্রান্তিতে ভুগছেন। এমন লোকদের নাম আরও উল্লেখ করা যায় এবং তাদের মূল মতলবটাও অনুধাবন কঠিন নয়। বিভ্রান্তিতে ভোগা একজনের নাম বিচারপতি হাবিবুর রহমান। আগেই বলেছি তিনি নিজেও স্বাীকার করেছিলেন যে তিনি ৩রা জানুয়ারিকে ৭ মার্চের সাথে গুলিয়ে ফেলেছিলেন (গাফ্ফার চৌধুরী)। তাই দ্বিতীয় সংস্করণে জয় পাকিস্তান শব্দদ্বয় বাদ দিয়েছেন (মুহম্মদ জাফর ইকবাল, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬/০৯/২০১৪)। অন্যান্য যারা উপস্থিত না থেকে বক্তৃতা শুনেছেন বা গণমাধ্যমে পরদিন জয় বাংলা জয় পাকিস্তান শুনেছেন বা দেখেছেন তাদের নাম জানা গেলেও তাদের সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্তের সময় এখন এসেছে। তাদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট হোল তারা আওয়ামী বলয়ের কিংবা দেশের স্বাধীনতার জন্যে নিবেদিত বলয়ের কেউ ছিলেন না।

এই সময়ের বিতর্কে অনেকেই যুক্ত হয়েছেন তার মধ্যে কাজী সিরাজ অন্যতম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান বিতর্কে তিনি জড়িয়ে পড়েছেন এবং বিভিন্ন জনের লেখার উদ্ধৃত্তি টেনে যা বলতে চেয়েছেন তা হোল বঙ্গবন্ধু যদি ৭ মার্চ তারিখে জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান বলে থাকেন তাহলে তিনি হাবিয়া দোজখে চলে যাবেন কেন? তিনি নিজেই জবাবটা দিয়েছেন এভাবে ‘তখন পরিস্থিতিটা পাকিস্তানিদের সঙ্গে সমঝোতার, সংলাপের, ১৫ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত মুজিব ইয়াহিয়া—ভূট্টো সংলাপও হয়েছে; সেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় কুটনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে বঙ্গবন্ধু বা অন্য কোন বাঙালি নেতা জয় পাকিস্তান স্লোগান দিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার গৌরব ক্ষুন্ন হয় না।’ কি চমৎকার! কোথায় বিক্রমপুর আর কোথায় ফরিদপুর, তারপর আমরা দু’জন প্রতিবেশী’’।

দ্বিতীয় আর একটি মতলব এখানে প্রকাশিত হয়েছে। লেখক তার নেতা মাওলানা ভাসানীকে ইনডেমনিটি প্রদান করেছেন, কারন এই সময়ে তার নেতা বহুবার স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান স্লোগান দিয়ে মুজিব সহ সকল নেতা ও জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন আর তাদের ক্ষুদে নেতারা ২৪ মার্চ ১৯৭১ সাল পর্যন্ত স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার স্বপ্ন দেখেছেন ও স্লোগান দিয়েছেন। আর একটা মতলব হয়ত ক্রিয়াশীল ছিল।

লেখক এক জায়গায় বলেছেন স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটাকেই আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা ঘোষণার দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে। হতে পারে কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের ঘেরাটপটাকে না দেখেই তা বলেন। আমি যেদিন ফেরদৌস কোরেশী বা এ’জাতীয় মানুষদের লেখায় দেখলাম যে ‘৭ মার্চের ভাষণের পর আর কি কোন স্বাধীনতার ঘোষণার প্রয়োজন আছে’, আমি তখনই প্রমাদ গুনেছিলাম যে আওয়ামী লীগকে একটা ঘেরাটপে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, যার থেকে বের হতে অনেক তেলখড়ি পোড়াতে হবে। এক আলোচনা সভায় আমি ও হাসানুন হক ইনু যারা ৭ই মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে, তাদেরকে সতর্ক করেছিলাম। কারন এ’দেশে সিরাজদের অভাব নেই। যখন কাজী সিরাজ পরবর্তীতে বলেন যে, ৭ মার্চ ছাড়া আওয়ামী লীগদের আর কিছু দেখানোর নেই, তখন বুঝে নিতে  কষ্ট হচ্ছে না যে আওয়ামী লীগকে যথার্থভাবে ঘেরাটপে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং এবারে ইঁদুরের মত পিষা হবে, যার কারনে শক্ত হয়ে তার দাঁড়াবার ক্ষমতাও হারিয়ে যেতে পারে। তারই ধারাবাহিকতায় কাজী সিরাজ এ কথাটা আমাদের দিয়ে কবুল করিয়ে নিতে চাচ্ছেন যে, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান বলে কোনো অন্যায়, অদেশপ্রেমিক কাজ করেন নি। অবস্থাই তাকে বাধ্য করেছে অর্থাৎ বদরুদ্দিন ওমর যা বলে যাচ্ছেন তিনিও তার প্রতিধ্বনি করছেন অর্থাৎ একটা মিথ্যাকে বার বার বলে সত্যি হিসাবে চালিয়ে দেবার প্রয়াস আছে। আবুল কাশেম ফজলুল হক অনেক কথা সাম্প্রতিক কালে লিখেছেন। তবে কয়েকদিন আগে অর্থাৎ ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সালে তিনি বলেছেন যে বিচারপতি হাবিবুর রহমান হচ্ছেন সবচে অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। অলি আহাদ তার বইয়ে এক কথা বলে মাঠে তার অনুরন ঘটালেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি ছিল তার অকৃতিম ভালবাসা এবং সত্যিটা বলতে ভুলেননি। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার মূল্যায়ন হোল ‘আমার ভাইয়ের মত ব্যাডা এই মূল্লুকে জন্ম নেয় নাই এবং নিবেও না (আবদুল মান্নান চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঘাতক দালাল প্রসঙ্গ, ২০১১)।’
আমার মনে হয় না কাজী সিরাজের বলার প্রয়োজন আছে যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। সে কথা বঙ্গবন্ধু নিজেও বলেছেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সার্থক অনুসারী যদি ‘আখ’ করলে আখাউরা বুঝে নেন কিংবা বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত চারটি শর্তকে ‘মা—বেচা দাম’ বলে মনে করেন কিংবা উপস্থিত বুদ্ধিজীবিরা তাকে ‘নয়মন তেল ও হবে না, ‘রাধাও নাচবেন না’ বলে মনে করে নেয় এবং সে মোতাবেক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন তাহলে কাকে দোষ দেব? আমার জানামতে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে সশস্ত্র যুদ্ধ ব্যতিরেকে কোন গত্যন্তর নাই। সে ভিত্তিতেই আমরা শিক্ষকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩রা মার্চ পূর্বাহ্নে ও ছাত্ররা বিকালে স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব সকল মানুষের কাছে তুলে ধরেছিল।
এবারে আসি অন্য প্রসঙ্গে। এই প্রসঙ্গটি কাজী সিরাজের ৭ এপ্রিল ২০১৩ সালের একটি লেখা। যার শিরোনাম ছিল খন্দকার কবে রাজাকার হবে (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। সেখানেই তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ কথোপকথনের অবতারনা করেন। ৮ এপ্রিল জনকণ্ঠ পত্রিকা তিনি খুলে দেখতে পারেন। সে পত্রিকায় আমি শুধু ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ কথোপকথনের উল্লেখ করিনি, মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর গ্রন্থের কথাও বলেছি। এমনকি বদরুদ্দীন উমরের একটি লেখার উপর আলোকপাত করেছি। শারমিন আহমেদ রচিত ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতার’ উপর কিছু লিখেও তা প্রকাশ করিনি। কারনটা হচ্ছে থুথু আকাশে ফেললে তা নিজের গায়ে এসে পড়ে। অন্যায় করেছি বলছি, কারণ এখন যারা মুক্তিযুদ্ধের উপর লিখছেন, বঙ্গবন্ধুকে কিঞ্চিতকর করতে চাচ্ছেন তারা শারমিনের উদ্ধৃতিই দিয়ে যাচ্ছেন। ব্যতিক্রম এ.কে. খন্দকার। শারমিন যে সব মাধ্যমিক উৎসের তথ্য ব্যবহার করেছেন সে সব খন্দকারও করেছেন। 

সাথে এস. এস. মীর্জা ও মইদুল হাসানের বক্তব্য জুড়ে দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কোন ঘোষণা দেননি। উদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে তারা মুজিবনগর সরকারকে অবৈধ বলার প্রয়াস পেয়েছেন।

‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রন্থটি পড়েই পীর হাবিবুর রহমান যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন, আমার প্রতিক্রিয়াটাও তদ্রুপ। কাজী সিরাজ কি প্রমান করতে পারবেন যে আমরা দু’জন আওয়ামী লীগের সুবিধা ভোগী। সম্প্রতি জেনেছি মুনতাসির মামুনও অনুরূপ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তার অবস্থান কি দালালের? ইতিহাস বিকৃতি কাকে বলে ইতোমধ্যে শুনেছি। তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে প্রলম্বিত করে জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তানও বসিয়ে প্রচার শুরু হয়েছিল। প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞ মাহবুব জামানরা তাকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক বলে প্রমাণ করেছেন। কাজী সিরাজ যাকে ছটফটানি বলেন, অস্থির আচরন বলেন, তোলপাড় বলেন, অর্বাচিন কিংবা সুবিধা ভোগী দালালদের আচরন বলেন তখন মনে হয় ভারতের রাজকাপুর যা প্রদর্শন করেন তা শিল্প আর অন্যরা যা করেন তা নগ্নতা। 

এ.কে. খন্দকার তার পূর্বসূরী কিংবা সহ তিন কথকের মত নিয়ে যদি বলেন যে বঙ্গবন্ধু কোন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি এবং যুদ্ধের কোন দিক নির্দেশনা বঙ্গবন্ধু দিয়ে যান নি তাহলে কাজী সিরাজও হয়ত তাই মনে করেন। তা না হলে কিভাবে তিনি বলতে পারেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উচ্চারনটা নাকি আওয়ামী লীগের বড় পুঁজি। আর প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে, প্রত্যেক গ্রামে মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম গড়ে তুলুন’ কথাগুলোর মধে খন্দকার সাহেব যদি যুদ্ধের প্রস্তুতি বা দিক নির্দেশনা না দেখেন, তাহলে এ’সবের কিসের ভ্রান্তি বিলাস বলব? কাজী সিরাজ এবারে সাক্ষী মেনেছেন তাজউদ্দিন আহমদ আর কন্যার গ্রন্থে উল্লেখিত তথ্যে। শারমিন আহমদের গ্রন্থ থেকে তিনি লাইনের পর লাইন তুলে দিয়ে দেখালেন যে মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা বা দিক নির্দেশনা দেননি। সম্প্রতি শারমিনের বইয়ের সমালোচনা করেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। শারমিন তার গ্রন্থের প্রথম পর্বে ৬টি উদ্ধৃত দিয়েছেন তার তিনটিই গাফ্ফার চৌধুরীর। তিনি অন্যান্য উৎস অর্থাৎ মঈদুল হাসানের মূলধারা ৭১ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর কথোপকথন’ বা ‘আলোকের অনন্তধারা’ থেকেও উদ্ধৃত দিয়েছেন।

মঈদুল হাসান প্রসঙ্গে আসি। তার দাবী অনুযায়ী তিনি তাজউদ্দিনের অতিশয় বিশ্বস্ত ও প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার লেখার প্রাথমিক তথ্য তিনি ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংগ্রহ করেছেন তাজউদ্দিনের কাছ থেকে। সময়টা একটু বিবেচনায় রাখুন। এই সময়ে তাজউদ্দিন সাহেব অর্থমন্ত্রী। বহু ব্যাপারে তার বঙ্গবন্ধুর সাথে মতানৈক্য। তিনি বিক্ষুগ্ধ, বিড়ম্বিত ও হতাশাগ্রস্থ। শারমিনের গ্রন্থে ব্যবহৃত তথ্য উপাত্তগুলো সে সময়ে মঈদুল হাসান কর্তৃক তথ্য থেকে নেয়া। মঈদুল যুদ্ধের সময়ে এ জাতীয় কথা তাজউদ্দিনের কাছ থেকে শুনেননি, ঘুনাক্ষরে কিংবা Slip of tongue এ এমন সব কথা তিনি মঈদুলকে সে সময়ে বলেননি; বললেন ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে! যুদ্ধের সময়ে মঈদুল মুজিব বাহিনী সম্পর্কে, আওয়ামী লীগ সম্পর্কে, যোদ্ধাদের সম্পর্কে বেশ কিছু ভিত্তিহীন কথা লিপিবদ্ধ করেছেন, কিন্তু তাজউদ্দিন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে কিছু শুনেননি বা তাজউদ্দীনকে জিজ্ঞেস করেননি। তাজউদ্দিন যে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বলেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছেন সে কথা জেনেও কেন ১৯৭২ সালে প্রশ্ন তোলেননি? প্রশ্ন তুলেননি যখন মুজিব নগর সরকারের ঘোষণা পত্রে উল্লেখিত হোল যে বঙ্গবন্ধু যথাযথভাবে এবং সাংবিধানিক পন্থায় ঢাকায় ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণার প্রণয়নের সাথে তাজউদ্দিন ও রেহমান সোবহান জড়িত, তবে মুখ্য প্রণেতা হলেন ব্যরিষ্টার আমিরুল ইসলাম। শেষোক্ত দু’জন এখনও জীবিত আছেন। মুজিব নগর ঘোষণার পরে তাজউদ্দীন বা আমিরুল যে সব কথা বলেছেন সেগুলো কি আত্ম—প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচার? মুজিবনগর ঘোষণার চেয়ে বড় দলিল এই জাতির ইতিহাসে কি আর আছে?

শারমিন বাবার সাহচর্যে দীর্ঘদিন থাকতে পারেননি। কিন্তু তিনি কি হলফ করে বলতে পারবেন যে তাজউদ্দিন উল্লেখিত তথাকথিত বঙ্গবন্ধুর দৌদল্যমানতা, অনীহা, অনাগ্রহ এবং শেষ কালের উক্তি সমূহের অংশ বিশেষও তিনি নিজে শুনেছেন? আমাদের বিদগ্ধজন যথা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বা আবুল কাশেম ফজলুল হক যখন সমগ্র বইটি না পড়ে কতিপয় অধ্যায়ের ভিত্তিতে মন্তব্য করে বসেন তাহলে এমন বিদগ্ধজন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের ভাবনাটা কি হবে? শারমিনের তথ্যগুলোও যে নির্ভরযোগ্য নয় তা আমি শারমিনের গ্রন্থ থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি। 

আমি অবশ্য বলব শারমিন প্রাথমিক তথ্য বলতে শুধু কোন কান কথা বা শোণা কথাকে বুঝাচ্ছেন। বইটির তথ্য তিনি ২০০৬ সালে সংগ্রহ করা শুরু করেন। তখন তাজউদ্দিন সাহেব এ’পৃথিবীতে নেই। তিনি নির্ভর করেছেন কতিপয় প্রকাশিত গ্রন্থের উপর এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মঈদুল ইসলামের মূলধারা ৭১, আমিরুল ইসলামের জীবন স্মৃতি ও ‘মুক্তিযুদ্ধে পূর্বাপর’ কথোপকথন। এ’সব মাধ্যমিক তথ্যের পরও তিনি আমিরুলের সাক্ষাৎকার নিতে ভুলেননি, যদিও মইদুল হাসান বা খোন্দকার সাহেবের সাক্ষাৎকার নেয়া বাঞ্চনীয় ছিল। তিনি তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ, শুভাকাক্সক্ষী, আমিরুল ইসলাম, হাজী মোর্শেদ ও ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এ মর্মে আপাততঃ সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, বঙ্গবন্ধু প্রস্তুতি নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আমিরুলও তদ্রুপ কথা বলেছেন তবে বঙ্গবন্ধু এ’সব কথা তাজউদ্দিন বা আমিরুলকে কেন বলেননি সে ব্যাখ্যাই দু’জন খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

ব্যাখ্যার কথায় পরে আসছি। এখন বদরুদ্দিন ওমরের সাম্প্রতিক লেখা প্রসঙ্গে আসি। বদরুদ্দীন উমর বলেছেন- “১৯৭১: ভিতরে — বাইরে” নামে খন্দকারের বইটিতে এমন অনেক বিষয় আছে যা গুরুতর আলোচনার যোগ্য (১৪/০৯/২০১৪, যুগান্তর)। কিন্তু সেগুলোতে বাইরে রেখে শুধু দুটো বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগ মহলে মাতামাতি চলছে। প্রথমটি হল— শেখ মুজিব কর্তৃক তার ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতার শেষে জয় বাংলার পরে জয় পাকিস্তান বলা, দ্বিতীয়টি হল— শেখ মুজিব কর্তৃক ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার দাবী নাকচ করা। প্রথমটি প্রসঙ্গে Circumstantial Evidence —এর ভিত্তিতে উমর সাহেব রায় দিয়েছেন খন্দকার সঠিক বলেছেন। অথচ তিনি ও খন্দকার কেউ ময়দানে ছিলেন না। তিনি যদি গণ মাধ্যমে শুনে থাকেন তাহলে বেল্লিক আওয়ামী লীগাররা তা পরিবর্তন করেই প্রচার করেছেন? তাহলে কথা দাঁড়ায় তারা নিজ কানে বা নিজ চোখে দেখেননি, দেখেছেন অন্যের চোখে, শুনেছেন কান কথা বা অন্যের মুখে। গবেষক হিসেবে এ’সব যারা গ্রহণ করেছে—তারা কি ধরনের গবেষক?

দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসি। বদরুদ্দীন সাহেব আবারও Circumstantial Evidence —এর উপর এবং মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর কথোপকথনের ভিত্তিতে খন্দকারের অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে গেছেন যা বেদ বাক্যের মত অপরিবর্তনীয়। তিনি যে সব কথা উল্লেখ করেছেন তা মঈদুল হাসান আর তার সতীর্থদের চর্বিতচর্বন কিংবা শারমিনের গ্রন্থের সরাসরি উদ্ধৃতি। তার বইয়ে অর্থাৎ Emergence  of Bangladesh নামক গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে Declaration of Independence শীর্ষক শেষ অধ্যায়ে তথ্য—প্রমানাদির অভাব এবং Circumstantial Evidence —এর ভিত্তিতে ‘আমি (বদরুদ্দীন উমর) দেখিয়াছি শেখ মুজিব কর্তৃক ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা মিথ্যা এবং আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা ছাড়া আর কিছু না।’ এই উপসংহার তার বেশ আগের হলেও তিনি ‘মুসলমানের এক কথা হিসাবে সেগুলো ধরে আছেন। শারমিনের গ্রন্থ তিনি পড়েছেন কিনা জানিনা তবে খন্দকারের বই পেয়ে তিনি হাতে চাঁদ পেয়েছেন। তিনি তার বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করেছেন এবং সর্বাংশে তিনি খন্দকার কর্তৃক উত্থাপিত বিষয়াদির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। তিনি ওয়ারল্যাসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে পরিহাসের স্বরে উচ্চারন করেছেন এবং এই জাতীয় কাহিনী নতুন নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে এমন দাবী শেখ মুজিব ১৯৫২ সালেও করেছিলেন যা তিনি বিশ্বাস করেননি; এবারে ১৯৭১ সালেও তিনি বিশ্বাস করেন না। জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে ই পি আর ওয়্যারলেস সংবাদ প্রেরনেকে খন্দকার ও তার সতীর্থগণ অবিশ্বাস্য এবং কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তারপর তিনি প্রশ্ন তুলেছেন চিরকুটের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রয়োজন কি ছিল? তিনি যদি সবই করতে পারেন’’ তাহলে আর একটি কষ্ট করে তা কেন তদানিন্তন শেরাটন হোটেলে পাঠিয়ে দিলেন না বা তাদের নিয়ন্ত্রিত বেতারে পাঠিয়ে দিলেন না; তাহলে এতসব কথা জন্ম হোত না’’। এ’সব Hypothetical প্রশ্নের জবাব বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউ দিতে পারবেন না। তার ভক্ত অনুরক্তরা এক ধরনের ব্যাখ্যা দাঁড় করাবেন ও তার বিরুদ্ধবাদীরা ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাবে। বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন তা শারমিন তার বইতে তথ্য—ভিত্তিক উপসংহার টেনেছেন। তবে তাজউদ্দিন বা অন্য কোন নেতার কাছে তা প্রকাশ করেননি কেন সে প্রশ্ন, খন্দকারের মত শারমিন ও আমিরুল তুলেছেন। তারা তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। ব্যাখ্যা যা—ই হোক না কেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নাই এবং সেটা প্রচারিত হয়নি সে কথা কিন্তু তারা দু’জন বলেননি। অথচ সমগ্র বইটি না পড়েই বিরুদ্ধবাদীরা মন্তব্য করে যাচ্ছেন বা উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। আমার জানামতে যুদ্ধ প্রস্তুতির কিছু কথা তাজউদ্দিন ও আমিরুল আগেই জানতে পেরেছিলেন আর জেনেছিলেন চিত্ত সূতার নামের একজনের ঠিকানা।

মজার ব্যাপার হলো — আমিরুল ও তাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলী ও রহমত আলী নাম নিয়ে দিল্লী যাবার আগেই চিত্তসুতারের খোঁজে গিয়েছিলেন। তবে তাকে পাননি। চিত্তসুতারকে না পাওয়ার কারণ ঠিকানায় পরিবর্তন ও চিত্তসুতারের ছদ্মনাম ব্যবহার। সে যাক দিল্লী থেকে ফিরে এসেই তারা ৮ এপ্রিল সেই চিত্তসুতারের বাড়ী গেলেন এবং সেখানে চার যুব নেতাকে পেয়ে গেলেন। আমিরুল, শারমিন বা মঈদুলের পক্ষ বিপক্ষ নেয়া বা তাদের প্রাথমিক উক্তির চূড়ান্ত বিশ্লেষণ বা উপসংহারের পূর্বে শারমিনের বইয়ের ১৪৭ — ১৪৮ এবং ২৬৩—৩১০ পৃঃ একটু এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথনে পৃঃ ১৩১—১৩৪ পর্যন্ত পরিবেশিত মঈদুল হাসানের কথাগুলি পড়ে দেখতে বলব। আমি কেন সবাই নিশ্চিত হবেন যে বঙ্গবন্ধু সে রাতে তাজউদ্দীন চলে যাবার পরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং তা বিভিন্ন মাধ্যমে দেশ—বিদেশে পৌঁছেছে। আমি জনকণ্ঠে প্রকাশিত আবদুল কাদের ও শহীদ সুবেদার মেজর শওকত আলীর কন্যা অধ্যাপক সেলিনা পারভিনের লেখাদ্বয়ও পড়ে দেখতে বলব। যাদের কলব বন্ধ হয়ে যায়নি তারা এ’সব কথা থেকে এমন সিদ্ধান্তেই উপনীত হবেন যেমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন শারমিন ও ব্যরিষ্টার আমিরুল, হাজী মোর্শেদ, ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের পরিবার। অন্যান্য তথ্যের  কথা নাই পাড়লাম; সে সবের সংখ্যা অনেক তবুও আমাদের দিলে কলব আঁটা বুদ্ধিজীবীগণ কি স্বীকার করবেন যে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন যা তৎকালীন ই পি আর এর শওকত আলী ও নূরুল হকের ট্রান্সমিটারও পরবর্তীতে বি এইচ এফ টেলিগ্রাম ও টেলিফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব জায়গায় প্রচারিত হয়? 

শারমিন এর আগে (পৃঃ ৭১) উল্লেখ করেন যে, ২৬ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সম্প্রতি এ’কথা স্পষ্ট হয়েছে যে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে নয়, বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন (মোরসালিন মিজান, দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪)। তার পক্ষ হয়ে বহু ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু ঘোষণাটিই তারই।
শারমিন অনেকটা আফসোসের স্বরেই বলছেন যে, “বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ গত ২৬ মার্চের শুরুতে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও পরবতীর্তে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক নিয়ে যে বির্তকের সৃষ্টি হয় তা অনাকাঙ্খিত’’। 

তিনি সম্ভবতঃ সে বিতর্কের একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্যে ব্যরিষ্টার আমিরুল ইসলাম, হাজী গোলাম মোর্শেদ ও শহীদ ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের পরিবার বর্গের সাক্ষাৎকার নেন (পৃঃ ২৬৩—৩১০)। তার সিদ্ধান্ত হলো যে, বঙ্গবন্ধু যে গোপনে স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তার প্রমান হলো শহীদ ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হককে তিনি ট্রান্সমিটার যোগাড় করতে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী তিনি খুলনা থেকে ট্রান্সমিটার এনেছিলেন এবং ব্যরিষ্টার আমিরুল ইসলামের কাছে সে বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন ২৫ মার্চ মধ্যাহ্নে। পাকিস্তান আর্মি ২৯ মার্চ সকালে নূরুল হককে তার বাসা থেকে চিরতরে তুলে নেন। তার পরিবারের ধারনা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ তালিমের কারণেই তাকে তুলে নেয়া হয় এবং পরে হত্যা করা হয়।

ওদিকে ২৫ মার্চ রাত ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন আসে। ফোন কলটা রিসিভ করেন তার পার্সনাল এইড হাজী গোলাম মোর্শেদ (পৃঃ ১৪৭)। ফোন কলটি ছিল এরূপ “আমি বলদা গার্ডেন থেকে বলছি। মেসেজ পাঠানো হয়ে গিয়েছে। মেশিন নিয়ে কি করব?” বঙ্গবন্ধু হাজী গোলাম মোর্শেদের মাধ্যমে উত্তর দিলেন, “মেশিনটা ভেঙ্গে পালিয়ে যাও।’’ এ প্রসঙ্গে ব্যরিষ্টার আমিরুলের কিছু কথা সংযোজন করছি যা ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক বলেছিলেন (পৃঃ ২৬৫) ‘‘বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছিলেন একটি ট্রান্সমিটার যোগাড় করতে। আমি খুলনা থেকে এটা নিয়ে এসেছি। আমি এটা এখন কোথায় পৌঁছে দেব।’’ আমি (আমিরুল) বললাম ট্রান্সমিটার কাজ করে? উনি বললেন, হ্যাঁ এটা কাজ করে। আমি তখন বললাম আমাকে ত বঙ্গবন্ধু এ সম্বন্ধে কোন নির্দেশ দেননি। বলেননি ট্রান্সমিটার সম্বন্ধে। এ কথাতে মঈদুল হাসান এর একটি কথাই প্রতিধ্বনিতে হচ্ছে যে বঙ্গবন্ধু অনেক কাজই করতেন One to one ভিত্তিতে (মঈদুল হাসান, ‘মূলধারা ৭১’)। প্রকৌশলী নূরুল হক, ব্যরিষ্টার আমিরুলের আত্মীয় (খোকা ভাই) হওয়া স্বত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু আমিরুলকে কিছু না বলে সরাসরি তা নূরুল হককেই বললেন। নূরুল হক এই কথা পরিবারের কাউকেও জানাননি, যদিও তিনি ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে কি কঠিন কাজটি করতে হবে তা জানতেন। আমিরুল বলছেন আমার ধারণা He was the one who sent the wireless message। ই পি আর এ wireless যে সুবেদার মেজর শওকত আলী নিজস্ব ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে ই পি আর প্রধানের মাষ্ট ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধরু স্বাধীনতার ঘোষণা দেশে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তা প্রতিষ্ঠিত সত্য (জনকণ্ঠ ১৭ ও ১৮ মার্চ, ২০১৩)। 

হাজী মোরশেদকে বঙ্গবন্ধু রাত ১০.৩০ বললেন যে, ‘আমরা স্বাধীন হয়ে গেলাম’। বঙ্গবন্ধু একই কথা আতাউল সামাদকেও বলেন। কর্ণেল ওসমানী, রিজভী ও মোশাররফ হোসেন তা জানতেন। রাত ১২টার পর তিনি মোর্শেদকে বললেন, They are coming to arrest me, I have decided to stay। এর আগে সন্ধ্যার প্রাক্কালে তিনি পাশের বাসার মোশারফ এর মাধ্যমে চাটগাঁয়ে খবর পাঠালেন যে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, সেনাবাহিনী আঘাত হানতে যাচ্ছে এবং চট্টগ্রাম থেকে লড়াই শুরু করতে হবে। ইংরেজিতে তৈরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাটি জহুর আহমেদ চৌধুরী পেয়েছিলেন বলে তিনি ড. মাযহারুল ইসলামকে বলেছিলেন (পিতৃ পুরুষ, পৃষ্ঠা—১৮—১৯)। হাজী মোরশেদের বক্তব্যে আরও জানা যায় বঙ্গবন্ধু সেই দুপুর থেকেই বিভিন্ন পুলিশ ও আনসার হেড কোয়াটার্সে আর্মস বন্টনের নির্দেশ দেন। সেলিনা পারভীন অর্থাৎ ই পি আর এর সুবেদার মেজর শওকত আলীর কন্যার মতে তার পিতা বিভিন্ন জায়গায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা ও পরবতীর্ করণীয় সম্পর্কে নির্দেশ পাঠিয়ে দেন। আমরা আরও জেনেছি একই কিংবা ভিন্ন ম্যাসেজ ভি এইচ এফ —এর মাধ্যমে সারাদেশে পাঠিয়ে দেন আবদুল কাদের সহ অনেকে। সে সব থেকে অনেকে টেলিফোনে, টেলিগ্রাফে ও টেলিপ্রিন্টারে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়ে দেন, যার ফলে সারাদেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠে। এ’সবের সাক্ষী ত অনেকেই। 

প্রখ্যাত বাম নেতা নির্মল সেন তাদের একজন।
শারমিন যদি শেষোক্তদের সাক্ষাৎকার নিতে পারতেন তাহলে আরও দৃঢ়তার সহিত বলতে পারতেন যে, বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং আরও জোর দিয়ে বলতে পারতেন যে, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট ডিভিশনের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত প্রদত্ত রায় অলঙ্ঘনীয়। 
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কথা আরও বহু জায়গায় বহুভাবে উল্লেখ আছে। তারপরও শারমিন এবং আমিরুল একটা ধাঁধায় এখনও আছেন যে, কেন বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিন বা আমিরুলকে এ’সব কথা বলেননি। এ’কারণে বিভ্রান্তি হতে পারে, অন্তহীন সংঘাত হতে পারে, কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা বাতিল হয়ে যেতে পারে না। এমনটির ব্যতিক্রম হলে তাজউদ্দিন ও আমিরুল মিথ্যুক প্রমানিত হবেন এবং মুজিব নগর ঘোষণাটি মিথ্যা বলে প্রমানিত হবে। তখন আমিরুলের অবস্থানটা কোথায় দাঁড়াবে? একটা কথার পুনরাবৃত্তি করছি: মঈদুল ইসলাম ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরের আগে কেন জানতে পারেননি যে বঙ্গবন্ধু কোন স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নাই, বঙ্গবন্ধুর নামে যে ঘোষণাটা পাঠান হয়েছিল তা তাজউদ্দিন প্রণীত ঘোষণা যা যে কোনভাবে বঙ্গবন্ধুর নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি তাজউদ্দিনের সাথে সংঘাত সৃষ্টিকারী মুজিব বাহিনীর কথা জানতেন, তাজউদ্দিনকে হত্যার জন্যে শেখ মনির ষড়যন্ত্রের কথা জানতেন কিন্তু একবারও সে সময়ে জানলেন না যে, বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিনের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। এই মইদুল যখন ‘মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর’ কথোপকথনে নিন্মের কথাগুলো বলেন তখন পাঠকের কাছে কি মনে হয়? কেমন করে মুজিব বাহিনীর নেতারা এত দ্রুত ট্রেনিং এর সুযোগ পেলেন; এ.কে. খন্দকারের জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি বললেন “এর দুটি উপাদানের কথা আমি জানি, যা হয়তো আপনার জিজ্ঞাসার উত্তর কিছুটা দিতে পারে’। একটা হচ্ছে, চিত্তরঞ্জন সুতার বরিশাল থেকে এমপিএ হয়েছিলেন ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে। তখন তিনি আওয়ামী লীগ করতেন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিখন্ডিত হওয়ার পর তিনি ন্যাশনাল  আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগদান করেছিলেন। সম্ভবত ১৯৬৮ সালে শেখ সাহেবের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। দুজনই তখন জেলখানায় বন্দি। তিনি শেখ মুজিবকে তখন বলেন, তাঁর সঙ্গে ভারতীয় উচ্চমহলের যোগযোগ আছে, গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনও তাঁর চেনাজানা। তখন শেখ সাহেব বললেন, তুমি কলকাতায় যাবে, সেখানে থাকবে এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে। তারপর চিত্তরঞ্জন সুতার জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ১৯৬৮ সালের দিকে আগরতলা চলে যান। এরপর তিনি চলে যান কলকাতায়। তিনি বেশির ভাগ সময় যোগাযোগ রাখতেন শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রীর সঙ্গে। বোধহয় এই সুবাদে চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা বিভাগ ‘র’—এর ঘনিষ্ঠ একজন হয়ে ওঠেন। এই সব বিবরণ আমি চিত্তরঞ্জন সুতারের কাছেই শুনেছিলাম ১৯৮০ সালে। আমার বই লেখার তাগিদে মুজিব বাহিনী নিয়ে কিছু বিষয় পরিস্কার হওয়ার জন্য ওই বছর গোড়ার দিকে দিল্লিতে আমি পি এন হাকসারের সহায়তা চাই। আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি  আমার সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন ‘র—এর প্রধান আর এন কাওয়ের সঙ্গে। দুজনই তখন অবসরপ্রাপ্ত। কাও আমাকে বিশেষ কিছু বলেননি, কিন্তু ব্যবস্থা করে দেন উবানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার। তিনিও অবসরপ্রাপ্ত। উবান বরং অনেক তথ্যই দেন এবং কলকাতায় চিত্তরঞ্জন সুতারের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন। চিত্তরঞ্জন সুতারের কাছে ‘র’ এর সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার এই বিবরণ আমি পাই।’
‘১৯৭১—এর মার্চ মাসে পাকিস্তানি আক্রমণ শুরু হওয়ার মুখে শেখ মুজিব যুবনেতাদের চিত্তরঞ্জন সুতারের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। স্পষ্টতই একটা পূর্ব নির্ধারিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এটা ঠিক করা হয়েছিল, যার হয়তো কিছুটা আভাস পাওয়া যাবে আরেকটা যে উপাদানের কথা আমি বলতে চলেছি তার মধ্য দিয়ে।’

১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর শেখ সাহেব জেল থেকে বেরোন। ওই বছর অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে ইয়াহিয়ার শাসনামলে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। ঠিক এমন সময় ইন্দিরা গান্ধীও লন্ডনে যান। সেই সময় ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন শেখ মুজিব। লন্ডনে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে শেখ সাহেবের দেখা হয় হামস্টেড হিথের একটা বাড়িতে। সেখানে ছিলেন আই সিং নামে এক পাঞ্জাবী ভদ্রলোক। আই সিং ছিলেন লন্ডনে ভারতীয় দূতাবাসের কাউন্সিলর। তিনি আসলে ছিলেন লন্ডনে ‘র—এর প্রধান। শেখ মুজিব ও ইন্ধিরা গান্ধীর বৈঠকে ব্যবস্থা করেছিলেন আই সিং নিজের বাড়িতেই। ১৯৭২ সালে আমি যখন লন্ডনে যাই, তখন আই সিং আমার সম্পর্কে জানতেন। হয়তো পি এন হাকসার বা ডি পি ধরের সুবাধে। ডি পি ধর তখন ভারতের পরিকল্পনামন্ত্রী এবং পি এন হাকসার প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি। আই সিং নিজেই একদিন এসে আমাকে তাঁর পরিচয় দেন। এবং তাঁকে কথা বলতে উৎসুকই দেখি। পুরোনো দিনের কথা প্রসঙ্গে আই সিং আমাকে জানান, সেই ১৯৬৯ সালের বৈঠকে তিনি নিজেও উপস্থিত ছিলেন। কেননা এটা একটা সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবেই শুরু হয়। সেই বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন যে আমরা জানি, নির্বাচনে আমরা বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতব। কিন্তু ওরা আমাদের ক্ষমতা দেবে না। ঠিক ১৯৫৪ সালের মতো হবে। আবার কেন্দ্রীয় শাসন জারি করবে। ধরপাকর করবে। শেখ সাহেব আরও বললেন, ‘কিন্তু এবার আমি তা হতে দেব না। আমার কিছু ছেলেকে তোমাদের অস্ত্রপ্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর একটা বেতার যন্ত্র দিতে হবে, যেখান থেকে তারা যাতে প্রচার করতে পারে যে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।’ আই সিংয়ের এই তথ্য আমি বিশ্বাসযোগ্য মনে করি, কেননা হুবহু একই ধরনের গেম—প্ল্যানের কথা আমি শুনেছিলাম ১৯৬২ সালে, যখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেপ্তার করা হয়’’।

আই সিংয়ের ভাষ্য মোতাবেক ইন্দিরা গান্ধী সহানভূতির সঙ্গেই শেখ মুজিবকে আশ্বাস দেন যে আমরা যথাসাধ্য সাহায্য করব। ঘটনা ঘটুক, দেখা যাক। এ সময় মিসেস গান্ধী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বটে, তবে মোরারজি দেশাইয়ের সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাঁর ক্ষমতা লড়াইয়ের ফলাফল তখন অনিশ্চিত। তাঁকে একটা নির্বাচন মোকাবিলা করতে হবে ১৯৭১ সালের শুরুতে। এই নির্বাচন ছিল ইন্দিরা গান্ধীর জন্য মরা—বাঁচার লড়াই। সে বছর মার্চ মাসের মাঝামাঝি সে নির্বাচন হয়। তাতে তিনি জয়যুক্ত হন।
এই দুটো উপাদান ছাড়াও আরও নিশ্চয় অনেক যোগাযোগ ছিল, ঘটনা ছিল। ঘটনার জটিল ডালপালাও ছিল। ফলে পাকিস্তানিরা ধ্বংশযজ্ঞ শুরু করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যুবনেতারা কলকাতায় ‘র—এর সহায়তায় সমস্ত সুবিধা পেলেন এবং অক্টোবরের শেষ অবধি তা পেতে থাকলেন। এখনো এই বিষয়গুলো অজ্ঞাত ও অনুদ্ঘাটিত।

মঈদুল হাসানের সাথে আমার দু’একটি কথা যোগ করি। চিত্ত সুতারের নাম ও ঠিকানা উভয়টি তাজউদ্দিনের জানা ছিল। যুব নেতাদের একজনের সাথে (সিরাজুল আলম খান) পূর্বেই তাজউদ্দিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং সে মাধ্যমে তিনি অনেক কিছু জেনেছেন। সীমান্ত অতিক্রমের আগেই আমিরুলের ভাষায় তারা নিশ্চিত করেই জানলেন যে বিএসএফ বা বর্ডার সিকিউরিটির ফোর্স টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার ম্যাসেজ পেয়েছে এবং তারা সেটা প্রিন্টও করেছে এবং ঐ ম্যাসেজ বিভিন্নভাবে গিয়েছিল। আমিরুল আরও বলছেন ‘আমরা যখন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা করলাম তখন ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার দিন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা কার্যকরী হবে এবং বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার ভিত্তিতে তা হয়েছে। 

আই সি এর মধ্যস্ততায় ইন্দিরার সাথে মুজিবের এ সাক্ষাতকারটি হয়ত দ্বিতীয় সাক্ষাত। এর আগেই নাকি ইন্দিরা যখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন ফনিদাও তারাপদের মাধ্যমে প্রথম একটি সাক্ষাত লন্ডনে হয়েছিল (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। তবে এ বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই কিংবা ১৯৬৪—৬৬ এর কোন সময়ে শেখ মুজিব আদৌও লন্ডনে গিয়েছিলেন কিনা তা খুঁজে দেখতে হবে।

শেষ করার পূর্বে শারমিন আহমদকে আবারও টেনে আনছি, নতুবা সত্যের অপলাপ হবে। শারমিন তার বই নিয়ে বিচিত্র আলোচনায় বলতে গেলে নিশ্চুপ ছিলেন। তবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একটি মন্তব্যে যা উল্লেখ করেন তা প্রনিধানযোগ্য। সেটা আমি একটি দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে আলোচনায় তুলব।  

এ’কথা অনস্বীকার্য যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ৭ই মার্চের ভাষণে বাঙালিদের জন্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে পরবর্তীতে তিনি সর্বজনের জন্যে কোন ঘোষণা দিতে পারবেন। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে তিনি পরবর্তীতে ২৬ শে মার্চ বিভিন্ন প্রহরে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর জন্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার এই ঘোষণার ভিত্তিতে মুজিব নগর সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরী করে। তার ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে এবং এই ঘোষণার ভিত্তিতেই বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বহুদিন পর একান্তই রাজনৈতিক কারনে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল এবং এখনও বিতর্ক অব্যাহত আছে। এটা অবাঞ্ছিত এবং মহাপাতকের কাজ বলেই অনেকে অনুমান করেন; যদি এ’সব বিতর্কে ইন্দন দাতা হোন বঙ্গবন্ধুর কোন সহকর্মী কিংবা তার সহকর্মীদের সন্তান—সন্ততি। অবশ্য তাদের সংখ্যা মুষ্টিমেয়; ভুল সংশোধন করে নিলেও তাদের অন্যতম হলেন শারমিন আহমদ। 

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের কন্যা, শারমিন আহমদ ‘তাজউদ্দিন আহমদ, নেতা ও পিতা’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। ঐতিহ্য ২০১৪ সালে বইটা প্রকাশ করার পর তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বইটির একাংশে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গ টেনে আপাতত: উপসংহার টেনেছেন যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতার কোন ঘোষণা দেননি। তবে ২৬ শে মার্চ যে ঘোষণাটি বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচারিত হয়েছিল তা তাজউদ্দিন আহমদ প্রণীত এবং হয়ত তারই কোন ছাত্র, শুভাকাঙ্খি ও অনুসারী তা গণ মাধ্যমে কোন না কোন ভাবে তুলে ধরেছেন (পৃঃ ৫৯—৬০)। বইটির ৭১ পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন যে চট্টগ্রাম থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আবদুল হান্নান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তারপর অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ট্রান্স—মিটারের মাধ্যমে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাটি অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তিনিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষ থেকেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তবে জিয়াউর রহমান কত নম্বর ঘোষক সে কথা অবশ্য বলেননি। বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় যে তিনি ৫ম, ৬ষ্ঠ কিংবা ৭ম ঘোষক। এই সংখ্যা বিভ্রান্তির মূল কারন হচ্ছে সবার আগে নাকি মাইকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা রিক্সাযোগে প্রচার করেছিলেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের অফিস সহকারী নূরুল হক (ড. হাসান মাহমুদ, গণমাধ্যম ৮ই মার্চ, ২০২১)। তার সাথে যদি আকাশ বানীর কথা যুক্ত করি তাহলে জিয়ার ক্রম আবার বদলে যাবে। এর সাথে যদি ৩রা মার্চ, ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির প্রস্তাব যোগ করি তাহলে জিয়ার ক্রম পুনরায় বদলে যাবে।

স্বাধীনতার ঘোষক প্রসঙ্গে উপরের কথাগুলো শারমিন, মইদুল হাসানকে উদ্ধৃত করে বলেছেন ঠিকই কিন্তু নিজের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ভিন্ন উপসংহার টেনেছেন। শারমিনের এই বক্তব্য নিয়ে বেশ ক’জন সহমতও পোষণ করেছেন। আমার ধারণা তারা কেউই শারমিনের গ্রন্থটি পুরো না পড়েই মন্তব্য দিয়েছেন। কেউ কেউ অবশ্য পুরো বইটি পড়ে শারমিনকে বাহবা না দিলেও কেউ কেউ শারমিনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে তিনি ‘পূর্বাপর’ সংগতি বিহীণ। ঐসব কারনে কিনা জানিনা অন্তত: এটুকু জানি যে এ’ব্যাপারে খালেদা জিয়ার একটি মন্তব্যের পরই শারমিন তার বইয়ের প্রাসঙ্গিক অধ্যায় নিয়ে জন সম্মুখে হাজির হয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার জামালপুরের ভাষণের প্রসঙ্গে শারমিনের নিজস্ব বক্তব্য নিম্নরূপঃ
‘‘বি এন পি’র সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামালপুরের জনসভায় (২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪) তাজউদ্দিন আহমদ: নেতা ও পিতা বইটি থেকে আমার লেখার উদ্বৃতি (৫৯—৬০ পৃষ্ঠা) দিয়ে বলেছেন যে তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে এনেছিলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেননি। তিনি সচেষ্ট থাকেন এ কথা প্রমাণ করতে যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। (ভিডিও বক্তব্যের লিংক http://www.youtube.com/watch?v=eOev2douY30)। বক্তব্যে তিনি অনুল্লেখিত রাখেন আমার বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়গুলোর উল্লেখিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাকি অংশগুলোর বর্ণনা। বঙ্গবন্ধু আমার বাবা বা দলকে জানিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও তিনি যে ভিন্ন মাধ্যমে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা তথ্য ও সাক্ষাৎকারসহ আমার বইয়ে স্পষ্ট উল্লেখিত (তাজউদ্দিন আহমদ: নেতা ও পিতা ১৪৭—১৪৮, ২৭৪—২৯১, ৩০১—৩১০ পৃষ্ঠা)।

বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার বার্তা পাঠিয়েছিলেন, তার একমাত্র জীবিত সাক্ষী, বঙ্গবন্ধুর পারসোনাল এইড হাজি গোলাম মোরশেদ, যিনি ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার হন, তাঁর ও প্রকৌশলী শহীদ নূরুল হক, যিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে খুলনা থেকে ট্রান্সমিটার এনেছিলেন ঘোষণা দেওয়ার জন্য, তাঁর স্ত্রীর সাক্ষাৎকার আমার বইয়ে ঐতিহাসিক তথ্য হিসাবে উল্লেখিত হয়েছে। হাজি গোলাম মোরশেদের সাক্ষাৎকারে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে তথ্যটি আমার জানামতে আমার বইতেই প্রথম উল্লেখ হয়। বইয়ে আরও উল্লেখিত যে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে ২৬ মার্চ দুপুরে এবং সেই সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন (১৪৭ পৃষ্ঠা) এবং ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে পরবর্তী ঘোষণা দেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান (৭১ ও ১৪৭ পৃষ্ঠা)। আরও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, যা বইয়ে ব্যারিষ্টার আমীর—উল—ইসলামের সাক্ষাৎকারে উদ্বৃত হয়েছে, তা হলো,’....অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। অতএব, ওই দিন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা কার্যকর হবে।’’ (২৭১ পৃষ্ঠা) (প্রথম আলো ১৩/১০/২০১৪)।

এরপর কি বলা যায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা দেননি? এ কথা থেকে এটাও উদঘাটিত হয়েছে যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার তিনটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রথমটি ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে, দ্বিতীয়টি সুবেদার মেজর শওকত আলীর মাধ্যমে এবং তৃতীয়টি পুলিশের ওয়ারলেসের মাধ্যমে।

তিনটি ঘোষণা দিয়েছেন একই ব্যক্তি, একই স্থান থেকে একই দিনের বিভিন্ন প্রহরে। তাহলে এখানে যে অন্যের কোন অংশীদারিত্ব নেই বা বাইরের কেউ জড়িত নেই তা স্পষ্ট। এর ভিত্তিতে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটির রচয়িতা আমিরুল ইসলাম। এ’ব্যাপারে তাজউদ্দিন আহমদ, রেহমান সোবহান ও সুব্রত রায় চৌধুরীর কিছুটা অংশীদারিত্ব রয়েছে। তবে এই ঘোষণা পত্রের মূল মালিক বা স্বত্ব বা উৎস হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং দেশের সকল অঞ্চল থেকে হাজারো ঘোষণা পঠিত হলেও তার মূল প্রণেতা, প্রকাশক ও প্রবক্তা হচ্ছেন আইনত: কার্যত: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

এই ঘোষণার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তা করা হয়েছে আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে এবং বাংলাদেশে জনগণের জন্য সমতা, মানব মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। আরও বিশ্লেষণে দেখা যায় এই ঘোষণা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক নীতি ও আইন অনুসারে। স্বাধীনতার সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় একজনের নাম আসে তিনি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- একজন প্রকৃত জননেতা। প্রক্রিয়াটি এমন যে অন্য কোন ব্যক্তি বা নেতার নাম আসতে পারেনা এবং স্বাভাবিকভাবে আসেনি। এই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম স্বাধীনতার ঘোষণা দাতা রূপে বহু কাটা ছেঁড়ার পরও সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়ে আছে। এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে ও তার রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান সকলের কর্তব্য। একই কারণে এ’সবের যেকোন জাতীয় লংঘন পেনাল কোর্ট ১২৩ এ ও সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত মোতাবেক দন্ডনীয় অপরাধ।

এই ঘোষণার বিরাট বিস্তার ও পটভূমি বিবেচনায় নিয়ে এবং বিশেষতঃ ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে এ স্বাধীনতার ঘোষণা বা ডাক। এই ডাক শুধু একজনই দিতে পারেন এবং এক ডাক দেবার পেছনে ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব একজন ব্যক্তিরই ছিল যার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই ঘোষণা তৈরি ও ১৭ এপ্রিল এই ঘোষণা প্রকাশ্যে পঠিত হলেও তা ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ সাল থেকে কার্যকরী করা হয়েছে বলে গণ্য হয়েছে। কেননা বঙ্গবন্ধু নিজে এই ঘোষণা প্রত্যাহার করেননি এবং নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিগণ এই ব্যক্তি ও ঘোষণা ব্যতিরেকে অন্য কোন ব্যক্তি বা ঘোষণার অনুমোদন দেয়নি। অবস্থার প্রেক্ষিতে ঘোষণাপত্র ঘোষিত হয়েছে মুজিব নগরে। তবুও ঘোষণার স্থান একমাত্র ঢাকা ছাড়া অন্য কোন জায়গা নয়। সর্বাধিক সংখ্যক বার পঠিত এই ঘোষণার স্থান চট্টগ্রাম হলেও স্বাধীনতার ঘোষণায় আইনত চট্টগ্রামের কোন স্থান নেই। 

চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তাই দেখা যায় বাংলাদেশের সংবিধানে আক্ষরিক অর্থে স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হচ্ছেন ফাউন্ডিং ফাদারদের নেতা। এই ফাউন্ডিং ফাদারগণ বা প্রতিষ্ঠাতা জনগণ, সার্বভৌম জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। আবার এই প্রতিষ্ঠাতা জনকবৃন্দের নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে তিনি নির্বাচিত সদস্যদের সংসদীয়নেতা এবং ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যতঃ তিনি প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট; ২৬ মার্চ ঢাকার স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের কালে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে প্রেসিডেন্ট ও সংবিধান রচনার সময় প্রধানমন্ত্রী রূপে সবসময় এই প্রক্রিয়ায় জনকদের নেতা। এই ঘোষণা বলেই তিনি পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সুতরাং সংবিধানের মর্মার্থে ও পরবতীর্ সংশোধনীর প্রেক্ষিতে তিনি জাতির পিতাও বটে। এতে সার্বভৌম জনগণেরও সম্মতি রয়েছে।

তবে মুজিবনগর সরকার গঠনের প্রেক্ষিতে ও পরবর্তীতে তার ভিত্তিতে দেশের প্রথম সংবিধান রচনা ও রক্ষনের মাধ্যমে ২৬ শে মার্চ সর্বজনীন স্বাধীনতা ঘোষণার দিন। তবে যারা বলেন বঙ্গবন্ধু ২৬ শে মার্চ তেমন কোন ঘোষণা দেননি কিংবা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন; তারা অবৈধ ও বে—আইনী কাজটি করছেন। তাদেরকে বাগে আনার সাংবিধানিক ও আইনী দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। 

*অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ

পাদ—টীকাঃ এ লেখাটি মোটামুটি পুরানো তবে প্রাসঙ্গিক বলেই কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সহকারে পুন:প্রকাশ করা হলো।

ট্যাগ: bdnewshour24