banglanewspaper

দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে তোলা মহামারী নভেল করোনাভাইরাসের উৎসাগার নিয়ে পাল্টাপাল্টি বাগযুদ্ধে নেমেছে বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।

২০১৯ সালে প্রথম চীনের উহানে অতিসংক্রামক করোনাভাইরাসের একটি ধরন ধরা পড়ার পর সেখানে প্রাণহানি শুরু হয়। এরপর দক্ষিণ কোরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে এই ব্যাধি ধরা পড়ার পর এটিকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।


সেই থেকে নভেল করোনাভাইরাসের এই নতুন ধরনটি ছড়ানোর উৎস নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। শুরু থেকেই সেসময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এর জন্য চীনকে দায়ী করে আসছিল।

ট্রাম্প করোনাভাইরাসকে ‘চায়না ভাইরাস’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি বলেছিলেন, করোনার সংক্রমণের জন্য চীনই দায়ী। তাই চীনকে এই মহামারির দায় নিতে হবে।

যদিও শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন চীন বরাবরই এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র সরকারসহ কিছু বিজ্ঞানীর করোনাভাইরাসের উৎস তদন্তের দাবির প্রেক্ষিতে চীন শুরুতে এই দাবিকে কোনো পাত্তা না দিলেও এক পর্যায়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মধ্যস্থতায় উহানে তদন্ত করতে দিতে রাজি হয়।

নভেল করোনাভাইরাসের এই নতুন ধরনটির (যেটি কোভিড-১৯ নামে পরিচিত) উৎপত্তি নিয়ে এখনো তেমন কিছু জানা যায়নি। কখনো বলা হয়েছে, বাদুড় থেকে ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রথম সংক্রমিত হয়েছে।

আবার উহানের ল্যাব থেকে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে বলেও প্রচার-প্রচারণা আছে। তবে এ ভাইরাস ঠিক কীভাবে ছড়িয়েছে, সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিয়ে এখন পর্যন্ত তা প্রমাণ করা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির তথ্য মতে, করোনায় এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ১৬ কোটি ৮২ লাখ মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন। মারা গেছেন প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।

ট্রাম্পের বিদায়ের পর জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর করোনাভাইরাসের উৎপত্তির অনুসন্ধানে নামে যুক্তরাষ্ট্র। চলছে চীনের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি বাগযুদ্ধ। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে চীন হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছে, করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল নিয়ে রাজনীতি করাটা ভাইরাস নিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে।

সম্প্রতি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল করোনা নিয়ে একটি মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, উহানের একটি ল্যাবে কর্মরত তিনজন গবেষক অসুস্থতা নিয়ে ২০১৯ সালের নভেম্বরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। করোনা প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে চীনের তথ্য প্রকাশের আগেই এ ঘটনা ঘটেছিল। ওই প্রতিবেদনের পর উহানের ল্যাব থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে বলে বিদ্যমান সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।

চীন বরাবরই উহানের ল্যাবকে দায়ী করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশগুলো ভাইরাস প্রতিরোধে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯-এর উৎস নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো গবেষণা শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়ায় উহানের ল্যাব থেকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তকারীদের আরও প্রবেশাধিকার দিতে এক ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে চীন।

সর্বশেষ স্থানীয় সময় বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন মহামারি করোনার উৎপত্তি নিয়ে তার দেশের গোয়েন্দাদের বিস্তারিত তদন্ত করে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পেশ করার নির্দেশ দেন।

বিস্তারিত তদন্তে অংশ নেওয়ার জন্য চীনের ওপর চাপ দেওয়ার কথাও বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে চীন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন আদেশ মহামারি প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাইডেন বলেন, চলতি মাসের শুরুতে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে একটি হালনাগাদ প্রতিবেদন তিনি পেয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বাড়তি প্রয়াস চালিয়ে এ ভাইরাস কীভাবে প্রথম মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়েছে, সে বিষয়ে একটি নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসার জন্য প্রেসিডেন্ট বাইডেন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। নিবিড় তদন্তের আওতায় চীনকে এ নিয়ে প্রশ্ন করার বিষয়টিকেও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি।

জো বাইডেনের এমন নির্দেশের পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের দূতাবাস। তাদের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতিতে চীনা দূতাবাসা বলেছে, ‘রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং দোষারোপের খেলা খেলতে কিছু রাজনৈতিক শক্তি জোট বেঁধেছে।’

উহানের ল্যাব পর্যন্ত তদন্ত বিস্তৃত করতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সব প্রয়াসকে সমন্বিত করার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন। বাইডেনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমেরিকা বিশ্বের সমমনাদের সঙ্গে নিয়ে চীনের ওপর এ বিষয়ে চাপ প্রদান করবে। একটি স্বচ্ছ, প্রমাণভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্যায়ের তদন্ত পরিচালনার প্রয়াসের কথা বলেছেন বাইডেন।

করোনাভাইরাসের উৎস অনুসন্ধানের জন্য চলতি বছরের শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা চীন গিয়েছিলেন। তদন্তকারীদের চীন পূর্ণ সহযোগিতা করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা করোনার উৎস সম্পর্কে কোনো পূর্ণ সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জেন সাকি বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন করে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করার ব্যাপারকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। এমন তদন্তে চীনকে এগিয়ে আসতে হবে। তদন্ত দলের সব পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার চীনকে নিশ্চিত করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চীনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে, দেশটি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে করোনার সংক্রমণ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত। তবে এমন সব তত্ত্ব ও অভিযোগের বিষয়ে চীন সবসময় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে।

ট্যাগ: bdnewshour24